হোসেন আবদুল মান্নান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা
দেশের বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। বলতে গেলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সহিংসতা, মাস্তানি, নৈরাজ্য এসব ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাতের টকশোওয়ালা বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি পর্যালোচকের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল ভিন্নতর।
এদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাস বলে, একনেতা, একদল এবং নিজের প্রতীকের ওপর বিশ্বাসী হয়ে একটি আসন নিয়েও কেউ কেউ সংসদ ভবনের হিরো হয়েছিলেন। সমগ্র জাতির নজরে পড়েছিলেন। শুধু এদেশে নয় এমনটা ভারতের লোকসভায় বা অন্য দেশেও নজির আছে। অথচ বর্তমানে এখানে এমন পর্বতসম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংকট মারাত্মকভাবে চোখে পড়ছে
তাদের আশঙ্কা ছিল হয়তো ভয়াবহ কিছু হবে। এককথায় বলা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই অতিক্রান্ত। এবং ফলাফল যা হয়েছে তাতেও জনমনে ব্যাপক কোনো অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়েছে তা-ও বলা যাবে না। রাস্তায় কোনো ডেমোনস্ট্রেশন হয়নি, বিক্ষোভ নেই বরং দলগুলোর প্রাপ্ত আসন সংখ্যা গণমানুষের পূর্ব প্রত্যাশার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে। নির্বাচন শেষে সরাসরি কেউ বলতে পারছে না একদিক-সেদিক বা হেরফের কিছু হয়েছে।
২.
এবারের নির্বাচন হয়েছে মূলত দুটো দলের ছায়ায় বা আনুকূল্যের ভেতরে থেকে। দল বলতে প্রথমত বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির মতো বড় দলের জোটের রাজনীতির প্রয়োজন ছিল না। তবুও হয়তো নানা অদৃশ্য হিসাবনিকাশের কারণে করা হয়েছে। তাছাড়া মাঠে আওয়ামী লীগের মতো বড় দলের অনুপস্থিতি এবং তৃণমূলের কর্মীদের নেপথ্যের সমর্থন এটাও নির্বাচনের ফলাফলকে বেশ ভালোভাবেই প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করে। বলা যায়, এবারের নির্বাচনী কৌশলে বিএনপি জোট অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের প্রতি গণমানুষের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে। মুখ্যত প্রতীকই হয়ে উঠেছে ফলাফলের নিয়ামক শক্তি। একইসঙ্গে বলা যায়, দেশব্যাপী জনমত জরিপেও দলটি আগাগোড়াই এগিয়ে ছিল। এবারের নির্বাচন ঘিরে অভূতপূর্ব গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছিল। কল্পনার ফানুস উড়িয়ে যে যার মতো ন্যারেটিভ তৈরি করেছে।
এর আগে অর্থাৎ গত পঞ্চাশ বছরে কখনো এমনটা দেখা যায়নি। কেউ শুনেনি ভোটের আগের দিনও রাস্তা ঘাটে বলাবলি হয়েছে, ‘নির্বাচন হবে না’। জাতিসংঘ, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই করছে, সেই করছে ইত্যাদি। এদিক থেকেও এবারের নির্বাচন ছিল নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
৩.
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে জোট বা মোর্চা গঠনের প্রথাকে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির এমন জয়জয়কারের যুগে একেবারেই যথাযথ বলে মনে হয় না। বিষয়টি ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে নেয়া গেলেও এর বাস্তবতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। এবারের নির্বাচনে লক্ষণীয় যে, একটা উদীয়মান তারুণ্যনির্ভর, অতি আত্মবিশ্বাসী, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের দাবিদার দল মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। তবে তারা এককভাবে নির্বাচন করেনি। করেছে ১১-দলীয় জোটের হয়ে। প্রতীক নিজস্ব হলেও ভোটার এবং সমর্থক সকলের। তারা এককভাবে নির্বাচন করলে ফলাফল কী হতো তা ভাবা যায়? আবার কেউ কেউ ভিন্ন প্রতীক নিয়েও সবচেয়ে বড় দলের সরাসরি আশীর্বাদ পেয়ে বৈতরণি পার করে যেন অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। অথচ তারা ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় পর্যায়ের বড় নেতা। বলা যায়, এরা রাজধানীর বড় তারকা লিডার। এখানে এদের আসন সর্বত্র সংরক্ষিত থাকে। বাস্তবতা হল, এদের অনেকেরই নিজের এলাকায় ন্যূনতম জনসম্পৃক্ততা নেই, পরিচিতি নেই। কিন্তু আসন্ন সংসদে হয়তো কথার ঝড় তুলে দিবেন। বাস্তবে এরা কোন দলের সমর্থকের পক্ষে বলবেন?
