এম এ হোসাইন
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার বিস্ফোরণ কোনো আকস্মিক যুদ্ধ নয়; বরং বহুদিনের অমীমাংসিত এক বিরোধের পুনরুত্থান-সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব, জঙ্গিবাদ এবং ইতিহাসের বোঝা নিয়ে। এই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ ছিল নাটকীয়: বিমান হামলা, পাল্টা আক্রমণ, “উন্মুক্ত যুদ্ধ”-এর ঘোষণা। কিন্তু এর পেছনের যুক্তি বহু বছরের জমাট বাস্তবতার ফল।
গত ২১-২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আফগানিস্তানের নানগারহার, পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, লক্ষ্য ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আইএসআইএস-কে সংশ্লিষ্ট ঘাঁটি। তারা একে গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বলে বর্ণনা করে। কাবুলের বক্তব্য ভিন্ন-এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং এতে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান সীমান্ত চৌকিতে পাল্টা হামলা চালায়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আরও বিস্তৃত আকারে হামলা জোরদার করে এবং ‘অপারেশন গাজব লিল হক’-এর কথা উল্লেখ করে।
উভয় পক্ষই শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে, নিজেদের ক্ষতি অস্বীকার করছে। এখানে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রবণতা: গত বছর দোহায় মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের চুক্তিতে আঁকা ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন আজও আফগান রাজনৈতিক স্মৃতিতে বিতর্কিত। আর যে জঙ্গি নেটওয়ার্ক একসময় ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল, তা এখন কৌশলগত বোঝা।
পাকিস্তান কেন এত আক্রমণাত্মক হলো- এর উত্তর খুঁজতে হলে কাবুল নয়, ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখতে হবে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে পাকিস্তানে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা হয়: রাজধানীতে একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে বহু মানুষ নিহত; বাজাউরে সীমান্তঘেঁষা হামলা; বান্নুতে গোয়েন্দা অভিযানের সময় সেনা কর্মকর্তাদের মৃত্যু। এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে টিটিপি। পাকিস্তানের অভিযোগ, হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয় হয়েছে আফগান ভূখ- থেকে।
এখানেই নির্মম বিদ্রƒপ। দশকের পর দশক পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতির একটি অংশ ছিল জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আঞ্চলিক প্রভাবের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা-প্রথমে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে, পরে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্যে। কিন্তু ভূ-রাজনীতির নিজস্ব প্রতিক্রিয়া আছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ও তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পর টিটিপি নতুন আশ্রয় ও উৎসাহ পায়। একসময়ের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ এখন ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্লোব্যাক’।
ইসলামাবাদ আজ টিটিপিকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যা নয়, রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে। সংগঠনটির লক্ষ্য পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে; গত বছরের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়নি। তাই তাদের ভাষায়, ‘ধৈর্যের সীমা শেষ।’
কিন্তু ডুরান্ড লাইনের ওপারে শক্তির ভাষা খুব কমই কাক্সিক্ষত অনুবাদ পায়। আফগান তালেবান ডুরান্ড লাইনকে চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করে না। তারা টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে, যদিও আদর্শিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাস্তবতাকে জটিল করে। পাকিস্তান যাকে জঙ্গিঘাঁটি বলে আখ্যা দেয়, আফগান কর্তৃপক্ষ তাকে বেসামরিক গ্রাম বলে। উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক আইন ও জনমতের আদালতে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত।
ডুরান্ড লাইন শুধু মানচিত্রের রেখা নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত। আফগানদের কাছে এটি ঔপনিবেশিক বিভাজনের স্মারক, যা পশতুন জনগোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। পাকিস্তানের কাছে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত, যার অখ-তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিটি সীমান্ত লঙ্ঘন সেই ক্ষতকে উসকে দেয়; প্রতিটি জঙ্গি অনুপ্রবেশ অবিশ্বাস বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সতর্ক। জাতিসংঘ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে এবং বেসামরিক সুরক্ষার কথা বলেছে। কাতার, সৌদি আরব ও ইরান সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত পাকিস্তানের বিমান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত-তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ আছে, কিন্তু নতুন সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ কম।
এই সংযমের পেছনে বৈশ্বিক বাস্তবতা রয়েছে। ইউক্রেন, গাজা, দক্ষিণ চীন সাগর-বিশ্বের মনোযোগ বিভক্ত। আফগানিস্তান আর আগের মতো শিরোনামে নেই। কিন্তু উপেক্ষা মানেই গুরুত্বহীনতা নয়। পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে অস্থিরতা শরণার্থী স্রোত, উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বেসামরিক-সামরিক টানাপোড়েন-এমন প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক নিরাপত্তা ইস্যু জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি করতে পারে। সমালোচকরা বলেন, এতে নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে রাজনৈতিক হিসাব মিশে যায়। সমর্থকেরা বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিক ও সৈনিকদের ওপর হামলা উপেক্ষা করতে পারে না।
