alt

উপ-সম্পাদকীয়

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

মিথুশিলাক মুরমু

: রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর সংঘটিত গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর রক্তের দাগ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। এরই মধ্যে জানা গেছে যে, পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে রিকুইজিশন করা বিশাল সম্পত্তিতে এবার গড়ে তোলা হবে এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোন (ইপিজেড)। আদেশটি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ মে প্রস্তাবাকারে সরকারের কাছে প্রেরিত হয়েছিল যার স্মারক নং ০৫.৫৫.৩২০০.০২৩.১৬.০২৭.১৫-২৩৩ (৩)। তৎকালীন সরকার কিংবা বর্তমান সরকারও রিকুইজিশনের ধারাগুলোকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে সম্পত্তির একাংশকে স্থানীয় জনসাধারণের কাছে লিজ প্রদান করেছিল।

আদিবাসী সাঁওতালরা রিকুইজিশনের উল্লিখিত ধারাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এবং স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে লিজে নেয়া জমিগুলো উদ্ধার করে বসবাস ও চাষাবাদ করতে থাকে। তারপর আমরা দেখলাম, প্রশাসনের উপস্থিতিতে, প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সাঁওতাল গ্রামগুলোকে পোড়ানো হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে শ্যামল, মঙ্গল, রমেশদের। একের পর এক মামলায় জর্জরিত করে সাঁওতালদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। একদা সাঁওতাল সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বাগদা সরেন- এর নামেই অধিকৃত জায়গায়টি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামকরণ হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত ১৮৪০.৩০ একর জায়গায় অতীতে ১৫টি সাঁওতাল গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রামের উপস্থিতি ছিল। এছাড়াও অতিরিক্ত প্রায় ৬২২ একর জমি থেকে সাঁওতালদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। দেশে আদিবাসী সাঁওতালদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিসংখ্যান সত্যিই পিলে চমকে দেয়ার মতো। তিন প্রজন্মে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাড়ে তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজার মূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকেও অধিক। অধ্যাপক আবুল বারকাত গবেষণায় উল্লেখ করেছেন,

‘২০১৪ সালের মূল্যমানে ১০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ জমি-যাতি সমতল ভূমির আদিবাসীর হাত থেকে চলে গেছে অন্যের হতে। তার মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে ৫৩% হচ্ছে সাঁওতালদের।’

সমতলের ১০টি আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতালদের জমিই সবচেয়ে বেশি বেদখল হয়েছে। ২০০৭-১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সাঁওতালদের সঙ্গে ভূমি কেন্দ্রিক ৯০টি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৩০ জন আহত এবং ১৬ জন সাঁওতাল নিহত হয়েছেন। বর্তমানে আদিবাসীদের হতদরিদ্রের মধ্যেও সাঁওতালদের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮.৮ শতাংশ। জেলাগুলোর মধ্যে তৃতীয়তম হতদরিদ্র জেলা হচ্ছে সাঁওতাল অধ্যুষিত দিনাজপুর; আর আয় বৈষম্যের চতুর্থতম জেলা হচ্ছে নওগাঁ জেলা, যেখানে শত-সহস্র আদিবাসী সাঁওতালের বসবাস ।

