alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

মিহির কুমার রায়

: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট এবং গভর্নর অফিসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে মাঠপর্যায়ে আলুর দাম নেমে আসায় কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদার-সব পক্ষই চাপে পড়েছে।

গবেষণা জরিপ দল ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলা পরিদর্শন করে পাঁচটি কৃষিপণ্য-ধান-চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি এবং ডিম-সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। জরিপটি ১৫ জুন ২০২৫ থেকে ৭ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত হয়। গবেষণায় উৎপাদন, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা ও সম্ভাবনার চিত্র উঠে এসেছে, যা ধারাবাহিকভাবে নিচে আলোচিত হলো।

আলু উৎপাদন : জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষক গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে বেশি জমিতে আলু চাষ করেছেন, ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় কৃষকরা আলু দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনছেন। মাঠ থেকে সরাসরি আলু বিক্রি করে কৃষকরা কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১৩ টাকা এবং বাড়ি থেকে বিক্রি করে ১২ টাকা পাচ্ছেন। অথচ গত মৌসুমে আলুর দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৪৫ টাকা।

চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা, যা আগের মৌসুমে ছিল ১৪ টাকা। লিজ ভাড়া বৃদ্ধি, বীজের উচ্চমূল্য এবং সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, মোট উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ ব্যয় হয় বীজে এবং ২১ শতাংশ ব্যয় হয় সার ও কীটনাশকে।

ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা মাঠ থেকে কেজিপ্রতি ১৩ টাকা এবং কৃষকের বাড়ি থেকে ১১ টাকায় আলু কিনছেন। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদে তাদের লাভ কেজিপ্রতি ২৫ পয়সা থেকে ১ টাকার মধ্যে। আড়তদাররাও সীমিত লাভে ব্যবসা করছেন এবং অনেকেই কম দামের কারণে হিমাগারে আলু মজুত করছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ৬ দশমিক ৭৫ টাকা হিমাগার ভাড়া পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় বেশি এবং তা কমানোর সুযোগ রয়েছে। দ্রুত রপ্তানি বা ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচির মাধ্যমে আলু সংগ্রহ না করলে দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। বড় চাষিদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে সংরক্ষণ সুবিধা ও পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

চালের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধি : গত বছরের তুলনায় মোটা চালের খুচরা মূল্য ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৬১ টাকা এবং চিকন চালের মূল্য ১১ শতাংশ বেড়ে ৭৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় মোটা চালের উৎপাদন খরচ ৩৫ শতাংশ এবং চিকন চালের ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

একইসঙ্গে কৃষকরা বেশি লাভজনক ফসলে ঝুঁকে পড়ায় ধানের আবাদি জমি কমেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঈদের টানা ব্যাংক ছুটির কারণে ধান কেনাবেচা ও চালকলের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

প্রতিবেদনে চিকন চালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং অটোমেটেড ধান ড্রায়ার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে গড় খরচ ৮৭২ টাকা, আর বিক্রি হয়েছে ১,১২৫ থেকে ১,৪৫০ টাকায়। তবে চালের বাজার মিলারনির্ভর। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায় পৌঁছায়।

পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ : পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষকরা কেজিপ্রতি গড়ে ৪৩ টাকায় বিক্রি করছেন, যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৩ টাকা। তবে উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব ও সারের উচ্চমূল্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি চালু করলে পচন কমে এবং কার্যকর ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ জন্য ৪ শতাংশ সুদে রিফাইন্যান্স সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্রয়লার ও ডিম খাত : জরিপকালে ব্রয়লার মুরগিতে কেজিপ্রতি গড়ে ১২ টাকা এবং ডিমে প্রতিটি ৮১ পয়সা ক্ষতি হচ্ছিল। মোট ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ক্ষুদ্র ও মধ্যম খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, ফিড ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ এবং মূল্য পর্যবেক্ষণ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ : ১. কৃষিপণ্য ও পোল্ট্রি খাতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) চালু।

২. সার, খাদ্য ও ওষুধের বাজারে কঠোর নজরদারি।

৩. আধুনিক সংরক্ষণ ও শুকানোর অবকাঠামো বৃদ্ধি।

৪. পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় স্বল্পসুদে ঋণ ও রিফাইন্যান্স সুবিধা চালু।

স্বল্প পরিসরের হলেও এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাঁচটি পণ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত পরিসরে মূল্য শৃঙ্খল বিশ্লেষণ প্রয়োজন। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যকার ফাঁক কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা বিঘিœত হবে।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থায় সমন্বিত নীতি সহায়তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা সেই আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ।

[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি]

