alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মতিউর রহমান

: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারে কড়া নাড়ছে। রাজনীতির চিরচেনা ময়দান এখন সরগরম-দলীয় মেরুকরণ, জোটের পাটিগণিত, নেতৃত্বের রদবদল আর প্রচারণার কৌশলী রসদ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এই উপরিস্তরের ডামাডোলের নিচে এক গভীর ও শক্তিশালী প্রবাহ বয়ে চলেছে, যাকে আমরা ‘অদৃশ্য সামাজিক শক্তি’ বলতে পারি। প্রথাগত রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই আনুষ্ঠানিক রাজনীতির এই পাদপ্রদীপের তলার অন্ধকারকে উপেক্ষা করা হয়। অথচ এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ডিজিটাল চাপের মুখে পিষ্ট হওয়া সাধারণ ভোটাররাই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা, নিত্যদিনের উদ্বেগ এবং আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর কেবল নির্বাচনের পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং তারা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন রাজনৈতিক বৈধতার নতুন ব্যাকরণ। এই ‘অসাধারণ চাপ’ ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্টে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে সমাজের এই পরিবর্তিত ভূমিকা মূলত নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিগত কয়েক দশকের নির্বাচনী চক্রগুলোতে বাংলাদেশের ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণ করা হতো প্রধানত আদর্শিক ঝোঁক, পারিবারিক পরিচয় কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে। সেই যুগটি ছিল ‘ব্র?্যান্ড লয়্যালটি’ বা অন্ধ আনুগত্যের। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সেই পুরনো দেয়ালগুলো ধসে পড়ছে। বর্তমানের ভোটাররা অনেক বেশি ইস্যুভিত্তিক এবং অভিজ্ঞতাচালিত। তারা এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার জাদুকরী শব্দজালে মুগ্ধ হন না। বরং তারা রাজনীতিকে মূল্যায়ন করছেন তাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের আয়না দিয়ে। স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্য, শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারি সেবার মান এবং প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি-এগুলোই এখন সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বিচারের মানদ-। এই জাগতিক বাস্তবতাগুলো এমন এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করেছে, যা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ক্লিশে আখ্যান দিয়ে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।

এই সামাজিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো জনমিতি বা ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের বড় একটি অংশ এমন এক তরুণ প্রজন্ম, যারা তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত। এই প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি নয়। তারা প্রশ্নহীন আনুগত্যের চেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কর্তৃত্বকে বেশি পছন্দ করে। শাসনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা সম্পর্কে বৈশ্বিক পরিম-লের সাথে তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাজনীতি থেকে তাদের প্রত্যাশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কাছে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভোট দান নয়; বরং এটি হলো বিগত দিনের পারফরম্যান্সের এক নির্মম মূল্যায়ন। এই তরুণ ভোটারদের তৈরি করা চাপটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু স্থায়ী। তারা হয়তো রাজপথে বড় মিছিল করছে না, কিন্তু ডিজিটাল স্পেসে তারা যে আলাপ-আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় তুলছে, তা রাজনৈতিক অভিনেতাদের নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করছে।