আফগান তালেবান নেতৃত্বও দ্বিধায়। তারা পাকিস্তানের চাপের কাছে নতি স্বীকারের ভাবমূর্তি চায় না। আবার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতও তাদের পক্ষে নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সীমিত; অর্থনীতি দুর্বল। দীর্ঘ সংঘাত তাদের বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে।
ইতিহাস সতর্ক করে। আশির দশকে সীমান্তবর্তী আশ্রয় আফগানিস্তানকে পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে পরিণত করেছিল। নব্বইয়ের গৃহযুদ্ধ আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতে রূপ নিয়েছিল। ২০০১-এর পর ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত দীর্ঘ যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছিল। প্রতিবারই স্বল্পমেয়াদি কৌশল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র তার ভূখ-ে সশস্ত্র হামলার মুখে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োজনীয়তা ও সামঞ্জস্যের নীতিতে আবদ্ধ। পাকিস্তানের বিমান হামলা কি ছিল শেষ উপায়, নাকি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ? এই প্রশ্নের উত্তরই কূটনৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করবে।
সমাধানের পথ সহজ নয়, কিন্তু অনুপস্থিতও নয়। প্রথমত, পাকিস্তানের মূল অভিযোগ-সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যক্রম নিরসনে বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া দরকার। যৌথ পর্যবেক্ষণ বা তৃতীয় পক্ষের যাচাই-কঠিন হলেও বিবেচনাযোগ্য। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত সহযোগিতা, যদিও রাজনৈতিক বিতর্ক অমীমাংসিত থাকে। তৃতীয়ত, বেসামরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কারণ প্রতিটি অনিচ্ছাকৃত হতাহত পরবর্তী আক্রমণের প্রচারণা হয়ে উঠে।
এই সপ্তাহের ট্র্যাজেডি হলো-উভয় পক্ষেরই বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ আছে, তবু অনিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধ সেই উদ্বেগকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পাকিস্তান ধারাবাহিক হামলা মেনে নিতে পারে না। আফগানিস্তান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন সহ্য করতে পারে না। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে যে ক্ষুদ্র পরিসর আছে, সেটিই কূটনীতির ক্ষেত্র।
যুদ্ধ প্রায়ই ‘অপরিহার্যতার’ ভাষায় শুরু হয়। কিন্তু শক্তি দিয়ে শতবর্ষের সীমান্ত বিতর্ক মীমাংসা হয় না। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি, দীর্ঘস্থায়ী সংলাপ এবং ইতিহাসের কঠিন অঙ্ক থেকে শিক্ষা নেওয়ার সদিচ্ছা। গতকালের প্রক্সি যে আগামীকালের বিপদ হতে পারে-এই স্বীকারোক্তিই হয়তো শান্তির প্রথম ধাপ।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
এম এ হোসাইন
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার বিস্ফোরণ কোনো আকস্মিক যুদ্ধ নয়; বরং বহুদিনের অমীমাংসিত এক বিরোধের পুনরুত্থান-সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব, জঙ্গিবাদ এবং ইতিহাসের বোঝা নিয়ে। এই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ ছিল নাটকীয়: বিমান হামলা, পাল্টা আক্রমণ, “উন্মুক্ত যুদ্ধ”-এর ঘোষণা। কিন্তু এর পেছনের যুক্তি বহু বছরের জমাট বাস্তবতার ফল।
গত ২১-২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আফগানিস্তানের নানগারহার, পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, লক্ষ্য ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আইএসআইএস-কে সংশ্লিষ্ট ঘাঁটি। তারা একে গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বলে বর্ণনা করে। কাবুলের বক্তব্য ভিন্ন-এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং এতে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান সীমান্ত চৌকিতে পাল্টা হামলা চালায়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আরও বিস্তৃত আকারে হামলা জোরদার করে এবং ‘অপারেশন গাজব লিল হক’-এর কথা উল্লেখ করে।
উভয় পক্ষই শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে, নিজেদের ক্ষতি অস্বীকার করছে। এখানে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রবণতা: গত বছর দোহায় মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের চুক্তিতে আঁকা ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন আজও আফগান রাজনৈতিক স্মৃতিতে বিতর্কিত। আর যে জঙ্গি নেটওয়ার্ক একসময় ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল, তা এখন কৌশলগত বোঝা।
পাকিস্তান কেন এত আক্রমণাত্মক হলো- এর উত্তর খুঁজতে হলে কাবুল নয়, ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখতে হবে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে পাকিস্তানে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা হয়: রাজধানীতে একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে বহু মানুষ নিহত; বাজাউরে সীমান্তঘেঁষা হামলা; বান্নুতে গোয়েন্দা অভিযানের সময় সেনা কর্মকর্তাদের মৃত্যু। এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে টিটিপি। পাকিস্তানের অভিযোগ, হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয় হয়েছে আফগান ভূখ- থেকে।
এখানেই নির্মম বিদ্রƒপ। দশকের পর দশক পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতির একটি অংশ ছিল জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আঞ্চলিক প্রভাবের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা-প্রথমে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে, পরে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্যে। কিন্তু ভূ-রাজনীতির নিজস্ব প্রতিক্রিয়া আছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ও তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পর টিটিপি নতুন আশ্রয় ও উৎসাহ পায়। একসময়ের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ এখন ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্লোব্যাক’।
