alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

গাজী তারেক আজিজ

: বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্র যেন একই সঙ্গে ক্লান্ত, উত্তেজিত এবং অনিশ্চিত। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা, তারপর আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ, ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে সরকার পতনের ছক, ক্ষমতার পতন, উচ্চ আদালতের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, এবং সামনে নির্বাচন কিংবা গণভোটের প্রশ্ন।

২০২৪ সালের আন্দোলন একটি দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দরজা খোলা আর সঠিক পথে হাঁটা এক নয়। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি পরিণত গণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। আর যদি তারা শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ফিরে যায়, তাহলে ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে

সংস্কার কার্যক্রম, সংস্কারের নিমিত্ত প্রস্তাবনা ও সুপারিশ। জুলাই সনদ প্রণয়ন। স্বাক্ষর করা না করা বিতর্ক। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, ভোট বর্জনের ডাক। পক্ষে বিপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ। কখনো সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্বাচন ইনক্লুসিভ না করার। নির্বাচন অনুষ্ঠানেও চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে মূল প্রশ্ন একটাই: শেষ পর্যন্ত শাসনের রাজদণ্ড কার হাতে উঠবে ২০২৪ সালকে ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত শুধু একটি বছর হিসেবে লিখবেন না।

এটিকে তারা বলবেন এক রাজনৈতিক বাঁকবদলের সময়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়েছিল। সেই অসন্তোষ কেবল বিরোধী দল বা কিছু রাজনৈতিক কর্মীর ছিল না, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে এসেছিল। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, প্রশাসনিক একচেটিয়া আধিপত্য এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এগুলো পৃথক পৃথক সমস্যা হিসেবে ছিল। ২০২৪ সালে এগুলো এক জায়গায় এসে মিলল। ফলে আন্দোলন আর কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকল না, তা হয়ে উঠল জনমনের প্রতিবাদ। প্রথমে ছাত্র, পরে পেশাজীবী, তারপর সাধারণ মানুষ। রাস্তায় নেমে আসা জনতার একটি বড় অংশ কোনো দলের পতাকা নিয়ে নামেনি। তারা একটি অনুভূতি নিয়ে নেমেছিল: রাষ্ট্রের ওপর তাদের আস্থা ভেঙে গেছে। বিস্তর অভিযোগ ছিল। গত ১৮ মাস সময়ে এসে জনমনে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হতেও দেখা গেছে, ‘আমরা কি ভুল করলাম’ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেছেন, ‘আমরা প্রতারিত হয়েছি।’ তিনি কি ইঙ্গিতে এই কথা বললেন তা-ও অনুমিত। তবে এটুকু বলে দেয়া যায়, জন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। যেটুকু সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিলো, তা-ও বিলীন হয়ে গেছে। আর মানুষও ফিরে ফিরে অতীতে আচ্ছন্ন হতে চাইছেন। এখন যে প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় নজিরবিহীন। একটি বড় ঐতিহাসিক দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে নির্বাচন কীভাবে হবে? নির্বাচন ঘোষিত সময়েই হওয়ার আয়োজন সম্পন্ন। তারপরও বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের নামে সড়ক অবরোধ, মূলত নির্বাচন বানচাল হিসেবে দেখছেন অনেকেই। আর সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে দমন করেছে। আপাতত ইস্যু ফ্লপ! একদিকে অনেকেই মনে করছেন নির্বাচন একটি নতুন সুযোগ।