অর্থনৈতিক চাপ সম্ভবত এই ‘অসাধারণ’ সামাজিক শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং শক্তিশালী অনুষঙ্গ। মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের অনিশ্চয়তা এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, এটি এখন রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রধান জ্বালানি। যখন একটি পরিবারের মাসিক বাজেট বাজারের ব্যাগের সাথে পাল্লা দিতে হিমশিম খায়, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির উজ্জ্বল সূচকগুলো তাদের কাছে নিছক উপহাস মনে হয়। ২০২৬ সালের সাধারণ ভোটাররা এই অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিবাদ করছেন রাজনৈতিক আশ্বাসের প্রতি এক ধরণের গভীর সন্দেহ পোষণের মাধ্যমে। তাদের ধৈর্যের সীমা সংকুচিত হয়ে আসছে এবং তারা এখন আর বিমূর্ত প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। অর্থনৈতিক এই সংকট ভোটারদের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, এখন আর কেবল ‘উন্নয়ন’ শব্দ দিয়ে তাদের তুষ্ট করা যাচ্ছে না, তারা চায় সেই উন্নয়নের সুষম বণ্টন এবং টেকসই সমাধান।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত গ-ি থেকে বের করে সমষ্টিগত সংহতিতে রূপান্তর করেছে। স্মার্টফোনের এক একটি ক্লিকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত হতাশা এখন মুহূর্তেই জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা এখন এমন এক কাচের ঘরে বাস করছেন, যেখানে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীন। আগে যেখানে কোনো খবর প্রচারের জন্য প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন নাগরিক সাংবাদিকতা সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছে। এই ডিজিটাল সক্রিয়তা শাসনের ওপর এক ধরণের অলিখিত নজরদারি তৈরি করেছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং জনমতের মধ্যবর্তী দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাহিত এই তীব্র ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াই মূলত ২০২৬ সালের নির্বাচনের আসল ‘পালস’ যা রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্রমাগত রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সংকটও এই সামাজিক চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণ ভোটাররা এখন আর কেবল প্রার্থীর ইশতেহার দেখেন না, তারা দেখেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি কতটা সংবেদনশীল। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিক্রিয়ার অভাব নাগরিকের মনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধরাছোঁয়ার বাইরে বা সাধারণের প্রতি উদাসীন বলে মনে হয়, তখন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ব্যালট বাক্সে বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। এই ধরনের চাপ অনেক সময় প্রকাশ্য প্রতিবাদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর, কারণ এটি ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদী অনাস্থার জন্ম দেয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই দলই এগিয়ে থাকবে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের বাস্তব পথ দেখাতে পারবে। সাধারণ মানুষের এই ‘নিনাদ’ এখন রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের প্রধান মানদ- হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক পরিচয়ের রাজনীতিও বাংলাদেশে নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে। ধর্ম, অঞ্চল বা শ্রেণীর মতো চিরাচরিত পরিচয়গুলো এখন বিলুপ্ত না হলেও তার সাথে যুক্ত হয়েছে পেশাগত পরিচয়, শিক্ষার স্তর এবং পরিবেশগত সচেতনতার মতো আধুনিক অনুষঙ্গ। জলবায়ু ঝুঁকি, নগরজট, মানসম্পন্ন শিক্ষার সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা এখন এমন কিছু সাধারণ উদ্বেগ যা প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনকে ভেঙে মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের সংহতি তৈরি করছে। এই ইস্যুগুলো রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণে এক ধরনের স্থায়ী সামাজিক চাপ তৈরি করছে। মানুষ এখন এমন নেতা খুঁজছে যারা কেবল দলীয় স্লোগান দেবে না, বরং যারা তাদের শহরের জলাবদ্ধতা বা উপকূলে নোনা পানির সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। এই ইস্যুভিত্তিক চাপ ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের সেকেলে প্রচারণা কৌশল বদলে আধুনিক হতে বাধ্য করছে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলোর অকার্যকারিতা। প্রথাগত জনমত জরিপ বা ভোটার জরিপগুলো অনেক সময় ভোটারদের মনের গহীনের এই অস্থিরতা ধরতে ব্যর্থ হয়। সামাজিক চাপ সবসময় চিৎকার করে আসে না; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যা অসংখ্য ছোট ছোট অভিজ্ঞতার সমষ্টি। যখন এটি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান হয়, ততক্ষণে নির্বাচনী গতিশীলতা হয়তো সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই গভীর ও সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য এখন প্রয়োজন সামাজিক আলাপ-আলোচনা এবং ডিজিটাল ট্রেন্ডের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ। যারা কেবল সমাবেশের লোকসমাগম দেখে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন, তারা হয়তো সাধারণ ভোটারের নীরব ও অসাধারণ চাপের মহিমা বুঝতে ভুল করছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে মূলত সমাজ থেকে আসা এই সিগন্যালগুলো পড়ার এক পরীক্ষা।

রাজনৈতিক অভিনেতাদের জন্য এই রূপান্তরের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার-এখন আর শাসনব্যবস্থাকে নির্বাচনী কৌশল থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিগত পদক্ষেপ ভোটারদের রায়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যদি অন্তুর্নিহিত সামাজিক উদ্বেগগুলোকে আমলে না নিয়ে কেবল নির্বাচনী প্রকৌশল দিয়ে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর বৈধতা তৈরি করবে। বিপরীতে, সাধারণ ভোটারদের এই অসাধারণ চাপকে যদি স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং তার প্রতি কার্যকর সাড়া দেয়া হয়, তবে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য স্থিতিশীলতার এক নতুন উৎস হতে পারে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা আর কেবল ব্যালট পেপার হাতে থাকা নিষ্ক্রিয় দর্শক নন; তারা এখন সক্রিয় বিচারক।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়। এটি কেবল একটি ভোটের লড়াই নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি সমাজের এক কঠোর জবাবদিহিতার মুহূর্ত। সাধারণ ভোটাররা তাদের দৈনন্দিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে অসাধারণ চাপের সৃষ্টি করেছেন, তা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অভিযোজন ও আধুনিকায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই নির্বাচনে সেই রাজনৈতিক শক্তিই জয়ী হবে যারা জনগণের এই সুপ্ত ভাষাটি বুঝতে পারবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল দলীয় কার্যালয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে, চায়ের দোকানে এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে গড়ে ওঠা সেই অমোঘ দাবির ওপর নির্ভর করছে। নীরব কিন্তু অবিরাম এই সামাজিক চাপই শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের নির্বাচনের আসল গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মতিউর রহমান