ইসলামাবাদ আজ টিটিপিকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যা নয়, রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে। সংগঠনটির লক্ষ্য পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে; গত বছরের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়নি। তাই তাদের ভাষায়, ‘ধৈর্যের সীমা শেষ।’
কিন্তু ডুরান্ড লাইনের ওপারে শক্তির ভাষা খুব কমই কাক্সিক্ষত অনুবাদ পায়। আফগান তালেবান ডুরান্ড লাইনকে চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করে না। তারা টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে, যদিও আদর্শিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাস্তবতাকে জটিল করে। পাকিস্তান যাকে জঙ্গিঘাঁটি বলে আখ্যা দেয়, আফগান কর্তৃপক্ষ তাকে বেসামরিক গ্রাম বলে। উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক আইন ও জনমতের আদালতে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত।
ডুরান্ড লাইন শুধু মানচিত্রের রেখা নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত। আফগানদের কাছে এটি ঔপনিবেশিক বিভাজনের স্মারক, যা পশতুন জনগোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। পাকিস্তানের কাছে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত, যার অখ-তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিটি সীমান্ত লঙ্ঘন সেই ক্ষতকে উসকে দেয়; প্রতিটি জঙ্গি অনুপ্রবেশ অবিশ্বাস বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সতর্ক। জাতিসংঘ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে এবং বেসামরিক সুরক্ষার কথা বলেছে। কাতার, সৌদি আরব ও ইরান সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত পাকিস্তানের বিমান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত-তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ আছে, কিন্তু নতুন সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ কম।
এই সংযমের পেছনে বৈশ্বিক বাস্তবতা রয়েছে। ইউক্রেন, গাজা, দক্ষিণ চীন সাগর-বিশ্বের মনোযোগ বিভক্ত। আফগানিস্তান আর আগের মতো শিরোনামে নেই। কিন্তু উপেক্ষা মানেই গুরুত্বহীনতা নয়। পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে অস্থিরতা শরণার্থী স্রোত, উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বেসামরিক-সামরিক টানাপোড়েন-এমন প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক নিরাপত্তা ইস্যু জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি করতে পারে। সমালোচকরা বলেন, এতে নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে রাজনৈতিক হিসাব মিশে যায়। সমর্থকেরা বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিক ও সৈনিকদের ওপর হামলা উপেক্ষা করতে পারে না।
আফগান তালেবান নেতৃত্বও দ্বিধায়। তারা পাকিস্তানের চাপের কাছে নতি স্বীকারের ভাবমূর্তি চায় না। আবার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতও তাদের পক্ষে নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সীমিত; অর্থনীতি দুর্বল। দীর্ঘ সংঘাত তাদের বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে।
ইতিহাস সতর্ক করে। আশির দশকে সীমান্তবর্তী আশ্রয় আফগানিস্তানকে পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে পরিণত করেছিল। নব্বইয়ের গৃহযুদ্ধ আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতে রূপ নিয়েছিল। ২০০১-এর পর ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত দীর্ঘ যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছিল। প্রতিবারই স্বল্পমেয়াদি কৌশল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র তার ভূখ-ে সশস্ত্র হামলার মুখে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োজনীয়তা ও সামঞ্জস্যের নীতিতে আবদ্ধ। পাকিস্তানের বিমান হামলা কি ছিল শেষ উপায়, নাকি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ? এই প্রশ্নের উত্তরই কূটনৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করবে।
সমাধানের পথ সহজ নয়, কিন্তু অনুপস্থিতও নয়। প্রথমত, পাকিস্তানের মূল অভিযোগ-সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যক্রম নিরসনে বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া দরকার। যৌথ পর্যবেক্ষণ বা তৃতীয় পক্ষের যাচাই-কঠিন হলেও বিবেচনাযোগ্য। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত সহযোগিতা, যদিও রাজনৈতিক বিতর্ক অমীমাংসিত থাকে। তৃতীয়ত, বেসামরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কারণ প্রতিটি অনিচ্ছাকৃত হতাহত পরবর্তী আক্রমণের প্রচারণা হয়ে উঠে।
এই সপ্তাহের ট্র্যাজেডি হলো-উভয় পক্ষেরই বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ আছে, তবু অনিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধ সেই উদ্বেগকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পাকিস্তান ধারাবাহিক হামলা মেনে নিতে পারে না। আফগানিস্তান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন সহ্য করতে পারে না। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে যে ক্ষুদ্র পরিসর আছে, সেটিই কূটনীতির ক্ষেত্র।
যুদ্ধ প্রায়ই ‘অপরিহার্যতার’ ভাষায় শুরু হয়। কিন্তু শক্তি দিয়ে শতবর্ষের সীমান্ত বিতর্ক মীমাংসা হয় না। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি, দীর্ঘস্থায়ী সংলাপ এবং ইতিহাসের কঠিন অঙ্ক থেকে শিক্ষা নেওয়ার সদিচ্ছা। গতকালের প্রক্সি যে আগামীকালের বিপদ হতে পারে-এই স্বীকারোক্তিই হয়তো শান্তির প্রথম ধাপ।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]