শেখর ভট্টাচার্য

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি বাংলাদেশের সর্বকালের ‘সব চেয়ে সুন্দর’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠতিব্য নির্বাচনটি বাংলাদেশের সর্বকালের ‘সব চেয়ে সুন্দর’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর অনুকরণীয় এই নির্বাচনের আয়োজন প্রক্রিয়া নিয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়বে বিশ্ব। একটি জাতীয় দৈনিক প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে বিষয়টি সম্পর্কে নাগরিকজনেদের অবহিত করে ১১ জুন, ২০২৫ ইংরেজি তারিখে। ‘১৭ বছর পর ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন বাংলাদেশে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।’ সংবাদটি বেশ পুরনো। নাগরিক সমাজ এই সুন্দর নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ‘স্বপ্নের সৌন্দর্য’ দেখার আকাক্সক্ষায় এখন বিভোর। প্রধান উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ কোন বার্তা জাতিকে কিংবা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে প্রদান করতে প্রেস সচিব, উপ প্রেস সচিব সেই বার্তার ধ্বনি প্রতিধ্বিনি দক্ষতার সঙ্গে ছড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়েন। দায়িত্ব পালনে তাদের নিষ্ঠা এবং কর্তব্যবোধ দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।
ইতিহাসের সব চেয়ে সুন্দর নির্বাচন বলতে আমাদের ধারণা কী? নির্বাচন শেষে কেমন নির্বাচন হলে নাগরিক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে? দিনশেষে ভোটারদের সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোন সংশাপত্র নির্বাচন ব্যবস্থায় আছে বলে আমরা জানি না। নানা মতের, নানা পথের, নানা উদ্দেশ্য নিয়ে যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে থাকেন তাদের মতামতও অনেক সময় সব মহলের কাছে প্রশ্নহীনভাবে গৃহীত হয় না
বাঙালির সেরা হওয়ার স্বপ্ন নতুন কিছু নয়। বাস্তব কর্মকাণ্ডে যা-ই ঘটুক না কেনো, ‘কথায় বড় হতে হবে’। কুসুম কুমারী দাশের সেই শাশ্বত কবিতাকে নেতিবাচকভাবে আমরা ক্রমাগত প্রমাণ করে যাচ্ছি। সহজ-সরল, সরাসরি বার্তা দিয়ে লেখা সম্পূর্ণ কবিতাটি পুরো উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে হয়। কবিতাটি নতুন নয়, বহুল পঠিত। যাদের স্মৃতি কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে তাদের জন্য চারটি পঙ্ক্তি তুলে ধতে হচ্ছে- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?/মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন/‘মানুষ হইতে হবে’- এই যার পণ?’ কুসুম কুমারী দাশ ক্ষমা করবেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হচ্ছে, ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’। বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজন নেই। আমরা কুসুম কুমারী দাশের, ‘আদর্শ ছেলে’ হতে পারিনি।
সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব চেয়ে বড় সংশাপত্র পাওয়া যায়, নির্বাচকমণ্ডলীর কাছ থেকে। এর পর আসে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা, পর্যবেক্ষকদের কাছ থাকে। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সফলতার আনন্দে মোহিত হয়ে পুলিশ বিভাগ নিজেরাই সফলতা উপভোগ করেছিল, পিঠা উৎসব আয়োজন করে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আর পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ইংরেজিতে।
‘আন্তর্জাতিক মানের’ নির্বাচন উপহার দেয়ায় পুলিশের সদর দপ্তর সারা দেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করেছে। নির্বাচন কমিশন নিজেদের কর্মকে আন্তর্জাতিক মানের দাবি না করলেও ‘সফল’ অভিহিত করে পিঠা উৎসব করেছে পুলিশ বিভাগ। নির্বাচনকে প্রহসন দাবি করে তার ফলাফল প্রত্যাখ্যানকারী বিরোধীরা যেদিন অভিযোগ জানাতে যাওয়ার কর্মসূচি দিয়েছিল, কমিশন সেই দিনটিতেই বাড়তি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পিঠা উৎসব করেছে পুলিশ বিভাগ। এমনকি কমিশনের শীর্ষ আমলা অফিস চত্বরের কৃত্রিম জলাশয়ে বড়শি ফেলে মাছও ধরেছেন। সফলতা এবং এর রকমফের দেখে পুলোকিত না হয়ে উপায় নেই।
