জাহাঙ্গীর আলম সরকার
মানুষের চরিত্র সত্যিই রহস্যময়-এক অদেখা মহাবিশ্ব, যার প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে আলো আর অন্ধকারের জটিল খেলা। কখনো তা ভোরের শিশিরবিন্দুর মতো নির্মল, স্বচ্ছ, নিঃশব্দ ও কোমল। ঠিক যেমন সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণ ছোঁয়ায় শিশির কণাগুলো ঝলমল করে ওঠে, হৃদয়েও তখন অচেনা প্রশান্তি ঢুকে পড়ে। স্পর্শ করলেই মনে হয়, সব ব্যথা কিছুক্ষণ থেমে আছে, সময় যেন স্থির হয়ে গেছে, এবং জীবন হঠাৎ সরল ও পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু আবার কখনো তা এমন গভীর অন্ধকারের মতো, যেখানে একটি ছোট্ট আলোও প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে ভালো ইচ্ছা হারিয়ে যায়, সুন্দর মনোবলও পথ হারিয়ে ফেলে। মানুষের ভেতরের এই অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে লোভ, স্বার্থপরতা, অহংকারের সঙ্গম। আবেগের সূক্ষ্ম দড়িগুলো ছিঁড়ে যায়; প্রেম, বিশ্বাস, সহানুভূতি-সবই যেন শুধু মায়াজালে বাঁধা। এমন সময় চোখে দেখা হাসি হয়ে ওঠে ছদ্মবেশ, কথাবার্তা হয়ে যায় মুখোশের সুর। অন্তরঙ্গ ইচ্ছা ও প্রকৃত চেতনা আচ্ছন্ন হয় অজানা ভয়, সন্দেহ ও দ্বন্দ্বে। এই আলো আর অন্ধকারের মিশ্রণ এক ধরনের দুঃসাধ্য নকশা-যা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। কখনো তা আমাদের কাছে কোমল ও নিরাপদ মনে হয়, আবার কখনো এতটাই কল্পনাতীতভাবে ভীতিকর যে হৃদয় নিজেই যেন সঙ্কোচিত হয়। এই অদৃশ্য মহাবিশ্বই মানুষকে রহস্যময় করে তোলে, এবং প্রতিটি সম্পর্ককে জটিল, প্রতিটি বিশ্বাসকে প্রহরীহীন। আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিদিন চলি-পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী-তাদের ভেতরের অদেখা রূপ প্রায়শই আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। তারা আমাদের কাছে পরিচিত, কাছে মনে হয়, কিন্তু হঠাৎ এক মুহূর্তে, সেই পরিচিত মুখও এমনভাবে বদলে যায় যে মনে হয়, “এই মানুষটিকে তো আমি চিনি না; এতদিন যার সঙ্গে হাসি ভাগ করেছি, সে যেন একেবারে অন্য কেউ।” এই অদেখা রূপ ঘটে নিঃশব্দে-দিনের আলোয় কখনো, রাতের অন্ধকারে কখনো, আর আমাদের অগোচরে।
তারা আসে মিষ্টি হাসি নিয়ে, কথা বলে কোমল সুরে, সহানুভূতির অভিনয় করে। আমরা সেই মায়ার জালে আটকে পড়ি, ভুলে যাই-আমরা ভাবছি, এরা কত সৎ, কত নিবেদিত। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তারা আমাদের অজান্তেই অন্তরের দরজায় লক দিয়ে দেয়। বাহ্যিক আচরণ, হাসি, কথাবার্তা-সবই হয়ে ওঠে সাজানো মুখোশ। ভেতরের মানুষটি থাকে একদম আলাদা-স্বার্থপর, কৌশলী, নিজের সুবিধার জাল বুনে থাকা। সত্যিটা স্পষ্টÑস্বার্থপর মানুষ কখনো নিজের প্রকৃত চরিত্র পরিবর্তন করে না; বদল হয় শুধুই নিজের প্রয়োজন ও স্বার্থের জন্য। তাদের পরিবর্তন চরিত্রের নয়, প্রয়োজনের; আত্মশুদ্ধির নয়, স্বার্থরক্ষার। ঠিক যেমন শীতের শেষে বিষধর সাপ পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুন রূপে বের হয়, তবে তার বিষের প্রকৃতি বদলায় না-শুধু বাঁচার কৌশল পরিবর্তিত হয়। তেমনি স্বার্থপর মানুষের রূপান্তরও শুধুই সময়, সুযোগ ও সুবিধার হিসাব; বাহ্যিক পরিবর্তন শুধু ছদ্মবেশ, অন্তরের প্রকৃত সত্তা অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই মানুষরা আমাদের জীবনের মাঝে আসে যেন অপ্রত্যাশিত অতিথি, ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত গেঁথে ফেলে। তারা আমাদের বিশ্বাস অর্জন করে, আমাদের অন্তর স্পর্শ করে-মিষ্টি কথায়, কোমল হাসিতে, এমনভাবে যে মনে হয়, এরা সত্যিই আমাদের পাশে, আমাদের জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই, যখন প্রয়োজন শেষ, সুযোগ শেষ, তারা নিঃশব্দে, অগোচরে, আবার নিজের মূল রূপে ফিরে যায়।
জীবনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যথা এখানেই-যাদের আমরা সত্যিকার বন্ধু, সহানুভূতিশীল ভেবেছি, তারা হঠাৎ মুখোশ খুলে আমাদের সামনে সত্য উন্মোচন করে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, সব বিশ্বাস, সব ভরসা যেন ধুলোয় মিলিয়ে গেছে। মানুষের এই অদেখা পরিবর্তন জীবনকে এত জটিল করে তোলে, এত গভীর, যে হৃদয়কেও আঁকড়ে ধরে। স্বার্থপরতার এই খোলস বদল যেন গোখরো সাপের ছদ্মবেশী। প্রকৃতিতে যেমন সাপ জানে কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন স্থির থাকতে হবে, তেমনি স্বার্থপর মানুষও বিষ লুকিয়ে রাখে। তারা জানে-বিশ্বাস অর্জন করতে হলে প্রথমে নম্র হতে হবে, মিষ্টি হতে হবে, আর মানুষকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। এটি এক ধরনের ‘নৈতিক অভিনয়’। তারা অনুশোচনার সাজানো বাক্য বলে, আত্মসমালোচনার নাট্যমঞ্চে অভিনয় করে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে শুধুই স্বার্থ। প্রকৃত পরিবর্তন আসে অভিজ্ঞতা, অনুতাপ এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে। তা জন্মে আত্মার ভিতর থেকে, শিকড় গেঁথে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্বার্থপর মানুষের পরিবর্তন আসে শুধু চেহারা ও ভাষার মাধ্যমে-হৃদয়ে নয়। বাহ্যিক কোমলতা, ভেজাল সহানুভূতি, সাজানো অনুতাপ-এসবই কৌশল, এগুলো বাস্তবতা নয়। হৃদয়ের নকশা সবসময় নিজেদের স্বার্থকে ঘিরে আঁকা থাকে, আর আমরা তা না বুঝে আবারও ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভাসি। জীবনের কঠিন সত্য হলো-যে মানুষ এতদিন আপনার গুরুত্ব দেয়নি, উদাসীন ছিল, হঠাৎ করে কোমল হয়ে আসে। আমরা মুহূর্তের আবেশে ভাবি-হয়তো সে সত্যিই বদলেছে। কিন্তু বাস্তবতা কষ্টকর, অমোঘ-এই পরিবর্তন আসে স্বার্থের লোভ থেকে, দায়িত্ব বা ভালোবাসা থেকে নয়। এদের আচরণ নদীর মতো-বর্ষায় উজান ভেঙে ছুটে আসে, খরায় শুকনো খাঁড়ি হয়ে থাকে। প্রকৃতির নিয়মে নদী পরিবর্তিত হয়, স্বার্থপর মানুষের পরিবর্তন হয় লাভের হিসাব অনুযায়ী। বাহ্যিক দৃষ্টি সহজে পরিবর্তন দেখায়, কিন্তু স্বভাবের গভীরতা অপরিবর্তনীয়। একবার স্বার্থপরতা মানুষের চরিত্রে শিকড় গেঁথে বসে, তা বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে-যেখানে পথ, পরিকল্পনা, সম্পর্ক-সবই নিজের স্বার্থের চারপাশে ঘুরে। প্রশ্ন জাগে-মানুষ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে? উত্তর স্পষ্ট-স্বার্থপরতার প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার জন্য কথার মায়ায় বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না; লক্ষ্য রাখতে হবে আচরণের ধারাবাহিকতা। প্রকৃত পরিবর্তন বীজের মতো-ভেতর থেকে জন্মায়, শিকড় গেঁথে স্থায়ী হয়। আর স্বার্থপরতার পরিবর্তন গিরগিটির মতো-বাইরের রং বদলায়, ভেতরের প্রাণ অচল থাকে। এই উপলব্ধিই আমাদের সতর্ক করে, শেখায়-হৃদয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাসের প্রবাহে ভাসতে দেয়া যায় না। সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য বোঝার জন্য বিচারদৃষ্টি শক্তিশালী হতে হবে। আবেগ হয়তো পথিক হতে পারে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তের নির্ধারক নয়।
