alt

উপ-সম্পাদকীয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লিভার সিরোসিস হয়েছে বলে তার চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিকেল বোর্ড অবহিত করেছে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ভারতীয় উপমহাদেশে নেই মর্মেও মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, তার শরীরে ইতোমধ্যে কয়েকবার ব্লিডিং হয়েছে এবং প্রতিবার ব্লিডিং বন্ধ করা সম্ভব হলেও ব্লিডিং আবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার মতো সাপোর্টিভ প্রযুক্তি আমাদের দেশে নেই; এই প্রযুক্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে। আবারও ব্লিডিং হয়েছে বলে পরে বিএনপির মহাসচিব অবহিত করেছেন।

খালেদা জিয়ার আরও নানাবিধ রোগ থাকায় লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা সহজ হচ্ছে না; ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ছাড়াও হিমোগ্লোবিন কমে যায়, অন্যদিকে কোলনে রক্ত জমাট বেঁধে থাকায় কোলনোস্কোপি করার সময় রক্তক্ষরণের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো না হলে সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করার দাবি জানিয়ে বেশ কয়েকদিন যাবত বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিএনপি। দলটির কোন কোন নেতার বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়ার কিছু হয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক নম্বর আসামি হবেন। এটা ধর্মে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির কথা হতে পারে না, ডাক্তারদের উল্লিখিত তিনটি দেশেও লিভার সিরোসিসে লোক মারা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেকের অভিমত হচ্ছে, বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, তাই বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন জমিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি খালেদা জিয়ার অসুস্থতার আবেগময় ইস্যুতে আন্দোলনে তীব্রতা আনার চেষ্টা করছে। ইস্যুটি মানবিক হওয়ায় সরকারও বিএনপির আন্দোলন আগের মতো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করছে না; এই পরিস্থিতে বিএনপির কর্মসূচিতে তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কর্মী, সমর্থকদের রাস্তায় দেখে নেতারাও উৎসাহিত, সরকার পতনের বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে তারা খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে অন্যতম প্রধান ইস্যু করতে চায়।

খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিচ্ছেন বেসরকারি ‘এভারকেয়ার’ হাসপাতালে। এক সময় খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে সরকার এবং বিএনপির মধ্যে প্রচুর বাগবিতন্ডা হয়েছিল; সরকার বলত, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সরকারি যে কোন হাসপাতালে হোক, কিন্তু বিএনপি তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চেয়েছিল। এবার যখন খালেদা জিয়া নিজস্ব সিদ্ধান্তে দেশের যে কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার স্বাধীনতা পেলেন তখন তাকে আর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হলো না। এভারকেয়ার নিশ্চয়ই বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের কাছে মানসম্পন্ন বিবেচিত হয়েছে; তাহলে তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডে এভারকেয়ারের কোন চিকিৎসককে দেখা গেল না কেন? যে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার লিভার সিরোসিসের খবর দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অপরিহার্যতা উল্লেখ করা হয় সেই সংবাদ সম্মেলনে এভারকেয়ারের কোন চিকিৎসক ছিলেন না। এ কারণেই একজন মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ড বিএনপির শেখানো বুলি উচ্চারণ করে গেছে।

