alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি ও তার জোটভুক্ত সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধানে বিধান না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এতে রাজনৈতিক আবহাওয়া কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও তাদের ১১ দলীয় জোট এই অবস্থায় বিএনপিকে চাপে রাখতে কোন শপথ নেবে না বলে ঘোষণা দেয়; কিন্তু পরক্ষণেই তারা কোন ব্যাখ্যা না দিয়েই সংসদ সদস্য ও পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ গ্রহণ করে।

জুলাই সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গেও সৎ ছিল না। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ৮৪টি প্রস্তাব পড়েছে, বা পড়ে বুঝতে পেরেছে এমন ১ শতাংশ ভোটারও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। জুলাই সনদের পক্ষে যারা ‘হ্যাঁ-ভোট’ দিয়েছে তারা যদি পড়ে সচেতনভাবে ভোট দিত তাহলে সব প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। ঠিক তেমনি যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তাদেরও সব প্রস্তাবে ‘না-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়

বিএনপির জোটভুক্ত এমপিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় তারা আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হলো না। কিন্তু ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এ বর্ণিত আছে যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং তারা প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ বর্ণিত সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন, এই সময়ে তারা ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে গণ্য হবেন। শপথ পাঠ করিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, তিনি শপথের ক্ষেত্রে দুই রকম নীতি অনুসরণ করলেন কীভাবে তা বোঝা গেল না। এর ফলে কী হলো? সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতেই সরকারি দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিচিত হবেন ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে, আর বিরোধী দলের সদস্যরা গণ্য হবেন ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে।

জুলাই জাতীয় সনদের তিনটি ভাগ আছে। প্রথম ভাগে আছে সনদের পটভূমি, দ্বিতীয় ভাগে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব এবং তৃতীয় ভাগে আছে সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকারনামা। জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত, বাকিগুলো অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে, সংসদে উপস্থাপনের প্রয়োজন হবে না। অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিএনপির ওপর, যদিও ঐকমত্য কমিশনের সব দল প্রস্তাব বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তবে অঙ্গীকার রক্ষার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত, আইন নয়। অবশ্য আইন না মানলেও যে সমস্যা হয় না তা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিনিয়ত দেখিয়ে দিয়েছে, সংবিধান ও আইন অমান্য করার অনিয়ম অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত আদেশ, অধ্যাদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের কোন লক্ষণ বিএনপির মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২৭০ দিনের মধ্যে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার পরিষদে পাস না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

স্বার্বভৌম সংসদের ওপর এভাবে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ‘আদেশ’ বা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ বাস্তবায়নের শর্ত এবং তা পরিপালনের জন্য ২৭০ দিনের সময় নির্ধারণ করে দিতে পারে না, পারলে সংসদের আর স্বার্বভৌমত্ব থাকে না। আবার বলেছে সবগুলো প্রস্তাব পাস করতে হবে। ‘আদেশ’-এর সবগুলো প্রস্তাব হুবহু পাস করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ২৭০ দিন লাগার কথা নয়, পরিষদে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন না হলে প্রস্তাবগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই পাস করা যায়। তাহলে কি আরও ২৭০ দিন মোহাম্মদ ইউনূসের ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছে ছিল? প্রকৃতপক্ষে স্বার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ‘জনগণ’। জনগণ আরও একটি ক্ষেত্রে তাদের স্বার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, তারা তাদের ভোট দিয়ে ‘জুলাই সনদ’ পাস করেছে এবং বিএনপি দলগতভাবে তাতে সমর্থনও দিয়েছে। তাই জনগণের ভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদকে উপেক্ষা করার সুযোগও নেই। এখন দুই স্বার্বভৌম ক্ষমতার বাস্তবায়নে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি দল বিএনপি গুরুত্ব দিচ্ছে স্বার্বভৌম সংসদের ওপর, আর বিরোধী দলের ১১ দলীয় জোট গুরুত্ব দিচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ওপর। উদ্ভূত এই সংঘাত নিরসনে কেউ আইনের আশ্রয় নিলে স্বার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী জনগণ খুব বেশি আশ্চর্য হবে বলে মনে হয় না। বিএনপিও জুলাই সনদ মানে, তবে ‘আদেশ’-এর হুবহু জুলাই সনদ নয়।

