alt

উপ-সম্পাদকীয়

দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল

সাকিলা পারভীন

: বুধবার, ২৮ এপ্রিল ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গোটা বিশ্ব আজ স্তম্ভিত। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির স্বীকার। বার বার ঘূর্ণিঝড়, বেড়িবাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় গ্রহণ করছে। খাদ্য সংকট, জীবিকার উৎস হ্রাস, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অপুষ্টি, রোগ ব্যাধি বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক সংকট উপকূলের মানুষকে গ্রাস করছে।

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার। যেটি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে এই অঞ্চলকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল, এই ১০ বছরের তুলনায় ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল, এই ১০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে ১০ গুণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অধিক বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূমিকম্প ইত্যাদির ফলে এই উপকূলের মানুষের খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, জীবিকার উৎস হ্রাস, অপুষ্টি এবং সুপেয় পানির অভাবে রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে অর্থনৈতিক সংকটও বেড়েছে।

জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ ভাগ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ ৫ কোটি মানুষ গৃহহীন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগর ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অধিক বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আর এ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেশিরভাগই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে ঘটে থাকে।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্ফান গত বছরের ২০ মে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের তথ্য মতে, আম্ফানের আঘাতে সাতক্ষীরায় মাছের ঘেরে ১৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকার, কৃষিতে মোট ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার, প্রাণিসম্পদে ৯৫ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি হয়। এই জেলায় ৮৩ হাজার ৪৩১টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়। জেলায় ৮১ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া সাড়ে ৫৬ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আম্ফানে প্রায় ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। আম্ফান পরবর্তী আগস্ট মাসে উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি প্রবেশ করে ক্ষতির মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে গভীর নিম্নচাপ থেকে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়ে বুলবুল। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বরে এই ঝড় হারিকেন ঝড়ের সমতুল্য শক্তি নিয়ে দেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা উপকূলীয় এলাকায়। হাজার হাজার বিঘা ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, গাছপালা ইত্যাদি ক্ষতির পাশাপাশি ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। একই বছরের ১২ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ফণী। ফণীর প্রভাবে উপকূল ছাড়াও অন্যান্য এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয় বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।

এছাড়া ২০০৯ সালে আইলা, ২০০৭ সালে সিডর, ২০১৬ সালের রোয়ানু, ২০১৫ সালের কোমেন, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০১৯ সালের বিজলী, ২০০৮ সালের রেশমী ইত্যাদি উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ উপকূলীয় এলাকায় অধিকাংশ ঘর বাড়ি মাটি, কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি। সেজন্য ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে টিকে থাকার মতো মজবুত নয়। এছাড়া আধাপাকা ও পাকা ঘরগুলোও পানিতে ডুবে যায়। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সংযোগ রাস্তাগুলো যথেষ্ট মজবুত নয়। বৃষ্টি হলেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিই নয়, এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকেও রক্ষা করে আসছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন আপন শক্তিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। ২০০ বছরে ৩০ বার বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো সামুদ্রিক দুর্যোগ আঘাত হানে সুন্দরবনের ওপর। এতে প্রচুর গাছপালা ধ্বংস হয়, বিপুলসংখ্যক বন্যপ্রাণীও মারা যায়। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদান অপরিসীম। দেশের অর্থনীতিতে এই সুন্দরবনের অবদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বছরে ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। এই বন থেকে জীবিকার মাধ্যমে বছরে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায়। এছাড়া কার্বন ক্রেডিটে সুন্দরবনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বন বিভাগের এক গবেষণায় জানা যায়, সুন্দরবন বছরে ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখে। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার অনুসারে এর মূল্য পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও সংস্কৃতিতেও সুন্দরবনের অনেক অবদান রয়েছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে একটি আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। এখানে জেলে, মৌয়ালদের জীবন অন্য পেশাজীবীদের মতো নয়। এছাড়া সুন্দরবন কেন্দ্রিক মানুষের জীবনও বৈচিত্র্যময়। অথচ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল এখন অরক্ষিত।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে উপকূলীয় এলাকা লোনা পানিতে ডুবে আছে। ৬০ এর দশকের ওয়াপদা বাঁধ এখন উপকূলের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার মানুষ তার সহায় সম্বল হারাচ্ছেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খাবার পানির অভাবে রোগ ব্যাধি বেড়ে গেছে। ১৯৯০ সালে দেশে লবণাক্ত ভূমির পরিমাণ ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর থাকলে ২০০১ সালে তা ৩০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও বার বার বাড়ি ঘর হারিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে প্রয়োজন নতুন বেড়িবাঁধ তৈরি, সুপেয় পানি নিশ্চিত করা এবং সুন্দরবনকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এসব দাবিতে উপকূলীয় এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ, সেমিনার, মানববন্ধন, সংলাপসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলকে দুর্যোক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলে যে সব সুবিধা পাওয়া যাবে তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ ওই অঞ্চলের ওপর সরকারের বিশেষ নজর থাকবে এবং বিশেষ বাজেট বরাদ্দ হবে। টেকসই বেড়িবাঁধের উদ্যোগ নেয়া হবে। এতে উপকূল সুরক্ষিত হবে। সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন প্রকল্প হবে। লবণাক্ততা দূরীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। সুন্দরবন রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাও উপকূলীয় অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। তাই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাকে দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।