ফিরে আসি আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে। ইতিহাসের সব চেয়ে সুন্দর নির্বাচন বলতে আমাদের ধারণা কী? নির্বাচন শেষে কেমন নির্বাচন হলে নাগরিক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে? দিনশেষে ভোটারদের সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোন সংশাপত্র নির্বাচন ব্যবস্থায় আছে বলে আমরা জানি না। নানা মতের, নানা পথের, নানা উদ্দেশ্য নিয়ে যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে থাকেন তাদের মতামতও অনেক সময় সব মহলের কাছে প্রশ্নহীনভাবে গৃহীত হয় না।
আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার হলো, এযাবতকালের সব চেয়ে দৃশ্যমান স্বপ্নচারী সরকার। পূর্বের অনেক সরকারের মতো তারা উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখতে চান। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শুধু কথায় বড় নন, তিনি কাজেও বড়। তিনি বলেছেন ‘ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের বাইরে মেলা বসলে পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা দেখছেন না।’ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কাব্যিকভাবে বলেছেন, ‘যদি সম্ভব হয় নির্বাচন কেন্দ্রের আশপাশে মেলা করে দেও, সবাই মেলায় আসবে, মেলায় কেনাবেচা হবে। বাণিজ্যও হল আবার ভোটও দিয়ে আসল।’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৭ জানুয়ারি,২০২৬)। কী অসাধারণ ভাবনা।
সফল, দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নির্বাচন করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন স্বতঃস্ফুর্ত ভোটার উপস্থিতি। ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গেলে দরকার ‘ভয়ডর হীন’ একটি নির্বাচনী পরিবেশ। ভোটারের জন্য ‘ভয়ডর হীন’ পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে উৎসবের মতো মেলা বা সামাজিক, বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান, আয়োজন করা সম্ভব হবে না। মেলা বা অন্য কোন অনুষ্ঠান আয়োজন না করেই উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। দলেদলে সব শ্রেণি ও মতের ভোটারদের জাতীয় উৎসবের মতো প্রাণের টানে নির্বাচন কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হলেই সব জল্পনা, কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনকে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব। উৎসবমুখর নির্বাচন করতে গেলে প্রয়োজন নিরাপত্তাবাহিনীর সঠিক ভূমিকা। এই ভূমিকা পালনের জন্য বাস্তবানুগ পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়ন সব চেয়ে জরুরি।
সফল নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন মূলত তিনটি বিষয়। নির্বাচনে যুক্ত সকল অংশীজনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পূর্বেই যেটা বলা হয়েছে ভোটার বা নির্বাচকমণ্ডলীর ভয়ডরহীন পরিবেশে ভোটদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই পরিবেশ কী শুধু নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। এটি আসলে একটি টিমওয়ার্ক। টিমওয়ার্ক বা দলীয় কাজের কেন্দ্রে থাকেন নির্বাচন কমিশন এবং সরকার। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে থাকেন রাজনৈতিক দল, নিরাপত্তাবাহিনী, প্রশাসন এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজ। এই দলের নেতৃত্বে যদি কোন শিথিলতা, অবহেলা, অস্বচ্ছতা থেকে যায় তাহলে অন্য সকল অংশীজন সঠিকভাবে কাজ করলেও নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না।
আবারো বলছি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত অংশীজনদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সঠিক কাজটি করতে হয়। যেহেতু নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব ও দায়িত্ব দে হয়েছে, তাই সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনটি সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক্-নির্বাচনী সময়, নির্বাচনকালীন সময় এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়। প্রাক্-নির্বাচনী সময়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানেরই যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার শরিকরা, বিশেষ করে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে সবচেয়ে বেশি। নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন কমিশনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করে সফল নির্বাচন আয়োজন করতে পারেন। নির্বাচনের সফলতা, ব্যর্থতার দায়ভার নির্বাচন কমিশনের মতো সরকারকেও সমানভাবে বহন করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতার প্রমাণ রাখা জরুরি।