সমস্যার এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। জুলাই সনদে আছে ৭ দফা অঙ্গীকার। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করায় বিএনপি এই অঙ্গীকারনামা মানতেও অঙ্গীকারাবদ্ধ। জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে প্রথম অঙ্গীকারনামায়। বিএনপি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘আদেশ’ অমান্য করেছে; এতে একটি ভয়াবহ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে- যে পরিষদে ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ পাস হওয়ার কথা, শপথ না নেওয়ায় সেই পরিষদই গঠিত হলো না। জুলাই সনদ বিল আকারে সংসদে উত্থাপিত হলে আরেক সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। কারণ সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই, থাকা উচিতও নয়, কারণ সংসদ গণভোটেই গঠিত। গণভোট হচ্ছে রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো নীতি, আইন প্রণয়ন বা সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয়ে জনগণের মতামত সরাসরি যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি সংসদে পাঠায় আইন প্রণয়ন ও তা পাস করার জন্য। সিম্পল মেজরিটি বা দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থনে যে আইন বা প্রস্তাব পাস হয়, তাতে পুনরায় জনগণের মত নেওয়া অপ্রয়োজনীয়। এতে শুধু সময়ক্ষেপণ হয় না, জনগণের অর্থেরও অপচয় হয়। তাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত গণভোটের বিধান ২০১১ সনে বাতিল করা হয়; কিন্তু ৫ আগস্টের পর আদালতের রায়ে তা আবার ফেরত এসেছে। আদালতের রায়ে ফেরত এলেও তা সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বাতিল করেছিল, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে পরবর্তীকালে সংবিধান থেকে তা রদ করা হয়।

আমরা যদি ধরেও নিই যে, গণভোট সংশ্লিষ্ট আদালতের রায় সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, তাহলেও সমস্যা থেকে যায়; কারণ গণভোটের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটে পরিপালিত হয়নি। সংবিধানের গণভোটের শর্ত মোতাবেক প্রথমে কোন নীতি, আইন বা সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে পাস হবে, পাস হওয়ার পর তা গণভোটে দেওয়া হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ উল্টা, আগে গণভোট, পরে সংসদ। এছাড়া সব সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির সম্মতি নেই; সংস্কার প্রস্তাবের ২, ৩, ৪ নম্বর দফাসহ মোট ১০টি প্রস্তাবে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু গণভোটে দেওয়া জুলাই সনদে ভিন্নমত থাকার কথা উল্লেখ নেই, ভিন্নমতকে বাদ দিয়েই জনগণ জুলাই সনদ পাস করেছে। এখন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ মোতাবেক জুলাই সনদ কাটছাঁট করা হলে তাতে জনগণের মতকে উপক্ষা করা হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিন্নমত থাকায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করাও বিএনপির জন্য উপযোগী হবে না। আবার জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ‘আদেশ’ এবং বিএনপির অঙ্গীকারের বরখেলাপ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ প্রণয়নে সততার পরিচয় দেয়নি। এই আদেশ গণভোটে দেওয়ার আগে বলা হয়েছিল, যে দল ক্ষমতায় যাবে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তাদের কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের জারিকৃত উক্ত ‘আদেশ’- এ তাদের কথা অন্তর্ভুক্ত করেনি; বরং বলা হয়েছে, গণভোটের মাধ্যমে ভিন্নমতের সুরাহা হবে। বিএনপি কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এহেন কপটতার প্রতিবাদ করেনি, চুপ ছিল, কারণ নির্বাচনে প্রতিবন্ধক হয় এমন কোন কথা বা কাজ থেকে তারা সচেতনভাবে বিরত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার যেমন সংবিধান বা বিরাজমান অনেক আইনকানুন মানেনি, বিএনপিও তেমনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ মানার গরজ বোধ করছে না। জুলাই সনদ নিয়ে বিপদ শুধু বিএনপির নয়, জনগণেরও। নির্বাচনের পর জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি নৈতিক সমস্যায় পড়েছে, আর জনগণ সমস্যায় পড়েছিল ভোটের আগে। জুলাই সনদের সবটুকু পড়ে বা জেনেশুনে ভোট দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। জুলাই সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গেও সৎ ছিল না। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ৮৪টি প্রস্তাব পড়েছে, বা পড়ে বুঝতে পেরেছে এমন ১ শতাংশ ভোটারও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। জুলাই সনদের পক্ষে যারা ‘হ্যাঁ-ভোট’ দিয়েছে তারা যদি পড়ে সচেতনভাবে ভোট দিত তাহলে সব প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। ঠিক তেমনি যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তাদেরও সব প্রস্তাবে ‘না-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। প্যাকেজ ভোটের এই নির্বাচন জনগণের সঙ্গে দুর্বৃত্তায়নের নামান্তর।

জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোন রদবদল না করে ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার করতে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে পাস করতে ব্যর্থ হলে ‘সংবিধান সংস্কার বিল’ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে মর্মে গণ্য হবে। জুলাই সনদ যাতে সহজেই পাস হয়ে যায় সেদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। বিদ্যমান সংবিধান অনুয়ায়ী সংবিধান সংশোধন সংশ্লিষ্ট যে কোন বিল পাসে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘আদেশ’ অনুযায়ী তাদের সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাব পাস করতে লাগবে শুধু পরিষদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। জুলাই সনদ সইয়ের আগে এই ধারাটি যুক্ত ছিল না; যুক্ত ছিল না সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও। সংবিধান সংস্কার পরিষদ জুলাই সনদ পাস না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনে পরিণত হয়ে যাবে- এমন উর্বর ও নির্দেশনামূলক প্রস্তাব এখন বিএনপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ ইস্যু না থাকলে বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠত।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি ও তার জোটভুক্ত সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধানে বিধান না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এতে রাজনৈতিক আবহাওয়া কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও তাদের ১১ দলীয় জোট এই অবস্থায় বিএনপিকে চাপে রাখতে কোন শপথ নেবে না বলে ঘোষণা দেয়; কিন্তু পরক্ষণেই তারা কোন ব্যাখ্যা না দিয়েই সংসদ সদস্য ও পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ গ্রহণ করে।

জুলাই সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গেও সৎ ছিল না। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ৮৪টি প্রস্তাব পড়েছে, বা পড়ে বুঝতে পেরেছে এমন ১ শতাংশ ভোটারও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। জুলাই সনদের পক্ষে যারা ‘হ্যাঁ-ভোট’ দিয়েছে তারা যদি পড়ে সচেতনভাবে ভোট দিত তাহলে সব প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। ঠিক তেমনি যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তাদেরও সব প্রস্তাবে ‘না-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়

বিএনপির জোটভুক্ত এমপিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় তারা আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হলো না। কিন্তু ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এ বর্ণিত আছে যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং তারা প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ বর্ণিত সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন, এই সময়ে তারা ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে গণ্য হবেন। শপথ পাঠ করিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, তিনি শপথের ক্ষেত্রে দুই রকম নীতি অনুসরণ করলেন কীভাবে তা বোঝা গেল না। এর ফলে কী হলো? সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতেই সরকারি দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিচিত হবেন ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে, আর বিরোধী দলের সদস্যরা গণ্য হবেন ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে।

জুলাই জাতীয় সনদের তিনটি ভাগ আছে। প্রথম ভাগে আছে সনদের পটভূমি, দ্বিতীয় ভাগে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব এবং তৃতীয় ভাগে আছে সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকারনামা। জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত, বাকিগুলো অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে, সংসদে উপস্থাপনের প্রয়োজন হবে না। অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিএনপির ওপর, যদিও ঐকমত্য কমিশনের সব দল প্রস্তাব বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তবে অঙ্গীকার রক্ষার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত, আইন নয়। অবশ্য আইন না মানলেও যে সমস্যা হয় না তা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিনিয়ত দেখিয়ে দিয়েছে, সংবিধান ও আইন অমান্য করার অনিয়ম অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত আদেশ, অধ্যাদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের কোন লক্ষণ বিএনপির মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২৭০ দিনের মধ্যে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার পরিষদে পাস না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