দীর্ঘদিন ধরে একপাক্ষিক নির্বাচনের অভিযোগ ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে একটি বাস্তব সমস্যাও আছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধানতম সংগঠন। তাদের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়াগত হলেও রাজনৈতিকভাবে পূর্ণতা পায় না। এখানেই দ্বিধা তৈরি হয়েছে। অনেকেই আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন চান, কিন্তু একই সঙ্গে আগের ধরনের ক্ষমতাকাঠামো ফিরে আসুক তা চান না। কিন্তু এত এত সংস্কারের বুলি আওড়িয়ে কতটুকু তার অর্জন? জনগণ রয়েছে পরিপূর্ণ ধোঁয়াশায়। তবে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান যত সহজ, নির্বাচিত সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অসীম, আর তাই টিকে থাকা ততটাই চ্যালেঞ্জিং। কারণ আওয়ামী লীগের অতীত বলে, সরকারের চেয়ে বিরোধী দলে অর্থাৎ রাজপথে থাকলেই তাদের মোকাবেলা কঠিন থেকে কঠিনতর। এখন যারা আওয়ামী লীগের শেষ দেখছেন তাদেরও ভুল ভাঙবে, এমনটাই বিশ্লেষকদের ধারণা। তাই আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন সুযোগ নয় বরং ব্যর্থ নির্বাচন হওয়ার শঙ্কাই প্রকট। বাকিটা দলটির সঠিক নেতৃত্ব ও তৃণমূলের ওপরই নির্ভর করবে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করার ইতিহাস দলটিকে সমৃদ্ধির যোগান দিবে বলেও ধারণা। এই পরিস্থিতিতে গণভোটের আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায় কিনা রাষ্ট্র কোন পথে যাবে। গণভোটের আকর্ষণ আছে, কারণ এটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির বাইরে সরাসরি জনগণের মতামত নেয়। কিন্তু এর ঝুঁকিও আছে। গণভোট সাধারণত একটি প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়, অথচ রাষ্ট্রের সমস্যা জটিল। কিন্তু এখানে একাধিক প্রশ্ন, অথচ উত্তর হ্যাঁ অথবা না। আর এই ‘হ্যাঁ অথবা না’ এর মধ্যে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা করে উত্তর দেয়ার বিধান রাখা হয়নি। আর তা-ই শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ! এদিকে সরকার নিজেই গণভোটের ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে। তাহলে কী দাঁড়ায়? সরকার আয়োজক হয়ে রেফারি হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে নয়, সরাসরি পক্ষ নিয়েছে। তাই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সংস্কার কমিটিও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছে। সরকার রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য বললেও, নির্বাচন কমিশন স্পষ্টতই বলে দিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের কোন পক্ষে প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও এই আলোচনার অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে মানুষ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনও ভাবছে। অর্থাৎ প্রশ্নটা আর শুধু কে ক্ষমতায় আসবে নয়, কী ধরনের শাসনব্যবস্থা হবে তা নিয়ে। আদতে সকলের মনে ভয় ও দ্বিধা! বিশ্লেষকদের ধারণা আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক ভোটার অনুপস্থিত থাকলে কত শতাংশ ভোট কাস্টিং হতে পারে? এদিকে ২৪-এর পাঁচ আগস্ট পরবর্তী আওয়ামী লীগের নিরীহ কর্মী-সমর্থকদের নামে গায়েবি মামলা হামলা। তাই দলটির ত্যাগী কর্মীরা যতটা না সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কোণঠাসা ছিল, এখন জীবনের শঙ্কা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কেউ বিনাবিচারে কারাবাসে রয়েছেন। তাহলে ভুক্তভোগীর পরিবার কেন আর কাকে ভোট দিবে? আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনীতির মাঠ ফাঁকা থাকেনি। ছোট দল, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, তরুণ নেতৃত্ব, এমনকি অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া কিছু মুখও রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এটি একদিকে ইতিবাচক। কারণ দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আন্দোলন করা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক জিনিস নয়। জনতার আবেগে নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে, কিন্তু প্রশাসন চালাতে লাগে সংগঠন, অভিজ্ঞতা এবং নীতি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বহুবার দেখা গেছে, পুরনো শক্তির পতনের পর নতুন শক্তি দ্রুত জনপ্রিয় হয়, কিন্তু শাসনে এসে সংকটে পড়ে। ফলে আবার পুরনো শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়। অধিকন্তু, ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে লুটের মহোৎসব যেমন দেখা হয়েছে, তেমনই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হতেও দেখেছি। আর তা ’২৪-এর আন্দোলনের পরই। তাহলে নয়া বন্দোবস্তের নামে লুটপাট করে দখলদারত্বের হাত বদলই কি মানুষ চেয়েছে? বলা হচ্ছে ৫৪ বছরের জঞ্জাল সাফ করতে এই সময় যথেষ্ট নয়! দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও জানার আগ্রহ কি সেই জঞ্জাল? যা পরবর্তী সরকার সরাবে! অতীতে আমরা দেখেছি, সরকারের ছায়া সরকার বিরোধী দল নয়। সেটা ছিল সরকারের প্যারালাল সরকার। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরালে আরেক ছায়া প্রধানমন্ত্রী দেশ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পত্রিকার পাতায় কতসব সংবাদের ফিরিস্তি! এখন তারাই এত ভালো হয়ে গেলেন কী করে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের নয়, আস্থার সংকট। মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কিনা, ক্ষমতাসীন থেকে সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করে পক্ষপাত করবে কিনা, কিংবা ক্ষমতা বদল হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে কিনা। এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। যদি নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করে কিন্তু রাজনৈতিক আচরণ একই থাকে, তাহলে সংকটের সমাধান হবে না। তখন শাসনের রাজদণ্ড বদলাবে, কিন্তু শাসনের ধরন বদলাবে না। তাহলে কি একইরকম পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে? নাগরিক কত যে অসহায়! শিরোনামের সেই রাজদণ্ডের মালিক বা নিয়ন্ত্রক কে হতে যাচ্ছে? প্রশ্নটি রাজনৈতিক হলেও উত্তরটি দার্শনিক। গণতন্ত্রে শাসনের রাজদণ্ড আসলে কোনো দল বা নেতার হাতে থাকে না, থাকার কথা জনগণের হাতে। নির্বাচন সেই রাজদণ্ড সাময়িকভাবে প্রতিনিধির কাছে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া মাত্র।