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন যেহেতু, বাংলাদেশের স্বাভাবিক সংসদীয় সরকারের বিদায়ের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না তাই এই নির্বাচনকে সফল করে তোলা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা স্বপ্ন দেখছি অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি নির্বাচনের, যে নির্বাচনে ভোটের আগে ভোটারদের বাড়ি, পাড়া বা গ্রামে গিয়ে ভয় দেখানোর সুযোগ থাকবে না। প্রচারণাকে ক্ষমতাসীন দল কিংবা ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত কোন দলের অনুকূলে রাখতে প্রশাসনের প্রভাব পরিলক্ষিত হবে না। ভোটারদের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থ বিতরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। প্রতিপক্ষ দলগুলোকে মিডিয়ায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কমিশন, সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে। নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত কর্তাদের দলীয় আনুগত্যের কারণে বিশেষ দলকে সহায়তা প্রদান অবশ্যই বন্ধ থাকবে।
উদাহরণ সৃষ্টিকারী নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখা একটি ইতিবাচক বিষয়। স্বপ্ন প্রকৃত অর্থে স্বপ্ন থেকে যাবে ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নের অসাড়তা উপলব্ধি করা যাবে যদি নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনত্তোর কাজগুলো বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করা যায়। দেশব্যাপী অংশগ্রহকারী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে আমরা যেরকম হানাহানি দেখতে পাচ্ছি এতে করে সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবাই শঙ্কিত। শঙ্কাকে দূর করার জন্য অন্তর্বর্তী সকার এবং নির্বাচন কমিশনকে সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন উচিত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্দেশ্যে সতর্কতা সংকেত প্রদান করা। মনে রাখতে হবে সফল নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোন বিকল্প নেই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি বাংলাদেশের সর্বকালের ‘সব চেয়ে সুন্দর’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে
সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠতিব্য নির্বাচনটি বাংলাদেশের সর্বকালের ‘সব চেয়ে সুন্দর’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর অনুকরণীয় এই নির্বাচনের আয়োজন প্রক্রিয়া নিয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়বে বিশ্ব। একটি জাতীয় দৈনিক প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে বিষয়টি সম্পর্কে নাগরিকজনেদের অবহিত করে ১১ জুন, ২০২৫ ইংরেজি তারিখে। ‘১৭ বছর পর ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন বাংলাদেশে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।’ সংবাদটি বেশ পুরনো। নাগরিক সমাজ এই সুন্দর নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ‘স্বপ্নের সৌন্দর্য’ দেখার আকাক্সক্ষায় এখন বিভোর। প্রধান উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ কোন বার্তা জাতিকে কিংবা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে প্রদান করতে প্রেস সচিব, উপ প্রেস সচিব সেই বার্তার ধ্বনি প্রতিধ্বিনি দক্ষতার সঙ্গে ছড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়েন। দায়িত্ব পালনে তাদের নিষ্ঠা এবং কর্তব্যবোধ দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।
ইতিহাসের সব চেয়ে সুন্দর নির্বাচন বলতে আমাদের ধারণা কী? নির্বাচন শেষে কেমন নির্বাচন হলে নাগরিক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে? দিনশেষে ভোটারদের সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোন সংশাপত্র নির্বাচন ব্যবস্থায় আছে বলে আমরা জানি না। নানা মতের, নানা পথের, নানা উদ্দেশ্য নিয়ে যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে থাকেন তাদের মতামতও অনেক সময় সব মহলের কাছে প্রশ্নহীনভাবে গৃহীত হয় না