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারে কড়া নাড়ছে। রাজনীতির চিরচেনা ময়দান এখন সরগরম-দলীয় মেরুকরণ, জোটের পাটিগণিত, নেতৃত্বের রদবদল আর প্রচারণার কৌশলী রসদ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এই উপরিস্তরের ডামাডোলের নিচে এক গভীর ও শক্তিশালী প্রবাহ বয়ে চলেছে, যাকে আমরা ‘অদৃশ্য সামাজিক শক্তি’ বলতে পারি। প্রথাগত রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই আনুষ্ঠানিক রাজনীতির এই পাদপ্রদীপের তলার অন্ধকারকে উপেক্ষা করা হয়। অথচ এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ডিজিটাল চাপের মুখে পিষ্ট হওয়া সাধারণ ভোটাররাই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা, নিত্যদিনের উদ্বেগ এবং আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর কেবল নির্বাচনের পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং তারা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন রাজনৈতিক বৈধতার নতুন ব্যাকরণ। এই ‘অসাধারণ চাপ’ ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্টে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে সমাজের এই পরিবর্তিত ভূমিকা মূলত নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিগত কয়েক দশকের নির্বাচনী চক্রগুলোতে বাংলাদেশের ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণ করা হতো প্রধানত আদর্শিক ঝোঁক, পারিবারিক পরিচয় কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে। সেই যুগটি ছিল ‘ব্র?্যান্ড লয়্যালটি’ বা অন্ধ আনুগত্যের। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সেই পুরনো দেয়ালগুলো ধসে পড়ছে। বর্তমানের ভোটাররা অনেক বেশি ইস্যুভিত্তিক এবং অভিজ্ঞতাচালিত। তারা এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার জাদুকরী শব্দজালে মুগ্ধ হন না। বরং তারা রাজনীতিকে মূল্যায়ন করছেন তাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের আয়না দিয়ে। স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্য, শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারি সেবার মান এবং প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি-এগুলোই এখন সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বিচারের মানদ-। এই জাগতিক বাস্তবতাগুলো এমন এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করেছে, যা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ক্লিশে আখ্যান দিয়ে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।

এই সামাজিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো জনমিতি বা ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের বড় একটি অংশ এমন এক তরুণ প্রজন্ম, যারা তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত। এই প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি নয়। তারা প্রশ্নহীন আনুগত্যের চেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কর্তৃত্বকে বেশি পছন্দ করে। শাসনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা সম্পর্কে বৈশ্বিক পরিম-লের সাথে তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাজনীতি থেকে তাদের প্রত্যাশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কাছে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভোট দান নয়; বরং এটি হলো বিগত দিনের পারফরম্যান্সের এক নির্মম মূল্যায়ন। এই তরুণ ভোটারদের তৈরি করা চাপটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু স্থায়ী। তারা হয়তো রাজপথে বড় মিছিল করছে না, কিন্তু ডিজিটাল স্পেসে তারা যে আলাপ-আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় তুলছে, তা রাজনৈতিক অভিনেতাদের নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করছে।

