alt

উপ-সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

মোস্তাফা জব্বার

: সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২

তিন॥

আমরা ছাত্র ইউনিয়নকে হারমোনিয়াম পার্টি বলতাম। খসরু-মন্টু-সেলিম তখন ছাত্রলীগের পেশিশক্তির প্রতীক। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের হুলিয়া ছিল। কিন্তু তারা ক্যাম্পাসে-বিশেষত জহুর হলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন। ওদেরকেও কাউকে কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি। বরং আমরা তাদের সবারই খুবই ¯েœহভাজন ছিলাম। আমাদের ব্যাচের ছেলেরা বেশিরভাগই ছাত্রলীগ করতাম। আমি স্মরণ করতে পারি ছাত্রলীগের মাত্র দু’জন সক্রিয় মহিলা কর্মী ছিলেন। একজন কুমিল্লার মমতাজ আপা, অন্যজন ঢাকার রোকেয়া। মমতাজ আপা মোটাসোটা ছিলেন। তার গায়ের রঙ ছিল কালো; আফ্রিকানদের মতো। রোকেয়ার মুখে ছিল বসন্তের দাগ। বোঝা যায় যে দু’জনেই দেখাশোনায় তেমন সুন্দরী ছিলেন না। আমাদের সবার চাইতে বয়ষ্ক মনে করে আমরা মমতাজ বেগমকে আপা ডাকতাম। রোকেয়ার মুখশ্রী সুন্দর ছিল। তবে মুখে বসন্তের দাগ ছিল বলে কেউ তার পেছনে প্রেম করার জন্য ঘুরাঘুরি করতো না। ফলে ছাত্রলীগের মিটিং-মিছিল মানেই ছিলেন তারা দু’জন। মেয়েদের একটি ছোট দলের নেত্রী ছিল ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী রোকসানা সুলতানা সানু, শিরি ও তাদের আরেক বান্ধবী। তারাও আমাদের সমর্থন দিতেন। বিভাগে সামগ্রিকভাবে ছাত্রলীগের অবস্থান ভালো ছিল না। ফলে আমি একবার বিভাগীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে গিয়ে ৬ ভোটে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীর কাছে হেরে যাই। তেমন একটি সময়ে আমাদের সহপাঠিনী রোকেয়া একদিন দোতালার বাংলা বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন যে একজন মহিলা আসছেন যার চেহারাটা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মিলে যায়। তার হাসিভরা মুখ। গলায় স্বর্ণের চেন এবং হাতে আংটি। এমনিতেই হৈচৈ করা রোকেয়া এই দৃশ্য দেখে পুরো বিভাগ মাতিয়ে ফেললেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ওই যে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা। আমরা তখনও ভাবিনি যে তিনি কলাভবনের দোতালাতেই আসছেন। তিনি দোতালায় ওঠলেন এবং সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার এবং বাংলা বিভাগের ৬৮ ব্যাচের পরিচয় সেদিন থেকে। এরপর তিনি বিভাগের রাজনীতিতে সিরিয়াস হন এবং আমাদের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবুও আমরা বিভাগীয় নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের কাছে হেরে যাই। আমার কাছে তখন বিস্ময়কর মনে হতো যে শেখ হাসিনা সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মতো ছাত্র ইউনিয়নের ঘাঁটিতে জিতেছিলেন কেমন করে। আমাদের ব্যাখ্যা যথার্থ ছিল যে তার বিজয়ের পেছনে ছাত্রলীগ কাজ করেনি- কাজ করেছে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা।