অন্যদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে লাখের কাছাকাছি ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন একাধিক জনপ্রিয় দলীয় নেতা। যার গ্রহণযোগ্যতা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় প্রশ্নাতীত ছিল। তিনি জোটের বলী হয়েছেন। কেউ আবার কঠোর বিদ্রোহী হয়েও জয় নিয়ে সগৌরবে ফিরে এসেছেন। অনেকে বলেন, এলাকায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভোটের খবর নেই কিন্তু সংসদে আসন আছে। এটা ভাগ্য বলে কথা। মানুষের ললাটের লিখন নাকি কেউ খন্ডন করতে পারে না। আবার দেখা গেছে, কোনো কোনো রাজনীতিবিদ নিজের তৈরি করা তিন-চার দশকের পুরনো দলকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে বড় দলের পেটে বিলীন করে দিয়ে কেবল একজন এমপি হতে চেয়েছেন। তবে এরা বেশির ভাগই সফল হতে পারেননি। মানুষ গ্রহণ করেনি। তারা একূল-ওকূল দু-কূল হারিয়েছেন। তাদের টার্গেট মূলত রাজনীতি নয় এর চেয়ে ঢের বেশি এমপি হওয়া।
৪.
এদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাস বলে, একনেতা, একদল এবং নিজের প্রতীকের ওপর বিশ্বাসী হয়ে একটি আসন নিয়েও কেউ কেউ সংসদ ভবনের হিরো হয়েছিলেন। সমগ্র জাতির নজরে পড়েছিলেন। শুধু এদেশে নয় এমনটা ভারতের লোকসভায় বা অন্য দেশেও নজির আছে। অথচ বর্তমানে এখানে এমন পর্বতসম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংকট মারাত্মকভাবে চোখে পড়ছে। সময় এসেছে, দলের বাইরের যোগ্য, শিক্ষিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের অন্বেষণ করতে হবে।
এদিক থেকে বরঞ্চ যারা নিজের দল, নিজের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন বা জামানত হারিয়েছেন তাদেরকে বাহবা দেয়া উচিত। কমিউনিস্ট পার্টি, নাগরিক ঐক্য বা অন্য যারাই করেছেন তারা ব্যক্তিত্ববান বিধায় গৌরববোধ করতে পারেন। অপর দিকে যারা নিজের দলকে শক্তিশালী ও কর্মীবান্ধব না করে সবসময় অন্যের কাঁধের ওপর হাত রেখে বড় রাজনীতিক হতে চান তাদের জন্য করুণা হয়। তাদের উচিত নিজের দলকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব না বানিয়ে মাঠে ঘাটে বিস্তৃত করা। আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচার করা। অন্তত নিজের নির্বাচনী এলাকায় বটবৃক্ষের মত দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থান তৈরি করা। অথবা প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোট করা। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যাতে করে স্বাধীনভাবে সব নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এর ওপরও অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া গনতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ এবং অপরিহার্য। একটা জাতীয় নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য, গণআস্হাশীল হয়েছে তা প্রমাণ করে দলহীন স্বতন্ত্র কতজন সদস্য নির্বাচিত হয়ে এসেছেন?
৫.
ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার আগে আলোচ্য বিষয়গুলো বিবেচনা করার সময় এসেছে। আসন্ন যে সংসদ গঠিত হতে চলেছে তারা বলা যায়, নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছেন। মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তাদেরকে পার্লামেন্টে নানা বিষয়ের সংস্কার প্রস্তাবে নিয়ে কাজ করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের দেশসমূহের মত এখানেও নির্বাচনের পরে জোট হতে পারে। এটা কেবল সরকার গঠনের প্রশ্নে। ভোটের ক্ষেত্রে জোট করা কতটা যৌক্তিক তা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। সংসদ হোক উচ্চশিক্ষিত, সৎ, মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও তারুণ্যদীপ্ত। জাতীয় সংসদেই সমগ্র জাতির আশা- আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: গল্পকার]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
হোসেন আবদুল মান্নান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
দেশের বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। বলতে গেলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সহিংসতা, মাস্তানি, নৈরাজ্য এসব ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাতের টকশোওয়ালা বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি পর্যালোচকের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল ভিন্নতর।
এদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাস বলে, একনেতা, একদল এবং নিজের প্রতীকের ওপর বিশ্বাসী হয়ে একটি আসন নিয়েও কেউ কেউ সংসদ ভবনের হিরো হয়েছিলেন। সমগ্র জাতির নজরে পড়েছিলেন। শুধু এদেশে নয় এমনটা ভারতের লোকসভায় বা অন্য দেশেও নজির আছে। অথচ বর্তমানে এখানে এমন পর্বতসম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংকট মারাত্মকভাবে চোখে পড়ছে
তাদের আশঙ্কা ছিল হয়তো ভয়াবহ কিছু হবে। এককথায় বলা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই অতিক্রান্ত। এবং ফলাফল যা হয়েছে তাতেও জনমনে ব্যাপক কোনো অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়েছে তা-ও বলা যাবে না। রাস্তায় কোনো ডেমোনস্ট্রেশন হয়নি, বিক্ষোভ নেই বরং দলগুলোর প্রাপ্ত আসন সংখ্যা গণমানুষের পূর্ব প্রত্যাশার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে। নির্বাচন শেষে সরাসরি কেউ বলতে পারছে না একদিক-সেদিক বা হেরফের কিছু হয়েছে।
২.
এবারের নির্বাচন হয়েছে মূলত দুটো দলের ছায়ায় বা আনুকূল্যের ভেতরে থেকে। দল বলতে প্রথমত বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির মতো বড় দলের জোটের রাজনীতির প্রয়োজন ছিল না। তবুও হয়তো নানা অদৃশ্য হিসাবনিকাশের কারণে করা হয়েছে। তাছাড়া মাঠে আওয়ামী লীগের মতো বড় দলের অনুপস্থিতি এবং তৃণমূলের কর্মীদের নেপথ্যের সমর্থন এটাও নির্বাচনের ফলাফলকে বেশ ভালোভাবেই প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করে। বলা যায়, এবারের নির্বাচনী কৌশলে বিএনপি জোট অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের প্রতি গণমানুষের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে। মুখ্যত প্রতীকই হয়ে উঠেছে ফলাফলের নিয়ামক শক্তি। একইসঙ্গে বলা যায়, দেশব্যাপী জনমত জরিপেও দলটি আগাগোড়াই এগিয়ে ছিল। এবারের নির্বাচন ঘিরে অভূতপূর্ব গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছিল। কল্পনার ফানুস উড়িয়ে যে যার মতো ন্যারেটিভ তৈরি করেছে।
এর আগে অর্থাৎ গত পঞ্চাশ বছরে কখনো এমনটা দেখা যায়নি। কেউ শুনেনি ভোটের আগের দিনও রাস্তা ঘাটে বলাবলি হয়েছে, ‘নির্বাচন হবে না’। জাতিসংঘ, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই করছে, সেই করছে ইত্যাদি। এদিক থেকেও এবারের নির্বাচন ছিল নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
৩.
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে জোট বা মোর্চা গঠনের প্রথাকে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির এমন জয়জয়কারের যুগে একেবারেই যথাযথ বলে মনে হয় না। বিষয়টি ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে নেয়া গেলেও এর বাস্তবতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। এবারের নির্বাচনে লক্ষণীয় যে, একটা উদীয়মান তারুণ্যনির্ভর, অতি আত্মবিশ্বাসী, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের দাবিদার দল মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। তবে তারা এককভাবে নির্বাচন করেনি। করেছে ১১-দলীয় জোটের হয়ে। প্রতীক নিজস্ব হলেও ভোটার এবং সমর্থক সকলের। তারা এককভাবে নির্বাচন করলে ফলাফল কী হতো তা ভাবা যায়? আবার কেউ কেউ ভিন্ন প্রতীক নিয়েও সবচেয়ে বড় দলের সরাসরি আশীর্বাদ পেয়ে বৈতরণি পার করে যেন অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। অথচ তারা ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় পর্যায়ের বড় নেতা। বলা যায়, এরা রাজধানীর বড় তারকা লিডার। এখানে এদের আসন সর্বত্র সংরক্ষিত থাকে। বাস্তবতা হল, এদের অনেকেরই নিজের এলাকায় ন্যূনতম জনসম্পৃক্ততা নেই, পরিচিতি নেই। কিন্তু আসন্ন সংসদে হয়তো কথার ঝড় তুলে দিবেন। বাস্তবে এরা কোন দলের সমর্থকের পক্ষে বলবেন?