অর্থনৈতিক চাপ সম্ভবত এই ‘অসাধারণ’ সামাজিক শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং শক্তিশালী অনুষঙ্গ। মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের অনিশ্চয়তা এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, এটি এখন রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রধান জ্বালানি। যখন একটি পরিবারের মাসিক বাজেট বাজারের ব্যাগের সাথে পাল্লা দিতে হিমশিম খায়, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির উজ্জ্বল সূচকগুলো তাদের কাছে নিছক উপহাস মনে হয়। ২০২৬ সালের সাধারণ ভোটাররা এই অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিবাদ করছেন রাজনৈতিক আশ্বাসের প্রতি এক ধরণের গভীর সন্দেহ পোষণের মাধ্যমে। তাদের ধৈর্যের সীমা সংকুচিত হয়ে আসছে এবং তারা এখন আর বিমূর্ত প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। অর্থনৈতিক এই সংকট ভোটারদের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, এখন আর কেবল ‘উন্নয়ন’ শব্দ দিয়ে তাদের তুষ্ট করা যাচ্ছে না, তারা চায় সেই উন্নয়নের সুষম বণ্টন এবং টেকসই সমাধান।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত গ-ি থেকে বের করে সমষ্টিগত সংহতিতে রূপান্তর করেছে। স্মার্টফোনের এক একটি ক্লিকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত হতাশা এখন মুহূর্তেই জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা এখন এমন এক কাচের ঘরে বাস করছেন, যেখানে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীন। আগে যেখানে কোনো খবর প্রচারের জন্য প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন নাগরিক সাংবাদিকতা সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছে। এই ডিজিটাল সক্রিয়তা শাসনের ওপর এক ধরণের অলিখিত নজরদারি তৈরি করেছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং জনমতের মধ্যবর্তী দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাহিত এই তীব্র ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াই মূলত ২০২৬ সালের নির্বাচনের আসল ‘পালস’ যা রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্রমাগত রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সংকটও এই সামাজিক চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণ ভোটাররা এখন আর কেবল প্রার্থীর ইশতেহার দেখেন না, তারা দেখেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি কতটা সংবেদনশীল। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিক্রিয়ার অভাব নাগরিকের মনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধরাছোঁয়ার বাইরে বা সাধারণের প্রতি উদাসীন বলে মনে হয়, তখন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ব্যালট বাক্সে বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। এই ধরনের চাপ অনেক সময় প্রকাশ্য প্রতিবাদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর, কারণ এটি ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদী অনাস্থার জন্ম দেয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই দলই এগিয়ে থাকবে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের বাস্তব পথ দেখাতে পারবে। সাধারণ মানুষের এই ‘নিনাদ’ এখন রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের প্রধান মানদ- হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক পরিচয়ের রাজনীতিও বাংলাদেশে নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে। ধর্ম, অঞ্চল বা শ্রেণীর মতো চিরাচরিত পরিচয়গুলো এখন বিলুপ্ত না হলেও তার সাথে যুক্ত হয়েছে পেশাগত পরিচয়, শিক্ষার স্তর এবং পরিবেশগত সচেতনতার মতো আধুনিক অনুষঙ্গ। জলবায়ু ঝুঁকি, নগরজট, মানসম্পন্ন শিক্ষার সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা এখন এমন কিছু সাধারণ উদ্বেগ যা প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনকে ভেঙে মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের সংহতি তৈরি করছে। এই ইস্যুগুলো রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণে এক ধরনের স্থায়ী সামাজিক চাপ তৈরি করছে। মানুষ এখন এমন নেতা খুঁজছে যারা কেবল দলীয় স্লোগান দেবে না, বরং যারা তাদের শহরের জলাবদ্ধতা বা উপকূলে নোনা পানির সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। এই ইস্যুভিত্তিক চাপ ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের সেকেলে প্রচারণা কৌশল বদলে আধুনিক হতে বাধ্য করছে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলোর অকার্যকারিতা। প্রথাগত জনমত জরিপ বা ভোটার জরিপগুলো অনেক সময় ভোটারদের মনের গহীনের এই অস্থিরতা ধরতে ব্যর্থ হয়। সামাজিক চাপ সবসময় চিৎকার করে আসে না; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যা অসংখ্য ছোট ছোট অভিজ্ঞতার সমষ্টি। যখন এটি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান হয়, ততক্ষণে নির্বাচনী গতিশীলতা হয়তো সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই গভীর ও সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য এখন প্রয়োজন সামাজিক আলাপ-আলোচনা এবং ডিজিটাল ট্রেন্ডের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ। যারা কেবল সমাবেশের লোকসমাগম দেখে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন, তারা হয়তো সাধারণ ভোটারের নীরব ও অসাধারণ চাপের মহিমা বুঝতে ভুল করছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে মূলত সমাজ থেকে আসা এই সিগন্যালগুলো পড়ার এক পরীক্ষা।

রাজনৈতিক অভিনেতাদের জন্য এই রূপান্তরের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার-এখন আর শাসনব্যবস্থাকে নির্বাচনী কৌশল থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিগত পদক্ষেপ ভোটারদের রায়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যদি অন্তুর্নিহিত সামাজিক উদ্বেগগুলোকে আমলে না নিয়ে কেবল নির্বাচনী প্রকৌশল দিয়ে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর বৈধতা তৈরি করবে। বিপরীতে, সাধারণ ভোটারদের এই অসাধারণ চাপকে যদি স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং তার প্রতি কার্যকর সাড়া দেয়া হয়, তবে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য স্থিতিশীলতার এক নতুন উৎস হতে পারে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা আর কেবল ব্যালট পেপার হাতে থাকা নিষ্ক্রিয় দর্শক নন; তারা এখন সক্রিয় বিচারক।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়। এটি কেবল একটি ভোটের লড়াই নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি সমাজের এক কঠোর জবাবদিহিতার মুহূর্ত। সাধারণ ভোটাররা তাদের দৈনন্দিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে অসাধারণ চাপের সৃষ্টি করেছেন, তা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অভিযোজন ও আধুনিকায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই নির্বাচনে সেই রাজনৈতিক শক্তিই জয়ী হবে যারা জনগণের এই সুপ্ত ভাষাটি বুঝতে পারবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল দলীয় কার্যালয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে, চায়ের দোকানে এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে গড়ে ওঠা সেই অমোঘ দাবির ওপর নির্ভর করছে। নীরব কিন্তু অবিরাম এই সামাজিক চাপই শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের নির্বাচনের আসল গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top