পরিশেষে শিক্ষা একটাই-সব হাসি বিশ্বাসযোগ্য নয়, সব ক্ষমা হৃদয়ের নয়। মানুষের মুখোশে লুকিয়ে থাকে ছদ্মবেশের কৌশল, যে হাসি মনে আনন্দ দেয়, সেই হাসিতেও প্রলুব্ধির ছায়া থাকে। প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মানুষের আচরণের ধারাবাহিকতা, অন্তর থেকে ফোটে ওঠা নৈতিকতা, আর সত্যিকার উপলব্ধির মাধ্যমে। যে সম্পর্ক শুধু আবেশ, মিষ্টি কথার ছায়া বা অস্থায়ী অনুকম্পার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তা ঝড়ে বা আঁধারে ভেঙে পড়তে বাধ্য। মানুষের মুখোশে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লে হৃদয় খাটিয়ে দেয়া বিশ্বাস একদিন আপনাকেই আঘাত করতে পারে। তাই বুদ্ধি ও সচেতনতা ছাড়া কোনো সম্পর্ক স্থায়ী হয় না; সতর্কতার আলো ছাড়া আবেগের প্রদীপ নিভে যায়। প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে ওঠে সৎ অভিপ্রায়, অন্তরের নিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা দিয়ে। বাহ্যিক সৌন্দর্য বা অস্থায়ী কোমলতা নয়-প্রকৃত মানবিক মূল্য বুঝতে হলে নজর দিতে হয় নীরব ধারাবাহিকতাকে, ছোট ছোট পদক্ষেপে প্রকাশিত সততা ও দৃষ্টান্তকে। হৃদয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাসের স্রোতে ভাসিয়ে দিলে, সবচেয়ে মধুর হাসি ও কোমল ক্ষমাও কখনো আমাদের আহত করতে পারে।
[লেখক: আইনজীবী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জাহাঙ্গীর আলম সরকার
রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
মানুষের চরিত্র সত্যিই রহস্যময়-এক অদেখা মহাবিশ্ব, যার প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে আলো আর অন্ধকারের জটিল খেলা। কখনো তা ভোরের শিশিরবিন্দুর মতো নির্মল, স্বচ্ছ, নিঃশব্দ ও কোমল। ঠিক যেমন সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণ ছোঁয়ায় শিশির কণাগুলো ঝলমল করে ওঠে, হৃদয়েও তখন অচেনা প্রশান্তি ঢুকে পড়ে। স্পর্শ করলেই মনে হয়, সব ব্যথা কিছুক্ষণ থেমে আছে, সময় যেন স্থির হয়ে গেছে, এবং জীবন হঠাৎ সরল ও পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু আবার কখনো তা এমন গভীর অন্ধকারের মতো, যেখানে একটি ছোট্ট আলোও প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে ভালো ইচ্ছা হারিয়ে যায়, সুন্দর মনোবলও পথ হারিয়ে ফেলে। মানুষের ভেতরের এই অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে লোভ, স্বার্থপরতা, অহংকারের সঙ্গম। আবেগের সূক্ষ্ম দড়িগুলো ছিঁড়ে যায়; প্রেম, বিশ্বাস, সহানুভূতি-সবই যেন শুধু মায়াজালে বাঁধা। এমন সময় চোখে দেখা হাসি হয়ে ওঠে ছদ্মবেশ, কথাবার্তা হয়ে যায় মুখোশের সুর। অন্তরঙ্গ ইচ্ছা ও প্রকৃত চেতনা আচ্ছন্ন হয় অজানা ভয়, সন্দেহ ও দ্বন্দ্বে। এই আলো আর অন্ধকারের মিশ্রণ এক ধরনের দুঃসাধ্য নকশা-যা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। কখনো তা আমাদের কাছে কোমল ও নিরাপদ মনে হয়, আবার কখনো এতটাই কল্পনাতীতভাবে ভীতিকর যে হৃদয় নিজেই যেন সঙ্কোচিত হয়। এই অদৃশ্য মহাবিশ্বই মানুষকে রহস্যময় করে তোলে, এবং প্রতিটি সম্পর্ককে জটিল, প্রতিটি বিশ্বাসকে