অন্যদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে লাখের কাছাকাছি ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন একাধিক জনপ্রিয় দলীয় নেতা। যার গ্রহণযোগ্যতা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় প্রশ্নাতীত ছিল। তিনি জোটের বলী হয়েছেন। কেউ আবার কঠোর বিদ্রোহী হয়েও জয় নিয়ে সগৌরবে ফিরে এসেছেন। অনেকে বলেন, এলাকায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভোটের খবর নেই কিন্তু সংসদে আসন আছে। এটা ভাগ্য বলে কথা। মানুষের ললাটের লিখন নাকি কেউ খন্ডন করতে পারে না। আবার দেখা গেছে, কোনো কোনো রাজনীতিবিদ নিজের তৈরি করা তিন-চার দশকের পুরনো দলকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে বড় দলের পেটে বিলীন করে দিয়ে কেবল একজন এমপি হতে চেয়েছেন। তবে এরা বেশির ভাগই সফল হতে পারেননি। মানুষ গ্রহণ করেনি। তারা একূল-ওকূল দু-কূল হারিয়েছেন। তাদের টার্গেট মূলত রাজনীতি নয় এর চেয়ে ঢের বেশি এমপি হওয়া।
৪.
এদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাস বলে, একনেতা, একদল এবং নিজের প্রতীকের ওপর বিশ্বাসী হয়ে একটি আসন নিয়েও কেউ কেউ সংসদ ভবনের হিরো হয়েছিলেন। সমগ্র জাতির নজরে পড়েছিলেন। শুধু এদেশে নয় এমনটা ভারতের লোকসভায় বা অন্য দেশেও নজির আছে। অথচ বর্তমানে এখানে এমন পর্বতসম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংকট মারাত্মকভাবে চোখে পড়ছে। সময় এসেছে, দলের বাইরের যোগ্য, শিক্ষিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের অন্বেষণ করতে হবে।
এদিক থেকে বরঞ্চ যারা নিজের দল, নিজের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন বা জামানত হারিয়েছেন তাদেরকে বাহবা দেয়া উচিত। কমিউনিস্ট পার্টি, নাগরিক ঐক্য বা অন্য যারাই করেছেন তারা ব্যক্তিত্ববান বিধায় গৌরববোধ করতে পারেন। অপর দিকে যারা নিজের দলকে শক্তিশালী ও কর্মীবান্ধব না করে সবসময় অন্যের কাঁধের ওপর হাত রেখে বড় রাজনীতিক হতে চান তাদের জন্য করুণা হয়। তাদের উচিত নিজের দলকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব না বানিয়ে মাঠে ঘাটে বিস্তৃত করা। আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচার করা। অন্তত নিজের নির্বাচনী এলাকায় বটবৃক্ষের মত দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থান তৈরি করা। অথবা প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোট করা। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যাতে করে স্বাধীনভাবে সব নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এর ওপরও অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া গনতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ এবং অপরিহার্য। একটা জাতীয় নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য, গণআস্হাশীল হয়েছে তা প্রমাণ করে দলহীন স্বতন্ত্র কতজন সদস্য নির্বাচিত হয়ে এসেছেন?
৫.
ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার আগে আলোচ্য বিষয়গুলো বিবেচনা করার সময় এসেছে। আসন্ন যে সংসদ গঠিত হতে চলেছে তারা বলা যায়, নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছেন। মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তাদেরকে পার্লামেন্টে নানা বিষয়ের সংস্কার প্রস্তাবে নিয়ে কাজ করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের দেশসমূহের মত এখানেও নির্বাচনের পরে জোট হতে পারে। এটা কেবল সরকার গঠনের প্রশ্নে। ভোটের ক্ষেত্রে জোট করা কতটা যৌক্তিক তা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। সংসদ হোক উচ্চশিক্ষিত, সৎ, মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও তারুণ্যদীপ্ত। জাতীয় সংসদেই সমগ্র জাতির আশা- আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: গল্পকার]