আনোয়ারুল হক
দীর্ঘ দেড় যুগ ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ মেটাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেলেও ভোট প্রদানের হার ৬০ শতাংশের নিচেই রইল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগে থেকেই বলছিলেন আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে যদি ভোটের হার অন্তত ৭০ শতাংশ হয় তাহলে বিএনপি জয়লাভ করবে ব্যপক ভোটের ব্যবধানে।
দীর্ঘ সময় যাবত আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্যস্ত বিএনপি কর্মীরা ভোটের মাঠে কিছুটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে ছিলেন। প্রার্থীদের শারিরীক ভাষায়ও ছিল নিস্তরঙ্গ একটা ভাব। কেমন যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি জমে না! আর এই সুযোগে নির্বাচনে আসন জয়ের ও ভোটপ্রাপ্তির হারে নতুন নজির গড়েছে জামায়াত। জামায়াত নেতাদের শারিরীক ভাষাও ছিল অনেকটা ‘নাউ অর নেভার’
আর তা যদি ৬০ শতাংশ বা তার নিচে হয় তবে বিএনপি ২০০ বা তার কাছাকাছি আসন পেলেও জামায়াত ইসলাম ও ইসলামপন্থী ১১ দলীয় জোটও উল্লেখযোগ্য আসন পাবে এবং ভোট প্রাপ্তির ব্যাবধান অনেক কম থাকবে। ঘটনা সেটাই ঘটেছে এবং ঢাকা শহরে গড়ে কমবেশি মাত্র ৪০% ভোট পড়ার সুবিধা জামাত পেয়েছে।
বিএনপি আসনের দিক থেকে ভূমিধস বিজয় অর্জন করলেও ভোট প্রাপ্তির হারে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সাথে ব্যবধান বেশ কম। অবশ্য আমাদের দেশে ভোটের দ্বিদলীয় মেরুকরণে সামান্য ২/১ শতাংশের পার্থক্যে আসন সংখ্যা প্রাপ্তির ব্যবধান যে অনেক বড় হয় তা আমরা ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলে দেখেছি। এবারেও মেরুকরণটা হয়েছে উগ্রডান ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বনাম মধ্য ডানপন্থী ও তুলনামূলক উদার গণতন্ত্রী রাজনৈতিক দল বিএনপির মাঝে। এই মেরুকরণে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং দেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমের অব্যাহত প্রচার সুবিধা লাভের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা, মধ্যপন্থার দাবিদার তরুণদের রাজনৈতিক দল আগেই নিজেদের স্বকীয় অস্তিত্ব বিপন্ন করে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ভোটের ময়দানে তারা পৃথক কোনো সমীকরণ সৃষ্টি না করে ও সমর্থকদের হতাশ করে জামায়াতে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে ৬টি আসন লাভ করেছে।
বাম ও মধ্য বামপন্থীরা জোট করার ঘোষণা দিলেও কার্যত কোনো আসন সমঝোতা ও নির্বাচনী কার্যক্রমে জোটগত তৎপরতা চোখে পড়েনি। বড় দলোগুলর বিপুল অর্থ ও কর্মী বাহিনীর বিপরীতে বামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার চালিয়ে গেছেন। প্রচারযুদ্ধে তাদের এই লড়াই স্বাভাবিকভাবেই ছিল অসম। এর প্রধানতম কারণ ‘অর্থনৈতিক’, আরেকটি হলো অপেক্ষাকৃত কম জনবল। দলগুলো সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে অতিরিক্ত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় অপেক্ষাকৃত ভালো করার মতো সম্ভাবনাময় আসনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হয়নি। আবার অনেক স্থানে বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটাররাও উগ্র ডানপন্থী উত্থান ঠেকাতে বিকল্প প্রার্থী বেছে নিয়েছেন। একমাত্র ব্যাতিক্রম বামপন্থী নেত্রী বরিশালের মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বামপন্থীদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন। উপযুক্ত প্রার্থী দিতে পারলে, মানুষকে আপন ভাবলে সাধারণ মানুষ লাল ঝাণ্ডাকে ভোট দিতে তৈরি আছে। এ ধরনের বার্তা আমরা বেশ আগে একবার পেয়েছিলাম খুলনার বটিয়াঘাটার প্রয়াত অচিন্ত বিশ্বাস এবং খুলনা মহানগরীর প্রয়াত ফিরোজ আহমেদের কাছ থেকে। এবারেও মনীষার বার্তা ভোটের এক স্বতন্ত্র বার্তা।