আমাদের সহপাঠী-সহপাঠিনী যারা লেখাপড়ায় খুব সিরিয়াস তারা ৭০-এর আগস্ট থেকেই নিয়মিত তৃতীয় বর্ষের ক্লাস করতে থাকেন। আমরা যারা রাজপথ, জহুর হল, মধুর ক্যান্টিন এসব জায়গায় সময় কাটাতাম তারা মাঝে মধ্যে কলাভবনের দোতালায় বাংলা বিভাগের বারান্দা দিয়ে হাটাহাটি করতাম। কোন কোন প্রিয় শিক্ষকের ক্লাসও করতাম। আমি স্মরণ করতে পারি না যে, শেখ হাসিনা নিয়মিত সবগুলো ক্লাসে বসে ক্লাস করছেন। তবে কলাভবনের দোতালার বারান্দায় তাকে নিয়মিত দেখা যেতো। রাজনীতি করতেন সবচেয়ে বেশি। ধীরে ধীরে আমরা জানতে পারি যে তিনি বিবাহিতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে তিনি মেয়েদের কলেজ মাতিয়ে এসেছেন। বাংলা বিভাগে আমাদের ব্যাচে তার যুক্ত হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত হলাম। বিশেষ করে ছেলেদের ছাত্রলীগ করা আর মেয়েদের ছাত্রলীগ করার ভারসাম্যটা আমরা পাব তেমন প্রত্যাশা আমাদের ছিল। তিনি আসার পরে আমাদের বিভাগে একটি নির্বাচন হয়। কিন্তু আমরা তাতেও হারি। আমাদের তখন ধারণা বাংলা বিভাগে ছাত্রলীগ কোনদিন জিতবে না। তবে আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এটুকু স্মরণ করতে পারি যে বাংলা বিভাগের শেখ হাসিনা অতি সাধারণ বাঙালি ঘরের বধূ-কন্যা হিসেবে পুরো বিভাগের জন্য একটি দৃষ্টান্ত ছিলেন। ৭০ সালে বঙ্গবন্ধু দেশের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু শেখ হাসিনা যে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে সেটি আমরা টেরই পেতাম না। টাঙ্গাইলের তাতের শাড়ি পরে আসতেন। গায়ে গয়নার কোন চিহ্ন দেখতাম না। আর পুরো বিভাগ জুড়ে আড্ডা দিতেন অতি সাধারণ ছাত্রীর মতো। আমাদের ব্যাচের জন্য শেখ হাসিনাকে সহপাঠিনী হিসেবে পাওয়াটা কেবল অপ্রত্যাশিতই ছিল না গৌরবেরও ছিল। তবে একটি মজার বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি তিনি যখন রাজনীতিতে আসেন বা সরকার গঠন করেন তখন আমাদের ব্যাচের ছাত্রলীগ করতো তেমন কাউকে প্রবলভাবে তার আশপাশে দেখা যায়নি। এটারও একটা কারণ আছে। মমতাজ ও রোকেয়া ৭২ সালের পর জাসদ করা শুরু করে। বরং আমাদের ব্যাচেরই যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতো বা আমাদের সিনিয়র যারা তার সঙ্গে পড়াশোনা করতেন তাদেরও বেশিরভাগ তৎকালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন। এটি সম্ভবত এজন্য যে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাকে তিনি কখনও ছোট করে দেখতেন না।

সত্তুর সালের প্রেক্ষিতটি সবারই জানা এবং আমরা যারা তখন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম এবং যাদের শেকড় গ্রামে ছিল তারা সবাই সত্তুরের নির্বাচনের জন্য গ্রামে চলে যাই। আমার নিজের গ্রামে যাওয়াটা একেবারেই লড়াই করা ছিল। কারণ আমার থানায় তখন আওয়ামী লীগ বলতে তেমন বড় কোন সংগঠন ছিল না। খালিযাজুরী সদরে সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার নামক একজন যুবক ছিলেন যিনি আওয়ামী লীগ করতেন। পুরো অঞ্চলটা হিন্দুপ্রধান এবং তাদের সঙ্গে সিপিবি ও ন্যাপের সম্পর্ক ছিল বেশি। আমাদের আসনে ন্যাপের একজন প্রার্থীও ছিলেন। তিনি তার কুড়েঘর প্রতীক নিয়ে বেশ দাপটের সঙ্গে আমাদের নৌকার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তবে নির্বাচনে আমরা এমপি ও এমএনএ দুটিতেই জিতে যাই। এরপর ৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করি। কিন্তু একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণের পর আমি গ্রামের বাড়ি চলে যাই। ৭২ সালে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াই বন্ধ করে দিই। ফলে তখন আর শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের আর কোন পথ খোলা থাকেনি।