স্বার্বভৌম সংসদের ওপর এভাবে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ‘আদেশ’ বা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ বাস্তবায়নের শর্ত এবং তা পরিপালনের জন্য ২৭০ দিনের সময় নির্ধারণ করে দিতে পারে না, পারলে সংসদের আর স্বার্বভৌমত্ব থাকে না। আবার বলেছে সবগুলো প্রস্তাব পাস করতে হবে। ‘আদেশ’-এর সবগুলো প্রস্তাব হুবহু পাস করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ২৭০ দিন লাগার কথা নয়, পরিষদে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন না হলে প্রস্তাবগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই পাস করা যায়। তাহলে কি আরও ২৭০ দিন মোহাম্মদ ইউনূসের ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছে ছিল? প্রকৃতপক্ষে স্বার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ‘জনগণ’। জনগণ আরও একটি ক্ষেত্রে তাদের স্বার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, তারা তাদের ভোট দিয়ে ‘জুলাই সনদ’ পাস করেছে এবং বিএনপি দলগতভাবে তাতে সমর্থনও দিয়েছে। তাই জনগণের ভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদকে উপেক্ষা করার সুযোগও নেই। এখন দুই স্বার্বভৌম ক্ষমতার বাস্তবায়নে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি দল বিএনপি গুরুত্ব দিচ্ছে স্বার্বভৌম সংসদের ওপর, আর বিরোধী দলের ১১ দলীয় জোট গুরুত্ব দিচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ওপর। উদ্ভূত এই সংঘাত নিরসনে কেউ আইনের আশ্রয় নিলে স্বার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী জনগণ খুব বেশি আশ্চর্য হবে বলে মনে হয় না। বিএনপিও জুলাই সনদ মানে, তবে ‘আদেশ’-এর হুবহু জুলাই সনদ নয়।

সমস্যার এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। জুলাই সনদে আছে ৭ দফা অঙ্গীকার। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করায় বিএনপি এই অঙ্গীকারনামা মানতেও অঙ্গীকারাবদ্ধ। জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে প্রথম অঙ্গীকারনামায়। বিএনপি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘আদেশ’ অমান্য করেছে; এতে একটি ভয়াবহ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে- যে পরিষদে ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ পাস হওয়ার কথা, শপথ না নেওয়ায় সেই পরিষদই গঠিত হলো না। জুলাই সনদ বিল আকারে সংসদে উত্থাপিত হলে আরেক সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। কারণ সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই, থাকা উচিতও নয়, কারণ সংসদ গণভোটেই গঠিত। গণভোট হচ্ছে রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো নীতি, আইন প্রণয়ন বা সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয়ে জনগণের মতামত সরাসরি যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি সংসদে পাঠায় আইন প্রণয়ন ও তা পাস করার জন্য। সিম্পল মেজরিটি বা দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থনে যে আইন বা প্রস্তাব পাস হয়, তাতে পুনরায় জনগণের মত নেওয়া অপ্রয়োজনীয়। এতে শুধু সময়ক্ষেপণ হয় না, জনগণের অর্থেরও অপচয় হয়। তাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত গণভোটের বিধান ২০১১ সনে বাতিল করা হয়; কিন্তু ৫ আগস্টের পর আদালতের রায়ে তা আবার ফেরত এসেছে। আদালতের রায়ে ফেরত এলেও তা সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বাতিল করেছিল, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে পরবর্তীকালে সংবিধান থেকে তা রদ করা হয়।

