সিরাজ প্রামাণিক
জমির মালিক তার জমি বিক্রি করতে চাইলে, প্রথমে অগ্রক্রয় অধিকারীদের বিক্রয়ের খবর জানাতে হবে। ওই জমির ওয়ারিশ সূত্রে যারা সহ অংশীদার, দ্বিতীয়ত ক্রয়সূত্রে যারা সহঅংশীদার এই দুশ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ অগ্রক্রয়ের অধিকারী। তারা আদালতে প্রি-এমপশন মোকদ্দমা দায়েরের মাধ্যমে পুনঃক্রয় করে নিতে পারবেন। যদি তারা ক্রয়ে আগ্রহী না হয় তখন বিক্রেতা বাইরের পার্টির কাছে জমি বিক্রি করতে পারবেন।
আরও সহজ করে বলতে গেলে অগ্রক্রয়াধিকার হলো একটি আইনগত অধিকার, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে কেনার সুযোগ দেয়। এটি মূলত সহশরিক, প্রতিবেশী বা নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এই আইনটি তৈরি হয়েছিল মূলত :
১। ভূমি বিভাজন রোধ করতে, যেন জমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত না হয়
২। পারিবারিক বা যৌথ মালিকানা সংরক্ষণ করা
৩। বহিরাগতদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি হলে পরিবারের মধ্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে
৪। জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাতে মালিকানার জটিলতা সৃষ্টি না হয়
৫। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো
৬। সহশরিকদের মধ্যে সমস্যা এড়ানোর জন্য।
এই অগ্রাধিকার প্রয়োগ করতে হলে কৃষি জমির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (ধারা ৯৬) অনুযায়ী করতে হবে। শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সহশরিকগণ কৃষিজমির অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন। জমি বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। যদি নোটিশ না পান, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা যাবে।
আর অকৃষিজমির ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ ধারা ২৪ অনুযায়ী মামলা করতে হবে। অকৃষি সম্পত্তির ক্ষেত্রে যৌথ মালিক বা প্রতিবেশী অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন। জমি বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ৪ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। যদি নোটিশ না পান, সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে আপনি যেদিন জানবেন সেদিন থেকে ৪ মাসের মধ্যে মামলা করা যাবে।
আর মুসলিম আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, তিন প্রকার (শুফা) অধিকার রয়েছে:
১। যৌথ মালিকানার অংশীদার
২। সম্পর্কিত সুবিধাভোগী
৩। প্রতিবেশী যা বর্তমানে অসাংবিধানিক ঘোষিত।
মনে রাখবেন মুসলিম আইনে হক সুফা মামলা করতে আগে টাকা জমা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। মামলার রায় হওয়ার পর টাকা জমা দিতে হয়। মুসলিম আইনের বিধানমতে প্রিয়েমশন মোকদ্দমায় মুসলিম সম্প্রদায় উপকার পেতে পারে। কিন্তু কোন হিন্দু ক্রেতা মুসলিম আইনে প্রতিকার দাবী করতে পারে না। (৬৭ ডিএলআর ৩০২)
মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের মামলা সর্বোচ্চ ১ বছরের মধ্যে করতে হয়। আর বসতবাড়ির ক্ষেত্রে বাঁটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ (ধারা ৪) অনুযায়ী, যদি কোনো অবিভক্ত বসতবাড়ির অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে অন্যান্য অংশীদাররা সেই সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন।
এ বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালত বলেছেন যে, অগ্রক্রয় মোকদ্দমায় সর্বপ্রথম উত্তরাধিকার সূত্রে শরীক তারপর খরিদা সূত্রে সর্বশেষ পাশ আইলার বিষয় বিবেচনা করা হয়। (৩০ ডিএলআর ৭৫)।
একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। রহিম এবং সুমি দুই ভাই বোন। তারা ৩০ শতক জমির যৌথ মালিক। সুমি তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু রহিম এই জমি কিনতে ইচ্ছুক ও সামর্থ্যবান। সহশরিক হিসেবে রহিমের অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে। তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন। যদি তিনি ২ মাসের মধ্যে না জানেন, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। রহিম আদালতে মামলা করলে জমিটি তিনি পেতে পারেন।
আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। কাদের এবং কলিমদ্দিন যৌথভাবে একটি পুকুরের মালিক। কাদের তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়। পুকুরটি কুলমিদ্দর প্রধান আয়ের উৎস, তাই তিনি এই অংশটি কিনতে চান। সহ-শরিক হিসেবে কলিমদিদ্দর অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী, তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন। যদি নোটিশ না পান, তাহলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। কলিমদ্দি মামলায় জয়ী হলে, তৃতীয় ব্যক্তির ক্রয় বাতিল হবে এবং তিনি পুকুরের মালিক হবেন।
অগ্রক্রয়ের মামলা করার নিয়মঃ
১। মামলায় জমির বিক্রেতা ও ক্রেতাকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
২। যদি বিক্রির আগে মামলা করা হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না
৩। বিক্রির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মামলা করতে হবে
৪। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা না করলে, অগ্রক্রয়ের অধিকার হারিয়ে যাবে।
মামলার খরচ ও আর্থিক দিকঃ
কৃষিজমির ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ২৫% ক্ষতিপূরণ এবং ৮% সরল সুদ জমা দিতে হবে।
অকৃষি জমির ক্ষেত্রে: বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫% ক্ষতিপূরণ এবং উন্নয়নের ওপর অতিরিক্ত ৬.২৫% সুদ দিতে হবে। প্রথম ক্রেতা কর্তৃক উন্নয়ন বাবদ অন্যান্য টাকা যা পরবর্তীতে আদালত সমীচীন মনে করলে জমা দিতে নির্দেশ দিবেন।
অগ্রক্রয়ের মামলা কখন করা যাবে না কিংবা মোকদ্দমাটি আইনত চলবে নাঃ
১. বিক্রীত জমি বসতবাড়ি হয়।
২. অগ্রক্রয়ের মোকদ্দমা দায়ের করার আগেই বিক্রীত জমি যদি বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়
৩. উক্ত বিক্রয় যোগসাজশি বা জাল বিবেচিত হয়
৪. বিনিময় বা অ্যাওয়াজ বা ভাগবাঁটোয়ারা-সংক্রান্ত সম্পত্তি বিক্রি হলে
৫. উইল বা দানমূলে বা হেবামূলে রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে জমি হস্তান্তর হলে
৬. হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে জমি হস্তান্তর করলে
৭. রক্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তিন পুরুষের কোনো দান বা উইল মূলে হস্তান্তর হলে
৮. মুসলিম আইনে ওয়াক্ফ এবং ধর্মীয় কারণে বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত হস্তান্তর হলে
৯। বৈধ পক্ষদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করলে
১০। নির্দিষ্ট সময়সীমার পর মামলা করা হলে
এমন ১০ কারণে জমি হস্তান্তর হলে উক্ত জমিতে আর প্রিয়েমশন করা যাবে না।
আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, আপনি জমি কিনেছেন কিন্তু অগ্রক্রয়ের অধিকারীরা প্রিয়েমশন করার পায়তারা করছে-এমন সময় আপনি জমিটি যদি স্ত্রী সন্তানদের কারও মধ্যে হেবা করে দেন তাহলে ওই জমিতে আর প্রিয়েমশন মোকদ্দমা চলবে না। (৬ বিএলডি, ১২৫)
এছাড়া অগ্রক্রয় মোকদ্দমা দাখিলের পূর্বেই নালিশী খতিয়ান পৃথক হয়ে থাকলে মামলাটি অচল হবে। (৩৯ ডিএলআর, ৭৫)
মোকদ্দমায় আদালত বাদীর আবেদন মঞ্জুর করা হলো তার বরাবর ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেবেন। তবে এ রেজিস্ট্রেশনের জন্য কোনো কর, ডিউটি বা ফিস দিতে হবে না। ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে দিতে ব্যর্থ হলে এর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আদালত সাফ কবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেবেন। মনে রাখবেন এই আদেশের বিরুদ্ধে একবার আপিল করার সুযোগ আছে। আপিলেও অসন্তুষ্ট হলে সুপ্রিম কোর্টে রিভিশন দায়ের করা যেতে পারে।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সিরাজ প্রামাণিক
শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জমির মালিক তার জমি বিক্রি করতে চাইলে, প্রথমে অগ্রক্রয় অধিকারীদের বিক্রয়ের খবর জানাতে হবে। ওই জমির ওয়ারিশ সূত্রে যারা সহ অংশীদার, দ্বিতীয়ত ক্রয়সূত্রে যারা সহঅংশীদার এই দুশ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ অগ্রক্রয়ের অধিকারী। তারা আদালতে প্রি-এমপশন মোকদ্দমা দায়েরের মাধ্যমে পুনঃক্রয় করে নিতে পারবেন। যদি তারা ক্রয়ে আগ্রহী না হয় তখন বিক্রেতা বাইরের পার্টির কাছে জমি বিক্রি করতে পারবেন।
আরও সহজ করে বলতে গেলে অগ্রক্রয়াধিকার হলো একটি আইনগত অধিকার, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে কেনার সুযোগ দেয়। এটি মূলত সহশরিক, প্রতিবেশী বা নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এই আইনটি তৈরি হয়েছিল মূলত :
১। ভূমি বিভাজন রোধ করতে, যেন জমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত না হয়
২। পারিবারিক বা যৌথ মালিকানা সংরক্ষণ করা
৩। বহিরাগতদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি হলে পরিবারের মধ্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে
৪। জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাতে মালিকানার জটিলতা সৃষ্টি না হয়
৫। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো
৬। সহশরিকদের মধ্যে সমস্যা এড়ানোর জন্য।
এই অগ্রাধিকার প্রয়োগ করতে হলে কৃষি জমির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (ধারা ৯৬) অনুযায়ী করতে হবে। শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সহশরিকগণ কৃষিজমির অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন। জমি বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। যদি নোটিশ না পান, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা যাবে।
আর অকৃষিজমির ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ ধারা ২৪ অনুযায়ী মামলা করতে হবে। অকৃষি সম্পত্তির ক্ষেত্রে যৌথ মালিক বা প্রতিবেশী অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন। জমি বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ৪ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। যদি নোটিশ না পান, সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে আপনি যেদিন জানবেন সেদিন থেকে ৪ মাসের মধ্যে মামলা করা যাবে।
আর মুসলিম আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, তিন প্রকার (শুফা) অধিকার রয়েছে:
১। যৌথ মালিকানার অংশীদার
২। সম্পর্কিত সুবিধাভোগী
৩। প্রতিবেশী যা বর্তমানে অসাংবিধানিক ঘোষিত।
মনে রাখবেন মুসলিম আইনে হক সুফা মামলা করতে আগে টাকা জমা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। মামলার রায় হওয়ার পর টাকা জমা দিতে হয়। মুসলিম আইনের বিধানমতে প্রিয়েমশন মোকদ্দমায় মুসলিম সম্প্রদায় উপকার পেতে পারে। কিন্তু কোন হিন্দু ক্রেতা মুসলিম আইনে প্রতিকার দাবী করতে পারে না। (৬৭ ডিএলআর ৩০২)
মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের মামলা সর্বোচ্চ ১ বছরের মধ্যে করতে হয়। আর বসতবাড়ির ক্ষেত্রে বাঁটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ (ধারা ৪) অনুযায়ী, যদি কোনো অবিভক্ত বসতবাড়ির অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে অন্যান্য অংশীদাররা সেই সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন।
এ বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালত বলেছেন যে, অগ্রক্রয় মোকদ্দমায় সর্বপ্রথম উত্তরাধিকার সূত্রে শরীক তারপর খরিদা সূত্রে সর্বশেষ পাশ আইলার বিষয় বিবেচনা করা হয়। (৩০ ডিএলআর ৭৫)।
একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। রহিম এবং সুমি দুই ভাই বোন। তারা ৩০ শতক জমির যৌথ মালিক। সুমি তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু রহিম এই জমি কিনতে ইচ্ছুক ও সামর্থ্যবান। সহশরিক হিসেবে রহিমের অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে। তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন। যদি তিনি ২ মাসের মধ্যে না জানেন, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। রহিম আদালতে মামলা করলে জমিটি তিনি পেতে পারেন।
আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। কাদের এবং কলিমদ্দিন যৌথভাবে একটি পুকুরের মালিক। কাদের তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়। পুকুরটি কুলমিদ্দর প্রধান আয়ের উৎস, তাই তিনি এই অংশটি কিনতে চান। সহ-শরিক হিসেবে কলিমদিদ্দর অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী, তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন। যদি নোটিশ না পান, তাহলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। কলিমদ্দি মামলায় জয়ী হলে, তৃতীয় ব্যক্তির ক্রয় বাতিল হবে এবং তিনি পুকুরের মালিক হবেন।
অগ্রক্রয়ের মামলা করার নিয়মঃ
১। মামলায় জমির বিক্রেতা ও ক্রেতাকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
২। যদি বিক্রির আগে মামলা করা হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না
৩। বিক্রির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মামলা করতে হবে
৪। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা না করলে, অগ্রক্রয়ের অধিকার হারিয়ে যাবে।
মামলার খরচ ও আর্থিক দিকঃ
কৃষিজমির ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ২৫% ক্ষতিপূরণ এবং ৮% সরল সুদ জমা দিতে হবে।
অকৃষি জমির ক্ষেত্রে: বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫% ক্ষতিপূরণ এবং উন্নয়নের ওপর অতিরিক্ত ৬.২৫% সুদ দিতে হবে। প্রথম ক্রেতা কর্তৃক উন্নয়ন বাবদ অন্যান্য টাকা যা পরবর্তীতে আদালত সমীচীন মনে করলে জমা দিতে নির্দেশ দিবেন।
অগ্রক্রয়ের মামলা কখন করা যাবে না কিংবা মোকদ্দমাটি আইনত চলবে নাঃ
১. বিক্রীত জমি বসতবাড়ি হয়।
২. অগ্রক্রয়ের মোকদ্দমা দায়ের করার আগেই বিক্রীত জমি যদি বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়
৩. উক্ত বিক্রয় যোগসাজশি বা জাল বিবেচিত হয়
৪. বিনিময় বা অ্যাওয়াজ বা ভাগবাঁটোয়ারা-সংক্রান্ত সম্পত্তি বিক্রি হলে
৫. উইল বা দানমূলে বা হেবামূলে রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে জমি হস্তান্তর হলে
৬. হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে জমি হস্তান্তর করলে
৭. রক্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তিন পুরুষের কোনো দান বা উইল মূলে হস্তান্তর হলে
৮. মুসলিম আইনে ওয়াক্ফ এবং ধর্মীয় কারণে বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত হস্তান্তর হলে
৯। বৈধ পক্ষদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করলে
১০। নির্দিষ্ট সময়সীমার পর মামলা করা হলে
এমন ১০ কারণে জমি হস্তান্তর হলে উক্ত জমিতে আর প্রিয়েমশন করা যাবে না।
আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, আপনি জমি কিনেছেন কিন্তু অগ্রক্রয়ের অধিকারীরা প্রিয়েমশন করার পায়তারা করছে-এমন সময় আপনি জমিটি যদি স্ত্রী সন্তানদের কারও মধ্যে হেবা করে দেন তাহলে ওই জমিতে আর প্রিয়েমশন মোকদ্দমা চলবে না। (৬ বিএলডি, ১২৫)
এছাড়া অগ্রক্রয় মোকদ্দমা দাখিলের পূর্বেই নালিশী খতিয়ান পৃথক হয়ে থাকলে মামলাটি অচল হবে। (৩৯ ডিএলআর, ৭৫)
মোকদ্দমায় আদালত বাদীর আবেদন মঞ্জুর করা হলো তার বরাবর ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেবেন। তবে এ রেজিস্ট্রেশনের জন্য কোনো কর, ডিউটি বা ফিস দিতে হবে না। ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে দিতে ব্যর্থ হলে এর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আদালত সাফ কবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেবেন। মনে রাখবেন এই আদেশের বিরুদ্ধে একবার আপিল করার সুযোগ আছে। আপিলেও অসন্তুষ্ট হলে সুপ্রিম কোর্টে রিভিশন দায়ের করা যেতে পারে।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]