alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। চাঞ্চল্যকর এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করতে যাচ্ছে।

আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ভোটারেরা নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে ভোট দিয়েছে বিএনপির প্রার্থীকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপি সেই ভোটগুলো আর পাবে না।এখন জামায়াত স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেখা গেছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে

ওয়াশিংটন পোস্টের এই ধারণার পেছনে রয়েছে এক অডিও বার্তা- এই অডিও বার্তায় ঢাকাস্থ মার্কিন কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে সম্প্রতি ইসলামী ভাবধারা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফলাফল করবে। এমন পূর্বাভাস পেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের বন্ধু হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং টেলিভিশনের টকশোতে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন শিবিরের প্রভাবশালী সদস্যদের উপস্থিতি কামনা করছে। অডিওর কথোপকথনে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবে না, দিলেও তার প্রতিকার রয়েছে আমেরিকার হাতে, তখন তারা জামায়াতে ইসলামী সরকারের ওপর শতভাগ ট্যারিফ বা বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করবে।

আমেরিকার সঙ্গে এমন একটি ‘অলিখিত সমঝোতা’ থেকেই সম্ভবত জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দিয়েছে যে, ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। উপরিল্লিখিত আমেরিকান কূটনৈতিক অবশ্য শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেননি, বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব ব্যাখ্যার শরিয়াহ আইন সম্পর্কে। আমেরিকা কখনো শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে ছিল না, এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। কারণ তারা চায় মুসলিম সমাজ পেছনে হাঁটুক, মুসলিম সমাজ সামনে এগিয়ে গেলে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। শরিয়াহ আইনে শাসন হচ্ছে ব্রুনাই, ইরান, আফগানিস্তান, সউদি আরবসহ আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ; কিন্তু আমেরিকা শুধু আফগানিস্তান আর ইরানকে শায়েস্তা করতে চায়, ব্রুনাই বা সৌদি আরবকে নয়। আমেরিকার কথা শুনে ওঠবস করলে কোন অপকর্মই আর অপকর্ম থাকে না, সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সউদি দূতাবাসে করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে বস্তাবন্দী করার পরও সৌদি আরব আমেরিকার রোষ থেকে রেহাই পেয়ে যায়, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারকে গোপনীয় চুক্তি করে আমেরিকার থাবা থেকে রক্ষা পেতে হয়। তাই আমেরিকা আসন্ন নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী বিএনপি এবং জামায়াত উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্গ্রীব। কিন্তু ভোট তো আমেরিকা দেবে না, ভোট দেবে বাংলাদেশের ভোটার। নির্বাচনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কারচুপি রোধ করা না গেলে সব পূর্বাভাস উল্টে যেতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবুল আলা মওদুদী পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেছিলেন। মাসিক ‘তরজমানুল কোরআন’ ম্যাগাজিনে মওলানা মওদুদী লিখেন যে, পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা হবে ‘আহাম্মকের বেহেশত’ এবং ‘মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র’। ১৯৫৩ সনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে ঘটানো দাঙ্গায় কাদিয়ানি নামে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের শত শত লোককে হত্যার অভিযোগে মওলানা মওদুদীকে পাকিস্তানের আদালত ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল, সউদি আরবের চাপে তা আর কার্যকর হয়নি, ১৯৫৫ সনে পাকিস্তানের সামিরক সরকার তাকে ছেড়ে দেয়। ১৯৭১ সনে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘঠিত ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা ও ধর্ষণের সহযোগী ছিল জামায়াতে ইসলামী। এই দলটি শুধু স্বাধীনতার বিরোধিতা ও গণহত্যার মধ্যে তাদের কর্মকা- সীমাবদ্ধ রাখেনি, স্বাধীনতা লাভের পরও তারা লন্ডনে ‘পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটি’ গঠন করেছিল, মুসলিম দেশগুলো যাতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয় সেই চেষ্টাও চালিয়ে গিয়েছিল। এখন এই দলটিই বাংলাদেশের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বে¡ও জামায়াতে ইসলামী কখনো কোন নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারেনি, এমনকি পাকিস্তানেও তাদের অগ্রগতি জিরো। ১৯৭০ সনে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ১৫১ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৪টি আসনে জামাত-ই-ইসলাম বিজয়ী হয়েছিল, তা-ও পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানে পরাজিত করতে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার জামায়াতকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলÑ জামায়াতকে সরকারে সমর্থন দেয়ার ফিরিস্তি রাও ফরমান আলীর ‘ভুট্টো শেখ মুজিব বাংলাদেশ’ বইটিতে আছে। ১৯৮৬ সনের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসন, ১৯৯১ সনে ১৮টি, ১৯৯৬ সনে ৩টি, ২০০১ সনে ১৭টি, ২০০৮ সনে মাত্র ২টি আসন পেয়েছিল। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের লোকজন তুলনামূলকভাবে বেশি ধর্মপ্রাণ হলেও ইসলামপন্থীদের ভোট দেয় না। কিন্তু এবার একটু ভিন্ন চিত্র মনে হচ্ছে, জামায়াতের আসন সংখ্যার তুলনায় ভোটের সংখ্যা বেড়ে যাবে, যা কাজে লাগবে সংসদের উচ্চ কক্ষে। আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ভোটারেরা নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে ভোট দিয়েছে বিএনপির প্রার্থীকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপি সেই ভোটগুলো আর পাবে না।এখন জামায়াত স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেখা গেছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা যেভাবে দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- করেছে তা যথাযথভাবে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিত্রায়িত হয়েছে, এই প্রচারে জামায়াতের লোকজন অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। এর ফলে বিএনপির প্রতি দলনিরপেক্ষ জনগণের বিরক্তি জন্মায়, তারা একবার জামায়াতকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তারা বলতে থাকে ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির সরকার দেখেছি, এবার জামায়াতকে দিয়ে দেখি’। এদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। কিন্তু বিএনপির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান আনুকল্য দেখে প্রশাসন এবং জনগণ নিশ্চিত হয়েছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসছে। উপরন্তু জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ও ভোটপ্রার্থীর লাগামহীন কথাবার্তায় তাদের সম্পর্কে ভুল বার্তা পরিবেশিত হতে থাকে, তাদের অনভিপ্রেত কথাবার্তায় ভোটারদের মধ্যে অজানা ভীতির সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ ব্লাণ্ডার করেছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি সাবেক টুইটার পোস্ট, উক্ত পোস্টে আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে আসাকে ‘বেশ্যার’ নামান্তর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বলছে, এই পোস্ট আমির দেননি, টুইটার একাউন্টটি হ্যাকড হয়েছিল। এছাড়া বিরুদ্ধমতের ইসলামপন্থী আলেমগণ অবিরত জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে ওয়াজ করে যাচ্ছেন। সর্বোপরি জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর সরে যাওয়াতে ভোটের মাঠে জামায়াত কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জামায়াত বা বিএনপির নেতাকর্মীরা যত ভুল-ত্রুটি ও অপরাধই করুক না কেন তাদের দলীয় ভোটের হেরফের হবে না, যেমন হয়নি রংপুরে এরশাদ সাহেবের বেলায়। বিগত ১৭ মাস ধরে লক্ষ্য করছি, যাদের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির সমর্থক বলে মনে হতো তারা এখন প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামের কথা বলছে।আমি এক চাকরিজীবী নারীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াতের পক্ষে পোস্ট দেয়া থেকে শত চেষ্টা করেও থামাতে পারিনি, তার বদ্ধমূল ধারণা জামায়াত ক্ষমতায় আসবে এবং তার পোস্টগুলোর কারণে ভবিষ্যতে তার চাকরির কোন সমস্যা হবে না। এমন ধারণা অনেকের মনে নতুন করে জন্ম নিয়েছে।জামায়াতের পক্ষে মানুষের কথা বলার আরেকটি কারণ হচ্ছে, মানুষ দুর্নীতি সহ্য করে না- আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ মানুষ বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় ছিল না বিধায় তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নেই, বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে জামায়াতের যে তিনজন মন্ত্রী ছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই, তাই কিছু ভোট তারা এই কারণেই পাবে। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় তাদের মধ্যেও হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে।তারপরও বলতে হয়, দেশের সব জায়গায় জামায়াতের জনভিত্তি বিএনপির মতো সবল নয়।