alt

উপ-সম্পাদকীয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

এম এ কবীর

: বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২

লোডশেডিংয়ের তথ্য নিতে গিয়ে ঝিনাইদহের তিন সাংবাদিক অবরুদ্ধ হন পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারের অফিস কক্ষে। রাউতাইল পল্লী বিদ্যুৎ ভবনে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঝিনাইদহের সাংবাদিকরা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাদের মুক্ত করেন।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় ৩৪টি নির্দেশনা রয়েছে। তার একটিও লঙ্ঘন করলে তা বিভাগীয় জবাবদিহির আওতায় পড়ে। সরকারের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বারবার। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কর্মরত কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে দিনে দিনে। সেবাপ্রত্যাশী মানুষের সঙ্গে প্রায় বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা ও স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টানতে বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটছে না। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে কর্মকর্তাদের ‘প্রশিক্ষণ ঘাটতি’ রয়েছে। মাঠ প্রশাসনের অনেকে বলেছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন অংশীজনের নানা রকম ‘অযাচিত’ তদবির ও আবদার সামলাতে হয় তাদের। এগুলো নিয়েই বেশি সমস্যা তৈরি হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব ভাগিয়ে নেয়। এভাবে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে বেশি।

একটি অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফের ইউএনও কায়সার খসরু স্থানীয় এক সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এ ঘটনায় ইউএনও সম্পর্কে উচ্চ আদালতের এক বিচারপতি বলেন, ‘কোন রং হেডেডপারসন ছাড়া এমনভাবে বলতে পারে না।’

এর আগে ২৭ এপ্রিল ফরিদপুর জেলা জজ আদালতের দুই কর্মচারী একটি দেওয়ানি মামলার সমন নোটিস জারি করতে বোয়ালমারীর ইউএনওর কার্যালয়ে যান। তখন ইউএনও রেজাউল করিম তার সহকর্মীদের নিয়ে জজ আদালতের কর্মচারীদের আটকে রাখেন, মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মুচলেকা নেন। এ ঘটনার পর ফরিদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ইউএনওকে শোকজ করার পরও তিনি হাজির হননি। পরে হাইকোর্ট তলব করলে গত ২১ জুন আদালতে হাজির হয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চান ইউএনও ও নাজির। এরপর গত ২৫ জুলাই ইউএনও রেজাউল করিমকে সতর্ক করে ক্ষমা করে হাইকোর্ট।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, গত ১০ বছরে প্রশাসনের প্রায় তিন হাজার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, নারীঘটিত সমস্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগ জমা হয়েছে। এ হিসাবে বছরে ৩০০ এবং মাসে অন্তত ২৫টি অভিযোগ জমা হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচশ’র মতো বিভাগীয় মামলা হয়। এগুলোতে একশ’র মতো কর্মকর্তাকে গুরুদন্ড ও লঘুদন্ড দেয়া হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ শাস্তি বা চাকরিচ্যুতির নজির একেবারেই কম। ২০২১ সালে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক সাংবাদিককে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচিত কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনকে ‘লঘুদন্ড’ দেয়া হয়। তার দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। এরপর এ বছর সুলতানাকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতিও দেয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইউএনও বলেন, বেশি সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় খাসজমি নিয়ে।

স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই খাসজমি দখলে নিতে চান। এগুলো ঠেকাতে গেলেই প্রতিবন্ধকতা আসে। আবার না ঠেকাতে গেলে সরকারি চাকরিও ঝুঁকিতে পড়ে। তবে সরকারি কর্মচারীদের আচরণের যে ধরনটি দেখা যায়, তাতে ক্ষমতা একটি বড় প্রভাবক। এ ধরনের আচরণের অন্যতম কারণ, এক ব্যক্তির হাতে অত্যধিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া। সরকারি কর্মচারী বিধি মোতাবেক তারা একেকটি উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এই পদের সরকারি কর্মচারীদের কাজের ফিরিস্তি অনেক, সরকারি ওয়েবসাইটে খুঁজলে বিশাল তালিকা পাওয়া যায়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড তদারকির ভারও আছে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্বটি ইউএনওর কাঁধেই দেয়া আছে। আর এত এত কাজ যখন ইউএনওদের করতে হয়, তখন সরকারি সেসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশ্নও করেন এক ব্যক্তিকেই।