বাংলাদেশের সংকট তৈরি হয়েছে কারণ এই ধারণাটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মানুষ মনে করতে শুরু করেছিল ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দাবি। এখন যে নির্বাচন ও গণভোট সেটি শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি আস্থার পরীক্ষা। মানুষ দেখতে চায় তাদের ভোট সত্যিই মূল্যবান কি না। যদি বিএনপির হাতে যায় ক্ষমতা তবে কি বিরোধী শক্তিকে দমন-নিপীড়ন চলতেই থাকবে? যেমনটি সরকার পতনের পর হয়েছিল। মামলা-হামলা দিয়ে বাণিজ্য। আর যদি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে, তবে কি অনুমিত পাকিস্তান প্রীতি বেড়ে যাবে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধারা হুমকি পড়বে? নাকি ২৪ নিয়ে গত আঠারো মাসের ন্যায় একাত্তর ভোলানো ইতিহাসের চর্চাই চলতে থাকবে? নারীদের এবং সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ কি কমবে? তবে কার হাতে উঠছে সেই বহুল কাক্সিক্ষত সেই রাজদণ্ড অনুমিত না চমক? তবে ভোট সবসময় ব্যালটে হয় না। ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও থাকে। তাই ব্যালটে জামায়াত পিছিয়ে থাকলেও সর্বকালের সেরা সময় অতিক্রম করা দল হিসেবে কি ভিন্ন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? অন্যদিকে ভোটার সমর্থন থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট বিএনপি খুব একটা টানতে পারবে বলে মনে হয় না। এই পর্যন্ত এবং ভোটের পর আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপর পুনরায় হামলার আশঙ্কা দলটির সকল নেতাকর্মীদের মনে ভীতি সঞ্চার করছে। তাই ফলাফল ঠিক একপেশে হওয়ারও সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে জামায়াতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। আবার দলটির আমীরের টুইটার হ্যান্ডলে কর্মজীবী নারীদের ‘পতিতা’ লিখে টুইট করার জবাব সঙ্গে সঙ্গে যতটুকু পেয়েছে, ব্যালটে তার চেয়েও তীব্র হলে অপেক্ষায় থাকতে হবে ক্ষমতার স্বাদ পেতে। বাংলাদেশের সামনে সমান সম্ভাবনা নিয়ে হাজির, তবে- প্রথমত, প্রতিযোগিতামূলক একটি নির্বাচন, যেখানে নতুন ও পুরনো সব শক্তি অংশ নেয় এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল পথ। দ্বিতীয়ত, খণ্ডিত রাজনীতি, যেখানে ছোট ছোট শক্তি ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং অস্থিরতা বাড়ে। তৃতীয়ত, আবারও কোনো একক শক্তির দ্রুত উত্থান, যা স্বল্পমেয়াদে স্থিতি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। শাসনের রাজদণ্ড শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, তার উত্তর কেবল নির্বাচনের ফল নয়। এটি নির্ভর করবে জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক দলের আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার ওপর। ২০২৪ সালের আন্দোলন একটি দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দরজা খোলা আর সঠিক পথে হাঁটা এক নয়। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি পরিণত গণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। আর যদি তারা শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ফিরে যায়, তাহলে ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে। সুতরাং প্রশ্নটি কেবল কে ক্ষমতায় আসবে নয়। প্রশ্নটি হলো, এবার কি সত্যিই ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরবে? আসুন প্রশ্ন করতে শিখি!

