alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

বাবুল রবিদাস

: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এই পৃথিবীতে সব পিতা-মাতাই সন্তানের অভিভাবক। সবার অন্তরেই পরিকল্পনার বাসা বাঁধে। যাদের বিয়ের পর সন্তান হতে বিলম্ব হয় বা একেবারেই হয় না, তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্নজনের কাছে পরামর্শ নিতে নিতে প্রায় পাগলপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে যায়। কেউ উন্নত চিকিৎসার আশায় ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়, কেউ ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়, আবার কেউ পীর-মুরশিদের কাছে ধরনা দেয়। কেউ ডাক্তার, বৈদ্য কিংবা কবিরাজের দ্বারস্থ হয়। যে যেভাবেই হোক সন্তান লাভ করলে সেটিকে ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য বা ঠাকুর-যে কারও অছিলা বলে মনে করে এবং তাদের প্রচুর পুরস্কার দেয়া হয়।

আর যার সন্তান হয় না, সে নিজেকে হতভাগা মনে করে অশান্তিতে দিন কাটায়। সমাজ তখন তাকে ‘আটকুড়ে’ বলে আখ্যায়িত করে, তার কাছ থেকে দূরে থাকে। তার মুখ দেখলে অকল্যাণ হবে-এমন ধারণা পোষণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর ওপর দোষ চাপিয়ে পুনরায় বিয়ের চেষ্টা চলে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হয়। সন্তানের আশায় স্বামী পুনরায় বিবাহ করে, কিন্তু বড় স্ত্রীর অবস্থার কী হয়? ফলে স্বামী ও বড় স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরে। এভাবেই বহু সংসার ভেঙে যেতে দেখা যায়। এটিই মূলত নরক।

এই দুনিয়া অস্থায়ী; মানবজীবনের কোনো স্থায়িত্ব নেই। তাই নশ্বর জীবন নিয়ে বাড়াবাড়ি করা সমীচীন নয়-এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে। সুখে-দুঃখে ধৈর্যের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করাই শ্রেয়। জীবনযুদ্ধে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু তাই বলে ধৈর্য হারালে চলবে না। অস্থায়ী মানবজীবনের এই সত্যটি আমাদের মনে রাখা দরকার।

চলার পথে অনেক সময় টক্কর লাগে। তাই দেখা যায়, কবি এ. কে. এম. ফজলুল করিম তাঁর ‘স্বর্গ-নরক’ কবিতায় একটি গভীর সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার তার লেখা “একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু” কবিতায় সমাজের আরেকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। ধনী লোকেরা যেখানে বসবাস করে, তার আশপাশেই বহু গরিব, দুঃখী, ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষ বাস করে। ধনীরা দলিত-বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের শোষণের মাধ্যমে সম্পদশালী হয়েছে।

অতিবৃদ্ধ বয়সে দুর্বল হয়ে পড়লে তারা অনুতপ্ত হয় এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ পুণ্য অর্জনের আশায় তীর্থে গিয়ে পাপখ-নের চেষ্টা করে। বহুদূরে অবস্থিত তীর্থে তারা পাপমোচনের আশায় যায়, বিপুল অর্থ ব্যয় করে। তীর্থভ্রমণে তারা বড় বড় পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী ও সমুদ্র দেখে-পর্যটনও হয় বটে। কিন্তু এসব লৌকিক দর্শনে কি সত্যিই পুণ্য অর্জিত হয়? মোটেই নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তীর্থভ্রমণের সময় হঠাৎ কোনো ভিক্ষুক সামনে এলে অনেক তীর্থযাত্রী তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। অর্থাৎ তারা দান করতে বা দরিদ্র মানুষকে ভালোবাসতে শেখেনি। এমন তীর্থভ্রমণ কি কোনো কাজে আসে? কেবল জায়গা দেখা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ বাড়ির পাশের গরিব-দুঃখী, দলিত-বঞ্চিত মানুষের সঙ্গে সদয় আচরণ করলে, অর্থের সুষম বণ্টন করলে, খোঁজখবর নিলে-সেটাই হতো প্রকৃত পুণ্য। কারণ মানুষকে ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ পুণ্যের কাজ।

বলা হয়-জীবের প্রতি যে দয়া করে, সে-ই ঈশ্বরের সেবা করে। জীবসেবাতেই জীবদাতার সেবা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ধনী, বলবান ও প্রতাপশালী লোকেরা ধন-দৌলতের গর্বে এসব ভুলে যায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করে এবং অন্যায় করতে দ্বিধা করে না। মানুষ অভ্যাসের দাস-একবার পাপকাজে অভ্যস্ত হলে সেখান থেকে সহজে বের হওয়া যায় না। তাই জ্ঞানীগুণীরা বলেন, অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।আবার এটাও বলা হয়-সমাজের সাধু ও সুধীজনদের উচিত পাপাচারী বা অপরাধী মানুষকে সৎ পরামর্শ দিয়ে কুপথ থেকে সুপথে ফিরিয়ে আনা। কারণ মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে অদেখা ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা কি প্রহসন নয়?

প্রভাবশালী মানুষেরা দরিদ্র ও দলিত-বঞ্চিত মানুষের রক্ত শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। পরে বৃদ্ধ বয়সে অনুশোচনায় বহু দূরে তীর্থে গিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে পাপমুক্তির আশা করে। গঙ্গায় স্নান করে মুক্তির প্রত্যাশা করে। কিন্তু এটি কি ‘যেমন কর্ম, তেমন ফল’-এর সম্পূর্ণ বিপরীত নয়? দরিদ্রদের ঘৃণা, অবহেলা ও শোষণ করে আবার স্বর্গপ্রাপ্তির আশা-এটা কি লৌকিক জ্ঞানেও গ্রহণযোগ্য?