[লেখক : সাংবাদিক ও পরিবেশ উন্নয়নকর্মী]

ই-কৃষি : কৃষকের মুখে হাসি

বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে চাই সচেতনতা

ছবি

বলাৎকার ও ধর্ষণ একই অপরাধের ভিন্ন সাজা কেন?

মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার ও নারী ইউএনও

পরিবেশ ছাড়পত্র কেন প্রয়োজন

হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর খাল

তিস্তার ডান তীরের মঙ্গা মোকাবিলায় করণীয়

ছবি

হিন্দু নারীর সমানাধিকারের দাবি

ছবি

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

ভূমিকম্প : প্রস্তুতি থাকলে মোকাবিলা করতে সুবিধা

মাগুরছড়ায় পরিবেশ-প্রতিবেশ হত্যার বিচার কি হবে না

ছবি

টিকা কখন

ছবি

সূর্যডিম

বাজেটে উপেক্ষিত আদিবাসীরা

ছবি

কোভিড-১৯ : ভ্যাকসিন তৈরি ও কর্মকৌশল

বাজেট ২০২১-২২

শিক্ষকদের বোবাকান্না

ছবি

তাদের আমি খুঁজে বেড়াই

ছবি

বাজেট কি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে

প্রান্তিক শিশুর মনোসামাজিক অবস্থা

শিক্ষা বাজেট : সংকট ও সম্ভাবনা

চোখ রাঙাচ্ছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট

উদ্যোক্তা উন্নয়নে চাই সামগ্রিক পরিকল্পনা

মাশরুম প্রকল্প কার জন্য?

হাফিজ হয়তো আগেই চলে গেছে

বনাখলা ও আগার খাসিপুঞ্জির ন্যায়বিচার

খাদেম ভিসা ও কিছু কথা

ব্যাংক ঋণ চাই

বাজেট কি গণমুখী

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

ছবি

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

পান গাছ না থাকলে খাসিয়ারা বাঁচবে কী করে

ছবি

ছয় দফা : জাতির মুক্তিসনদ

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

মধ্যবিত্তবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়ন কৌশল

tab

উপ-সম্পাদকীয়

দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল

সাকিলা পারভীন

বুধবার, ২৮ এপ্রিল ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গোটা বিশ্ব আজ স্তম্ভিত। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির স্বীকার। বার বার ঘূর্ণিঝড়, বেড়িবাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় গ্রহণ করছে। খাদ্য সংকট, জীবিকার উৎস হ্রাস, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অপুষ্টি, রোগ ব্যাধি বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক সংকট উপকূলের মানুষকে গ্রাস করছে।

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার। যেটি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে এই অঞ্চলকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল, এই ১০ বছরের তুলনায় ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল, এই ১০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে ১০ গুণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অধিক বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূমিকম্প ইত্যাদির ফলে এই উপকূলের মানুষের খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, জীবিকার উৎস হ্রাস, অপুষ্টি এবং সুপেয় পানির অভাবে রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে অর্থনৈতিক সংকটও বেড়েছে।

জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ ভাগ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ ৫ কোটি মানুষ গৃহহীন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগর ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অধিক বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আর এ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেশিরভাগই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে ঘটে থাকে।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্ফান গত বছরের ২০ মে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের তথ্য মতে, আম্ফানের আঘাতে সাতক্ষীরায় মাছের ঘেরে ১৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকার, কৃষিতে মোট ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার, প্রাণিসম্পদে ৯৫ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি হয়। এই জেলায় ৮৩ হাজার ৪৩১টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়। জেলায় ৮১ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া সাড়ে ৫৬ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আম্ফানে প্রায় ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। আম্ফান পরবর্তী আগস্ট মাসে উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি প্রবেশ করে ক্ষতির মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে গভীর নিম্নচাপ থেকে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়ে বুলবুল। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বরে এই ঝড় হারিকেন ঝড়ের সমতুল্য শক্তি নিয়ে দেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা উপকূলীয় এলাকায়। হাজার হাজার বিঘা ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, গাছপালা ইত্যাদি ক্ষতির পাশাপাশি ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। একই বছরের ১২ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ফণী। ফণীর প্রভাবে উপকূল ছাড়াও অন্যান্য এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয় বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।

এছাড়া ২০০৯ সালে আইলা, ২০০৭ সালে সিডর, ২০১৬ সালের রোয়ানু, ২০১৫ সালের কোমেন, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০১৯ সালের বিজলী, ২০০৮ সালের রেশমী ইত্যাদি উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ উপকূলীয় এলাকায় অধিকাংশ ঘর বাড়ি মাটি, কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি। সেজন্য ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে টিকে থাকার মতো মজবুত নয়। এছাড়া আধাপাকা ও পাকা ঘরগুলোও পানিতে ডুবে যায়। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সংযোগ রাস্তাগুলো যথেষ্ট মজবুত নয়। বৃষ্টি হলেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিই নয়, এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকেও রক্ষা করে আসছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন আপন শক্তিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। ২০০ বছরে ৩০ বার বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো সামুদ্রিক দুর্যোগ আঘাত হানে সুন্দরবনের ওপর। এতে প্রচুর গাছপালা ধ্বংস হয়, বিপুলসংখ্যক বন্যপ্রাণীও মারা যায়। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদান অপরিসীম। দেশের অর্থনীতিতে এই সুন্দরবনের অবদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বছরে ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। এই বন থেকে জীবিকার মাধ্যমে বছরে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায়। এছাড়া কার্বন ক্রেডিটে সুন্দরবনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বন বিভাগের এক গবেষণায় জানা যায়, সুন্দরবন বছরে ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখে। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার অনুসারে এর মূল্য পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও সংস্কৃতিতেও সুন্দরবনের অনেক অবদান রয়েছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে একটি আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। এখানে জেলে, মৌয়ালদের জীবন অন্য পেশাজীবীদের মতো নয়। এছাড়া সুন্দরবন কেন্দ্রিক মানুষের জীবনও বৈচিত্র্যময়। অথচ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল এখন অরক্ষিত।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে উপকূলীয় এলাকা লোনা পানিতে ডুবে আছে। ৬০ এর দশকের ওয়াপদা বাঁধ এখন উপকূলের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার মানুষ তার সহায় সম্বল হারাচ্ছেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খাবার পানির অভাবে রোগ ব্যাধি বেড়ে গেছে। ১৯৯০ সালে দেশে লবণাক্ত ভূমির পরিমাণ ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর থাকলে ২০০১ সালে তা ৩০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও বার বার বাড়ি ঘর হারিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে প্রয়োজন নতুন বেড়িবাঁধ তৈরি, সুপেয় পানি নিশ্চিত করা এবং সুন্দরবনকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এসব দাবিতে উপকূলীয় এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ, সেমিনার, মানববন্ধন, সংলাপসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলকে দুর্যোক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলে যে সব সুবিধা পাওয়া যাবে তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ ওই অঞ্চলের ওপর সরকারের বিশেষ নজর থাকবে এবং বিশেষ বাজেট বরাদ্দ হবে। টেকসই বেড়িবাঁধের উদ্যোগ নেয়া হবে। এতে উপকূল সুরক্ষিত হবে। সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন প্রকল্প হবে। লবণাক্ততা দূরীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। সুন্দরবন রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাও উপকূলীয় অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। তাই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাকে দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।

[লেখক : সাংবাদিক ও পরিবেশ উন্নয়নকর্মী]

back to top