গণমাধ্যমের বদৌলতে জানা যাচ্ছে, আদিবাসী সাঁওতালদের ১৮৪০.৩০ একর জমিতে ইপিজেড গড়ে তোলার ঘোষণায় জেলার রাজনৈতিক দলগুলো, প্রশাসনের কর্মকর্তাগুলো স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছে। শহরে আনন্দ মিছিল হয়েছে, মিষ্টিমুখ করে ঘোষণার প্রতি সহমত জানিয়েছে। আপনা থেকেই যেন মনে হয়েছে- সাঁওতালদের জায়গায় ইপিজেড নির্মাণ একটা অঘোষিত যুদ্ধে বিজয়লাভ। কিন্তু কেন এই আনন্দ মিছিল! আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, বাঙালিদের স্থানচ্যুততে কেন মিষ্টিমুখ! সত্যিই আমাদের নির্বাক করে তোলে। আমার দেশের সরকার বারংবারই আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে তাদের জায়গা-জমিতে সরকারি স্থাপনা, ইকোপার্ক, ইপিজেড নির্মাণ এবং একদা কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে হাজার হাজার আদিবাসী দেশান্তরিত হয়েছে। তাহলে কী সরকার আদিবাসী বান্ধব সরকার নয়! আদিবাসীদের ভাষা, দাবি-দাওয়ার প্লাকার্ড, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু সন্তানদের চোখের চাহনিতেও কী উচ্চ প্রশাসনের উপলব্ধি হচ্ছে না; আদিবাসীরা কতটা অসহায়, কতটা নিরাপত্তাহীন এবং আতঙ্কিত! সরকার কর্তৃক ঘোষণার পর শত শত আদিবাসী নারী-পুরুষরা প্রতিবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন; জীবনের শেষ অবলম্বনকে বাঁচাতে রাজপথকেই বেছে নিয়েছে। অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের অনুচ্ছেদগুলো উপস্থাপন করছে। চুক্তিপত্রে লেখা ছিল, ‘১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি রংপুর সুগার মিলের ইক্ষু ফার্ম করার জন্য দেয়া হলো। উক্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো অন্য ফসল উৎপাদিত হয়, তাহলে অধিগ্রহণকৃত ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট করপোরেশন সরকার বরাবর সারেন্ডার করবে। সরকার উক্ত সম্পত্তি গ্রহণ করে পূর্বের অবস্থায় ফেরত যেতে পারবেন।”

দেশের ১৬টি চিনিকলের মধ্যে রংপুর চিনিকল অন্যতম। ঘটনার সূত্রপাত ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে, রংপুর চিনিকলকে সরকার লে-অফ হিসেবে ঘোষণা করলে আদিবাসীরা পৈতৃক সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এ সময়কালে মিল ও খামারের সব কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। খামারের কৃষি যন্ত্রপাতিও অন্যান্য মিলকে দিয়ে দেয়া হয়। ফলে খামারের জমি পতিত না রেখে ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি ইজারা দেয়া হয়। ইজারা ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ইজারা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয় এবং মিল ব্যবস্থাপনার অধীনে খামারের জমি চাষাবাদ করা হয়। এ বছরগুলোতে আদিবাসীরা প্রশাসনের নজরে বিষয়টি এনেছে এবং জমি ফেরত পাবার জন্য আবেদন জানিয়েছে; আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরজমিনে উপস্থিত হয়ে তদন্ত কার্য পরিচালনা করেন। তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। তার সঙ্গে ওইদিন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সার্ভেয়ার উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করেছেন। জেলা প্রশাসক মহোদয় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করেছেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন জেলা প্রশাসক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন (স্মারক নং ০৫.৫৫.৩২০০.০৩০.০০.০০১.১৫-৪১), প্রতিবেদনটিতে আখ চাষ বাদে অন্য ফসল চাষের বিষয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল-শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ২৫/৮/২০০৯ তারিখের ১৮৭৪ নং বোর্ডসভার সিদ্ধান্তের আলোকে সাহেবগঞ্জ খামারের ১৫০২ একর জমিতে তারা আখ চাষের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল আবাদ করার জন্য জমি লিজ দিয়ে থাকে। জেলা প্রশাসক মহোদয় স্বচক্ষে দেখা কৃষিজ ফসলাদিতে পূর্ণ জমিকে বলেছেন ‘অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত’ হিসেবে। প্রশাসনের এহেন মিথ্যাচারে আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীরা চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন।

দেশের সংবিধানে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শিরোনাম ২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি শিরোনামের ২৩.ক- অনুচ্ছেদে বর্ণিত রয়েছে-‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এক্ষেত্রে অবলোকন করছি যে, বাংলাদেশে আদিবাসীরা বিলুপ্তির তালিকায় স্থান পাচ্ছে। পাটিগণিতের সহজ হিসাব মতে প্রতি ৪৫ বছরে কমছে ১৮টি। সেই হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রাখা বাদবাকী অদিবাসীর বিলুপ্তি হতে আরও ৬৫/৭০ বছর লাগার কথা।

কিন্তু গোবিন্দগঞ্জের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে আমরা ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে না পারলেও আদিবাসীদের উচ্ছেদ, বিলুপ্তের লক্ষ্যে পৌঁছে যাব। জাতীয় সংসদে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ পাস হয়েছে, তাদের সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু তাদেরই যদি রক্ষা করা না যায় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করে কি হবে!

