alt

উপ-সম্পাদকীয়

আয়কর রিটার্ন : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

মিহির কুমার রায়

: শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করোনা-পরবর্তী সময়ের পর এই বছরেও জাতীয় আয়কর দিবস পালন করেছে না যদিও এটি হতে পারত আয়কর আদায়ের একটি সুবর্ণ সুযোগ। এখন পর্যন্ত যে আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে তা নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম। দেশে টিনধারী লোকের সংখ্যা ৭৪ লাখ যার মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ২৪ লাখ, যা হলো করযোগ্য ব্যক্তির মাত্র ৩১ শতাংশ যারা ৮০ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। তাছাড়াও দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৮২টিতে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ করই রয়ে গেছে রাজস্ব কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের এই পথ পরিক্রমায় পাঁচ দশক পরেও দেশের কর্পোরেট ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানি প্রদত্ত আয়করের প্রবৃদ্ধি তেমন হারে বাড়েনি। অপর দিকে কোম্পানি ব্যতিত করদাতাদের মধ্যে ব্যক্তি করদাতা, পার্টনারশিপ ফার্ম, অ্যাসোসিয়েশন অব পারসনস ইত্যাদি রয়েছে যাদের কর্পোরেট করের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতি বছর জুলাই-নভেম্বর মাস আসলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আহরন আয়োজন শুরু করে কিন্তু সারা বছরব্যাপী এই ধরনের তৎপরতা চোখে পড়েনি অথচ বাজেট ভিত্তিক সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অতিব জাতীয় গুরত্বপূর্ণ যার সঙ্গে সরকারের প্রশাসনিক পরিচালনার ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। কারণ প্রতি বছর সরকার রাজস্ব আয়ের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা ধার করে প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের অর্থনীতি বড় হলেও রাজস্ব আহরণ তথা কর কাঠামোর সূচকে তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনো দেশে করনীতি প্রণয়ন ও আদায় দুটো কাজেরই গুরুভার একক একটি সংস্থার ওপর ন্যস্ত, কর পরিশোধ ব্যবস্থারও সহজীকরণ হয়নি, সাধারণ করদাতাদের মধ্য থেকেও দূর করা যায়নি হয়রানির এবং করজাল বড় করার বিষয়টিও সীমাবদ্ধ থাকছে শুধু আলোচনাতেই।

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে এবং সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর-জিডিপির গড় অনুপাত ৩৬ শতাংশের মতো। উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অনুপাতও গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত সাড়ে ১৮ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারা খ্যাত আফ্রিকার দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর-জিডিপি অনুপাত নেপালের, প্রায় ১৯ শতাংশ। এরপর ভুটানের, ১৬ শতাংশ। ভারতের ১২ শতাংশ, শ্রীলংকার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপের ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশের ঘরে। উল্লিখিত দেশগুলোয় রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মূলে কাজ করছে আধুনিক, সহজ ও নির্বিঘ্ন কর ব্যবস্থা, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি একটি সহায়ক রাজস্ব সংস্কৃতি।

জিডিপির বিপরীতে কর আহরণের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। এখনো দেশের কর আহরণ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি পরোক্ষ কর। এনবিআরের তথ্যমতে, দেশে মোট আহরিত করে প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ৩৩ শতাংশ। বাকিটুকু আসছে পরোক্ষ করের মাধ্যমে। জিডিপির বিপরীতে প্রত্যক্ষ কর আহরণের হিসেবে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বেই বাংলাদেশের অবস্থান বেশ দুর্বল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখানো বাংলাদেশে ২০০ বছরের পুরনো কর কাঠামো চলছে, পৃথিবীর সব দেশই তাদের কর কাঠামোর উন্নয়ন করেছে, আর বাংলাদেশের বড় সমস্যা করনীতি প্রণয়ন ও কর আহরণ কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের ওপরই ন্যস্ত যা আলাদা করা প্রয়োজন, যারা নীতি প্রণয়ন করবে তাদের সঙ্গে কর আহরণকারীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকবে না, কোড নাম্বার অনুযায়ী কর পরিশোধ হতে হবে, উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ হবে ই-মেইলে, এক স্থানের কর্মকর্তারা অন্য স্থানে কর আহরণ করবেন, তাহলে যোগাযোগের সুযোগ থাকবে এবং তখন স্বচ্ছতা আসবে। যারা কর আহরণ করেন এবং যারা নীতিনির্ধারণ করেন তাদের মধ্যে ব্যবধান থাকতে হবে যা হলে কর ব্যবস্থা আধুনিক হবে, একসঙ্গে থাকলে সেখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং দেশের করজালও বাড়াতে হবে। দেশের সুষম উন্নয়ন না হওয়ায় রাজস্বও সুষমভাবে সব জায়গা থেকে আসছে