সাংবাদিকতার ওপর রাগ-ক্ষোভসংশ্লিষ্ট সবারই। অনিয়মের খবরে তো আরও বেশি। কারণ, তাতে কারও না কারও বাড়া ভাতে ছাই পড়ে। আর ওতেই যত গন্ডগোল। তবে প্রতিবাদের রাস্তাও আছে। সংবাদের প্রতিবাদ করে পত্র পাঠানো যেতে পারে, এমনকি প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগও করা যায়। কিন্তু যখনই একজন সরকারি বা বেসরকারি ক্ষমতা চর্চাকারী ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বসেন, তখনই বোঝা যায়, ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়’। দেশে এখন পর্যন্ত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে প্রায়োগিকভাবে পুরোপুরি আলাদা করা সম্ভব হয়নি। আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ২০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রায়ে দেয়া ১২ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। তা ছাড়া, সরকারি কর্মচারীকে ‘স্যার’ ডাকা বা সম্মান প্রদর্শন না করাসংক্রান্ত জটিলতা তো আছেই। স্যার বা ম্যাডাম না ডাকায় সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের হেনস্তা করছেন বা দপ্তর থেকে বের করে দিচ্ছেন এমন খবর গুগলে খুঁজলেই পাওয়া যায়। আমরা সামন্ত শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার বহু বছর পরও সামন্তের ধারণা থেকে বের হতে পারিনি। কথায় কথায় ব্রিটিশ বা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার ইতিহাস গৌরবের সঙ্গে বয়ান করলেও, ঠিক তেমনি একটি সামন্ত শাসন আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর বানিয়েছি। তাতে পিষ্ট করছি নিজেদের ঘরের আপনজনদেরই। কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সরকারি কর্মচারী সেই সামন্ত প্রভুদের শূন্যস্থানটি অলংকৃত করে চলেছেন।

সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকদের হাতেই ক্ষমতা থাকার কথা ছিল। তাদেরই ‘স্যার বা ম্যাডাম’ ডাকার কথা ছিল। তবে প্রবাদ আছে, ‘অদন্তের দাঁত হলো, কামড় খেতে খেতে প্রাণ গেল’। যে শিশুর সবেমাত্র দাঁত উঠেছে, তার মুখের কাছে আঙুল নিলেই কামড়ে দেবে। সমস্যা হলো, আমাদের শিশুরা বড় হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু কামড়ানোর ‘মজা’ কিছুদিন হলো পেয়েছে। এক দাপুটে সরকারি কর্মকর্তা। সদ্য অবসরে গেছেন। ইন্দোর শহরের বিজয়নগরের এক আবাসিক কমপ্লেক্সে এসেছেন অবসরজীবন কাটাতে। রোজ বিকেলে পার্কে হাঁটতে আসেন আর পার্কের সবাইকে দেখেন অবজ্ঞার চোখে। হাঁটা শেষ করে ক্লান্তি নিবারণের জন্য পার্কের বেঞ্চে এক বৃদ্ধের পাশে বসেন এবং সেই সূত্রেই তাদের মধ্যে টুকটাক বাক্যবিনিময় হয়। তবে তার কথার বিষয়বস্তু ছিল ‘আমি ভোপালে এত বড় আইএএস অফিসার ছিলাম যে আপনি ভাবতেই পারবেন না। আমি ভোপালে খুবই মজে গিয়েছিলাম, নইলে আমার ইচ্ছে ছিল দিল্লিতে জয়েন করার’ বৃদ্ধ লোকটি রোজ শান্তভাবে লোকটার কথা শুনতেন।

এক দিন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি কি কোন দিন ফিউজ বাল্ব দেখেছেন? বাল্ব ফিউজ হয়ে যাওয়ার পর কেউ কি দেখে ওটা কোন কোম্পানির ছিল? ওটা কত ওয়াটের ছিল? ওটার আলো কেমন ছিল? একটা বাল্ব ফিউজ হয়ে যাওয়ার পর এসবের কোনো মূল্য ও গুরুত্ব থাকে না। ফিউজ বাল্ব মানুষ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়’। বৃদ্ধ বলেন, ‘অবসর গ্রহণের পর আমাদের সবার স্থিতি ফিউজ বাল্বের মতো হয়ে যায়। আমরা কোথায় কাজ করতাম, আমাদের পদ কত বড় ছিল, আমাদের কী ক্ষমতা ছিল, অবসর গ্রহণের পর এসবের কোন মূল্যই থাকে না। আমি এই হাউসিং সোসাইটিতে অনেক বছর থেকে বাস করছি, অথচ আজ পর্যন্ত এই সোসাইটির কেউ জানে না একসময় আমি একজন মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছিলাম।