দেশের অনেক উন্নয়ন যোদ্ধারা বলেছেন, ইপিজেড স্থাপিত হলে অনেক কর্মসংস্থান হবে অর্থাৎ আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীসহ অত্র এলাকার জনসাধারণের আয়-উন্নতি হবে। আদতে কী সেটি হতে পারে! সরকার আদিবাসীদের কোটা প্রথা বাতিল করেছেন অথচ তথ্য-উপাত্ততে দেখা যায়, সমগ্র উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র দেড় ডজন বিসিএস ক্যাডারের উপস্থিতিও নেই। স্বাধীনচেতা আদিবাসীরা কৃষি জমিতে ফসল উৎপাদনে যেভাবে শ্রমদান করে থাকেন; চার দেওয়ালে আবদ্ধ ও বিধিবদ্ধ নিয়মে স্থায়িত্বলাভ সম্ভবপর হবে কী না, সেটিও বড় গবেষণার বিষয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী আদিবাসীদের জীবনাচারণ পর্যালোচনা করা খুবই আবশ্যিক। নইলে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইতে পারে, অপরদিকে রাতের অন্ধকারে স্বাধীনচেতা আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীরা জনস্রোতে হারিয়ে যেতে পারে। হয়তোবা নিরবে নিভৃতে সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে আশ্রিত হবে নতুন জায়গায়, নতুন দেশে। এটি তো কোনো রূপকথা গল্প নয়, এটিই সত্যি, এটিই দেখে আসছি।

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

খসড়া আয়কর আইন নিয়ে কিছু কথা

তেল-গ্যাস সংকট : হাত বাড়াতে হবে সমুদ্রে

ইউপি নির্বাচন ও ইসির ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা পরিষদেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে

খেলার মাঠে পাকিস্তানপন্থার উল্লাস

পঞ্চাশের পাওয়া না-পাওয়া

ছবি

স্মরণ : লাল ঝান্ডা ও সম্পাদকের কলম

ছবি

স্মরণ : একজন সাহসী সম্পাদক

গ্লাসগো সম্মেলন থেকে কী মিলল?

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

মিথুশিলাক মুরমু

রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর সংঘটিত গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর রক্তের দাগ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। এরই মধ্যে জানা গেছে যে, পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে রিকুইজিশন করা বিশাল সম্পত্তিতে এবার গড়ে তোলা হবে এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোন (ইপিজেড)। আদেশটি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ মে প্রস্তাবাকারে সরকারের কাছে প্রেরিত হয়েছিল যার স্মারক নং ০৫.৫৫.৩২০০.০২৩.১৬.০২৭.১৫-২৩৩ (৩)। তৎকালীন সরকার কিংবা বর্তমান সরকারও রিকুইজিশনের ধারাগুলোকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে সম্পত্তির একাংশকে স্থানীয় জনসাধারণের কাছে লিজ প্রদান করেছিল।

আদিবাসী সাঁওতালরা রিকুইজিশনের উল্লিখিত ধারাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এবং স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে লিজে নেয়া জমিগুলো উদ্ধার করে বসবাস ও চাষাবাদ করতে থাকে। তারপর আমরা দেখলাম, প্রশাসনের উপস্থিতিতে, প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সাঁওতাল গ্রামগুলোকে পোড়ানো হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে শ্যামল, মঙ্গল, রমেশদের। একের পর এক মামলায় জর্জরিত করে সাঁওতালদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। একদা সাঁওতাল সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বাগদা সরেন- এর নামেই অধিকৃত জায়গায়টি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামকরণ হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত ১৮৪০.৩০ একর জায়গায় অতীতে ১৫টি সাঁওতাল গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রামের উপস্থিতি ছিল। এছাড়াও অতিরিক্ত প্রায় ৬২২ একর জমি থেকে সাঁওতালদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। দেশে আদিবাসী সাঁওতালদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিসংখ্যান সত্যিই পিলে চমকে দেয়ার মতো। তিন প্রজন্মে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাড়ে তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজার মূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকেও অধিক। অধ্যাপক আবুল বারকাত গবেষণায় উল্লেখ করেছেন,

