alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

আনোয়ারুল হক

: সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আর কয়েকটা রাত পোহালেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যদিও সব দলের অংশগ্রহণে এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তারপরও মুখে যে যাই বলুক, বিরাজমান পরিস্থিতিতে একটি অনির্বাচিত দিশাহীন দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন অপেক্ষা দুর্বল নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনেকটা বাধ্যতামূলক পন্থা।

সংস্কার তো শুধু আইন করে ও চাপিয়ে দিয়ে হয় না। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যদি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনা না যায়, শুধু জনতুষ্টিমূলক কথা ‘কেউ দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’- এটা বলেই সংস্কার হবে?

কিন্তু সেখানেও বাধ সাধছে দেশের ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা। তাদের বাহানার শেষ নেই।

ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের প্রধান দল অর্থবিত্তে শক্তিশালী জামায়াতে ইসলাম যেমন দেশি-বিদেশি নিউজ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু জরিপকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে ভোটের মাঠে মানুষের মাঝে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করছে যে, তাদের ক্ষমতায় আসা আর দিন কয়েকের ব্যাপার মাত্র। আবার অন্যদিকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হলে ভোটার উপস্থিতি যাই হোক আর যত লক্ষ বোরখা-নেকাব-টাকা বিতরণ করুক না কেন আসল ফলাফল কী হবে তা তাদের জানা। তাই প্রয়োজনে ভোটের মাঠকে এবং ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য ইনকিলাব, ইনসাফ- এরকম নানা নামে তাদের মঞ্চ প্রস্তুত আছে। জামাত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাঝে যেসব বক্তব্য বিবৃতি নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে সরাসরি দিতে পারে না- সেগুলো ওই সব মঞ্চের মুখপাত্রদের মাধ্যমে দিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময় মব সৃষ্টিতেও এসব মঞ্চের ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েকটা দিন আগে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে এমন একটি মব সৃষ্টির প্রয়াস আমরা দেখলাম। সভা-সমাবেশ করা নিষিদ্ধ স্থানে তাদের জমায়েত হতে কোনো বাধা দেয়া হলো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যত বাধা না দেয়, ততো তারা বাহিনীর ওপর আগ্রাসী আচরণ করে। অবশেষে তাদের বাধ্য করলো লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে। আবার প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী এরাই দেশের সূর্য সন্তান! অদ্ভুত এক নাটকীয় পরিস্থিতি। নির্বাচনকালীন তাদের হাদিযাত্রা, ‘জাতিসংঘ যাত্রা’ এরকম নানা কর্মসূচিও আছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় বাংলাদেশটাকে আফগানিস্তান, সোমালিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার মতো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার একটা গভীর প্রচেষ্টা আছে। দেড়টি বছর ধরে ‘ফ্যাসিবাদ’ নির্মূলের নাম করে অন্তর্বর্তী সরকার এই ভয়ংকর গোষ্ঠীকে দুধ কলা দিয়ে পুষে এমন ধরনের ‘নতুন মব বন্দোবস্ত’ কায়েম করেছেন যেটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ।

আর এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে নিয়ে বিশ্ব মোড়লরা ও পশ্চিমা দুনিয়া বাংলাদেশে এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায়- মার্কিনী পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের ভয়াবহতা তো আমাদের সবারই জানা আছে। অন্যসব দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের নতুন দোস্ত, পেয়ারে পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বুঝা যায় কি ধরনের তাঁবেদার রাষ্ট্র মার্কিনীরা চায়। মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকারী পাকসেনাবাহিনী নির্ধারণ করে থাকে কখন কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সাবেক শাসক ইমরান খানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বনিবনা না হওয়ায় সামরিক বাহিনীর মদদে পার্লামেন্টারি ক‍্যু করে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো। ইমরান খান ও তার দলীয় নেতাদেরকে জবরদস্তিমূলক জেলে পুরে এবং দলকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে জাতীয় নির্বাচন করা হল। নির্বাচনে ইমরান খানের দলের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও ভোট গননায় ও ফলাফল ঘোষণায় কারচুপির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট শেহবাজ শরীফকে গদিনসীন করা হয়। বাংলাদেশে সংস্কার আর নতুন বন্দোবস্তের পুরোহিতরা সেই পাকিস্তানের নামে বিগলিত হয়ে কি সংস্কার করবেন? এমন একটি দিন কি পৃথক করা যাবে, যেদিন পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের রক্ত ঝরছে না? ডুবন্ত জাহাজ পাকিস্তান বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে ডুবতে চায়। আর তাতেই আমরা আহ্লাদিত।