আলোচনা হচ্ছিল ভোট প্রদানের হার নিয়ে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এমন অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ বিশ্ব নাকি কখনও দেখেনি। কিন্তু আমরা যদি ১৯৯৬ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দিকে তাকাই, দেখবো সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তেমনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৭৪.৮২% এবং একইভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৭৪.৯০% ভোটার ভোট দেন। সে অনুযায়ী এবার সব দল যেমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তেমনি ওই তিন নির্বাচন অপেক্ষা ভোটার উপস্থিতি কম। হতে পারে আওয়ামী লীগ অনুগামী ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনী মাঠে বিজয় নিশ্চিত ভেবে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বিএনপি কর্মীরা বিশেষ উদ্যোগ নেননি।
দীর্ঘ সময় যাবত আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্যস্ত বিএনপি কর্মীরা ভোটের মাঠে কিছুটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে ছিলেন। প্রার্থীদের শারিরীক ভাষায়ও ছিল নিস্তরঙ্গ একটা ভাব। কেমন যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি জমে না! আর এই সুযোগে নির্বাচনে আসন জয়ের ও ভোটপ্রাপ্তির হারে নতুন নজির গড়েছে জামায়াত। জামায়াত নেতাদের শারিরীক ভাষাও ছিল অনেকটা ‘নাউ অর নেভার’। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জিতেছিলেন জামাতের প্রার্থীরা। এবার প্রায় তার চারগুণ আসন তাদের ঝুলিতে। দেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আবার এবারের মতো বিএনপির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মতো ফাঁকা মাঠ ও অনুকূল পরিস্থিতি সামনে তারা নাও পেতে পারে। তবে জামাত পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে। তাদের বিটিম এনসিপিকে দিয়ে রাজনীতির মাঠে নানা খেলাধুলা করিয়ে নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার আগমুহূর্তে নিজ জোটে টেনে এনে জামায়াতের মতাদর্শের সাথে একমত নন কিন্তু জুলাই আন্দোলন ও তরুণদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটার বিশেষত নতুন ভোটারদের ভোটে বড়সড় ভাগ বসাতে পেরেছে।
নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ না থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ ভোট দিয়েছেন। ভোটে না দাঁড়িয়েও কার্যত এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশে ভোট হয় এবং আওয়ামী লীগ সময়ের চেয়ে ভালো হয়, এটা প্রমাণ হয়েছে। দল হিসেবে বিএনপিরও এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে।রাজনীতির নিয়মে একদিন হয়তো আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে ফিরে আসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা তারা নিজেরাই এবং তাদের ইগো। তাদের ভুল ভ্রান্তি অপরাধ পর্যালোচনা করে কতৃত্ববাদী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে দল পুনর্গঠন ও নবায়নের পথে তারা নেই। তাদের কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। একসময় না একসময় তা পূরণ হয়ে যায় ভিন্নভাবে।
নির্বাচনী রায়ের বিষয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালন করার পর বিজয়ী দলকে অভিনন্দন না জানিয়ে শুধু জামায়াত বিরোধী দলের আসনে বসবে এটা উল্লেখ করে জামায়াত আমীর তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। বিজয়ীর স্বীকৃতি আনার জন্য তারেক জিয়াকে জামায়াত আমীর এবং তার ‘নির্বাচনী নায়েব আমীর’ তথা এনসিপি প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাদের বাসভবনে যেতে হচ্ছে। মজার বিষয় হলো এতো দিন আওয়ামী লীগ ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধকে আড়াল করতে চেয়েছে। এখন দেখছি একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘দলের একটি সূত্র দাবি করছে প্রশাসনিক প্রভাব ও ডিপ স্টেটের হস্তক্ষেপের কারণে জামায়াত ইসলামের বিজয়ী আসন সংখ্যা ৭০-৮০ আসনে সীমিত দেখানো হয়েছে। জামায়াত-জোট প্রকৃতপক্ষে ১৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছে।’ তাহলে আন্দোলন নয় কেন? এ প্রশ্নে জামায়াত সূত্র বলছে, ‘এ ধরনের আন্দোলনে প্রশাসনিক কঠোরতার সম্মুখীন হওয়ার ও সাংগঠনিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আন্দোলন’ নয়, ‘সমঝোতা ও প্রস্তুতি’কেই বেছে নিতে হয়।’ দলের অভ্যন্তরের এসব কথা থেকে বুঝা যাচ্ছে, ডিপ স্টেট-এর সহযোগিতায় ও পরামর্শ মোতাবেক জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি তাদের পা ফেলছে।
জামাত দীর্ঘ সময় যাবত বিএনপির জোটসঙ্গী থাকলেও সেই সময়ে তার রাশ নিজের হাতে রেখেছিলেন খালেদা জিয়া। এখন তো জামায়াতের রাশ ডিপ স্টেটের হাতে। আর ইউনূস ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীত্বের চেয়ারে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছেন। তাই সবদিকের ভারসাম্য বজায় রেখে তারেককে মেপে মেপে পা ফেলতে হচ্ছে। জীবন এমনই। কখনো সেসব ছিনিয়ে নেয়, নিঃস্ব করে দেয়। সেই আবার ফিরিয়ে দেয় দুহাত ভরে। জীবনের এই খেলা তারেক রহমান থেকে ভালো আর কে জানেন! জীবনে উত্থান দেখেছেন। দেখেছেন পতনও। নিজ পিতা ও মাতার সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার রূপও দেখা হয়ে গিয়েছে তার। তাকে নিয়েও যে নানা বিতর্ক ও নেতিবাচক ধারণা সমাজের একাংশে আছে নিশ্চয়ই সেটাও তার অজানা নয়। নতুন এই সময় কি তাকে অতীতের ভুল ক্রটি শুধরে সামনের জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেবে?
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক
রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
দীর্ঘ দেড় যুগ ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ মেটাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেলেও ভোট প্রদানের হার ৬০ শতাংশের নিচেই রইল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগে থেকেই বলছিলেন আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে যদি ভোটের হার অন্তত ৭০ শতাংশ হয় তাহলে বিএনপি জয়লাভ করবে ব্যপক ভোটের ব্যবধানে।
দীর্ঘ সময় যাবত আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্যস্ত বিএনপি কর্মীরা ভোটের মাঠে কিছুটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে ছিলেন। প্রার্থীদের শারিরীক ভাষায়ও ছিল নিস্তরঙ্গ একটা ভাব। কেমন যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি জমে না! আর এই সুযোগে নির্বাচনে আসন জয়ের ও ভোটপ্রাপ্তির হারে নতুন নজির গড়েছে জামায়াত। জামায়াত নেতাদের শারিরীক ভাষাও ছিল অনেকটা ‘নাউ অর নেভার’
আর তা যদি ৬০ শতাংশ বা তার নিচে হয় তবে বিএনপি ২০০ বা তার কাছাকাছি আসন পেলেও জামায়াত ইসলাম ও ইসলামপন্থী ১১ দলীয় জোটও উল্লেখযোগ্য আসন পাবে এবং ভোট প্রাপ্তির ব্যাবধান অনেক কম থাকবে। ঘটনা সেটাই ঘটেছে এবং ঢাকা শহরে গড়ে কমবেশি মাত্র ৪০% ভোট পড়ার সুবিধা জামাত পেয়েছে।
বিএনপি আসনের দিক থেকে ভূমিধস বিজয় অর্জন করলেও ভোট প্রাপ্তির হারে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সাথে ব্যবধান বেশ কম। অবশ্য আমাদের দেশে ভোটের দ্বিদলীয় মেরুকরণে সামান্য ২/১ শতাংশের পার্থক্যে আসন সংখ্যা প্রাপ্তির ব্যবধান যে অনেক বড় হয় তা আমরা ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলে দেখেছি। এবারেও মেরুকরণটা হয়েছে উগ্রডান ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বনাম মধ্য ডানপন্থী ও তুলনামূলক উদার গণতন্ত্রী রাজনৈতিক দল বিএনপির মাঝে। এই