‘২০১৪ সালের মূল্যমানে ১০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ জমি-যাতি সমতল ভূমির আদিবাসীর হাত থেকে চলে গেছে অন্যের হতে। তার মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে ৫৩% হচ্ছে সাঁওতালদের।’

সমতলের ১০টি আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতালদের জমিই সবচেয়ে বেশি বেদখল হয়েছে। ২০০৭-১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সাঁওতালদের সঙ্গে ভূমি কেন্দ্রিক ৯০টি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৩০ জন আহত এবং ১৬ জন সাঁওতাল নিহত হয়েছেন। বর্তমানে আদিবাসীদের হতদরিদ্রের মধ্যেও সাঁওতালদের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮.৮ শতাংশ। জেলাগুলোর মধ্যে তৃতীয়তম হতদরিদ্র জেলা হচ্ছে সাঁওতাল অধ্যুষিত দিনাজপুর; আর আয় বৈষম্যের চতুর্থতম জেলা হচ্ছে নওগাঁ জেলা, যেখানে শত-সহস্র আদিবাসী সাঁওতালের বসবাস ।

গণমাধ্যমের বদৌলতে জানা যাচ্ছে, আদিবাসী সাঁওতালদের ১৮৪০.৩০ একর জমিতে ইপিজেড গড়ে তোলার ঘোষণায় জেলার রাজনৈতিক দলগুলো, প্রশাসনের কর্মকর্তাগুলো স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছে। শহরে আনন্দ মিছিল হয়েছে, মিষ্টিমুখ করে ঘোষণার প্রতি সহমত জানিয়েছে। আপনা থেকেই যেন মনে হয়েছে- সাঁওতালদের জায়গায় ইপিজেড নির্মাণ একটা অঘোষিত যুদ্ধে বিজয়লাভ। কিন্তু কেন এই আনন্দ মিছিল! আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, বাঙালিদের স্থানচ্যুততে কেন মিষ্টিমুখ! সত্যিই আমাদের নির্বাক করে তোলে। আমার দেশের সরকার বারংবারই আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে তাদের জায়গা-জমিতে সরকারি স্থাপনা, ইকোপার্ক, ইপিজেড নির্মাণ এবং একদা কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে হাজার হাজার আদিবাসী দেশান্তরিত হয়েছে। তাহলে কী সরকার আদিবাসী বান্ধব সরকার নয়! আদিবাসীদের ভাষা, দাবি-দাওয়ার প্লাকার্ড, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু সন্তানদের চোখের চাহনিতেও কী উচ্চ প্রশাসনের উপলব্ধি হচ্ছে না; আদিবাসীরা কতটা অসহায়, কতটা নিরাপত্তাহীন এবং আতঙ্কিত! সরকার কর্তৃক ঘোষণার পর শত শত আদিবাসী নারী-পুরুষরা প্রতিবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন; জীবনের শেষ অবলম্বনকে বাঁচাতে রাজপথকেই বেছে নিয়েছে। অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের অনুচ্ছেদগুলো উপস্থাপন করছে। চুক্তিপত্রে লেখা ছিল, ‘১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি রংপুর সুগার মিলের ইক্ষু ফার্ম করার জন্য দেয়া হলো। উক্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো অন্য ফসল উৎপাদিত হয়, তাহলে অধিগ্রহণকৃত ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট করপোরেশন সরকার বরাবর সারেন্ডার করবে। সরকার উক্ত সম্পত্তি গ্রহণ করে পূর্বের অবস্থায় ফেরত যেতে পারবেন।”