না এবং পৃথিবীতে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে একটি অনুসৃত কাঠামো হলো রাজস্ব বোর্ড ফাঁকি উদ্ঘাটন করবে, কিন্তু রাজস্ব আহরণ করবে না। পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন এজেন্সি ট্যাক্স কেটে রাখে, সরকারি কর্তৃপক্ষ শুধুযাচাই করে তার হিসাব ঠিক আছে কিনা , এনবিআরের কাঠামোতেও সেপরিমাণে ডিজিটাইজ করা যায়নি, এখন ডিজিটাল রিটার্ন জমা দেয়া যায়স্বল্পমাত্রায় যা করদাতারা শুধু জমা দিতে পারেন কিন্তু পদ্ধতিটি বড় করদাতাদের যেসবনথি জমা দিতে হয়, সেটির উপযোগী নয়। আবার একসময় মানুষ বিভিন্নকারণে টিআইএন নিয়েছে, কিন্তু রিটার্ন দেয়নি। এখন আইন করা হয়েছে, টিআইএন থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং এ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হচ্ছে যার ফলে ধীরে ধীরে রিটার্ন বাড়বে।

দেশের অর্থনীতি বড় হলেও রাজস্ব আহরণ তথা কর কাঠামোর সূচকে তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনো দেশে করনীতি প্রণয়ন ও আদায় দুটো কাজেরই গুরুভার একক একটি সংস্থার ওপর ন্যস্ত, কর পরিশোধ ব্যবস্থারও সহজীকরণ হয়নি, সাধারণ করদাতাদের মধ্য থেকেও দূর করা যায়নি হয়রানির এবং করজাল বড় করার বিষয়টিও সীমাবদ্ধ থাকছে শুধু আলোচনাতেই

বলা হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত ১৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অবস্থার তেমন পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় হচ্ছে না। এরূপ অবস্থায় কর ফাঁকি রোধ এনবিআরের অটোমেশনে গতি আনা খুব জরুরি। এটা কেবল কর ফাঁকি ধরতে সাহায্য করবে না, উপরন্তু নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং এনবিআর ডাটাবেজের সঙ্গে কর প্রদানকারীর ব্যাংক হিসাবের যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে। সংস্থাটি এরই মধ্যে অবশ্য কিছু সার্ভিস সেন্টার খুলেছে। এ ব্যাপারে করদাতাদের ওয়াকিবহাল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব বিভাগে কর গোয়েন্দা সেলকেও আরও সক্ষম ও কার্যকর করা চাই। বিশ্বায়নের যুগে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে, প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। এর মধ্যেই বহু প্রতীক্ষিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার এবং ব্যবসায়ীদেরও হয়রানি কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আয়কর আইন যুগোপযোগী এবং এটি এখন বাংলা ভাষায় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা প্রশংশনীয়। এটা হলে অনেক অস্পষ্টতা দূর হবে এবং জনগণও এ-সম্পর্কিত বিধিবিধান সহজেই জানতে পারবে, যা কর বাড়াতে সহায়ক। প্রতি বছরই করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম এবং যারা নিয়মিতভাবে কর দেন, তাদের ওপরই দেয়া হয় বাড়তি চাপ। বড় শহরগুলোয় কর দেয়ার প্রবণতা বেশি হলেও মফস্বল পর্যায়ের অনেক সচ্ছল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান করের আওতায় নেই। উদীয়মান গ্রোথ সেন্টারগুলো চিহ্নিত করে তাদের করের আওতায় আনা সময়ের দাবি। কাজেই স্থানীয় কর কার্যালয়গুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