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

গাজী তারেক আজিজ

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্র যেন একই সঙ্গে ক্লান্ত, উত্তেজিত এবং অনিশ্চিত। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা, তারপর আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ, ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে সরকার পতনের ছক, ক্ষমতার পতন, উচ্চ আদালতের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, এবং সামনে নির্বাচন কিংবা গণভোটের প্রশ্ন।

২০২৪ সালের আন্দোলন একটি দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দরজা খোলা আর সঠিক পথে হাঁটা এক নয়। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি পরিণত গণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। আর যদি তারা শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ফিরে যায়, তাহলে ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে

সংস্কার কার্যক্রম, সংস্কারের নিমিত্ত প্রস্তাবনা ও সুপারিশ। জুলাই সনদ প্রণয়ন। স্বাক্ষর করা না করা বিতর্ক। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, ভোট বর্জনের ডাক। পক্ষে বিপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ। কখনো সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্বাচন ইনক্লুসিভ না করার। নির্বাচন অনুষ্ঠানেও চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে মূল প্রশ্ন একটাই: শেষ পর্যন্ত শাসনের রাজদণ্ড কার হাতে উঠবে ২০২৪ সালকে ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত শুধু একটি বছর হিসেবে লিখবেন না।

এটিকে তারা বলবেন এক রাজনৈতিক বাঁকবদলের সময়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়েছিল। সেই অসন্তোষ কেবল বিরোধী দল বা কিছু রাজনৈতিক কর্মীর ছিল না, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে এসেছিল। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, প্রশাসনিক একচেটিয়া আধিপত্য এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এগুলো পৃথক পৃথক সমস্যা হিসেবে ছিল। ২০২৪ সালে এগুলো এক জায়গায় এসে মিলল। ফলে আন্দোলন আর কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকল না, তা হয়ে উঠল জনমনের প্রতিবাদ। প্রথমে ছাত্র, পরে পেশাজীবী, তারপর সাধারণ মানুষ। রাস্তায় নেমে আসা জনতার একটি বড় অংশ কোনো দলের পতাকা নিয়ে নামেনি। তারা একটি অনুভূতি নিয়ে নেমেছিল: রাষ্ট্রের ওপর তাদের আস্থা ভেঙে গেছে। বিস্তর অভিযোগ ছিল। গত ১৮ মাস সময়ে এসে জনমনে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হতেও দেখা গেছে, ‘আমরা কি ভুল করলাম’ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেছেন, ‘আমরা প্রতারিত হয়েছি।’ তিনি কি ইঙ্গিতে এই কথা বললেন তা-ও অনুমিত। তবে এটুকু বলে দেয়া যায়, জন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। যেটুকু সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিলো, তা-ও বিলীন হয়ে গেছে। আর মানুষও ফিরে ফিরে অতীতে আচ্ছন্ন হতে চাইছেন। এখন যে প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় নজিরবিহীন। একটি বড় ঐতিহাসিক দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে নির্বাচন কীভাবে হবে? নির্বাচন ঘোষিত সময়েই হওয়ার আয়োজন সম্পন্ন। তারপরও বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের নামে সড়ক অবরোধ, মূলত নির্বাচন বানচাল হিসেবে দেখছেন অনেকেই। আর সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে দমন করেছে। আপাতত ইস্যু ফ্লপ! একদিকে অনেকেই মনে করছেন নির্বাচন একটি নতুন সুযোগ।