মেরুকরণে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং দেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমের অব্যাহত প্রচার সুবিধা লাভের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা, মধ্যপন্থার দাবিদার তরুণদের রাজনৈতিক দল আগেই নিজেদের স্বকীয় অস্তিত্ব বিপন্ন করে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ভোটের ময়দানে তারা পৃথক কোনো সমীকরণ সৃষ্টি না করে ও সমর্থকদের হতাশ করে জামায়াতে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে ৬টি আসন লাভ করেছে।
বাম ও মধ্য বামপন্থীরা জোট করার ঘোষণা দিলেও কার্যত কোনো আসন সমঝোতা ও নির্বাচনী কার্যক্রমে জোটগত তৎপরতা চোখে পড়েনি। বড় দলোগুলর বিপুল অর্থ ও কর্মী বাহিনীর বিপরীতে বামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার চালিয়ে গেছেন। প্রচারযুদ্ধে তাদের এই লড়াই স্বাভাবিকভাবেই ছিল অসম। এর প্রধানতম কারণ ‘অর্থনৈতিক’, আরেকটি হলো অপেক্ষাকৃত কম জনবল। দলগুলো সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে অতিরিক্ত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় অপেক্ষাকৃত ভালো করার মতো সম্ভাবনাময় আসনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হয়নি। আবার অনেক স্থানে বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটাররাও উগ্র ডানপন্থী উত্থান ঠেকাতে বিকল্প প্রার্থী বেছে নিয়েছেন। একমাত্র ব্যাতিক্রম বামপন্থী নেত্রী বরিশালের মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বামপন্থীদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন। উপযুক্ত প্রার্থী দিতে পারলে, মানুষকে আপন ভাবলে সাধারণ মানুষ লাল ঝাণ্ডাকে ভোট দিতে তৈরি আছে। এ ধরনের বার্তা আমরা বেশ আগে একবার পেয়েছিলাম খুলনার বটিয়াঘাটার প্রয়াত অচিন্ত বিশ্বাস এবং খুলনা মহানগরীর প্রয়াত ফিরোজ আহমেদের কাছ থেকে। এবারেও মনীষার বার্তা ভোটের এক স্বতন্ত্র বার্তা।
আলোচনা হচ্ছিল ভোট প্রদানের হার নিয়ে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এমন অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ বিশ্ব নাকি কখনও দেখেনি। কিন্তু আমরা যদি ১৯৯৬ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দিকে তাকাই, দেখবো সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তেমনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৭৪.৮২% এবং একইভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৭৪.৯০% ভোটার ভোট দেন। সে অনুযায়ী এবার সব দল যেমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তেমনি ওই তিন নির্বাচন অপেক্ষা ভোটার উপস্থিতি কম। হতে পারে আওয়ামী লীগ অনুগামী ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনী মাঠে বিজয় নিশ্চিত ভেবে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বিএনপি কর্মীরা বিশেষ উদ্যোগ নেননি।
দীর্ঘ সময় যাবত আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্যস্ত বিএনপি কর্মীরা ভোটের মাঠে কিছুটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে ছিলেন। প্রার্থীদের শারিরীক ভাষায়ও ছিল নিস্তরঙ্গ একটা ভাব। কেমন যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি জমে না! আর এই সুযোগে নির্বাচনে আসন জয়ের ও ভোটপ্রাপ্তির হারে নতুন নজির গড়েছে জামায়াত। জামায়াত নেতাদের শারিরীক ভাষাও ছিল অনেকটা ‘নাউ অর নেভার’। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জিতেছিলেন জামাতের প্রার্থীরা। এবার প্রায় তার চারগুণ আসন তাদের ঝুলিতে। দেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আবার এবারের মতো বিএনপির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মতো ফাঁকা মাঠ ও অনুকূল পরিস্থিতি সামনে তারা নাও পেতে পারে। তবে জামাত পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে। তাদের বিটিম এনসিপিকে দিয়ে রাজনীতির মাঠে নানা খেলাধুলা করিয়ে নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার আগমুহূর্তে নিজ জোটে টেনে এনে জামায়াতের মতাদর্শের সাথে একমত নন কিন্তু জুলাই আন্দোলন ও তরুণদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটার বিশেষত নতুন ভোটারদের ভোটে বড়সড় ভাগ বসাতে পেরেছে।
নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ না থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ ভোট দিয়েছেন। ভোটে না দাঁড়িয়েও কার্যত এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশে ভোট হয় এবং আওয়ামী লীগ সময়ের চেয়ে ভালো হয়, এটা প্রমাণ হয়েছে। দল হিসেবে বিএনপিরও এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে।রাজনীতির নিয়মে একদিন হয়তো আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে ফিরে আসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা তারা নিজেরাই এবং তাদের ইগো। তাদের ভুল ভ্রান্তি অপরাধ পর্যালোচনা করে কতৃত্ববাদী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে দল পুনর্গঠন ও নবায়নের পথে তারা নেই। তাদের কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। একসময় না একসময় তা পূরণ হয়ে যায় ভিন্নভাবে।
নির্বাচনী রায়ের বিষয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালন করার পর বিজয়ী দলকে অভিনন্দন না জানিয়ে শুধু জামায়াত বিরোধী দলের আসনে বসবে এটা উল্লেখ করে জামায়াত আমীর তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। বিজয়ীর স্বীকৃতি আনার জন্য তারেক জিয়াকে জামায়াত আমীর এবং তার ‘নির্বাচনী নায়েব আমীর’ তথা এনসিপি প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাদের বাসভবনে যেতে হচ্ছে। মজার বিষয় হলো এতো দিন আওয়ামী লীগ ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধকে আড়াল করতে চেয়েছে। এখন দেখছি একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘দলের একটি সূত্র দাবি করছে প্রশাসনিক প্রভাব ও ডিপ স্টেটের হস্তক্ষেপের কারণে জামায়াত ইসলামের বিজয়ী আসন সংখ্যা ৭০-৮০ আসনে সীমিত দেখানো হয়েছে। জামায়াত-জোট প্রকৃতপক্ষে ১৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছে।’ তাহলে আন্দোলন নয় কেন? এ প্রশ্নে জামায়াত সূত্র বলছে, ‘এ ধরনের আন্দোলনে প্রশাসনিক কঠোরতার সম্মুখীন হওয়ার ও সাংগঠনিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আন্দোলন’ নয়, ‘সমঝোতা ও প্রস্তুতি’কেই বেছে নিতে হয়।’ দলের অভ্যন্তরের এসব কথা থেকে বুঝা যাচ্ছে, ডিপ স্টেট-এর সহযোগিতায় ও পরামর্শ মোতাবেক জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি তাদের পা ফেলছে।
জামাত দীর্ঘ সময় যাবত বিএনপির জোটসঙ্গী থাকলেও সেই সময়ে তার রাশ নিজের হাতে রেখেছিলেন খালেদা জিয়া। এখন তো জামায়াতের রাশ ডিপ স্টেটের হাতে। আর ইউনূস ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীত্বের চেয়ারে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছেন। তাই সবদিকের ভারসাম্য বজায় রেখে তারেককে মেপে মেপে পা ফেলতে হচ্ছে। জীবন এমনই। কখনো সেসব ছিনিয়ে নেয়, নিঃস্ব করে দেয়। সেই আবার ফিরিয়ে দেয় দুহাত ভরে। জীবনের এই খেলা তারেক রহমান থেকে ভালো আর কে জানেন! জীবনে উত্থান দেখেছেন। দেখেছেন পতনও। নিজ পিতা ও মাতার সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার রূপও দেখা হয়ে গিয়েছে তার। তাকে নিয়েও যে নানা বিতর্ক ও নেতিবাচক ধারণা সমাজের একাংশে আছে নিশ্চয়ই সেটাও তার অজানা নয়। নতুন এই সময় কি তাকে অতীতের ভুল ক্রটি শুধরে সামনের জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেবে?
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]