মিহির কুমার রায়
খাদ্য নিরাপত্তায় সরিষা ভোজ্যতেল হিসেবে আজ নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় সরিষা শুধু ঐতিহ্যবাহী ফসল হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি এবং পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরিষা তেলের চাহিদা বেড়েছে। দেশে মাথাপিছু দৈনিক ভোজ্যতেলের চাহিদা ৪০ গ্রাম ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টনে পৌঁছাবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেল আমদানি করতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। বর্তমানে দেশের উৎপাদিত ভোজ্যতেলের মধ্যে শুধু ৩ লাখ টন সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়, যা দেশের মোট চাহিদার মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের মধ্যে সরিষার তেলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৬ শতাংশ। সরিষার তেল স্বাস্থ্যসম্মত ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। এতে পরিমাণে পরিপূর্ণ ফ্যাটি অ্যাসিড কম, অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ ৫০ শতাংশের উপরে এবং ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ এর অনুপাত ১:২, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। দেশের অন্য প্রধান তেলবীজ ফসল হলো সয়াবিন, যা বছরে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার টন উৎপাদিত হয়, তবে এর একটি বড় অংশ পোলট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সরিষার চাহিদা বৃদ্ধি, কৃষকের আগ্রহ এবং উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণের কারণে চলতি অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেড়েছে।
সরিষার আবাদে প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে সাধারণত আমন ধান কাটার পর জমি পতিত থাকে। তবে এই পতিত জমিতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা আবাদ করলে একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা সম্ভব। এতে দুই ফসলি জমি তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হয়। স্বল্পজীবনকাল ও উচ্চফলনশীল সরিষার জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার কৃষককে উৎসাহিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭, বারি সরিষা-১৮, বিনা-৪ এবং বিনা-৯ জাতের সরিষা বপন করলে মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল। এরপরের কয়েক বছর ধরে আবাদ ক্রমেই বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরিষার আবাদ ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে পৌঁছেছে এবং উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৬০ হাজার টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ ২৯ হাজার টন। এই বৃদ্ধি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের ভোজ্যতেলের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরিষার আবাদে সরকারি সহায়তা ও প্রকল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০২৫ সালে শেষ হবে। প্রকল্পের ব্যয় ২২২ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিষা বীজ ও সার বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং মাঠ পর্যায়ে সরিষা চাষে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরিষার চাষে কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। চাঁদপুর, নড়াইল, যশোর, শার্শা ও বেনাপোলের মাঠজুড়ে হলুদের সমারোহ। আগাম জাতের সরিষার ফুল একে একে মাঠ ঢেকে দিচ্ছে উজ্জ্বল হলুদ আভায়। মৌমাছি মধু আহরণ করছে, কৃষকরা তৃপ্তি অনুভব করছেন। প্রণোদনা এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা বপনের কারণে চলতি মৌসুমে সরিষার আবাদ বেড়েছে। উপজেলার কৃষকরা ধান কাটার পর জমিতে সরিষা চাষ করে লাভের আশা করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন।
সরিষা চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়; এটি সহজ ও কম খরচে চাষযোগ্য। বীজ ও সার সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সরিষার অবদান অপরিসীম। সরিষার আবাদ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমানো যায়।
সংক্ষেপে, সরিষা চাষে প্রযুক্তি ব্যবহার, উচ্চ ফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ, সরকারি সহায়তা এবং কৃষকের আগ্রহ একত্রিত হলে দেশের ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি শুধু কৃষকের আয়ের জন্যই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশের ভোজ্যতেল চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে পূরণ করা সম্ভব হবে।
[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মিহির কুমার রায়
শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
খাদ্য নিরাপত্তায় সরিষা ভোজ্যতেল হিসেবে আজ নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় সরিষা শুধু ঐতিহ্যবাহী ফসল হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি এবং পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরিষা তেলের চাহিদা বেড়েছে। দেশে মাথাপিছু দৈনিক ভোজ্যতেলের চাহিদা ৪০ গ্রাম ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টনে পৌঁছাবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেল আমদানি করতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। বর্তমানে দেশের উৎপাদিত ভোজ্যতেলের মধ্যে শুধু ৩ লাখ টন সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়, যা দেশের মোট চাহিদার মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের মধ্যে সরিষার তেলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৬ শতাংশ। সরিষার তেল স্বাস্থ্যসম্মত ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। এতে পরিমাণে পরিপূর্ণ ফ্যাটি অ্যাসিড কম, অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ ৫০ শতাংশের উপরে এবং ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ এর অনুপাত ১:২, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। দেশের অন্য প্রধান তেলবীজ ফসল হলো সয়াবিন, যা বছরে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার টন উৎপাদিত হয়, তবে এর একটি বড় অংশ পোলট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সরিষার চাহিদা বৃদ্ধি, কৃষকের আগ্রহ এবং উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণের কারণে চলতি অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেড়েছে।
সরিষার আবাদে প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে সাধারণত আমন ধান কাটার পর জমি পতিত থাকে। তবে এই পতিত জমিতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা আবাদ করলে একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা সম্ভব। এতে দুই ফসলি জমি তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হয়। স্বল্পজীবনকাল ও উচ্চফলনশীল সরিষার জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার কৃষককে উৎসাহিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭, বারি সরিষা-১৮, বিনা-৪ এবং বিনা-৯ জাতের সরিষা বপন করলে মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল। এরপরের কয়েক বছর ধরে আবাদ ক্রমেই বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরিষার আবাদ ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে পৌঁছেছে এবং উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৬০ হাজার টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ ২৯ হাজার টন। এই বৃদ্ধি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের ভোজ্যতেলের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরিষার আবাদে সরকারি সহায়তা ও প্রকল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০২৫ সালে শেষ হবে। প্রকল্পের ব্যয় ২২২ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিষা বীজ ও সার বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং মাঠ পর্যায়ে সরিষা চাষে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরিষার চাষে কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। চাঁদপুর, নড়াইল, যশোর, শার্শা ও বেনাপোলের মাঠজুড়ে হলুদের সমারোহ। আগাম জাতের সরিষার ফুল একে একে মাঠ ঢেকে দিচ্ছে উজ্জ্বল হলুদ আভায়। মৌমাছি মধু আহরণ করছে, কৃষকরা তৃপ্তি অনুভব করছেন। প্রণোদনা এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা বপনের কারণে চলতি মৌসুমে সরিষার আবাদ বেড়েছে। উপজেলার কৃষকরা ধান কাটার পর জমিতে সরিষা চাষ করে লাভের আশা করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন।
সরিষা চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়; এটি সহজ ও কম খরচে চাষযোগ্য। বীজ ও সার সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সরিষার অবদান অপরিসীম। সরিষার আবাদ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমানো যায়।
সংক্ষেপে, সরিষা চাষে প্রযুক্তি ব্যবহার, উচ্চ ফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ, সরকারি সহায়তা এবং কৃষকের আগ্রহ একত্রিত হলে দেশের ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি শুধু কৃষকের আয়ের জন্যই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশের ভোজ্যতেল চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে পূরণ করা সম্ভব হবে।
[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]