দেশের ১৬টি চিনিকলের মধ্যে রংপুর চিনিকল অন্যতম। ঘটনার সূত্রপাত ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে, রংপুর চিনিকলকে সরকার লে-অফ হিসেবে ঘোষণা করলে আদিবাসীরা পৈতৃক সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এ সময়কালে মিল ও খামারের সব কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। খামারের কৃষি যন্ত্রপাতিও অন্যান্য মিলকে দিয়ে দেয়া হয়। ফলে খামারের জমি পতিত না রেখে ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি ইজারা দেয়া হয়। ইজারা ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ইজারা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয় এবং মিল ব্যবস্থাপনার অধীনে খামারের জমি চাষাবাদ করা হয়। এ বছরগুলোতে আদিবাসীরা প্রশাসনের নজরে বিষয়টি এনেছে এবং জমি ফেরত পাবার জন্য আবেদন জানিয়েছে; আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরজমিনে উপস্থিত হয়ে তদন্ত কার্য পরিচালনা করেন। তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। তার সঙ্গে ওইদিন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সার্ভেয়ার উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করেছেন। জেলা প্রশাসক মহোদয় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করেছেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন জেলা প্রশাসক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন (স্মারক নং ০৫.৫৫.৩২০০.০৩০.০০.০০১.১৫-৪১), প্রতিবেদনটিতে আখ চাষ বাদে অন্য ফসল চাষের বিষয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল-শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ২৫/৮/২০০৯ তারিখের ১৮৭৪ নং বোর্ডসভার সিদ্ধান্তের আলোকে সাহেবগঞ্জ খামারের ১৫০২ একর জমিতে তারা আখ চাষের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল আবাদ করার জন্য জমি লিজ দিয়ে থাকে। জেলা প্রশাসক মহোদয় স্বচক্ষে দেখা কৃষিজ ফসলাদিতে পূর্ণ জমিকে বলেছেন ‘অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত’ হিসেবে। প্রশাসনের এহেন মিথ্যাচারে আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীরা চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন।

দেশের সংবিধানে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শিরোনাম ২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি শিরোনামের ২৩.ক- অনুচ্ছেদে বর্ণিত রয়েছে-‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এক্ষেত্রে অবলোকন করছি যে, বাংলাদেশে আদিবাসীরা বিলুপ্তির তালিকায় স্থান পাচ্ছে। পাটিগণিতের সহজ হিসাব মতে প্রতি ৪৫ বছরে কমছে ১৮টি। সেই হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রাখা বাদবাকী অদিবাসীর বিলুপ্তি হতে আরও ৬৫/৭০ বছর লাগার কথা।

কিন্তু গোবিন্দগঞ্জের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে আমরা ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে না পারলেও আদিবাসীদের উচ্ছেদ, বিলুপ্তের লক্ষ্যে পৌঁছে যাব। জাতীয় সংসদে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ পাস হয়েছে, তাদের সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু তাদেরই যদি রক্ষা করা না যায় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করে কি হবে!

দেশের অনেক উন্নয়ন যোদ্ধারা বলেছেন, ইপিজেড স্থাপিত হলে অনেক কর্মসংস্থান হবে অর্থাৎ আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীসহ অত্র এলাকার জনসাধারণের আয়-উন্নতি হবে। আদতে কী সেটি হতে পারে! সরকার আদিবাসীদের কোটা প্রথা বাতিল করেছেন অথচ তথ্য-উপাত্ততে দেখা যায়, সমগ্র উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র দেড় ডজন বিসিএস ক্যাডারের উপস্থিতিও নেই। স্বাধীনচেতা আদিবাসীরা কৃষি জমিতে ফসল উৎপাদনে যেভাবে শ্রমদান করে থাকেন; চার দেওয়ালে আবদ্ধ ও বিধিবদ্ধ নিয়মে স্থায়িত্বলাভ সম্ভবপর হবে কী না, সেটিও বড় গবেষণার বিষয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী আদিবাসীদের জীবনাচারণ পর্যালোচনা করা খুবই আবশ্যিক। নইলে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইতে পারে, অপরদিকে রাতের অন্ধকারে স্বাধীনচেতা আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালীরা জনস্রোতে হারিয়ে যেতে পারে। হয়তোবা নিরবে নিভৃতে সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে আশ্রিত হবে নতুন জায়গায়, নতুন দেশে। এটি তো কোনো রূপকথা গল্প নয়, এটিই সত্যি, এটিই দেখে আসছি।

back to top