আমরা সামন্ত শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার বহু বছর পরও সামন্তের ধারণা থেকে বের হতে পারিনি। কথায় কথায় ব্রিটিশ বা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার ইতিহাস গৌরবের সঙ্গে বয়ান করলেও, ঠিক তেমনি একটি সামন্ত শাসন আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর বানিয়েছি

ওই সামনের বেঞ্চে বসে আছেন রহমান, তিনি একসময় রেল বিভাগের চিফ ম্যানেজার ছিলেন। ওই যে এই দিকে হেঁটে আসছেন আবদুল্লাহ সাহেব, তিনি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ছিলেন। ওই যে যিনি পার্কের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি হলেন রাজিব শেখ, তিনি আইএসআরও চিফ ছিলেন। তারা কোন দিন নিজের মুখে এসব কাউকে বলেননি। কেন জানেন? চন্দন কাঠ কখনো কাউকে বলে না যে আমি চন্দন, সৌরভই মানুষকে তার কাছে নিয়ে আসে। তারা কেউই তাদের বিগত দিনের উচ্চপদের কথা বলেননি, তবে আমি সেটা জেনেছি নিজের আগ্রহে, তাদের অতি সাধারণ জীবনযাত্রা দেখে। আমি জানি সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান। হতে পারে এই ফিউজ বাল্ব কোনটা জিরো ওয়াটের, কোনোটা ৫০ বা ১০০ ওয়াটের। কিন্তু তাদের কারোরই আজ আলো দেয়ার সাধ্য নেই, কাজেই তাদের কোনো উপযোগিতা নেই। মানুষ উদিত সূর্যের উদ্দেশ্যে জল অর্পণ করে সূর্যদেবের পূজা করে। কিন্তু অস্তাচলগামী সূর্যের পূজা কেউ করে না।’

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

এম এ কবীর

বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২

লোডশেডিংয়ের তথ্য নিতে গিয়ে ঝিনাইদহের তিন সাংবাদিক অবরুদ্ধ হন পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারের অফিস কক্ষে। রাউতাইল পল্লী বিদ্যুৎ ভবনে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঝিনাইদহের সাংবাদিকরা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাদের মুক্ত করেন।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় ৩৪টি নির্দেশনা রয়েছে। তার একটিও লঙ্ঘন করলে তা বিভাগীয় জবাবদিহির আওতায় পড়ে। সরকারের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বারবার। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কর্মরত কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে দিনে দিনে। সেবাপ্রত্যাশী মানুষের সঙ্গে প্রায় বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা ও স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টানতে বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটছে না। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে কর্মকর্তাদের ‘প্রশিক্ষণ ঘাটতি’ রয়েছে। মাঠ প্রশাসনের অনেকে বলেছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন অংশীজনের নানা রকম ‘অযাচিত’ তদবির ও আবদার সামলাতে হয় তাদের। এগুলো নিয়েই বেশি সমস্যা তৈরি হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব ভাগিয়ে নেয়। এভাবে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে বেশি।

একটি অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফের ইউএনও কায়সার খসরু স্থানীয় এক সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এ ঘটনায় ইউএনও সম্পর্কে উচ্চ আদালতের এক বিচারপতি বলেন, ‘কোন রং হেডেডপারসন ছাড়া এমনভাবে বলতে পারে না।’