লিভার সিরোসিস একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ; আক্রান্ত হওয়ার পর নমনীয়তা এবং স্থিতিশীলতা কমতে কমতে লিভার কঠিন হয়ে যায়। লিভারের ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন ছাড়া এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা যায় না। হেপাটাইটিস বি, সি প্রভৃতি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লিভারে সিরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে লিভারে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমলেও লিভার সিরোসিস হতে পারে। যারা শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করে না তাদের লিভারে চর্বি জমে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অতিরিক্ত আয়রন, রক্তে অতিরিক্ত কোলোস্টেরল থাকলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান থেকেও লিভার সিরোসিস হয়। রোগীর খাদ্যনালির ভেতরে রক্তপাত হলে তা লিভারের খারাপ অবস্থা নির্দেশ করে; এ ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপন একমাত্র চিকিৎসা। লিভার সিরোসিস থেকে লিভারের ক্যানসার হতে পারে। তবে লিভার একটি শক্তিশালী অঙ্গ, ১২% সুস্থ লিভার নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, তবে তা ঝুঁকিপূর্ণ। বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চন ৭৫% নষ্ট লিভার নিয়ে ১৯৮২ সন থেকে বেঁচে আছেন। লিভার ট্রান্সপ্লান্টে কোন একজন সুস্থ ব্যক্তির লিভারের কিয়দংশ কেটে নিয়ে রোগীর লিভারে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এই কিয়দংশ লিভার নিয়ে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিস প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না; এই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর ওষুধের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন বেশি জরুরি। লিভার সিরোসিস রোগীকে অবশ্যই অ্যালকোহল ছাড়তে হবে। বাংলাদেশে লিভার বা যকৃতের চিকিৎসা হচ্ছে, আমাদের অনেক অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী চিকিৎসক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ক্ষেত্রে বেশ সুনামও অর্জন করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে লিভারের প্রতিস্থাপন সম্ভব হলেও স্পর্শকাতর এই প্রতিস্থাপনে ধনী ব্যক্তিরা ভরসা পান না, এক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী রোগী ভারত, শ্রীলঙ্কা বা সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। সামর্থ্য থাকলে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও রোগী ছুটছে ভারত আর থাইল্যান্ডে, তাই লিভারের অনিরাময়যোগ্য চিকিৎসা বাংলাদেশে করাতে কেউ চাইবে না। শুধু ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তিরা নন, রাজনীতিবিদদেরও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা নেই। বিএনপি বহু বছর ক্ষমতায় ছিল, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়- জেলখানার মতো স্বাস্থ্য খাতও দুর্নীতির কারণে ভগ্নদশা থেকে উঠতে পারল না। লজ্জার বিষয় হচ্ছে, উন্নত চিকিৎসাসেবা দেশে নেই, এমন উদ্ভট কথা ডাক্তারের মুখ থেকে বের হচ্ছে। দেশে অসংখ্য লিভার সিরোসিসের রোগী রয়েছে, তাদের চিকিৎসা তো দেশেই হচ্ছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করতে সমর্থ হনÑতখনকার ভূমিকার জন্য তাকে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তার সব কয়টিতেই তিনি জয়লাভ করেছেন; জীবনের প্রথম নির্বাচনেই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন। অবশ্য প্রেসিডেন্ট এরশাদও পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেছিলেন। বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে রাজনীতি করেও তিনি তার রুচি নিয়ে কখনও আপোষ করেননি, নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি শত কটু কথায়ও বিচলিত হননি। তিনি বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী; পুরুষের নেতৃত্ব নারীর ওপর অর্পিত হওয়ায় ধর্মান্ধরা ক্ষেপেছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী খালেদা জিয়াকে বরণ করতে তাদের অসুবিধা হয়নি; এই সুযোগে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে আপোষ করলেও আমাদের দুই মহিলা প্রধানমন্ত্রীর কেউই ভোটের জন্য বোরকা বা হিজাব পরেননি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত। ফৌজাদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় ন্যাস্ত ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনার সরকার তাদের নির্বাহী আদেশে ১৭ বছরের জেল-সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে বাসায় থাকার অনুমতি দিয়েছে। আইনমন্ত্রী বলছেন, সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে যে ধারায় যে আবেদনের ভিত্তিতে একবার সুযোগ দেয়া হয়েছে সেই একই ধারায় একই আবেদনে আবার সুযোগ দেয়ার সুযোগ নেই; সুযোগ নিতে হলে তাকে আবার জেলে গিয়ে পুনরায় আবেদন করতে হবে। আবার অন্য মন্ত্রী বলছেন, উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়া আপিল করেছেন, জামিন বা মুক্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর এক্তিয়ার শুধু আদালতেরই রয়েছে। তবে শাস্তি মওকুফ করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে প্রেসিডেন্টের হাতে, খালেদা জিয়া বা তার পরিবারের কোন সদস্য প্রেসিডেন্টের কাছে এখনও কোন আবেদন করেননি। তবে শাস্তি স্থগিত অবস্থায় সরকার বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিলেও সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে; কারণ শাস্তি বহাল থাকা অবস্থায় ভিসা নাও দিতে পারে। তাই বিদেশে পাঠাতে হলে স্থগিত দন্ড মওকুফ করার প্রয়োজন হতে পারে।