যাহোক খুব সঙ্গতকারণেই ৭০-৭১ সালেতো বটেই শেখ হাসিনা ৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পূর্ব পর্যন্ত আমার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ ছিল না। ৭৫-এর পর কঠিনতম সময় পার করতে করতে এক সময়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় শেখ হাসিনা যখন নতুন করে আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেন তখনও তার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। আমি স্মরণ করতে পারি যে শেখ হাসিনার সঙ্গে পরের দেখাটি হয় ১৯৮৩ সালে। সেই বছরের মার্চ মাসে আমি মাসিক নিপুণ পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করি। একটি সিনেমা পত্রিকাকে পারিবারিক সাময়িকীতে রূপান্তর করার জন্য আমি তখন আপ্রাণ চেষ্টা করি। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ গড়ে ওঠে বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে। নিহত জিয়াউর রহমানের বিধবা পত্নীকে নিয়ে তখনও কোন পত্রিকায় কোন ফিচার বা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়নি। নাসির আলী মামুন বেগম জিয়ার ছবি তুলেন এবং কবি অসীম সাহা তাকে কেন্দ্র করে প্রচ্ছদ কাহিনী তৈরি করেন। অসীম সাহা বেগম জিয়ার সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। নিপুণ-এর প্রথম সংখ্যাটি সুপার হিট হয়। হাজার হাজার কপি বিক্রি হবার প্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে এপ্রিল ৮৩ সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী করা হবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। শেখ হাসিনার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হলো। জানা গেল যে, তিনি মহাখালীতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। কিন্তু তার সাক্ষাৎকার ছাড়াতো প্রচ্ছদ কাহিনী হবে না। আমার ওপরই দায়িত্ব পড়লো সাক্ষাৎকার নেবার। আমি তার মহাখালীর বাসায় গেলাম। তিনি খুব সহজেই চিনলেন। বসে আলাপ করা শুরু করতেই আমি আমার পত্রিকার একটি কপি দিলাম এবং সেটিকে নিয়মিত প্রকাশ করবো সেটি জানালাম। প্রসঙ্গত আমি তার একটি সাক্ষাৎকারের কথা জানালাম। তিনি নিপুণ-এর নাম শুনেই রেগে গেলেন। ‘আপনি খুনী জিয়াউর রহমানের মুর্খ বৌটাকে কভার ছবি করেছেন, আর সেই পত্রিকাকে আমি সাক্ষাৎকার দেব? আামি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানাতে চাইলাম যে পত্রিকাটি রাজনৈতিক নয় এবং খালেদার সাক্ষাৎকারও রাজনৈতিক নয়। বস্তুত এটিও বলতে চাইলাম যে আমি আপনার রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, আমি এই পত্রিকার জন্য কথা বলতে পারি না-আপনি ওঠতে পারেন। বুঝতে পারলাম, তিনি ভীষণ রেগে গেছেন। আমি ওঠার ভঙ্গি করে বললাম, কথা না বলেন ভালো কথা, চা খাওয়াবেন না? তিনি হেসে ফেললেন। বললেন বসেন। আমি চা বানিয়ে আনি। আমিও বসে গেলাম। তিনি নিজের হাতে চা বানালেন এবং দু’জনের হাতে কাপ নিয়ে আমরা ছোটখাটো কথা বলতে শুরু করলাম। অতীতের স্মৃতি, বাংলা বিভাগের কথা ছাড়াও আমাদের সহপাঠিনী রোকেয়া, মমতাজ আপার কথা হলো। কথা হলো সহপাঠিনী রোকসানাকে নিয়ে। তিনি জানলেন ক্লাসের প্রথম হওয়া রোকসানা আর আমি সংসার পেতেছি। সন্তানদের নিয়ে কথা হলো। সঙ্গে সঙ্গে একটু রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হলো। আমার আলাপের ধরন দেখেই তিনি বুঝলেন আমি সাক্ষাৎকারটা নেবই। অনেকক্ষণ আলাপ করে ছবি তুলে নিপুণ-এর ৮৩ সালের এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী করলাম। বাংলা বিভাগের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে সেটাই প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। তারপর মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হতো

