জাহাঙ্গীর আলম সরকার
একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে মানবিক অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগের নিশ্চয়তা লাভ করে। সামাজিক সাম্য শুধু অর্থনৈতিক সম্পদের সমবণ্টন বা সুযোগের আনুষ্ঠানিক সমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো ধারণা নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার গভীর প্রকাশ। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রশাসনিক কাঠামো, আইনপ্রণয়ন বা বাহ্যিক শাসনব্যবস্থায় নয়-বরং নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস এবং জীবনমান রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা সংহত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যেই নিহিত। রাষ্ট্র যদি শুধু আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনগণের কাছে এক ধরনের দূরবর্তী ও যান্ত্রিক কাঠামো হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্র তার নীতি, সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাকে মানুষের সামাজিক বাস্তবতা ও নৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করে, তখনই রাষ্ট্র নাগরিকের আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে আইন ও নীতি আর শুধু নিয়ম-কানুনের সংকলন থাকে না; বরং তা মানুষের আশা, মর্যাদা ও ন্যায়বোধের প্রতিফলনে পরিণত হয়। একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তখনই, যখন শাসনব্যবস্থা নাগরিকের জীবনের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রীয় নীতি যখন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তখন তা সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতার বীজ বপন করে। সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও সুযোগের নিশ্চয়তা অনুভব করতে পারে। এই অনুভব থেকেই জন্ম নেয় নাগরিক আস্থা, যা সমাজকে সুসংহত ও স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যেখানে এই আস্থা দৃঢ় হয়, সেখানে সামাজিক সংহতি, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে ওঠে। সমাজ তখন আর বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসমষ্টি থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি সচেতন ও সংযুক্ত নাগরিক সমাজ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সামাজিক সাম্য শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার সমতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র, নাগরিকের আস্থা এবং সমাজের স্থিতিশীলতার এক অন্তর্নিহিত ভিত্তি। রাষ্ট্র যখন এই দায়বদ্ধতাকে তার নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে অনুশীলন করে, তখন প্রতিটি নাগরিক নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও সমানাধিকারপ্রাপ্ত বলে অনুভব করে।
এভাবেই সামাজিক সাম্য একটি তাত্ত্বিক ধারণা থেকে নাগরিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। তবে বাস্তবতা প্রায়ই এই আদর্শ চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সুযোগের অসমতা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশেষাধিকার সমাজের ভেতরে এক গভীর-যদিও অনেক সময় অদৃশ্য-বিভাজন সৃষ্টি করে। এই বিভাজন মানুষকে শুধু শ্রেণিভেদে বিভক্ত করে না; বরং তাদের মর্যাদা, আত্মসম্মান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলস্বরূপ, সমাজে ন্যায্যতার ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়। প্রভাবশালী, ধনী কিংবা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী প্রায়শই এই বৈষম্যের সুবিধাভোগী হয়। তারা উন্নত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদেও অবস্থান আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়। অপরদিকে সাধারণ জনগণ-বিশেষত সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী-তাদের ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। এই বঞ্চনা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অসন্তোষ, হতাশা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার জন্ম দেয়, যা কোনো সমাজের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন প্রণয়ন বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা, সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অসাম্য দূর করার জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না; বরং তা সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তিকে নড়িয়ে দেয়। আজকের বিশ্বে সামাজিক সাম্য আর শুধু অর্থনৈতিক সমতার সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। সামাজিক সাম্য আজ একটি নৈতিক দাবি হওয়ার পাশাপাশি একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। তবে শুধুই নীতিগত অঙ্গীকার বা আইনি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব হলো এই সুযোগগুলো বাস্তবে কার্যকর করা। নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা, বাজেট বরাদ্দে ন্যায়সংগতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও অংশগ্রহণ-এসবের সমন্বয়ের মাধ্যমেই সামাজিক সাম্য বাস্তব রূপ লাভ করে। রাষ্ট্র যখন এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তখন নাগরিক শুধু সুযোগের দাবিদার থাকে না; সে বাস্তবে তা লাভ করে এবং তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ শুধু নীতিমালার সংশোধন, আইনগত সংস্কার কিংবা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাগরিকের প্রতি তার মৌলিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গভীর আত্মপর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সামাজিক সাম্য তখন আর বিমূর্ত কোনো আদর্শ বা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় বাস্তব রূপ লাভ করে। নাগরিক যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও ন্যায্য আচরণ অনুভব করে, তখনই সামাজিক সাম্যের অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই নাগরিকের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে, যা যে কোনো স্থিতিশীল সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এখানে শুধু সেবা প্রদান বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
রাষ্ট্র যখন নাগরিককে কেবল শাসনের বিষয় হিসেবে না দেখে অধিকারসম্পন্ন, মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন শাসক ও শাসিতের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে। এর ফলে নাগরিক নিজেকে রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে অনুভব করে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি তার দায়বদ্ধতাও গভীরতর হয়। একই সঙ্গে, সামাজিক সাম্যের এই পুনর্নির্ধারণ রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে পরিচালিত করে। বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রান্তিকতার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে না। কিন্তু ন্যায়, মানবিকতা ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র নাগরিকের সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সংহতিকে উন্মোচিত করে, যা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কাজেই, সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আজ আর শুধু নীতিনির্ধারকদেও আলোচনার বিষয় নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিক, প্রশাসক ও রাজনৈতিক অংশীদারের নৈতিক চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র যখন এই চ্যালেঞ্জকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে এবং নাগরিকের মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের সুরক্ষাকে তার শাসনদর্শনের কেন্দ্রে স্থাপন করে, তখন সামাজিক সাম্য আর শুধু আকাক্সক্ষা থাকে না-তা হয়ে ওঠে একটি জীবন্ত বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র মানুষের আস্থা, নৈতিকতা ও মানবিক চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।
[লেখক: আইনজীবী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জাহাঙ্গীর আলম সরকার
সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে মানবিক অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগের নিশ্চয়তা লাভ করে। সামাজিক সাম্য শুধু অর্থনৈতিক সম্পদের সমবণ্টন বা সুযোগের আনুষ্ঠানিক সমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো ধারণা নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার গভীর প্রকাশ। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রশাসনিক কাঠামো, আইনপ্রণয়ন বা বাহ্যিক শাসনব্যবস্থায় নয়-বরং নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস এবং জীবনমান রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা সংহত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যেই নিহিত। রাষ্ট্র যদি শুধু আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনগণের কাছে এক ধরনের দূরবর্তী ও যান্ত্রিক কাঠামো হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্র তার নীতি, সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাকে মানুষের সামাজিক বাস্তবতা ও নৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করে, তখনই রাষ্ট্র নাগরিকের আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে আইন ও নীতি আর শুধু নিয়ম-কানুনের সংকলন থাকে না; বরং তা মানুষের আশা, মর্যাদা ও ন্যায়বোধের প্রতিফলনে পরিণত হয়। একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তখনই, যখন শাসনব্যবস্থা নাগরিকের জীবনের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রীয় নীতি যখন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তখন তা সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতার বীজ বপন করে। সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও সুযোগের নিশ্চয়তা অনুভব করতে পারে। এই অনুভব থেকেই জন্ম নেয় নাগরিক আস্থা, যা সমাজকে সুসংহত ও স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যেখানে এই আস্থা দৃঢ় হয়, সেখানে সামাজিক সংহতি, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে ওঠে। সমাজ তখন আর বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসমষ্টি থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি সচেতন ও সংযুক্ত নাগরিক সমাজ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সামাজিক সাম্য শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার সমতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র, নাগরিকের আস্থা এবং সমাজের স্থিতিশীলতার এক অন্তর্নিহিত ভিত্তি। রাষ্ট্র যখন এই দায়বদ্ধতাকে তার নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে অনুশীলন করে, তখন প্রতিটি নাগরিক নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও সমানাধিকারপ্রাপ্ত বলে অনুভব করে।