বাঙালির সেরা হওয়ার স্বপ্ন নতুন কিছু নয়। বাস্তব কর্মকাণ্ডে যা-ই ঘটুক না কেনো, ‘কথায় বড় হতে হবে’। কুসুম কুমারী দাশের সেই শাশ্বত কবিতাকে নেতিবাচকভাবে আমরা ক্রমাগত প্রমাণ করে যাচ্ছি। সহজ-সরল, সরাসরি বার্তা দিয়ে লেখা সম্পূর্ণ কবিতাটি পুরো উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে হয়। কবিতাটি নতুন নয়, বহুল পঠিত। যাদের স্মৃতি কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে তাদের জন্য চারটি পঙ্ক্তি তুলে ধতে হচ্ছে- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?/মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন/‘মানুষ হইতে হবে’- এই যার পণ?’ কুসুম কুমারী দাশ ক্ষমা করবেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হচ্ছে, ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’। বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজন নেই। আমরা কুসুম কুমারী দাশের, ‘আদর্শ ছেলে’ হতে পারিনি।
সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব চেয়ে বড় সংশাপত্র পাওয়া যায়, নির্বাচকমণ্ডলীর কাছ থেকে। এর পর আসে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা, পর্যবেক্ষকদের কাছ থাকে। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সফলতার আনন্দে মোহিত হয়ে পুলিশ বিভাগ নিজেরাই সফলতা উপভোগ করেছিল, পিঠা উৎসব আয়োজন করে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আর পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ইংরেজিতে।
‘আন্তর্জাতিক মানের’ নির্বাচন উপহার দেয়ায় পুলিশের সদর দপ্তর সারা দেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করেছে। নির্বাচন কমিশন নিজেদের কর্মকে আন্তর্জাতিক মানের দাবি না করলেও ‘সফল’ অভিহিত করে পিঠা উৎসব করেছে পুলিশ বিভাগ। নির্বাচনকে প্রহসন দাবি করে তার ফলাফল প্রত্যাখ্যানকারী বিরোধীরা যেদিন অভিযোগ জানাতে যাওয়ার কর্মসূচি দিয়েছিল, কমিশন সেই দিনটিতেই বাড়তি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পিঠা উৎসব করেছে পুলিশ বিভাগ। এমনকি কমিশনের শীর্ষ আমলা অফিস চত্বরের কৃত্রিম জলাশয়ে বড়শি ফেলে মাছও ধরেছেন। সফলতা এবং এর রকমফের দেখে পুলোকিত না হয়ে উপায় নেই।
ফিরে আসি আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে। ইতিহাসের সব চেয়ে সুন্দর নির্বাচন বলতে আমাদের ধারণা কী? নির্বাচন শেষে কেমন নির্বাচন হলে নাগরিক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে? দিনশেষে ভোটারদের সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোন সংশাপত্র নির্বাচন ব্যবস্থায় আছে বলে আমরা জানি না। নানা মতের, নানা পথের, নানা উদ্দেশ্য নিয়ে যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে থাকেন তাদের মতামতও অনেক সময় সব মহলের কাছে প্রশ্নহীনভাবে গৃহীত হয় না।
আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার হলো, এযাবতকালের সব চেয়ে দৃশ্যমান স্বপ্নচারী সরকার। পূর্বের অনেক সরকারের মতো তারা উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখতে চান। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শুধু কথায় বড় নন, তিনি কাজেও বড়। তিনি বলেছেন ‘ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের বাইরে মেলা বসলে পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা দেখছেন না।’ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কাব্যিকভাবে বলেছেন, ‘যদি সম্ভব হয় নির্বাচন কেন্দ্রের আশপাশে মেলা করে দেও, সবাই মেলায় আসবে, মেলায় কেনাবেচা হবে। বাণিজ্যও হল আবার ভোটও দিয়ে আসল।’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৭ জানুয়ারি,২০২৬)। কী অসাধারণ ভাবনা।
সফল, দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নির্বাচন করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন স্বতঃস্ফুর্ত ভোটার উপস্থিতি। ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গেলে দরকার ‘ভয়ডর হীন’ একটি নির্বাচনী পরিবেশ। ভোটারের জন্য ‘ভয়ডর হীন’ পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে উৎসবের মতো মেলা বা সামাজিক, বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান, আয়োজন করা সম্ভব হবে না। মেলা বা অন্য কোন অনুষ্ঠান আয়োজন না করেই উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। দলেদলে সব শ্রেণি ও মতের ভোটারদের জাতীয় উৎসবের মতো প্রাণের টানে নির্বাচন কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হলেই সব জল্পনা, কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনকে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব। উৎসবমুখর নির্বাচন করতে গেলে প্রয়োজন নিরাপত্তাবাহিনীর সঠিক ভূমিকা। এই ভূমিকা পালনের জন্য বাস্তবানুগ পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়ন সব চেয়ে জরুরি।