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

মোস্তাফা জব্বার

সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২

তিন॥

আমরা ছাত্র ইউনিয়নকে হারমোনিয়াম পার্টি বলতাম। খসরু-মন্টু-সেলিম তখন ছাত্রলীগের পেশিশক্তির প্রতীক। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের হুলিয়া ছিল। কিন্তু তারা ক্যাম্পাসে-বিশেষত জহুর হলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন। ওদেরকেও কাউকে কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি। বরং আমরা তাদের সবারই খুবই ¯েœহভাজন ছিলাম। আমাদের ব্যাচের ছেলেরা বেশিরভাগই ছাত্রলীগ করতাম। আমি স্মরণ করতে পারি ছাত্রলীগের মাত্র দু’জন সক্রিয় মহিলা কর্মী ছিলেন। একজন কুমিল্লার মমতাজ আপা, অন্যজন ঢাকার রোকেয়া। মমতাজ আপা মোটাসোটা ছিলেন। তার গায়ের রঙ ছিল কালো; আফ্রিকানদের মতো। রোকেয়ার মুখে ছিল বসন্তের দাগ। বোঝা যায় যে দু’জনেই দেখাশোনায় তেমন সুন্দরী ছিলেন না। আমাদের সবার চাইতে বয়ষ্ক মনে করে আমরা মমতাজ বেগমকে আপা ডাকতাম। রোকেয়ার মুখশ্রী সুন্দর ছিল। তবে মুখে বসন্তের দাগ ছিল বলে কেউ তার পেছনে প্রেম করার জন্য ঘুরাঘুরি করতো না। ফলে ছাত্রলীগের মিটিং-মিছিল মানেই ছিলেন তারা দু’জন। মেয়েদের একটি ছোট দলের নেত্রী ছিল ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী রোকসানা সুলতানা সানু, শিরি ও তাদের আরেক বান্ধবী। তারাও আমাদের সমর্থন দিতেন। বিভাগে সামগ্রিকভাবে ছাত্রলীগের অবস্থান ভালো ছিল না। ফলে আমি একবার বিভাগীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে গিয়ে ৬ ভোটে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীর কাছে হেরে যাই। তেমন একটি সময়ে আমাদের সহপাঠিনী রোকেয়া একদিন দোতালার বাংলা বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন যে একজন মহিলা আসছেন যার চেহারাটা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মিলে যায়। তার হাসিভরা মুখ। গলায় স্বর্ণের চেন এবং হাতে আংটি। এমনিতেই হৈচৈ করা রোকেয়া এই দৃশ্য দেখে পুরো বিভাগ মাতিয়ে ফেললেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ওই যে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা। আমরা তখনও ভাবিনি যে তিনি কলাভবনের দোতালাতেই আসছেন। তিনি দোতালায় ওঠলেন এবং সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার এবং বাংলা বিভাগের ৬৮ ব্যাচের পরিচয় সেদিন থেকে। এরপর তিনি বিভাগের রাজনীতিতে সিরিয়াস হন এবং আমাদের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবুও আমরা বিভাগীয় নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের কাছে হেরে যাই। আমার কাছে তখন বিস্ময়কর মনে হতো যে শেখ হাসিনা সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মতো ছাত্র ইউনিয়নের ঘাঁটিতে জিতেছিলেন কেমন করে। আমাদের ব্যাখ্যা যথার্থ ছিল যে তার বিজয়ের পেছনে ছাত্রলীগ কাজ করেনি- কাজ করেছে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা।