এর আগে ২৭ এপ্রিল ফরিদপুর জেলা জজ আদালতের দুই কর্মচারী একটি দেওয়ানি মামলার সমন নোটিস জারি করতে বোয়ালমারীর ইউএনওর কার্যালয়ে যান। তখন ইউএনও রেজাউল করিম তার সহকর্মীদের নিয়ে জজ আদালতের কর্মচারীদের আটকে রাখেন, মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মুচলেকা নেন। এ ঘটনার পর ফরিদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ইউএনওকে শোকজ করার পরও তিনি হাজির হননি। পরে হাইকোর্ট তলব করলে গত ২১ জুন আদালতে হাজির হয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চান ইউএনও ও নাজির। এরপর গত ২৫ জুলাই ইউএনও রেজাউল করিমকে সতর্ক করে ক্ষমা করে হাইকোর্ট।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, গত ১০ বছরে প্রশাসনের প্রায় তিন হাজার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, নারীঘটিত সমস্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগ জমা হয়েছে। এ হিসাবে বছরে ৩০০ এবং মাসে অন্তত ২৫টি অভিযোগ জমা হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচশ’র মতো বিভাগীয় মামলা হয়। এগুলোতে একশ’র মতো কর্মকর্তাকে গুরুদন্ড ও লঘুদন্ড দেয়া হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ শাস্তি বা চাকরিচ্যুতির নজির একেবারেই কম। ২০২১ সালে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক সাংবাদিককে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচিত কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনকে ‘লঘুদন্ড’ দেয়া হয়। তার দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। এরপর এ বছর সুলতানাকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতিও দেয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইউএনও বলেন, বেশি সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় খাসজমি নিয়ে।

স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই খাসজমি দখলে নিতে চান। এগুলো ঠেকাতে গেলেই প্রতিবন্ধকতা আসে। আবার না ঠেকাতে গেলে সরকারি চাকরিও ঝুঁকিতে পড়ে। তবে সরকারি কর্মচারীদের আচরণের যে ধরনটি দেখা যায়, তাতে ক্ষমতা একটি বড় প্রভাবক। এ ধরনের আচরণের অন্যতম কারণ, এক ব্যক্তির হাতে অত্যধিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া। সরকারি কর্মচারী বিধি মোতাবেক তারা একেকটি উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এই পদের সরকারি কর্মচারীদের কাজের ফিরিস্তি অনেক, সরকারি ওয়েবসাইটে খুঁজলে বিশাল তালিকা পাওয়া যায়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড তদারকির ভারও আছে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্বটি ইউএনওর কাঁধেই দেয়া আছে। আর এত এত কাজ যখন ইউএনওদের করতে হয়, তখন সরকারি সেসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশ্নও করেন এক ব্যক্তিকেই।

সাংবাদিকতার ওপর রাগ-ক্ষোভসংশ্লিষ্ট সবারই। অনিয়মের খবরে তো আরও বেশি। কারণ, তাতে কারও না কারও বাড়া ভাতে ছাই পড়ে। আর ওতেই যত গন্ডগোল। তবে প্রতিবাদের রাস্তাও আছে। সংবাদের প্রতিবাদ করে পত্র পাঠানো যেতে পারে, এমনকি প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগও করা যায়। কিন্তু যখনই একজন সরকারি বা বেসরকারি ক্ষমতা চর্চাকারী ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বসেন, তখনই বোঝা যায়, ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়’। দেশে এখন পর্যন্ত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে প্রায়োগিকভাবে পুরোপুরি আলাদা করা সম্ভব হয়নি। আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ২০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রায়ে দেয়া ১২ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। তা ছাড়া, সরকারি কর্মচারীকে ‘স্যার’ ডাকা বা সম্মান প্রদর্শন না করাসংক্রান্ত জটিলতা তো আছেই। স্যার বা ম্যাডাম না ডাকায় সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের হেনস্তা করছেন বা দপ্তর থেকে বের করে দিচ্ছেন এমন খবর গুগলে খুঁজলেই পাওয়া যায়। আমরা সামন্ত শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার বহু বছর পরও সামন্তের ধারণা থেকে বের হতে পারিনি। কথায় কথায় ব্রিটিশ বা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার ইতিহাস গৌরবের সঙ্গে বয়ান করলেও, ঠিক তেমনি একটি সামন্ত শাসন আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর বানিয়েছি। তাতে পিষ্ট করছি নিজেদের ঘরের আপনজনদেরই। কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সরকারি কর্মচারী সেই সামন্ত প্রভুদের শূন্যস্থানটি অলংকৃত করে চলেছেন।

সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকদের হাতেই ক্ষমতা থাকার কথা ছিল। তাদেরই ‘স্যার বা ম্যাডাম’ ডাকার কথা ছিল। তবে প্রবাদ আছে, ‘অদন্তের দাঁত হলো, কামড় খেতে খেতে প্রাণ গেল’। যে শিশুর সবেমাত্র দাঁত উঠেছে, তার মুখের কাছে আঙুল নিলেই কামড়ে দেবে। সমস্যা হলো, আমাদের শিশুরা বড় হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু কামড়ানোর ‘মজা’ কিছুদিন হলো পেয়েছে। এক দাপুটে সরকারি কর্মকর্তা। সদ্য অবসরে গেছেন। ইন্দোর শহরের বিজয়নগরের এক আবাসিক কমপ্লেক্সে এসেছেন অবসরজীবন কাটাতে। রোজ বিকেলে পার্কে হাঁটতে আসেন আর পার্কের সবাইকে দেখেন অবজ্ঞার চোখে। হাঁটা শেষ করে ক্লান্তি নিবারণের জন্য পার্কের বেঞ্চে এক বৃদ্ধের পাশে বসেন এবং সেই সূত্রেই তাদের মধ্যে টুকটাক বাক্যবিনিময় হয়। তবে তার কথার বিষয়বস্তু ছিল ‘আমি ভোপালে এত বড় আইএএস অফিসার ছিলাম যে আপনি ভাবতেই পারবেন না। আমি ভোপালে খুবই মজে গিয়েছিলাম, নইলে আমার ইচ্ছে ছিল দিল্লিতে জয়েন করার’ বৃদ্ধ লোকটি রোজ শান্তভাবে লোকটার কথা শুনতেন।

এক দিন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি কি কোন দিন ফিউজ বাল্ব দেখেছেন? বাল্ব ফিউজ হয়ে যাওয়ার পর কেউ কি দেখে ওটা কোন কোম্পানির ছিল? ওটা কত ওয়াটের ছিল? ওটার আলো কেমন ছিল? একটা বাল্ব ফিউজ হয়ে যাওয়ার পর এসবের কোনো মূল্য ও গুরুত্ব থাকে না। ফিউজ বাল্ব মানুষ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়’। বৃদ্ধ বলেন, ‘অবসর গ্রহণের পর আমাদের সবার স্থিতি ফিউজ বাল্বের মতো হয়ে যায়। আমরা কোথায় কাজ করতাম, আমাদের পদ কত বড় ছিল, আমাদের কী ক্ষমতা ছিল, অবসর গ্রহণের পর এসবের কোন মূল্যই থাকে না। আমি এই হাউসিং সোসাইটিতে অনেক বছর থেকে বাস করছি, অথচ আজ পর্যন্ত এই সোসাইটির কেউ জানে না একসময় আমি একজন মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছিলাম।

আমরা সামন্ত শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার বহু বছর পরও সামন্তের ধারণা থেকে বের হতে পারিনি। কথায় কথায় ব্রিটিশ বা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার ইতিহাস গৌরবের সঙ্গে বয়ান করলেও, ঠিক তেমনি একটি সামন্ত শাসন আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর বানিয়েছি

ওই সামনের বেঞ্চে বসে আছেন রহমান, তিনি একসময় রেল বিভাগের চিফ ম্যানেজার ছিলেন। ওই যে এই দিকে হেঁটে আসছেন আবদুল্লাহ সাহেব, তিনি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ছিলেন। ওই যে যিনি পার্কের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি হলেন রাজিব শেখ, তিনি আইএসআরও চিফ ছিলেন। তারা কোন দিন নিজের মুখে এসব কাউকে বলেননি। কেন জানেন? চন্দন কাঠ কখনো কাউকে বলে না যে আমি চন্দন, সৌরভই মানুষকে তার কাছে নিয়ে আসে। তারা কেউই তাদের বিগত দিনের উচ্চপদের কথা বলেননি, তবে আমি সেটা জেনেছি নিজের আগ্রহে, তাদের অতি সাধারণ জীবনযাত্রা দেখে। আমি জানি সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান। হতে পারে এই ফিউজ বাল্ব কোনটা জিরো ওয়াটের, কোনোটা ৫০ বা ১০০ ওয়াটের। কিন্তু তাদের কারোরই আজ আলো দেয়ার সাধ্য নেই, কাজেই তাদের কোনো উপযোগিতা নেই। মানুষ উদিত সূর্যের উদ্দেশ্যে জল অর্পণ করে সূর্যদেবের পূজা করে। কিন্তু অস্তাচলগামী সূর্যের পূজা কেউ করে না।’

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top