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

বাবুল রবিদাস

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এই পৃথিবীতে সব পিতা-মাতাই সন্তানের অভিভাবক। সবার অন্তরেই পরিকল্পনার বাসা বাঁধে। যাদের বিয়ের পর সন্তান হতে বিলম্ব হয় বা একেবারেই হয় না, তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্নজনের কাছে পরামর্শ নিতে নিতে প্রায় পাগলপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে যায়। কেউ উন্নত চিকিৎসার আশায় ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়, কেউ ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়, আবার কেউ পীর-মুরশিদের কাছে ধরনা দেয়। কেউ ডাক্তার, বৈদ্য কিংবা কবিরাজের দ্বারস্থ হয়। যে যেভাবেই হোক সন্তান লাভ করলে সেটিকে ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য বা ঠাকুর-যে কারও অছিলা বলে মনে করে এবং তাদের প্রচুর পুরস্কার দেয়া হয়।

আর যার সন্তান হয় না, সে নিজেকে হতভাগা মনে করে অশান্তিতে দিন কাটায়। সমাজ তখন তাকে ‘আটকুড়ে’ বলে আখ্যায়িত করে, তার কাছ থেকে দূরে থাকে। তার মুখ দেখলে অকল্যাণ হবে-এমন ধারণা পোষণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর ওপর দোষ চাপিয়ে পুনরায় বিয়ের চেষ্টা চলে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হয়। সন্তানের আশায় স্বামী পুনরায় বিবাহ করে, কিন্তু বড় স্ত্রীর অবস্থার কী হয়? ফলে স্বামী ও বড় স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরে। এভাবেই বহু সংসার ভেঙে যেতে দেখা যায়। এটিই মূলত নরক।

এই দুনিয়া অস্থায়ী; মানবজীবনের কোনো স্থায়িত্ব নেই। তাই নশ্বর জীবন নিয়ে বাড়াবাড়ি করা সমীচীন নয়-এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে। সুখে-দুঃখে ধৈর্যের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করাই শ্রেয়। জীবনযুদ্ধে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু তাই বলে ধৈর্য হারালে চলবে না। অস্থায়ী মানবজীবনের এই সত্যটি আমাদের মনে রাখা দরকার।

চলার পথে অনেক সময় টক্কর লাগে। তাই দেখা যায়, কবি এ. কে. এম. ফজলুল করিম তাঁর ‘স্বর্গ-নরক’ কবিতায় একটি গভীর সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার তার লেখা “একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু” কবিতায় সমাজের আরেকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। ধনী লোকেরা যেখানে বসবাস করে, তার আশপাশেই বহু গরিব, দুঃখী, ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষ বাস করে। ধনীরা দলিত-বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের শোষণের মাধ্যমে সম্পদশালী হয়েছে।

অতিবৃদ্ধ বয়সে দুর্বল হয়ে পড়লে তারা অনুতপ্ত হয় এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ পুণ্য অর্জনের আশায় তীর্থে গিয়ে পাপখ-নের চেষ্টা করে। বহুদূরে অবস্থিত তীর্থে তারা পাপমোচনের আশায় যায়, বিপুল অর্থ ব্যয় করে। তীর্থভ্রমণে তারা বড় বড় পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী ও সমুদ্র দেখে-পর্যটনও হয় বটে। কিন্তু এসব লৌকিক দর্শনে কি সত্যিই পুণ্য অর্জিত হয়? মোটেই নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তীর্থভ্রমণের সময় হঠাৎ কোনো ভিক্ষুক সামনে এলে অনেক তীর্থযাত্রী তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। অর্থাৎ তারা দান করতে বা দরিদ্র মানুষকে ভালোবাসতে শেখেনি। এমন তীর্থভ্রমণ কি কোনো কাজে আসে? কেবল জায়গা দেখা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ বাড়ির পাশের গরিব-দুঃখী, দলিত-বঞ্চিত মানুষের সঙ্গে সদয় আচরণ করলে, অর্থের সুষম বণ্টন করলে, খোঁজখবর নিলে-সেটাই হতো প্রকৃত পুণ্য। কারণ মানুষকে ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ পুণ্যের কাজ।

বলা হয়-জীবের প্রতি যে দয়া করে, সে-ই ঈশ্বরের সেবা করে। জীবসেবাতেই জীবদাতার সেবা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ধনী, বলবান ও প্রতাপশালী লোকেরা ধন-দৌলতের গর্বে এসব ভুলে যায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করে এবং অন্যায় করতে দ্বিধা করে না। মানুষ অভ্যাসের দাস-একবার পাপকাজে অভ্যস্ত হলে সেখান থেকে সহজে বের হওয়া যায় না। তাই জ্ঞানীগুণীরা বলেন, অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।আবার এটাও বলা হয়-সমাজের সাধু ও সুধীজনদের উচিত পাপাচারী বা অপরাধী মানুষকে সৎ পরামর্শ দিয়ে কুপথ থেকে সুপথে ফিরিয়ে আনা। কারণ মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে অদেখা ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা কি প্রহসন নয়?

প্রভাবশালী মানুষেরা দরিদ্র ও দলিত-বঞ্চিত মানুষের রক্ত শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। পরে বৃদ্ধ বয়সে অনুশোচনায় বহু দূরে তীর্থে গিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে পাপমুক্তির আশা করে। গঙ্গায় স্নান করে মুক্তির প্রত্যাশা করে। কিন্তু এটি কি ‘যেমন কর্ম, তেমন ফল’-এর সম্পূর্ণ বিপরীত নয়? দরিদ্রদের ঘৃণা, অবহেলা ও শোষণ করে আবার স্বর্গপ্রাপ্তির আশা-এটা কি লৌকিক জ্ঞানেও গ্রহণযোগ্য?

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

back to top