আমাদের সহপাঠী-সহপাঠিনী যারা লেখাপড়ায় খুব সিরিয়াস তারা ৭০-এর আগস্ট থেকেই নিয়মিত তৃতীয় বর্ষের ক্লাস করতে থাকেন। আমরা যারা রাজপথ, জহুর হল, মধুর ক্যান্টিন এসব জায়গায় সময় কাটাতাম তারা মাঝে মধ্যে কলাভবনের দোতালায় বাংলা বিভাগের বারান্দা দিয়ে হাটাহাটি করতাম। কোন কোন প্রিয় শিক্ষকের ক্লাসও করতাম। আমি স্মরণ করতে পারি না যে, শেখ হাসিনা নিয়মিত সবগুলো ক্লাসে বসে ক্লাস করছেন। তবে কলাভবনের দোতালার বারান্দায় তাকে নিয়মিত দেখা যেতো। রাজনীতি করতেন সবচেয়ে বেশি। ধীরে ধীরে আমরা জানতে পারি যে তিনি বিবাহিতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে তিনি মেয়েদের কলেজ মাতিয়ে এসেছেন। বাংলা বিভাগে আমাদের ব্যাচে তার যুক্ত হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত হলাম। বিশেষ করে ছেলেদের ছাত্রলীগ করা আর মেয়েদের ছাত্রলীগ করার ভারসাম্যটা আমরা পাব তেমন প্রত্যাশা আমাদের ছিল। তিনি আসার পরে আমাদের বিভাগে একটি নির্বাচন হয়। কিন্তু আমরা তাতেও হারি। আমাদের তখন ধারণা বাংলা বিভাগে ছাত্রলীগ কোনদিন জিতবে না। তবে আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এটুকু স্মরণ করতে পারি যে বাংলা বিভাগের শেখ হাসিনা অতি সাধারণ বাঙালি ঘরের বধূ-কন্যা হিসেবে পুরো বিভাগের জন্য একটি দৃষ্টান্ত ছিলেন। ৭০ সালে বঙ্গবন্ধু দেশের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু শেখ হাসিনা যে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে সেটি আমরা টেরই পেতাম না। টাঙ্গাইলের তাতের শাড়ি পরে আসতেন। গায়ে গয়নার কোন চিহ্ন দেখতাম না। আর পুরো বিভাগ জুড়ে আড্ডা দিতেন অতি সাধারণ ছাত্রীর মতো। আমাদের ব্যাচের জন্য শেখ হাসিনাকে সহপাঠিনী হিসেবে পাওয়াটা কেবল অপ্রত্যাশিতই ছিল না গৌরবেরও ছিল। তবে একটি মজার বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি তিনি যখন রাজনীতিতে আসেন বা সরকার গঠন করেন তখন আমাদের ব্যাচের ছাত্রলীগ করতো তেমন কাউকে প্রবলভাবে তার আশপাশে দেখা যায়নি। এটারও একটা কারণ আছে। মমতাজ ও রোকেয়া ৭২ সালের পর জাসদ করা শুরু করে। বরং আমাদের ব্যাচেরই যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতো বা আমাদের সিনিয়র যারা তার সঙ্গে পড়াশোনা করতেন তাদেরও বেশিরভাগ তৎকালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন। এটি সম্ভবত এজন্য যে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাকে তিনি কখনও ছোট করে দেখতেন না।

সত্তুর সালের প্রেক্ষিতটি সবারই জানা এবং আমরা যারা তখন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম এবং যাদের শেকড় গ্রামে ছিল তারা সবাই সত্তুরের নির্বাচনের জন্য গ্রামে চলে যাই। আমার নিজের গ্রামে যাওয়াটা একেবারেই লড়াই করা ছিল। কারণ আমার থানায় তখন আওয়ামী লীগ বলতে তেমন বড় কোন সংগঠন ছিল না। খালিযাজুরী সদরে সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার নামক একজন যুবক ছিলেন যিনি আওয়ামী লীগ করতেন। পুরো অঞ্চলটা হিন্দুপ্রধান এবং তাদের সঙ্গে সিপিবি ও ন্যাপের সম্পর্ক ছিল বেশি। আমাদের আসনে ন্যাপের একজন প্রার্থীও ছিলেন। তিনি তার কুড়েঘর প্রতীক নিয়ে বেশ দাপটের সঙ্গে আমাদের নৌকার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তবে নির্বাচনে আমরা এমপি ও এমএনএ দুটিতেই জিতে যাই। এরপর ৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করি। কিন্তু একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণের পর আমি গ্রামের বাড়ি চলে যাই। ৭২ সালে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াই বন্ধ করে দিই। ফলে তখন আর শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের আর কোন পথ খোলা থাকেনি।