[লেখক : অধ্যাপক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

আয়কর রিটার্ন : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

মিহির কুমার রায়

শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করোনা-পরবর্তী সময়ের পর এই বছরেও জাতীয় আয়কর দিবস পালন করেছে না যদিও এটি হতে পারত আয়কর আদায়ের একটি সুবর্ণ সুযোগ। এখন পর্যন্ত যে আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে তা নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম। দেশে টিনধারী লোকের সংখ্যা ৭৪ লাখ যার মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ২৪ লাখ, যা হলো করযোগ্য ব্যক্তির মাত্র ৩১ শতাংশ যারা ৮০ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। তাছাড়াও দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৮২টিতে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ করই রয়ে গেছে রাজস্ব কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের এই পথ পরিক্রমায় পাঁচ দশক পরেও দেশের কর্পোরেট ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানি প্রদত্ত আয়করের প্রবৃদ্ধি তেমন হারে বাড়েনি। অপর দিকে কোম্পানি ব্যতিত করদাতাদের মধ্যে ব্যক্তি করদাতা, পার্টনারশিপ ফার্ম, অ্যাসোসিয়েশন অব পারসনস ইত্যাদি রয়েছে যাদের কর্পোরেট করের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতি বছর জুলাই-নভেম্বর মাস আসলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আহরন আয়োজন শুরু করে কিন্তু সারা বছরব্যাপী এই ধরনের তৎপরতা চোখে পড়েনি অথচ বাজেট ভিত্তিক সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অতিব জাতীয় গুরত্বপূর্ণ যার সঙ্গে সরকারের প্রশাসনিক পরিচালনার ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। কারণ প্রতি বছর সরকার রাজস্ব আয়ের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা ধার করে প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের অর্থনীতি বড় হলেও রাজস্ব আহরণ তথা কর কাঠামোর সূচকে তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনো দেশে করনীতি প্রণয়ন ও আদায় দুটো কাজেরই গুরুভার একক একটি সংস্থার ওপর ন্যস্ত, কর পরিশোধ ব্যবস্থারও সহজীকরণ হয়নি, সাধারণ করদাতাদের মধ্য থেকেও দূর করা যায়নি হয়রানির এবং করজাল বড় করার বিষয়টিও সীমাবদ্ধ থাকছে শুধু আলোচনাতেই।

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে এবং সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর-জিডিপির গড় অনুপাত ৩৬ শতাংশের মতো। উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অনুপাতও গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত সাড়ে ১৮ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারা খ্যাত আফ্রিকার দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর-জিডিপি অনুপাত নেপালের, প্রায় ১৯ শতাংশ। এরপর ভুটানের, ১৬ শতাংশ। ভারতের ১২ শতাংশ, শ্রীলংকার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপের ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশের ঘরে। উল্লিখিত দেশগুলোয় রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মূলে কাজ করছে আধুনিক, সহজ ও নির্বিঘ্ন কর ব্যবস্থা, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি একটি সহায়ক রাজস্ব সংস্কৃতি।

জিডিপির বিপরীতে কর আহরণের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। এখনো দেশের কর আহরণ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি পরোক্ষ কর। এনবিআরের তথ্যমতে, দেশে মোট আহরিত করে প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ৩৩ শতাংশ। বাকিটুকু আসছে পরোক্ষ করের মাধ্যমে। জিডিপির বিপরীতে প্রত্যক্ষ কর আহরণের হিসেবে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বেই বাংলাদেশের অবস্থান বেশ দুর্বল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখানো বাংলাদেশে ২০০ বছরের পুরনো কর কাঠামো চলছে, পৃথিবীর সব দেশই তাদের কর কাঠামোর উন্নয়ন করেছে, আর বাংলাদেশের বড় সমস্যা করনীতি প্রণয়ন ও কর আহরণ কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের ওপরই ন্যস্ত যা আলাদা করা প্রয়োজন, যারা নীতি প্রণয়ন করবে তাদের সঙ্গে কর আহরণকারীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকবে না, কোড নাম্বার অনুযায়ী কর পরিশোধ হতে হবে, উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ হবে ই-মেইলে, এক স্থানের কর্মকর্তারা অন্য স্থানে কর আহরণ করবেন, তাহলে যোগাযোগের সুযোগ থাকবে এবং তখন স্বচ্ছতা আসবে। যারা কর আহরণ করেন এবং যারা নীতিনির্ধারণ করেন তাদের মধ্যে ব্যবধান থাকতে হবে যা হলে কর ব্যবস্থা আধুনিক হবে, একসঙ্গে থাকলে সেখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং দেশের করজালও বাড়াতে হবে। দেশের সুষম উন্নয়ন না হওয়ায় রাজস্বও সুষমভাবে সব জায়গা থেকে আসছে