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এই বিষয়টি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুদিন আগে লন্ডনে অবস্থানকালীন আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘নো বোট, নো ভোট’ স্লোগানের প্রচার হলেও নির্বাচনে কর্মী ও ভোটারদের করণীয় নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কোন নির্দেশনা এখনো স্পষ্ট হয়নি। আওয়ামী লীগের ভোট বর্জন বা অংশগ্রহণে ভোটের দৃশ্যপট বদলে যাবে। ৫ আগস্টের পর বিএনপি, জামায়াত উভয় দলই আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, এখনো ভয়-ভীতির মধ্যে রেখেছে। বিএনপি এবং জামায়াতের কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ ভোটারদের হুমকি দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা করছেন, নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ। তাই ভয়-ভীতির কারণে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকের আচরণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। আতঙ্কগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে গেলে যে বিপদ কেটে যাবে তা কিন্তু নয়- বিএনপি, জামায়াত যে দলের প্রার্থীই পরাজিত হোক না কেন, সব দোষ হবে আওয়ামী লীগ ভোটারদের।

সর্বশেষে টাকার খেলা হবে। আওয়ামী লীগ একনাগাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করে দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করা অন্য দলের প্রার্থীরা চলমান নির্বাচনে দুহাতে যেভাবে খরচ করছে তা দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এরা এত টাকা পেল কই? কে যে দুর্নীতিবাজ, আর কে যে দুর্নীতির দোসর তা বোঝার উপায় নেই। তবে একটি বিষয়ের প্রতি সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, অধিকাংশ প্রার্থীর মাথায় এখন সর্বক্ষণ টুপি থাকে। এদেরই অনেকে নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতিবাজ হয়। এসব দুর্নীতিবাজদের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সাবেক চিফ জাস্টিজ মুহাম্মদ রোস্তম কায়ানী তার ‘নট দ্য হোল ট্রুথ’ বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, বিচারক জীবনে তিনি প্রায় সব চোর, ডাকাত, বদমাশ, দুর্নীতিবাজ অপরাধীকে এজলাসে টুপি পরা অবস্থায় দেখেছেন।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, দুর্বিনীত এবং দম্ভোক্তি সুইং ভোটারদের মতো পরিবর্তনের সহায়ক। বিএনপি এই নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, কারণ ১৯৯১ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবশ্যম্ভাবী জয় শেষ পর্যন্ত কষ্টদায়ক পরাজয়ে পর্যবসিত হয়েছিল।এমন একটি ধারণা এবারের নির্বাচনেও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। শেষ কথা, অন্তর্বর্তী সরকার ও আমেরিকার মনোভাব দুর্জ্ঞেয়, তারা যা বলে তা করে না, যা মনের মধ্যে থাকে তাই করে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। চাঞ্চল্যকর এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করতে যাচ্ছে।

আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ভোটারেরা নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে ভোট দিয়েছে বিএনপির প্রার্থীকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপি সেই ভোটগুলো আর পাবে না।এখন জামায়াত স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেখা গেছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে

ওয়াশিংটন পোস্টের এই ধারণার পেছনে রয়েছে এক অডিও বার্তা- এই অডিও বার্তায় ঢাকাস্থ মার্কিন কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে সম্প্রতি ইসলামী ভাবধারা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফলাফল করবে। এমন পূর্বাভাস পেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের বন্ধু হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং টেলিভিশনের টকশোতে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন শিবিরের প্রভাবশালী সদস্যদের উপস্থিতি কামনা করছে। অডিওর কথোপকথনে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবে না, দিলেও তার প্রতিকার রয়েছে আমেরিকার হাতে, তখন তারা জামায়াতে ইসলামী সরকারের ওপর শতভাগ ট্যারিফ বা বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করবে।

আমেরিকার সঙ্গে এমন একটি ‘অলিখিত সমঝোতা’ থেকেই সম্ভবত জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দিয়েছে যে, ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। উপরিল্লিখিত আমেরিকান কূটনৈতিক অবশ্য শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেননি, বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব ব্যাখ্যার শরিয়াহ আইন সম্পর্কে। আমেরিকা কখনো শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে ছিল না, এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। কারণ তারা চায় মুসলিম সমাজ পেছনে হাঁটুক, মুসলিম সমাজ সামনে এগিয়ে গেলে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। শরিয়াহ আইনে শাসন হচ্ছে ব্রুনাই, ইরান, আফগানিস্তান, সউদি আরবসহ আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ; কিন্তু আমেরিকা শুধু আফগানিস্তান আর ইরানকে শায়েস্তা করতে চায়, ব্রুনাই বা সৌদি আরবকে নয়। আমেরিকার কথা শুনে ওঠবস করলে কোন অপকর্মই আর অপকর্ম থাকে না, সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সউদি