প্রহরীহীন। আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিদিন চলি-পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী-তাদের ভেতরের অদেখা রূপ প্রায়শই আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। তারা আমাদের কাছে পরিচিত, কাছে মনে হয়, কিন্তু হঠাৎ এক মুহূর্তে, সেই পরিচিত মুখও এমনভাবে বদলে যায় যে মনে হয়, “এই মানুষটিকে তো আমি চিনি না; এতদিন যার সঙ্গে হাসি ভাগ করেছি, সে যেন একেবারে অন্য কেউ।” এই অদেখা রূপ ঘটে নিঃশব্দে-দিনের আলোয় কখনো, রাতের অন্ধকারে কখনো, আর আমাদের অগোচরে।
তারা আসে মিষ্টি হাসি নিয়ে, কথা বলে কোমল সুরে, সহানুভূতির অভিনয় করে। আমরা সেই মায়ার জালে আটকে পড়ি, ভুলে যাই-আমরা ভাবছি, এরা কত সৎ, কত নিবেদিত। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তারা আমাদের অজান্তেই অন্তরের দরজায় লক দিয়ে দেয়। বাহ্যিক আচরণ, হাসি, কথাবার্তা-সবই হয়ে ওঠে সাজানো মুখোশ। ভেতরের মানুষটি থাকে একদম আলাদা-স্বার্থপর, কৌশলী, নিজের সুবিধার জাল বুনে থাকা। সত্যিটা স্পষ্টÑস্বার্থপর মানুষ কখনো নিজের প্রকৃত চরিত্র পরিবর্তন করে না; বদল হয় শুধুই নিজের প্রয়োজন ও স্বার্থের জন্য। তাদের পরিবর্তন চরিত্রের নয়, প্রয়োজনের; আত্মশুদ্ধির নয়, স্বার্থরক্ষার। ঠিক যেমন শীতের শেষে বিষধর সাপ পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুন রূপে বের হয়, তবে তার বিষের প্রকৃতি বদলায় না-শুধু বাঁচার কৌশল পরিবর্তিত হয়। তেমনি স্বার্থপর মানুষের রূপান্তরও শুধুই সময়, সুযোগ ও সুবিধার হিসাব; বাহ্যিক পরিবর্তন শুধু ছদ্মবেশ, অন্তরের প্রকৃত সত্তা অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই মানুষরা আমাদের জীবনের মাঝে আসে যেন অপ্রত্যাশিত অতিথি, ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত গেঁথে ফেলে। তারা আমাদের বিশ্বাস অর্জন করে, আমাদের অন্তর স্পর্শ করে-মিষ্টি কথায়, কোমল হাসিতে, এমনভাবে যে মনে হয়, এরা সত্যিই আমাদের পাশে, আমাদের জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই, যখন প্রয়োজন শেষ, সুযোগ শেষ, তারা নিঃশব্দে, অগোচরে, আবার নিজের মূল রূপে ফিরে যায়।
জীবনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যথা এখানেই-যাদের আমরা সত্যিকার বন্ধু, সহানুভূতিশীল ভেবেছি, তারা হঠাৎ মুখোশ খুলে আমাদের সামনে সত্য উন্মোচন করে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, সব বিশ্বাস, সব ভরসা যেন ধুলোয় মিলিয়ে গেছে। মানুষের এই অদেখা পরিবর্তন জীবনকে এত জটিল করে তোলে, এত গভীর, যে হৃদয়কেও আঁকড়ে ধরে। স্বার্থপরতার এই খোলস বদল যেন গোখরো সাপের ছদ্মবেশী। প্রকৃতিতে যেমন সাপ জানে কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন স্থির থাকতে হবে, তেমনি স্বার্থপর মানুষও বিষ লুকিয়ে রাখে। তারা জানে-বিশ্বাস অর্জন করতে হলে প্রথমে নম্র হতে হবে, মিষ্টি হতে হবে, আর মানুষকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। এটি এক ধরনের ‘নৈতিক অভিনয়’। তারা অনুশোচনার সাজানো বাক্য বলে, আত্মসমালোচনার নাট্যমঞ্চে অভিনয় করে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে শুধুই স্বার্থ। প্রকৃত পরিবর্তন আসে অভিজ্ঞতা, অনুতাপ এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে। তা জন্মে আত্মার ভিতর থেকে, শিকড় গেঁথে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্বার্থপর