সফল নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন মূলত তিনটি বিষয়। নির্বাচনে যুক্ত সকল অংশীজনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পূর্বেই যেটা বলা হয়েছে ভোটার বা নির্বাচকমণ্ডলীর ভয়ডরহীন পরিবেশে ভোটদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই পরিবেশ কী শুধু নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। এটি আসলে একটি টিমওয়ার্ক। টিমওয়ার্ক বা দলীয় কাজের কেন্দ্রে থাকেন নির্বাচন কমিশন এবং সরকার। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে থাকেন রাজনৈতিক দল, নিরাপত্তাবাহিনী, প্রশাসন এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজ। এই দলের নেতৃত্বে যদি কোন শিথিলতা, অবহেলা, অস্বচ্ছতা থেকে যায় তাহলে অন্য সকল অংশীজন সঠিকভাবে কাজ করলেও নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না।
আবারো বলছি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত অংশীজনদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সঠিক কাজটি করতে হয়। যেহেতু নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব ও দায়িত্ব দে হয়েছে, তাই সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনটি সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক্-নির্বাচনী সময়, নির্বাচনকালীন সময় এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়। প্রাক্-নির্বাচনী সময়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানেরই যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার শরিকরা, বিশেষ করে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে সবচেয়ে বেশি। নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন কমিশনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করে সফল নির্বাচন আয়োজন করতে পারেন। নির্বাচনের সফলতা, ব্যর্থতার দায়ভার নির্বাচন কমিশনের মতো সরকারকেও সমানভাবে বহন করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতার প্রমাণ রাখা জরুরি।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন যেহেতু, বাংলাদেশের স্বাভাবিক সংসদীয় সরকারের বিদায়ের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না তাই এই নির্বাচনকে সফল করে তোলা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা স্বপ্ন দেখছি অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি নির্বাচনের, যে নির্বাচনে ভোটের আগে ভোটারদের বাড়ি, পাড়া বা গ্রামে গিয়ে ভয় দেখানোর সুযোগ থাকবে না। প্রচারণাকে ক্ষমতাসীন দল কিংবা ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত কোন দলের অনুকূলে রাখতে প্রশাসনের প্রভাব পরিলক্ষিত হবে না। ভোটারদের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থ বিতরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। প্রতিপক্ষ দলগুলোকে মিডিয়ায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কমিশন, সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে। নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত কর্তাদের দলীয় আনুগত্যের কারণে বিশেষ দলকে সহায়তা প্রদান অবশ্যই বন্ধ থাকবে।
উদাহরণ সৃষ্টিকারী নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখা একটি ইতিবাচক বিষয়। স্বপ্ন প্রকৃত অর্থে স্বপ্ন থেকে যাবে ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নের অসাড়তা উপলব্ধি করা যাবে যদি নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনত্তোর কাজগুলো বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করা যায়। দেশব্যাপী অংশগ্রহকারী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে আমরা যেরকম হানাহানি দেখতে পাচ্ছি এতে করে সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবাই শঙ্কিত। শঙ্কাকে দূর করার জন্য অন্তর্বর্তী সকার এবং নির্বাচন কমিশনকে সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন উচিত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্দেশ্যে সতর্কতা সংকেত প্রদান করা। মনে রাখতে হবে সফল নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোন বিকল্প নেই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]