alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
image

মাতৃভাষায় নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় কোমলমতি আদিবাসী শিশুরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে

এই ভাষার মাসে প্রথমেই বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ভাষাশহীদদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।

বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ। পাহাড়ের শিশুদের সমতলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে হলে শিক্ষার শক্ত ভিত প্রয়োজন। সেই ভিতই যদি দুর্বল ও শিক্ষকশূন্য থাকে, তবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। পাহাড় কিংবা সমতলে শিক্ষাবিস্তারে কোনো বৈষম্য না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার অবহেলা শিশুদের ভাষাচর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় আদিবাসীরা হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হন। অনেকে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে পড়াশোনা বা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণ নিয়ে বলা যায়, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।’ মাতৃভাষা ভালোভাবে না জানলে অন্য ভাষায়ও দক্ষতা অর্জন কঠিন। আবার রামনিধি গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা।’ এই চরণে আপন ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রকাশ রয়েছে। মানুষ নিজের ভাষায় যত সহজে মনের কথা প্রকাশ ও জ্ঞান আহরণ করতে পারে, অন্য ভাষায় তা পারে না।

মাতৃভাষায় নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় কোমলমতি আদিবাসী শিশুরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তিতে স্থানীয় আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ভাষার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শান্তিচুক্তির ‘খ’ অংশের ৩৩ নম্বর ক্রমিকের ‘খ (২)’ উপ-অনুচ্ছেদে প্রাথমিক ও প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে পাঠদানের গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু পদক্ষেপ নেয়। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে সীমিত আকারে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান শুরু হয়। ২০১৮ সালে পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০২২ সালে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিজ মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, গারো ও সাদরি ভাষায় শিখনসামগ্রী ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। উন্নয়নের পথে ভাষা হলো পরিচয় ও মর্যাদার শক্ত ভিত্তি। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাঙামাটি জেলায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকপদ শূন্য। সাত শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে চার শতাধিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষকপদ শূন্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয় এক বা দুজন শিক্ষক দিয়ে চালাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সমতল ও পাহাড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসী ভাষায় শিক্ষার নিশ্চয়তায় একটি কমিশন গঠন।

২. পার্বত্য চুক্তির আলোকে জেলাপরিষদের মাধ্যমে পাহাড়ে শিক্ষক নিয়োগ এবং শূন্যপদ দ্রুত পূরণ।

৩. অধ্যুষিত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষ শিক্ষকের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।

৪. মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ; কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা।

৫. ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ ও লিখিত রূপ উন্নয়ন; সমঅধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন।

৬. প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে আবাসিক হোস্টেল চালু ও প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা।

৭. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আদিবাসী ভাষার গবেষণা ও চর্চায় পর্যাপ্ত অনুদান নিশ্চিত করা।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষায় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সচেতন নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বইয়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

image

মাতৃভাষায় নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় কোমলমতি আদিবাসী শিশুরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এই ভাষার মাসে প্রথমেই বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ভাষাশহীদদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।

বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ। পাহাড়ের শিশুদের সমতলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে হলে শিক্ষার শক্ত ভিত প্রয়োজন। সেই ভিতই যদি দুর্বল ও শিক্ষকশূন্য থাকে, তবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। পাহাড় কিংবা সমতলে শিক্ষাবিস্তারে কোনো বৈষম্য না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার অবহেলা শিশুদের ভাষাচর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় আদিবাসীরা হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হন। অনেকে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে পড়াশোনা বা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণ নিয়ে বলা যায়, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।’ মাতৃভাষা ভালোভাবে না জানলে অন্য ভাষায়ও দক্ষতা অর্জন কঠিন। আবার রামনিধি গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা।’ এই চরণে আপন ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রকাশ রয়েছে। মানুষ নিজের ভাষায় যত সহজে মনের কথা প্রকাশ ও জ্ঞান আহরণ করতে পারে, অন্য ভাষায় তা পারে না।

মাতৃভাষায় নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় কোমলমতি আদিবাসী শিশুরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তিতে স্থানীয় আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ভাষার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শান্তিচুক্তির ‘খ’ অংশের ৩৩ নম্বর ক্রমিকের ‘খ (২)’ উপ-অনুচ্ছেদে প্রাথমিক ও প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে পাঠদানের গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু পদক্ষেপ নেয়। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে সীমিত আকারে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান শুরু হয়। ২০১৮ সালে পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০২২ সালে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিজ মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, গারো ও সাদরি ভাষায় শিখনসামগ্রী ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। উন্নয়নের পথে ভাষা হলো পরিচয় ও মর্যাদার শক্ত ভিত্তি। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাঙামাটি জেলায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকপদ শূন্য। সাত শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে চার শতাধিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষকপদ শূন্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয় এক বা দুজন শিক্ষক দিয়ে চালাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সমতল ও পাহাড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসী ভাষায় শিক্ষার নিশ্চয়তায় একটি কমিশন গঠন।

২. পার্বত্য চুক্তির আলোকে জেলাপরিষদের মাধ্যমে পাহাড়ে শিক্ষক নিয়োগ এবং শূন্যপদ দ্রুত পূরণ।

৩. অধ্যুষিত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষ শিক্ষকের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।

৪. মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ; কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা।

৫. ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ ও লিখিত রূপ উন্নয়ন; সমঅধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন।

৬. প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে আবাসিক হোস্টেল চালু ও প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা।

৭. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আদিবাসী ভাষার গবেষণা ও চর্চায় পর্যাপ্ত অনুদান নিশ্চিত করা।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষায় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সচেতন নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বইয়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

back to top