কোন কোন মন্ত্রী বলছেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ২০০৪ সনের ২১ আগস্টে বোমা হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী যতটুকু মানবিকতা দেখানোর দরকার ততটুকু দেখিয়েছেন, আর নয়। এটাও সত্য যে, সাজাপ্রাপ্ত আসামির দন্ড স্থগিতের কোন নজির এর আগে ছিল না। অবশ্য বিএনপি এই শাস্তিকে কখনও মেনে নেয়নি; তারা মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা দুদকের মামলা এবং বর্তমান সরকারের আমলে প্রদত্ত শাস্তি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ‘অবৈধ সরকারের সাজানো নাটক’। রাজনীতিবিদদের লাজলজ্জা নেই; একদল আরেক দলকে সাজানো নাটকের কিসসা শোনায়। আগস্টের গ্রেনেড হামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য ‘জজমিয়ার সাজানো নাটক’ তো বিএনপির আমলেই হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য, বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য বিএনপি তাদের কথিত ‘অবৈধ সরকারের’ কাছেই বারবার দাবি করছে। যে আইনে শাস্তি মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি করা হচ্ছে, সেই আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা তো ‘অবৈধ সরকারের’ থাকার কথা নয়। আমরা রাজনীতির দ্বিচারিতায় যাব না, আমরা চাই সরকারের সুবিবেচনায় বা আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দুইবারের বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া মুক্তি পাক, চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো হোক, তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন এবং দীর্ঘজীবী হোন।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedzeauddin0@gmail.com

প্রিয়জন হারানোর বেদনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয়েছেটা কী

ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অন্যতম কারণ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন চাই

বাংলাদেশ-রাশিয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

মুজিববর্ষে আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে হবে মূল লক্ষ্য

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা : এখনও অনেক কাজ বাকি

ছবি

নাসিক নির্বাচন কি বার্তা দিচ্ছে?

ছবি

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো

ছবি

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমাদের জীবন, আমাদের সন্তান

সমাজে বিভক্তির ফাটল

ভারতে মুসলমানের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক অবহেলা

প্রসঙ্গ তালাকের নোটিশ

কীভাবে অজান্তেই ধনী হয়ে উঠছি

নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত কল্যাণ হবে না

ননএমপিও : অবসান হোক এ অসহ রাত্রির

ছবি

কখন ও কেমন হবে করোনার শেষটা

ছবি

‘বিদ্রোহী’ ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ

আস্থাহীনতা কেন চিন্তাহীনতার জন্ম দেয়?

কৃষির রূপান্তর : প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিও আছে

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আধুনিকায়ন ও প্রত্যাশা

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

“অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু”

নতুন কপিরাইট আইনের খসড়া

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর অংশগ্রহণ

গণমাধ্যমের শিরদাঁড়া

এনসিটিবিতে হচ্ছেটা কী?

করোনায় সৃষ্ট মনোজগতের বিচ্ছিন্নতা

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

ছবি

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

ছবি

উড়বে ঘুড়ি, পুড়বে আতশবাজি

স্বজন হত্যার বিচারের অপেক্ষায় এক মানুষ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লিভার সিরোসিস হয়েছে বলে তার চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিকেল বোর্ড অবহিত করেছে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ভারতীয় উপমহাদেশে নেই মর্মেও মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, তার শরীরে ইতোমধ্যে কয়েকবার ব্লিডিং হয়েছে এবং প্রতিবার ব্লিডিং বন্ধ করা সম্ভব হলেও ব্লিডিং আবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার মতো সাপোর্টিভ প্রযুক্তি আমাদের দেশে নেই; এই প্রযুক্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে। আবারও ব্লিডিং হয়েছে বলে পরে বিএনপির মহাসচিব অবহিত করেছেন।

খালেদা জিয়ার আরও নানাবিধ রোগ থাকায় লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা সহজ হচ্ছে না; ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ছাড়াও হিমোগ্লোবিন কমে যায়, অন্যদিকে কোলনে রক্ত জমাট বেঁধে থাকায় কোলনোস্কোপি করার সময় রক্তক্ষরণের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো না হলে সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করার দাবি জানিয়ে বেশ কয়েকদিন যাবত বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিএনপি। দলটির কোন কোন নেতার বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়ার কিছু হয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক নম্বর আসামি হবেন। এটা ধর্মে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির কথা হতে পারে না, ডাক্তারদের উল্লিখিত তিনটি দেশেও লিভার সিরোসিসে লোক মারা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেকের অভিমত হচ্ছে, বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, তাই বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন জমিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি খালেদা জিয়ার অসুস্থতার আবেগময় ইস্যুতে আন্দোলনে তীব্রতা আনার চেষ্টা করছে। ইস্যুটি মানবিক হওয়ায় সরকারও বিএনপির আন্দোলন আগের মতো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করছে না; এই পরিস্থিতে বিএনপির কর্মসূচিতে তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কর্মী, সমর্থকদের রাস্তায় দেখে নেতারাও উৎসাহিত, সরকার পতনের বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে তারা খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে অন্যতম প্রধান ইস্যু করতে চায়।

খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিচ্ছেন বেসরকারি ‘এভারকেয়ার’ হাসপাতালে। এক সময় খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে সরকার এবং বিএনপির মধ্যে প্রচুর বাগবিতন্ডা হয়েছিল; সরকার বলত, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সরকারি যে কোন হাসপাতালে হোক, কিন্তু বিএনপি তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চেয়েছিল। এবার যখন খালেদা জিয়া নিজস্ব সিদ্ধান্তে দেশের যে কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার স্বাধীনতা পেলেন তখন তাকে আর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হলো না। এভারকেয়ার নিশ্চয়ই বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের কাছে মানসম্পন্ন বিবেচিত হয়েছে; তাহলে তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডে এভারকেয়ারের কোন চিকিৎসককে দেখা গেল না কেন? যে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার লিভার সিরোসিসের খবর দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অপরিহার্যতা উল্লেখ করা হয় সেই সংবাদ সম্মেলনে এভারকেয়ারের কোন চিকিৎসক ছিলেন না। এ কারণেই একজন মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ড বিএনপির শেখানো বুলি উচ্চারণ করে গেছে।

লিভার সিরোসিস একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ; আক্রান্ত হওয়ার পর নমনীয়তা এবং স্থিতিশীলতা কমতে কমতে লিভার কঠিন হয়ে যায়। লিভারের ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন ছাড়া এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা যায় না। হেপাটাইটিস বি, সি প্রভৃতি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লিভারে সিরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে লিভারে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমলেও লিভার সিরোসিস হতে পারে। যারা শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করে না তাদের লিভারে চর্বি জমে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অতিরিক্ত আয়রন, রক্তে অতিরিক্ত কোলোস্টেরল থাকলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান থেকেও লিভার সিরোসিস হয়। রোগীর খাদ্যনালির ভেতরে রক্তপাত হলে তা লিভারের খারাপ অবস্থা নির্দেশ করে; এ ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপন একমাত্র চিকিৎসা। লিভার সিরোসিস থেকে লিভারের ক্যানসার হতে পারে। তবে লিভার একটি শক্তিশালী অঙ্গ, ১২% সুস্থ লিভার নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, তবে তা ঝুঁকিপূর্ণ। বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চন ৭৫% নষ্ট লিভার নিয়ে ১৯৮২ সন থেকে বেঁচে আছেন। লিভার ট্রান্সপ্লান্টে কোন একজন সুস্থ ব্যক্তির লিভারের কিয়দংশ কেটে নিয়ে রোগীর লিভারে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এই কিয়দংশ লিভার নিয়ে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিস প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না; এই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর ওষুধের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন বেশি জরুরি। লিভার সিরোসিস রোগীকে অবশ্যই অ্যালকোহল ছাড়তে হবে। বাংলাদেশে লিভার বা যকৃতের চিকিৎসা হচ্ছে, আমাদের অনেক অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী চিকিৎসক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ক্ষেত্রে বেশ সুনামও অর্জন করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে লিভারের প্রতিস্থাপন সম্ভব হলেও স্পর্শকাতর এই প্রতিস্থাপনে ধনী ব্যক্তিরা ভরসা পান না, এক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী রোগী ভারত, শ্রীলঙ্কা বা সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। সামর্থ্য থাকলে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও রোগী ছুটছে ভারত আর থাইল্যান্ডে, তাই লিভারের অনিরাময়যোগ্য চিকিৎসা বাংলাদেশে করাতে কেউ চাইবে না। শুধু ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তিরা নন, রাজনীতিবিদদেরও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা নেই। বিএনপি বহু বছর ক্ষমতায় ছিল, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়- জেলখানার মতো স্বাস্থ্য খাতও দুর্নীতির কারণে ভগ্নদশা থেকে উঠতে পারল না। লজ্জার