আমরা যদি ধরেও নিই যে, গণভোট সংশ্লিষ্ট আদালতের রায় সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, তাহলেও সমস্যা থেকে যায়; কারণ গণভোটের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটে পরিপালিত হয়নি। সংবিধানের গণভোটের শর্ত মোতাবেক প্রথমে কোন নীতি, আইন বা সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে পাস হবে, পাস হওয়ার পর তা গণভোটে দেওয়া হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ উল্টা, আগে গণভোট, পরে সংসদ। এছাড়া সব সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির সম্মতি নেই; সংস্কার প্রস্তাবের ২, ৩, ৪ নম্বর দফাসহ মোট ১০টি প্রস্তাবে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু গণভোটে দেওয়া জুলাই সনদে ভিন্নমত থাকার কথা উল্লেখ নেই, ভিন্নমতকে বাদ দিয়েই জনগণ জুলাই সনদ পাস করেছে। এখন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ মোতাবেক জুলাই সনদ কাটছাঁট করা হলে তাতে জনগণের মতকে উপক্ষা করা হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিন্নমত থাকায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করাও বিএনপির জন্য উপযোগী হবে না। আবার জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ‘আদেশ’ এবং বিএনপির অঙ্গীকারের বরখেলাপ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ প্রণয়নে সততার পরিচয় দেয়নি। এই আদেশ গণভোটে দেওয়ার আগে বলা হয়েছিল, যে দল ক্ষমতায় যাবে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তাদের কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের জারিকৃত উক্ত ‘আদেশ’- এ তাদের কথা অন্তর্ভুক্ত করেনি; বরং বলা হয়েছে, গণভোটের মাধ্যমে ভিন্নমতের সুরাহা হবে। বিএনপি কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এহেন কপটতার প্রতিবাদ করেনি, চুপ ছিল, কারণ নির্বাচনে প্রতিবন্ধক হয় এমন কোন কথা বা কাজ থেকে তারা সচেতনভাবে বিরত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার যেমন সংবিধান বা বিরাজমান অনেক আইনকানুন মানেনি, বিএনপিও তেমনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার ) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ মানার গরজ বোধ করছে না। জুলাই সনদ নিয়ে বিপদ শুধু বিএনপির নয়, জনগণেরও। নির্বাচনের পর জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি নৈতিক সমস্যায় পড়েছে, আর জনগণ সমস্যায় পড়েছিল ভোটের আগে। জুলাই সনদের সবটুকু পড়ে বা জেনেশুনে ভোট দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। জুলাই সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গেও সৎ ছিল না। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ৮৪টি প্রস্তাব পড়েছে, বা পড়ে বুঝতে পেরেছে এমন ১ শতাংশ ভোটারও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। জুলাই সনদের পক্ষে যারা ‘হ্যাঁ-ভোট’ দিয়েছে তারা যদি পড়ে সচেতনভাবে ভোট দিত তাহলে সব প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। ঠিক তেমনি যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তাদেরও সব প্রস্তাবে ‘না-ভোট’ দেওয়ার কথা নয়। প্যাকেজ ভোটের এই নির্বাচন জনগণের সঙ্গে দুর্বৃত্তায়নের নামান্তর।

জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোন রদবদল না করে ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার করতে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে পাস করতে ব্যর্থ হলে ‘সংবিধান সংস্কার বিল’ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে মর্মে গণ্য হবে। জুলাই সনদ যাতে সহজেই পাস হয়ে যায় সেদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। বিদ্যমান সংবিধান অনুয়ায়ী সংবিধান সংশোধন সংশ্লিষ্ট যে কোন বিল পাসে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘আদেশ’ অনুযায়ী তাদের সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাব পাস করতে লাগবে শুধু পরিষদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। জুলাই সনদ সইয়ের আগে এই ধারাটি যুক্ত ছিল না; যুক্ত ছিল না সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও। সংবিধান সংস্কার পরিষদ জুলাই সনদ পাস না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনে পরিণত হয়ে যাবে- এমন উর্বর ও নির্দেশনামূলক প্রস্তাব এখন বিএনপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ ইস্যু না থাকলে বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠত।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top