মানুষের পরিবর্তন আসে শুধু চেহারা ও ভাষার মাধ্যমে-হৃদয়ে নয়। বাহ্যিক কোমলতা, ভেজাল সহানুভূতি, সাজানো অনুতাপ-এসবই কৌশল, এগুলো বাস্তবতা নয়। হৃদয়ের নকশা সবসময় নিজেদের স্বার্থকে ঘিরে আঁকা থাকে, আর আমরা তা না বুঝে আবারও ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভাসি। জীবনের কঠিন সত্য হলো-যে মানুষ এতদিন আপনার গুরুত্ব দেয়নি, উদাসীন ছিল, হঠাৎ করে কোমল হয়ে আসে। আমরা মুহূর্তের আবেশে ভাবি-হয়তো সে সত্যিই বদলেছে। কিন্তু বাস্তবতা কষ্টকর, অমোঘ-এই পরিবর্তন আসে স্বার্থের লোভ থেকে, দায়িত্ব বা ভালোবাসা থেকে নয়। এদের আচরণ নদীর মতো-বর্ষায় উজান ভেঙে ছুটে আসে, খরায় শুকনো খাঁড়ি হয়ে থাকে। প্রকৃতির নিয়মে নদী পরিবর্তিত হয়, স্বার্থপর মানুষের পরিবর্তন হয় লাভের হিসাব অনুযায়ী। বাহ্যিক দৃষ্টি সহজে পরিবর্তন দেখায়, কিন্তু স্বভাবের গভীরতা অপরিবর্তনীয়। একবার স্বার্থপরতা মানুষের চরিত্রে শিকড় গেঁথে বসে, তা বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে-যেখানে পথ, পরিকল্পনা, সম্পর্ক-সবই নিজের স্বার্থের চারপাশে ঘুরে। প্রশ্ন জাগে-মানুষ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে? উত্তর স্পষ্ট-স্বার্থপরতার প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার জন্য কথার মায়ায় বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না; লক্ষ্য রাখতে হবে আচরণের ধারাবাহিকতা। প্রকৃত পরিবর্তন বীজের মতো-ভেতর থেকে জন্মায়, শিকড় গেঁথে স্থায়ী হয়। আর স্বার্থপরতার পরিবর্তন গিরগিটির মতো-বাইরের রং বদলায়, ভেতরের প্রাণ অচল থাকে। এই উপলব্ধিই আমাদের সতর্ক করে, শেখায়-হৃদয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাসের প্রবাহে ভাসতে দেয়া যায় না। সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য বোঝার জন্য বিচারদৃষ্টি শক্তিশালী হতে হবে। আবেগ হয়তো পথিক হতে পারে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তের নির্ধারক নয়।
পরিশেষে শিক্ষা একটাই-সব হাসি বিশ্বাসযোগ্য নয়, সব ক্ষমা হৃদয়ের নয়। মানুষের মুখোশে লুকিয়ে থাকে ছদ্মবেশের কৌশল, যে হাসি মনে আনন্দ দেয়, সেই হাসিতেও প্রলুব্ধির ছায়া থাকে। প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মানুষের আচরণের ধারাবাহিকতা, অন্তর থেকে ফোটে ওঠা নৈতিকতা, আর সত্যিকার উপলব্ধির মাধ্যমে। যে সম্পর্ক শুধু আবেশ, মিষ্টি কথার ছায়া বা অস্থায়ী অনুকম্পার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তা ঝড়ে বা আঁধারে ভেঙে পড়তে বাধ্য। মানুষের মুখোশে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লে হৃদয় খাটিয়ে দেয়া বিশ্বাস একদিন আপনাকেই আঘাত করতে পারে। তাই বুদ্ধি ও সচেতনতা ছাড়া কোনো সম্পর্ক স্থায়ী হয় না; সতর্কতার আলো ছাড়া আবেগের প্রদীপ নিভে যায়। প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে ওঠে সৎ অভিপ্রায়, অন্তরের নিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা দিয়ে। বাহ্যিক সৌন্দর্য বা অস্থায়ী কোমলতা নয়-প্রকৃত মানবিক মূল্য বুঝতে হলে নজর দিতে হয় নীরব ধারাবাহিকতাকে, ছোট ছোট পদক্ষেপে প্রকাশিত সততা ও দৃষ্টান্তকে। হৃদয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাসের স্রোতে ভাসিয়ে দিলে, সবচেয়ে মধুর হাসি ও কোমল ক্ষমাও কখনো আমাদের আহত করতে পারে।
[লেখক: আইনজীবী]