যাহোক খুব সঙ্গতকারণেই ৭০-৭১ সালেতো বটেই শেখ হাসিনা ৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পূর্ব পর্যন্ত আমার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ ছিল না। ৭৫-এর পর কঠিনতম সময় পার করতে করতে এক সময়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় শেখ হাসিনা যখন নতুন করে আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেন তখনও তার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। আমি স্মরণ করতে পারি যে শেখ হাসিনার সঙ্গে পরের দেখাটি হয় ১৯৮৩ সালে। সেই বছরের মার্চ মাসে আমি মাসিক নিপুণ পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করি। একটি সিনেমা পত্রিকাকে পারিবারিক সাময়িকীতে রূপান্তর করার জন্য আমি তখন আপ্রাণ চেষ্টা করি। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ গড়ে ওঠে বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে। নিহত জিয়াউর রহমানের বিধবা পত্নীকে নিয়ে তখনও কোন পত্রিকায় কোন ফিচার বা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়নি। নাসির আলী মামুন বেগম জিয়ার ছবি তুলেন এবং কবি অসীম সাহা তাকে কেন্দ্র করে প্রচ্ছদ কাহিনী তৈরি করেন। অসীম সাহা বেগম জিয়ার সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। নিপুণ-এর প্রথম সংখ্যাটি সুপার হিট হয়। হাজার হাজার কপি বিক্রি হবার প্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে এপ্রিল ৮৩ সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী করা হবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। শেখ হাসিনার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হলো। জানা গেল যে, তিনি মহাখালীতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। কিন্তু তার সাক্ষাৎকার ছাড়াতো প্রচ্ছদ কাহিনী হবে না। আমার ওপরই দায়িত্ব পড়লো সাক্ষাৎকার নেবার। আমি তার মহাখালীর বাসায় গেলাম। তিনি খুব সহজেই চিনলেন। বসে আলাপ করা শুরু করতেই আমি আমার পত্রিকার একটি কপি দিলাম এবং সেটিকে নিয়মিত প্রকাশ করবো সেটি জানালাম। প্রসঙ্গত আমি তার একটি সাক্ষাৎকারের কথা জানালাম। তিনি নিপুণ-এর নাম শুনেই রেগে গেলেন। ‘আপনি খুনী জিয়াউর রহমানের মুর্খ বৌটাকে কভার ছবি করেছেন, আর সেই পত্রিকাকে আমি সাক্ষাৎকার দেব? আামি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানাতে চাইলাম যে পত্রিকাটি রাজনৈতিক নয় এবং খালেদার সাক্ষাৎকারও রাজনৈতিক নয়। বস্তুত এটিও বলতে চাইলাম যে আমি আপনার রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, আমি এই পত্রিকার জন্য কথা বলতে পারি না-আপনি ওঠতে পারেন। বুঝতে পারলাম, তিনি ভীষণ রেগে গেছেন। আমি ওঠার ভঙ্গি করে বললাম, কথা না বলেন ভালো কথা, চা খাওয়াবেন না? তিনি হেসে ফেললেন। বললেন বসেন। আমি চা বানিয়ে আনি। আমিও বসে গেলাম। তিনি নিজের হাতে চা বানালেন এবং দু’জনের হাতে কাপ নিয়ে আমরা ছোটখাটো কথা বলতে শুরু করলাম। অতীতের স্মৃতি, বাংলা বিভাগের কথা ছাড়াও আমাদের সহপাঠিনী রোকেয়া, মমতাজ আপার কথা হলো। কথা হলো সহপাঠিনী রোকসানাকে নিয়ে। তিনি জানলেন ক্লাসের প্রথম হওয়া রোকসানা আর আমি সংসার পেতেছি। সন্তানদের নিয়ে কথা হলো। সঙ্গে সঙ্গে একটু রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হলো। আমার আলাপের ধরন দেখেই তিনি বুঝলেন আমি সাক্ষাৎকারটা নেবই। অনেকক্ষণ আলাপ করে ছবি তুলে নিপুণ-এর ৮৩ সালের এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী করলাম। বাংলা বিভাগের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে সেটাই প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। তারপর মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হতো

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক]

back to top