দীর্ঘদিন ধরে একপাক্ষিক নির্বাচনের অভিযোগ ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে একটি বাস্তব সমস্যাও আছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধানতম সংগঠন। তাদের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়াগত হলেও রাজনৈতিকভাবে পূর্ণতা পায় না। এখানেই দ্বিধা তৈরি হয়েছে। অনেকেই আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন চান, কিন্তু একই সঙ্গে আগের ধরনের ক্ষমতাকাঠামো ফিরে আসুক তা চান না। কিন্তু এত এত সংস্কারের বুলি আওড়িয়ে কতটুকু তার অর্জন? জনগণ রয়েছে পরিপূর্ণ ধোঁয়াশায়। তবে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান যত সহজ, নির্বাচিত সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অসীম, আর তাই টিকে থাকা ততটাই চ্যালেঞ্জিং। কারণ আওয়ামী লীগের অতীত বলে, সরকারের চেয়ে বিরোধী দলে অর্থাৎ রাজপথে থাকলেই তাদের মোকাবেলা কঠিন থেকে কঠিনতর। এখন যারা আওয়ামী লীগের শেষ দেখছেন তাদেরও ভুল ভাঙবে, এমনটাই বিশ্লেষকদের ধারণা। তাই আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন সুযোগ নয় বরং ব্যর্থ নির্বাচন হওয়ার শঙ্কাই প্রকট। বাকিটা দলটির সঠিক নেতৃত্ব ও তৃণমূলের ওপরই নির্ভর করবে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করার ইতিহাস দলটিকে সমৃদ্ধির যোগান দিবে বলেও ধারণা। এই পরিস্থিতিতে গণভোটের আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায় কিনা রাষ্ট্র কোন পথে যাবে। গণভোটের আকর্ষণ আছে, কারণ এটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির বাইরে সরাসরি জনগণের মতামত নেয়। কিন্তু এর ঝুঁকিও আছে। গণভোট সাধারণত একটি প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়, অথচ রাষ্ট্রের সমস্যা জটিল। কিন্তু এখানে একাধিক প্রশ্ন, অথচ উত্তর হ্যাঁ অথবা না। আর এই ‘হ্যাঁ অথবা না’ এর মধ্যে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা করে উত্তর দেয়ার বিধান রাখা হয়নি। আর তা-ই শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ! এদিকে সরকার নিজেই গণভোটের ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে। তাহলে কী দাঁড়ায়? সরকার আয়োজক হয়ে রেফারি হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে নয়, সরাসরি পক্ষ নিয়েছে। তাই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সংস্কার কমিটিও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছে। সরকার রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য বললেও, নির্বাচন কমিশন স্পষ্টতই বলে দিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের কোন পক্ষে প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও এই আলোচনার অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে মানুষ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনও ভাবছে। অর্থাৎ প্রশ্নটা আর শুধু কে ক্ষমতায় আসবে নয়, কী ধরনের শাসনব্যবস্থা হবে তা নিয়ে। আদতে সকলের মনে ভয় ও দ্বিধা! বিশ্লেষকদের ধারণা আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক ভোটার অনুপস্থিত থাকলে কত শতাংশ ভোট কাস্টিং হতে পারে? এদিকে ২৪-এর পাঁচ আগস্ট পরবর্তী আওয়ামী লীগের নিরীহ কর্মী-সমর্থকদের নামে গায়েবি মামলা হামলা। তাই দলটির ত্যাগী কর্মীরা যতটা না সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কোণঠাসা ছিল, এখন জীবনের শঙ্কা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কেউ বিনাবিচারে কারাবাসে রয়েছেন। তাহলে ভুক্তভোগীর পরিবার কেন আর কাকে ভোট দিবে? আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনীতির মাঠ ফাঁকা থাকেনি। ছোট দল, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, তরুণ নেতৃত্ব, এমনকি অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া কিছু মুখও রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এটি একদিকে ইতিবাচক। কারণ দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আন্দোলন করা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক জিনিস নয়। জনতার আবেগে নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে, কিন্তু প্রশাসন চালাতে লাগে সংগঠন, অভিজ্ঞতা এবং নীতি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বহুবার দেখা গেছে, পুরনো শক্তির পতনের পর নতুন শক্তি দ্রুত জনপ্রিয় হয়, কিন্তু শাসনে এসে সংকটে পড়ে। ফলে আবার পুরনো শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়। অধিকন্তু, ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে লুটের মহোৎসব যেমন দেখা হয়েছে, তেমনই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হতেও দেখেছি। আর তা ’২৪-এর আন্দোলনের পরই। তাহলে নয়া বন্দোবস্তের নামে লুটপাট করে দখলদারত্বের হাত বদলই কি মানুষ চেয়েছে? বলা হচ্ছে ৫৪ বছরের জঞ্জাল সাফ করতে এই সময় যথেষ্ট নয়! দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও জানার আগ্রহ কি সেই জঞ্জাল? যা পরবর্তী সরকার সরাবে! অতীতে আমরা দেখেছি, সরকারের ছায়া সরকার বিরোধী দল নয়। সেটা ছিল সরকারের প্যারালাল সরকার। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরালে আরেক ছায়া প্রধানমন্ত্রী দেশ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পত্রিকার পাতায় কতসব সংবাদের ফিরিস্তি! এখন তারাই এত ভালো হয়ে গেলেন কী করে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের নয়, আস্থার সংকট। মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কিনা, ক্ষমতাসীন থেকে সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করে পক্ষপাত করবে কিনা, কিংবা ক্ষমতা বদল হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে কিনা। এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। যদি নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করে কিন্তু রাজনৈতিক আচরণ একই থাকে, তাহলে সংকটের সমাধান হবে না। তখন শাসনের রাজদণ্ড বদলাবে, কিন্তু শাসনের ধরন বদলাবে না। তাহলে কি একইরকম পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে? নাগরিক কত যে অসহায়! শিরোনামের সেই রাজদণ্ডের মালিক বা নিয়ন্ত্রক কে হতে যাচ্ছে? প্রশ্নটি রাজনৈতিক হলেও উত্তরটি দার্শনিক। গণতন্ত্রে শাসনের রাজদণ্ড আসলে কোনো দল বা নেতার হাতে থাকে না, থাকার কথা জনগণের হাতে। নির্বাচন সেই রাজদণ্ড সাময়িকভাবে প্রতিনিধির কাছে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া মাত্র।