সংস্কার তো শুধু আইন করে ও চাপিয়ে দিয়ে হয় না। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব?্যবস্থায় যদি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনা না যায়, শুধু জনতুষ্টিমূলক কথা ‘কেউ দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’- এটা বলেই সংস্কার হবে? এই মূহূর্তে উচ্চ কক্ষ করে রাজনৈতিক এলিটদের পুনর্বাসনের নামে রাষ্ট্রের কাঁধে হাতি পোষার খরচ চাপিয়ে দেয়া এবং প্রয়োজনমতো উচ্চকক্ষকে এস্টাবলিশমেন্ট এবং বিশ্বমোড়লদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের রাস্তা তৈরির প্রচেষ্টা কিনা সে বিতর্ক কিন্তু আছে। আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচন করার মতো বাস্তবতা যদি থেকে থাকে তবে দুই কক্ষ না করে এক কক্ষের বা জাতীয় সংসদের ভোটই তো সেভাবে করা যেতে পারে। আর আমাদের দেশের মানুষের মনোভাব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি এই মুহূর্তে ‘ভোটের আনুপাতিক হারে’ সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিষয়টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বিবেচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা যেত। অন্তর্বর্তী সরকার কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন? আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। মার্কা দেওয়া মূল ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নাম্বার দেওয়া থাকলেও কোন দূরভিসন্ধী বাস্তবায়নের জন্য সিরিয়াল নাম্বারবিহীন হ্যাঁ-না ভোটের ব্যালট পেপার ছাপানো হলো? এটা কি ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে না?

অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত এক বিশৃঙ্খল ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি রেখে যাবেন পরবর্তী সরকারের জন্য। মব সংস্কৃতি নামক একটা আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির উপহার দেশবাসীর জন্য তারা রেখে যাবেন। মানুষ তো সাদা চোখে দৈনন্দিন জীবনে যা দেখে তা দিয়েই মূল্যায়ন করে। শুধু ঢাকা শহরের ফুটপাথের দিকে তাকাই। ফুটপাথের এক লাইন আওয়ামী আমলেই হকারদের জন্য বরাদ্দ ছিল। ৫ আগস্টের পরে সে লাইনে যারা আছেন তাদের দৈনিক চাঁদা দেয়ার ঠিকানা শুধু বদলেছে। কিন্তু নতুন মালিকরা শুধু অতটুকুতেই সন্তুষ্ট না। নতুন পত্তনিতে এককালীন মোটা অঙ্কও পাওয়া যায়। তাই ব্যবসায়িক এলাকাগুলোতে ফুটপাথের ওপর গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় লাইন। মানুষের হাঁটার জায়গা ওই সমস্ত এলাকার ফুটপাথে নাই। ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় এত অবনতি ইতঃপূর্বে চোখে পড়েনি। কোথাও কোনো নিয়ম কাজ করছে না। ফ্লাইওভারেও রিকশা পাবেন। অফিস আদালতে ‘স্পিড মানি’ প্রদানের প্রথা অবসান হয়নি, বরং ‘রেট’ বেড়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়েছে। এগুলো তো দৃশ্যমান।

আর মানুষের কাছে অদৃশ্যমান বিষয়সমূহ যেমন- নির্বাচনের আগে ভিনদেশীদের সঙ্গে বিতর্কিত সব চুক্তি স্বাক্ষর বা স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর এবং শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি। এসব চুক্তিতে সরকার আগবাড়িয়ে গোপনীয়তার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এভাবে মানুষের অগোচরে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে মার্কিনীদের এবং মার্কিনী স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের হাতে। আবার দেশের অভ্যন্তরে সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প নিয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে এ মুহূর্তে জরুরি নয় এবং বিতর্কিত বেশকিছু প্রকল্পও এর মধ্যে আছে। আবার বেশকিছু প্রকল্প নেয়া হয়েছে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে। নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে এসব প্রকল্পের রাজনৈতিক যোগসূত্রতা রয়েছে বলে সমালোচনা আছে।

এসব পরিস্থিতি ও দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির বাড়বাড়ন্ত দেখে পৌরাণিক কাহিনি থেকে নেয়া সুপরিচিত বাংলা প্রবাদ ‘তোমাকে বধিবে যে ...’ সামান্য পরিবর্তন করে বলা যায় ‘দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে’-এর মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। আর এটা শুধু পুরাণের কাহিনির বক্তব্যই তো না, পবিত্র কুরআনেও মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে ‘জীবনের সমস্ত দুর্ভোগ তোমাদের দুহাতের কামাই’। মানুষের কর্মই তার পরিণতি ডেকে নিয়ে আসে এবং একবার পরিণতি যদি ডাক দেয় তাহলে আর ফেরার পথ থাকে না। তাতো আমরা একবার দেখলাম ২০২৪-এর ৫ আগস্টে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় বেলায় মনে এ প্রশ্ন জাগছে, কোন পরিণতির দিকে তারা নিজেদের এবং একই সঙ্গে আমাদের মাতৃভূমিকে ঠেলে দিলেন?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা]

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

আনোয়ারুল হক

সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আর কয়েকটা রাত পোহালেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যদিও সব দলের অংশগ্রহণে এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তারপরও মুখে যে যাই বলুক, বিরাজমান পরিস্থিতিতে একটি অনির্বাচিত দিশাহীন দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন অপেক্ষা দুর্বল নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনেকটা বাধ্যতামূলক পন্থা।

সংস্কার তো শুধু আইন করে ও চাপিয়ে দিয়ে হয় না। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যদি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনা না যায়, শুধু জনতুষ্টিমূলক কথা ‘কেউ দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’- এটা বলেই সংস্কার হবে?