এভাবেই সামাজিক সাম্য একটি তাত্ত্বিক ধারণা থেকে নাগরিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। তবে বাস্তবতা প্রায়ই এই আদর্শ চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সুযোগের অসমতা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশেষাধিকার সমাজের ভেতরে এক গভীর-যদিও অনেক সময় অদৃশ্য-বিভাজন সৃষ্টি করে। এই বিভাজন মানুষকে শুধু শ্রেণিভেদে বিভক্ত করে না; বরং তাদের মর্যাদা, আত্মসম্মান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলস্বরূপ, সমাজে ন্যায্যতার ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়। প্রভাবশালী, ধনী কিংবা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী প্রায়শই এই বৈষম্যের সুবিধাভোগী হয়। তারা উন্নত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদেও অবস্থান আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়। অপরদিকে সাধারণ জনগণ-বিশেষত সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী-তাদের ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। এই বঞ্চনা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অসন্তোষ, হতাশা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার জন্ম দেয়, যা কোনো সমাজের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন প্রণয়ন বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা, সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অসাম্য দূর করার জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না; বরং তা সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তিকে নড়িয়ে দেয়। আজকের বিশ্বে সামাজিক সাম্য আর শুধু অর্থনৈতিক সমতার সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। সামাজিক সাম্য আজ একটি নৈতিক দাবি হওয়ার পাশাপাশি একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। তবে শুধুই নীতিগত অঙ্গীকার বা আইনি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব হলো এই সুযোগগুলো বাস্তবে কার্যকর করা। নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা, বাজেট বরাদ্দে ন্যায়সংগতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও অংশগ্রহণ-এসবের সমন্বয়ের মাধ্যমেই সামাজিক সাম্য বাস্তব রূপ লাভ করে। রাষ্ট্র যখন এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তখন নাগরিক শুধু সুযোগের দাবিদার থাকে না; সে বাস্তবে তা লাভ করে এবং তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ শুধু নীতিমালার সংশোধন, আইনগত সংস্কার কিংবা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাগরিকের প্রতি তার মৌলিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গভীর আত্মপর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সামাজিক সাম্য তখন আর বিমূর্ত কোনো আদর্শ বা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় বাস্তব রূপ লাভ করে। নাগরিক যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও ন্যায্য আচরণ অনুভব করে, তখনই সামাজিক সাম্যের অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই নাগরিকের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে, যা যে কোনো স্থিতিশীল সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এখানে শুধু সেবা প্রদান বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
রাষ্ট্র যখন নাগরিককে কেবল শাসনের বিষয় হিসেবে না দেখে অধিকারসম্পন্ন, মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন শাসক ও শাসিতের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে। এর ফলে নাগরিক নিজেকে রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে অনুভব করে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি তার দায়বদ্ধতাও গভীরতর হয়। একই সঙ্গে, সামাজিক সাম্যের এই পুনর্নির্ধারণ রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে পরিচালিত করে। বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রান্তিকতার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে না। কিন্তু ন্যায়, মানবিকতা ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র নাগরিকের সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সংহতিকে উন্মোচিত করে, যা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কাজেই, সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আজ আর শুধু নীতিনির্ধারকদেও আলোচনার বিষয় নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিক, প্রশাসক ও রাজনৈতিক অংশীদারের নৈতিক চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র যখন এই চ্যালেঞ্জকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে এবং নাগরিকের মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের সুরক্ষাকে তার শাসনদর্শনের কেন্দ্রে স্থাপন করে, তখন সামাজিক সাম্য আর শুধু আকাক্সক্ষা থাকে না-তা হয়ে ওঠে একটি জীবন্ত বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র মানুষের আস্থা, নৈতিকতা ও মানবিক চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।
[লেখক: আইনজীবী]