না এবং পৃথিবীতে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে একটি অনুসৃত কাঠামো হলো রাজস্ব বোর্ড ফাঁকি উদ্ঘাটন করবে, কিন্তু রাজস্ব আহরণ করবে না। পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন এজেন্সি ট্যাক্স কেটে রাখে, সরকারি কর্তৃপক্ষ শুধুযাচাই করে তার হিসাব ঠিক আছে কিনা , এনবিআরের কাঠামোতেও সেপরিমাণে ডিজিটাইজ করা যায়নি, এখন ডিজিটাল রিটার্ন জমা দেয়া যায়স্বল্পমাত্রায় যা করদাতারা শুধু জমা দিতে পারেন কিন্তু পদ্ধতিটি বড় করদাতাদের যেসবনথি জমা দিতে হয়, সেটির উপযোগী নয়। আবার একসময় মানুষ বিভিন্নকারণে টিআইএন নিয়েছে, কিন্তু রিটার্ন দেয়নি। এখন আইন করা হয়েছে, টিআইএন থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং এ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হচ্ছে যার ফলে ধীরে ধীরে রিটার্ন বাড়বে।

দেশের অর্থনীতি বড় হলেও রাজস্ব আহরণ তথা কর কাঠামোর সূচকে তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনো দেশে করনীতি প্রণয়ন ও আদায় দুটো কাজেরই গুরুভার একক একটি সংস্থার ওপর ন্যস্ত, কর পরিশোধ ব্যবস্থারও সহজীকরণ হয়নি, সাধারণ করদাতাদের মধ্য থেকেও দূর করা যায়নি হয়রানির এবং করজাল বড় করার বিষয়টিও সীমাবদ্ধ থাকছে শুধু আলোচনাতেই

বলা হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত ১৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অবস্থার তেমন পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় হচ্ছে না। এরূপ অবস্থায় কর ফাঁকি রোধ এনবিআরের অটোমেশনে গতি আনা খুব জরুরি। এটা কেবল কর ফাঁকি ধরতে সাহায্য করবে না, উপরন্তু নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং এনবিআর ডাটাবেজের সঙ্গে কর প্রদানকারীর ব্যাংক হিসাবের যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে। সংস্থাটি এরই মধ্যে অবশ্য কিছু সার্ভিস সেন্টার খুলেছে। এ ব্যাপারে করদাতাদের ওয়াকিবহাল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব বিভাগে কর গোয়েন্দা সেলকেও আরও সক্ষম ও কার্যকর করা চাই। বিশ্বায়নের যুগে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে, প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। এর মধ্যেই বহু প্রতীক্ষিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার এবং ব্যবসায়ীদেরও হয়রানি কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আয়কর আইন যুগোপযোগী এবং এটি এখন বাংলা ভাষায় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা প্রশংশনীয়। এটা হলে অনেক অস্পষ্টতা দূর হবে এবং জনগণও এ-সম্পর্কিত বিধিবিধান সহজেই জানতে পারবে, যা কর বাড়াতে সহায়ক। প্রতি বছরই করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম এবং যারা নিয়মিতভাবে কর দেন, তাদের ওপরই দেয়া হয় বাড়তি চাপ। বড় শহরগুলোয় কর দেয়ার প্রবণতা বেশি হলেও মফস্বল পর্যায়ের অনেক সচ্ছল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান করের আওতায় নেই। উদীয়মান গ্রোথ সেন্টারগুলো চিহ্নিত করে তাদের করের আওতায় আনা সময়ের দাবি। কাজেই স্থানীয় কর কার্যালয়গুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

[লেখক : অধ্যাপক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

back to top