কিন্তু সেখানেও বাধ সাধছে দেশের ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা। তাদের বাহানার শেষ নেই।

ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের প্রধান দল অর্থবিত্তে শক্তিশালী জামায়াতে ইসলাম যেমন দেশি-বিদেশি নিউজ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু জরিপকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে ভোটের মাঠে মানুষের মাঝে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করছে যে, তাদের ক্ষমতায় আসা আর দিন কয়েকের ব্যাপার মাত্র। আবার অন্যদিকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হলে ভোটার উপস্থিতি যাই হোক আর যত লক্ষ বোরখা-নেকাব-টাকা বিতরণ করুক না কেন আসল ফলাফল কী হবে তা তাদের জানা। তাই প্রয়োজনে ভোটের মাঠকে এবং ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য ইনকিলাব, ইনসাফ- এরকম নানা নামে তাদের মঞ্চ প্রস্তুত আছে। জামাত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাঝে যেসব বক্তব্য বিবৃতি নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে সরাসরি দিতে পারে না- সেগুলো ওই সব মঞ্চের মুখপাত্রদের মাধ্যমে দিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময় মব সৃষ্টিতেও এসব মঞ্চের ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েকটা দিন আগে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে এমন একটি মব সৃষ্টির প্রয়াস আমরা দেখলাম। সভা-সমাবেশ করা নিষিদ্ধ স্থানে তাদের জমায়েত হতে কোনো বাধা দেয়া হলো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যত বাধা না দেয়, ততো তারা বাহিনীর ওপর আগ্রাসী আচরণ করে। অবশেষে তাদের বাধ্য করলো লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে। আবার প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী এরাই দেশের সূর্য সন্তান! অদ্ভুত এক নাটকীয় পরিস্থিতি। নির্বাচনকালীন তাদের হাদিযাত্রা, ‘জাতিসংঘ যাত্রা’ এরকম নানা কর্মসূচিও আছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় বাংলাদেশটাকে আফগানিস্তান, সোমালিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার মতো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার একটা গভীর প্রচেষ্টা আছে। দেড়টি বছর ধরে ‘ফ্যাসিবাদ’ নির্মূলের নাম করে অন্তর্বর্তী সরকার এই ভয়ংকর গোষ্ঠীকে দুধ কলা দিয়ে পুষে এমন ধরনের ‘নতুন মব বন্দোবস্ত’ কায়েম করেছেন যেটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ।

আর এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে নিয়ে বিশ্ব মোড়লরা ও পশ্চিমা দুনিয়া বাংলাদেশে এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায়- মার্কিনী পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের ভয়াবহতা তো আমাদের সবারই জানা আছে। অন্যসব দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের নতুন দোস্ত, পেয়ারে পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বুঝা যায় কি ধরনের তাঁবেদার রাষ্ট্র মার্কিনীরা চায়। মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকারী পাকসেনাবাহিনী নির্ধারণ করে থাকে কখন কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সাবেক শাসক ইমরান খানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বনিবনা না হওয়ায় সামরিক বাহিনীর মদদে পার্লামেন্টারি ক‍্যু করে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো। ইমরান খান ও তার দলীয় নেতাদেরকে জবরদস্তিমূলক জেলে পুরে এবং দলকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে জাতীয় নির্বাচন করা হল। নির্বাচনে ইমরান খানের দলের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও ভোট গননায় ও ফলাফল ঘোষণায় কারচুপির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট শেহবাজ শরীফকে গদিনসীন করা হয়। বাংলাদেশে সংস্কার আর নতুন বন্দোবস্তের পুরোহিতরা সেই পাকিস্তানের নামে বিগলিত হয়ে কি সংস্কার করবেন? এমন একটি দিন কি পৃথক করা যাবে, যেদিন পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের রক্ত ঝরছে না? ডুবন্ত জাহাজ পাকিস্তান বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে ডুবতে চায়। আর তাতেই আমরা আহ্লাদিত।