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

মিহির কুমার রায়

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট এবং গভর্নর অফিসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে মাঠপর্যায়ে আলুর দাম নেমে আসায় কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদার-সব পক্ষই চাপে পড়েছে।

গবেষণা জরিপ দল ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলা পরিদর্শন করে পাঁচটি কৃষিপণ্য-ধান-চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি এবং ডিম-সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। জরিপটি ১৫ জুন ২০২৫ থেকে ৭ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত হয়। গবেষণায় উৎপাদন, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা ও সম্ভাবনার চিত্র উঠে এসেছে, যা ধারাবাহিকভাবে নিচে আলোচিত হলো।

আলু উৎপাদন : জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষক গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে বেশি জমিতে আলু চাষ করেছেন, ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় কৃষকরা আলু দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনছেন। মাঠ থেকে সরাসরি আলু বিক্রি করে কৃষকরা কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১৩ টাকা এবং বাড়ি থেকে বিক্রি করে ১২ টাকা পাচ্ছেন। অথচ গত মৌসুমে আলুর দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৪৫ টাকা।

চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা, যা আগের মৌসুমে ছিল ১৪ টাকা। লিজ ভাড়া বৃদ্ধি, বীজের উচ্চমূল্য এবং সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, মোট উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ ব্যয় হয় বীজে এবং ২১ শতাংশ ব্যয় হয় সার ও কীটনাশকে।

ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা মাঠ থেকে কেজিপ্রতি ১৩ টাকা এবং কৃষকের বাড়ি থেকে ১১ টাকায় আলু কিনছেন। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদে তাদের লাভ কেজিপ্রতি ২৫ পয়সা থেকে ১ টাকার মধ্যে। আড়তদাররাও সীমিত লাভে ব্যবসা করছেন এবং অনেকেই কম দামের কারণে হিমাগারে আলু মজুত করছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ৬ দশমিক ৭৫ টাকা হিমাগার ভাড়া পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় বেশি এবং তা কমানোর সুযোগ রয়েছে। দ্রুত রপ্তানি বা ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচির মাধ্যমে আলু সংগ্রহ না করলে দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। বড় চাষিদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে সংরক্ষণ সুবিধা ও পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

চালের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধি : গত বছরের তুলনায় মোটা চালের খুচরা মূল্য ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৬১ টাকা এবং চিকন চালের মূল্য ১১ শতাংশ বেড়ে ৭৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় মোটা চালের উৎপাদন খরচ ৩৫ শতাংশ এবং চিকন চালের ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

একইসঙ্গে কৃষকরা বেশি লাভজনক ফসলে ঝুঁকে পড়ায় ধানের আবাদি জমি কমেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঈদের টানা ব্যাংক ছুটির কারণে ধান কেনাবেচা ও চালকলের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

প্রতিবেদনে চিকন চালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং অটোমেটেড ধান ড্রায়ার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে গড় খরচ ৮৭২ টাকা, আর বিক্রি হয়েছে ১,১২৫ থেকে ১,৪৫০ টাকায়। তবে চালের বাজার মিলারনির্ভর। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায় পৌঁছায়।

পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ : পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষকরা কেজিপ্রতি গড়ে ৪৩ টাকায় বিক্রি করছেন, যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৩ টাকা। তবে উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব ও সারের উচ্চমূল্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি চালু করলে পচন কমে এবং কার্যকর ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ জন্য ৪ শতাংশ সুদে রিফাইন্যান্স সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্রয়লার ও ডিম খাত : জরিপকালে ব্রয়লার মুরগিতে কেজিপ্রতি গড়ে ১২ টাকা এবং ডিমে প্রতিটি ৮১ পয়সা ক্ষতি হচ্ছিল। মোট ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ক্ষুদ্র ও মধ্যম খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, ফিড ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ এবং মূল্য পর্যবেক্ষণ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ : ১. কৃষিপণ্য ও পোল্ট্রি খাতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) চালু।

২. সার, খাদ্য ও ওষুধের বাজারে কঠোর নজরদারি।

৩. আধুনিক সংরক্ষণ ও শুকানোর অবকাঠামো বৃদ্ধি।

৪. পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় স্বল্পসুদে ঋণ ও রিফাইন্যান্স সুবিধা চালু।

স্বল্প পরিসরের হলেও এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাঁচটি পণ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত পরিসরে মূল্য শৃঙ্খল বিশ্লেষণ প্রয়োজন। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যকার ফাঁক কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা বিঘিœত হবে।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থায় সমন্বিত নীতি সহায়তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা সেই আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ।

[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি]

back to top