বাংলাদেশের সংকট তৈরি হয়েছে কারণ এই ধারণাটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মানুষ মনে করতে শুরু করেছিল ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দাবি। এখন যে নির্বাচন ও গণভোট সেটি শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি আস্থার পরীক্ষা। মানুষ দেখতে চায় তাদের ভোট সত্যিই মূল্যবান কি না। যদি বিএনপির হাতে যায় ক্ষমতা তবে কি বিরোধী শক্তিকে দমন-নিপীড়ন চলতেই থাকবে? যেমনটি সরকার পতনের পর হয়েছিল। মামলা-হামলা দিয়ে বাণিজ্য। আর যদি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে, তবে কি অনুমিত পাকিস্তান প্রীতি বেড়ে যাবে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধারা হুমকি পড়বে? নাকি ২৪ নিয়ে গত আঠারো মাসের ন্যায় একাত্তর ভোলানো ইতিহাসের চর্চাই চলতে থাকবে? নারীদের এবং সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ কি কমবে? তবে কার হাতে উঠছে সেই বহুল কাক্সিক্ষত সেই রাজদণ্ড অনুমিত না চমক? তবে ভোট সবসময় ব্যালটে হয় না। ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও থাকে। তাই ব্যালটে জামায়াত পিছিয়ে থাকলেও সর্বকালের সেরা সময় অতিক্রম করা দল হিসেবে কি ভিন্ন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? অন্যদিকে ভোটার সমর্থন থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট বিএনপি খুব একটা টানতে পারবে বলে মনে হয় না। এই পর্যন্ত এবং ভোটের পর আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপর পুনরায় হামলার আশঙ্কা দলটির সকল নেতাকর্মীদের মনে ভীতি সঞ্চার করছে। তাই ফলাফল ঠিক একপেশে হওয়ারও সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে জামায়াতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। আবার দলটির আমীরের টুইটার হ্যান্ডলে কর্মজীবী নারীদের ‘পতিতা’ লিখে টুইট করার জবাব সঙ্গে সঙ্গে যতটুকু পেয়েছে, ব্যালটে তার চেয়েও তীব্র হলে অপেক্ষায় থাকতে হবে ক্ষমতার স্বাদ পেতে। বাংলাদেশের সামনে সমান সম্ভাবনা নিয়ে হাজির, তবে- প্রথমত, প্রতিযোগিতামূলক একটি নির্বাচন, যেখানে নতুন ও পুরনো সব শক্তি অংশ নেয় এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল পথ। দ্বিতীয়ত, খণ্ডিত রাজনীতি, যেখানে ছোট ছোট শক্তি ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং অস্থিরতা বাড়ে। তৃতীয়ত, আবারও কোনো একক শক্তির দ্রুত উত্থান, যা স্বল্পমেয়াদে স্থিতি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। শাসনের রাজদণ্ড শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, তার উত্তর কেবল নির্বাচনের ফল নয়। এটি নির্ভর করবে জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক দলের আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার ওপর। ২০২৪ সালের আন্দোলন একটি দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দরজা খোলা আর সঠিক পথে হাঁটা এক নয়। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি পরিণত গণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। আর যদি তারা শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ফিরে যায়, তাহলে ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে। সুতরাং প্রশ্নটি কেবল কে ক্ষমতায় আসবে নয়। প্রশ্নটি হলো, এবার কি সত্যিই ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরবে? আসুন প্রশ্ন করতে শিখি!

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]

back to top