সংস্কার তো শুধু আইন করে ও চাপিয়ে দিয়ে হয় না। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব?্যবস্থায় যদি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনা না যায়, শুধু জনতুষ্টিমূলক কথা ‘কেউ দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’- এটা বলেই সংস্কার হবে? এই মূহূর্তে উচ্চ কক্ষ করে রাজনৈতিক এলিটদের পুনর্বাসনের নামে রাষ্ট্রের কাঁধে হাতি পোষার খরচ চাপিয়ে দেয়া এবং প্রয়োজনমতো উচ্চকক্ষকে এস্টাবলিশমেন্ট এবং বিশ্বমোড়লদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের রাস্তা তৈরির প্রচেষ্টা কিনা সে বিতর্ক কিন্তু আছে। আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচন করার মতো বাস্তবতা যদি থেকে থাকে তবে দুই কক্ষ না করে এক কক্ষের বা জাতীয় সংসদের ভোটই তো সেভাবে করা যেতে পারে। আর আমাদের দেশের মানুষের মনোভাব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি এই মুহূর্তে ‘ভোটের আনুপাতিক হারে’ সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিষয়টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বিবেচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা যেত। অন্তর্বর্তী সরকার কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন? আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। মার্কা দেওয়া মূল ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নাম্বার দেওয়া থাকলেও কোন দূরভিসন্ধী বাস্তবায়নের জন্য সিরিয়াল নাম্বারবিহীন হ্যাঁ-না ভোটের ব্যালট পেপার ছাপানো হলো? এটা কি ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে না?

অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত এক বিশৃঙ্খল ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি রেখে যাবেন পরবর্তী সরকারের জন্য। মব সংস্কৃতি নামক একটা আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির উপহার দেশবাসীর জন্য তারা রেখে যাবেন। মানুষ তো সাদা চোখে দৈনন্দিন জীবনে যা দেখে তা দিয়েই মূল্যায়ন করে। শুধু ঢাকা শহরের ফুটপাথের দিকে তাকাই। ফুটপাথের এক লাইন আওয়ামী আমলেই হকারদের জন্য বরাদ্দ ছিল। ৫ আগস্টের পরে সে লাইনে যারা আছেন তাদের দৈনিক চাঁদা দেয়ার ঠিকানা শুধু বদলেছে। কিন্তু নতুন মালিকরা শুধু অতটুকুতেই সন্তুষ্ট না। নতুন পত্তনিতে এককালীন মোটা অঙ্কও পাওয়া যায়। তাই ব্যবসায়িক এলাকাগুলোতে ফুটপাথের ওপর গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় লাইন। মানুষের হাঁটার জায়গা ওই সমস্ত এলাকার ফুটপাথে নাই। ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় এত অবনতি ইতঃপূর্বে চোখে পড়েনি। কোথাও কোনো নিয়ম কাজ করছে না। ফ্লাইওভারেও রিকশা পাবেন। অফিস আদালতে ‘স্পিড মানি’ প্রদানের প্রথা অবসান হয়নি, বরং ‘রেট’ বেড়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়েছে। এগুলো তো দৃশ্যমান।

আর মানুষের কাছে অদৃশ্যমান বিষয়সমূহ যেমন- নির্বাচনের আগে ভিনদেশীদের সঙ্গে বিতর্কিত সব চুক্তি স্বাক্ষর বা স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর এবং শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি। এসব চুক্তিতে সরকার আগবাড়িয়ে গোপনীয়তার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এভাবে মানুষের অগোচরে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে মার্কিনীদের এবং মার্কিনী স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের হাতে। আবার দেশের অভ্যন্তরে সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প নিয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে এ মুহূর্তে জরুরি নয় এবং বিতর্কিত বেশকিছু প্রকল্পও এর মধ্যে আছে। আবার বেশকিছু প্রকল্প নেয়া হয়েছে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে। নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে এসব প্রকল্পের রাজনৈতিক যোগসূত্রতা রয়েছে বলে সমালোচনা আছে।

এসব পরিস্থিতি ও দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির বাড়বাড়ন্ত দেখে পৌরাণিক কাহিনি থেকে নেয়া সুপরিচিত বাংলা প্রবাদ ‘তোমাকে বধিবে যে ...’ সামান্য পরিবর্তন করে বলা যায় ‘দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে’-এর মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। আর এটা শুধু পুরাণের কাহিনির বক্তব্যই তো না, পবিত্র কুরআনেও মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে ‘জীবনের সমস্ত দুর্ভোগ তোমাদের দুহাতের কামাই’। মানুষের কর্মই তার পরিণতি ডেকে নিয়ে আসে এবং একবার পরিণতি যদি ডাক দেয় তাহলে আর ফেরার পথ থাকে না। তাতো আমরা একবার দেখলাম ২০২৪-এর ৫ আগস্টে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় বেলায় মনে এ প্রশ্ন জাগছে, কোন পরিণতির দিকে তারা নিজেদের এবং একই সঙ্গে আমাদের মাতৃভূমিকে ঠেলে দিলেন?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা]

back to top