বিষয় হচ্ছে, উন্নত চিকিৎসাসেবা দেশে নেই, এমন উদ্ভট কথা ডাক্তারের মুখ থেকে বের হচ্ছে। দেশে অসংখ্য লিভার সিরোসিসের রোগী রয়েছে, তাদের চিকিৎসা তো দেশেই হচ্ছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করতে সমর্থ হনÑতখনকার ভূমিকার জন্য তাকে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তার সব কয়টিতেই তিনি জয়লাভ করেছেন; জীবনের প্রথম নির্বাচনেই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন। অবশ্য প্রেসিডেন্ট এরশাদও পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেছিলেন। বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে রাজনীতি করেও তিনি তার রুচি নিয়ে কখনও আপোষ করেননি, নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি শত কটু কথায়ও বিচলিত হননি। তিনি বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী; পুরুষের নেতৃত্ব নারীর ওপর অর্পিত হওয়ায় ধর্মান্ধরা ক্ষেপেছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী খালেদা জিয়াকে বরণ করতে তাদের অসুবিধা হয়নি; এই সুযোগে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে আপোষ করলেও আমাদের দুই মহিলা প্রধানমন্ত্রীর কেউই ভোটের জন্য বোরকা বা হিজাব পরেননি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত। ফৌজাদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় ন্যাস্ত ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনার সরকার তাদের নির্বাহী আদেশে ১৭ বছরের জেল-সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে বাসায় থাকার অনুমতি দিয়েছে। আইনমন্ত্রী বলছেন, সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে যে ধারায় যে আবেদনের ভিত্তিতে একবার সুযোগ দেয়া হয়েছে সেই একই ধারায় একই আবেদনে আবার সুযোগ দেয়ার সুযোগ নেই; সুযোগ নিতে হলে তাকে আবার জেলে গিয়ে পুনরায় আবেদন করতে হবে। আবার অন্য মন্ত্রী বলছেন, উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়া আপিল করেছেন, জামিন বা মুক্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর এক্তিয়ার শুধু আদালতেরই রয়েছে। তবে শাস্তি মওকুফ করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে প্রেসিডেন্টের হাতে, খালেদা জিয়া বা তার পরিবারের কোন সদস্য প্রেসিডেন্টের কাছে এখনও কোন আবেদন করেননি। তবে শাস্তি স্থগিত অবস্থায় সরকার বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিলেও সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে; কারণ শাস্তি বহাল থাকা অবস্থায় ভিসা নাও দিতে পারে। তাই বিদেশে পাঠাতে হলে স্থগিত দন্ড মওকুফ করার প্রয়োজন হতে পারে।

কোন কোন মন্ত্রী বলছেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ২০০৪ সনের ২১ আগস্টে বোমা হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী যতটুকু মানবিকতা দেখানোর দরকার ততটুকু দেখিয়েছেন, আর নয়। এটাও সত্য যে, সাজাপ্রাপ্ত আসামির দন্ড স্থগিতের কোন নজির এর আগে ছিল না। অবশ্য বিএনপি এই শাস্তিকে কখনও মেনে নেয়নি; তারা মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা দুদকের মামলা এবং বর্তমান সরকারের আমলে প্রদত্ত শাস্তি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ‘অবৈধ সরকারের সাজানো নাটক’। রাজনীতিবিদদের লাজলজ্জা নেই; একদল আরেক দলকে সাজানো নাটকের কিসসা শোনায়। আগস্টের গ্রেনেড হামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য ‘জজমিয়ার সাজানো নাটক’ তো বিএনপির আমলেই হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য, বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য বিএনপি তাদের কথিত ‘অবৈধ সরকারের’ কাছেই বারবার দাবি করছে। যে আইনে শাস্তি মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি করা হচ্ছে, সেই আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা তো ‘অবৈধ সরকারের’ থাকার কথা নয়। আমরা রাজনীতির দ্বিচারিতায় যাব না, আমরা চাই সরকারের সুবিবেচনায় বা আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দুইবারের বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া মুক্তি পাক, চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো হোক, তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন এবং দীর্ঘজীবী হোন।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedzeauddin0@gmail.com

back to top