দূতাবাসে করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে বস্তাবন্দী করার পরও সৌদি আরব আমেরিকার রোষ থেকে রেহাই পেয়ে যায়, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারকে গোপনীয় চুক্তি করে আমেরিকার থাবা থেকে রক্ষা পেতে হয়। তাই আমেরিকা আসন্ন নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী বিএনপি এবং জামায়াত উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্গ্রীব। কিন্তু ভোট তো আমেরিকা দেবে না, ভোট দেবে বাংলাদেশের ভোটার। নির্বাচনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কারচুপি রোধ করা না গেলে সব পূর্বাভাস উল্টে যেতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবুল আলা মওদুদী পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেছিলেন। মাসিক ‘তরজমানুল কোরআন’ ম্যাগাজিনে মওলানা মওদুদী লিখেন যে, পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা হবে ‘আহাম্মকের বেহেশত’ এবং ‘মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র’। ১৯৫৩ সনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে ঘটানো দাঙ্গায় কাদিয়ানি নামে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের শত শত লোককে হত্যার অভিযোগে মওলানা মওদুদীকে পাকিস্তানের আদালত ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল, সউদি আরবের চাপে তা আর কার্যকর হয়নি, ১৯৫৫ সনে পাকিস্তানের সামিরক সরকার তাকে ছেড়ে দেয়। ১৯৭১ সনে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘঠিত ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা ও ধর্ষণের সহযোগী ছিল জামায়াতে ইসলামী। এই দলটি শুধু স্বাধীনতার বিরোধিতা ও গণহত্যার মধ্যে তাদের কর্মকা- সীমাবদ্ধ রাখেনি, স্বাধীনতা লাভের পরও তারা লন্ডনে ‘পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটি’ গঠন করেছিল, মুসলিম দেশগুলো যাতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয় সেই চেষ্টাও চালিয়ে গিয়েছিল। এখন এই দলটিই বাংলাদেশের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বে¡ও জামায়াতে ইসলামী কখনো কোন নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারেনি, এমনকি পাকিস্তানেও তাদের অগ্রগতি জিরো। ১৯৭০ সনে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ১৫১ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৪টি আসনে জামাত-ই-ইসলাম বিজয়ী হয়েছিল, তা-ও পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানে পরাজিত করতে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার জামায়াতকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলÑ জামায়াতকে সরকারে সমর্থন দেয়ার ফিরিস্তি রাও ফরমান আলীর ‘ভুট্টো শেখ মুজিব বাংলাদেশ’ বইটিতে আছে। ১৯৮৬ সনের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসন, ১৯৯১ সনে ১৮টি, ১৯৯৬ সনে ৩টি, ২০০১ সনে ১৭টি, ২০০৮ সনে মাত্র ২টি আসন পেয়েছিল। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের লোকজন তুলনামূলকভাবে বেশি ধর্মপ্রাণ হলেও ইসলামপন্থীদের ভোট দেয় না। কিন্তু এবার একটু ভিন্ন চিত্র মনে হচ্ছে, জামায়াতের আসন সংখ্যার তুলনায় ভোটের সংখ্যা বেড়ে যাবে, যা কাজে লাগবে সংসদের উচ্চ কক্ষে। আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ভোটারেরা নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে ভোট দিয়েছে বিএনপির প্রার্থীকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপি সেই ভোটগুলো আর পাবে না।এখন জামায়াত স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেখা গেছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা যেভাবে দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- করেছে তা যথাযথভাবে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিত্রায়িত হয়েছে, এই প্রচারে জামায়াতের লোকজন অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। এর ফলে বিএনপির প্রতি দলনিরপেক্ষ জনগণের বিরক্তি জন্মায়, তারা একবার জামায়াতকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তারা বলতে থাকে ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির সরকার দেখেছি, এবার জামায়াতকে দিয়ে দেখি’। এদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। কিন্তু বিএনপির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান আনুকল্য দেখে প্রশাসন এবং জনগণ নিশ্চিত হয়েছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসছে। উপরন্তু জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ও ভোটপ্রার্থীর লাগামহীন কথাবার্তায় তাদের সম্পর্কে ভুল বার্তা পরিবেশিত হতে থাকে, তাদের অনভিপ্রেত কথাবার্তায় ভোটারদের মধ্যে অজানা ভীতির সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ ব্লাণ্ডার করেছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি সাবেক টুইটার পোস্ট, উক্ত পোস্টে আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে আসাকে ‘বেশ্যার’ নামান্তর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বলছে, এই পোস্ট আমির দেননি, টুইটার একাউন্টটি হ্যাকড হয়েছিল। এছাড়া বিরুদ্ধমতের ইসলামপন্থী আলেমগণ অবিরত জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে ওয়াজ করে যাচ্ছেন। সর্বোপরি জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর সরে যাওয়াতে ভোটের মাঠে জামায়াত কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জামায়াত বা বিএনপির নেতাকর্মীরা যত ভুল-ত্রুটি ও অপরাধই করুক না কেন তাদের দলীয় ভোটের হেরফের হবে না, যেমন হয়নি রংপুরে এরশাদ সাহেবের বেলায়। বিগত ১৭ মাস ধরে লক্ষ্য করছি, যাদের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির সমর্থক বলে মনে হতো তারা এখন প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামের কথা বলছে।আমি এক চাকরিজীবী নারীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াতের পক্ষে পোস্ট দেয়া থেকে শত চেষ্টা করেও থামাতে পারিনি, তার বদ্ধমূল ধারণা জামায়াত ক্ষমতায় আসবে এবং তার পোস্টগুলোর কারণে ভবিষ্যতে তার চাকরির কোন সমস্যা হবে না। এমন ধারণা অনেকের মনে নতুন করে জন্ম নিয়েছে।জামায়াতের পক্ষে মানুষের কথা বলার আরেকটি কারণ হচ্ছে, মানুষ দুর্নীতি সহ্য করে না- আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ মানুষ বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় ছিল না বিধায় তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নেই, বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে জামায়াতের যে তিনজন মন্ত্রী ছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই, তাই কিছু ভোট তারা এই কারণেই পাবে। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় তাদের মধ্যেও হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে।তারপরও বলতে হয়, দেশের সব জায়গায় জামায়াতের জনভিত্তি বিএনপির মতো সবল নয়।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এই বিষয়টি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুদিন আগে লন্ডনে অবস্থানকালীন আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘নো বোট, নো ভোট’ স্লোগানের প্রচার হলেও নির্বাচনে কর্মী ও ভোটারদের করণীয় নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কোন নির্দেশনা এখনো স্পষ্ট হয়নি। আওয়ামী লীগের ভোট বর্জন বা অংশগ্রহণে ভোটের দৃশ্যপট বদলে যাবে। ৫ আগস্টের পর বিএনপি, জামায়াত উভয় দলই আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, এখনো ভয়-ভীতির মধ্যে রেখেছে। বিএনপি এবং জামায়াতের কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ ভোটারদের হুমকি দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা করছেন, নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ। তাই ভয়-ভীতির কারণে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকের আচরণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। আতঙ্কগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে গেলে যে বিপদ কেটে যাবে তা কিন্তু নয়- বিএনপি, জামায়াত যে দলের প্রার্থীই পরাজিত হোক না কেন, সব দোষ হবে আওয়ামী লীগ ভোটারদের।

সর্বশেষে টাকার খেলা হবে। আওয়ামী লীগ একনাগাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করে দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করা অন্য দলের প্রার্থীরা চলমান নির্বাচনে দুহাতে যেভাবে খরচ করছে তা দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এরা এত টাকা পেল কই? কে যে দুর্নীতিবাজ, আর কে যে দুর্নীতির দোসর তা বোঝার উপায় নেই। তবে একটি বিষয়ের প্রতি সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, অধিকাংশ প্রার্থীর মাথায় এখন সর্বক্ষণ টুপি থাকে। এদেরই অনেকে নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতিবাজ হয়। এসব দুর্নীতিবাজদের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সাবেক চিফ জাস্টিজ মুহাম্মদ রোস্তম কায়ানী তার ‘নট দ্য হোল ট্রুথ’ বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, বিচারক জীবনে তিনি প্রায় সব চোর, ডাকাত, বদমাশ, দুর্নীতিবাজ অপরাধীকে এজলাসে টুপি পরা অবস্থায় দেখেছেন।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, দুর্বিনীত এবং দম্ভোক্তি সুইং ভোটারদের মতো পরিবর্তনের সহায়ক। বিএনপি এই নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, কারণ ১৯৯১ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবশ্যম্ভাবী জয় শেষ পর্যন্ত কষ্টদায়ক পরাজয়ে পর্যবসিত হয়েছিল।এমন একটি ধারণা এবারের নির্বাচনেও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। শেষ কথা, অন্তর্বর্তী সরকার ও আমেরিকার মনোভাব দুর্জ্ঞেয়, তারা যা বলে তা করে না, যা মনের মধ্যে থাকে তাই করে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top