নূর-ই আলম সিদ্দিকী
জন্মের পর প্রত্যেক মানুষ বাক প্রকাশে অভ্যস্ত হয়। মাতৃভাষা তার ভাব প্রকাশের বাহন। যে কোনো মাতৃভাষা তাই মানুষের পরম প্রিয়। পৃথিবীর সাড়ে তিন হাজার ভাষার মধ্যে বাঙালির প্রিয় ভাষা বাংলা। এ ভাষা উচ্চারণ মানে মাকে সম্মান জানানো। নরম পলিমাটির এ বাংলার সবকিছু অপূর্ব ও মায়াময়। প্রকৃতি ও জন্মগত কারণে বাংলা ভাষা আমাদের সত্তার অবিচ্ছিন্ন অংশ। আমাদের প্রিয় ভাষায় প্রতিটি শব্দ খুব মধুর। মুখ দিয়ে আমরা যা উচ্চারণ করি তা হৃদয় ছুঁয়ে যায় প্রাণের গভীর থেকে। কবির অনুভূতি, ‘মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে,কত শান্তি ভালবাসা,আমরি বাংলা ভাষা।’ কিন্তু বর্তমানে বাংলা ভাষার শব্দ ব্যবহার এবং ভুল উচ্চারণের যে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা নিয়ে যে কোনো ভাষাপ্রেমিক বড় উদ্বিগ্ন।
বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণ মনের গহীনে জড়িয়ে সকল বাঙালি সারা দিনমান পার করে। অথচ এই প্রাণের ভাষা কেন জানি আজও আপন হলো না কারো কারো। একটু পেছনে চোখ রাখলে দেখা যায় মাতৃভাষার জন্য বাঙালি প-িতগণ আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন; যা প্রতিটি দেশপ্রেমিককে বড্ড ভাবনায় ফেলে। প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ নিরন্তর চেষ্টা চলেছে এ ভাষাকে মর্যাদাশীল স্তরে রূপান্তরের। মধ্যকালের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানে কবিরা সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যেকে গতানুগতিক ঐতিহ্যের বাইরে নতুন ভাবধারা প্রবাহিত করতে। চর্যাপদের ভুসুকুর পর চতুর্দশ শতকের শেষে শাহ মুহম্মদ সগীর স্পষ্ট স্বাক্ষর রাখেন বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে। তারপর দৌলত উজীর বাহরাম খান,সাবিরিদ খান, মুহম্মদ কবির ও আব্দুল হাকিম প্রমুখ আন্তরিক চেষ্টা করেছেন এ ভাষা প্রসারে।
আমরা জানি ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলা গদ্যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইলিয়াস শাহী সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। অবশ্য গদ্য ভাষা নবযাত্রা শুরু করে উনিশ শতক থেকে। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তাতে আটজন মেধাবী প-িত ১৩টি গ্রন্থ রচনা করেন। উইলিয়াম কেরি থেকে হরপ্রসাদ রায় পর্যন্ত প-িতদের পরে আসেন রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঠিক এখান থেকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির জোয়ার বইতে শুরু করে। মাতৃভাষাকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেলে তার কদর বুঝতে পারা সহজ হয়। যেমনটি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যে আমরা দেখতে পাই। যার আনুক্রমিক ধারায় উনিশ শতকের মধ্যভাগের পর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্যে আমরা পরিণত রূপ লক্ষ করি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের বাংলা ভাষা প্রীতি ও নিষ্ঠা সকলের অতি-বিদিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যাপক পরিচিত রচনা ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭)। এ-গ্রন্থে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার অধিক। আশ্চর্যের বিষয় ‘প্রথম ১০,০০০ (দশ হাজার) শব্দ গুণে তার মধ্যে কোন ইংরেজি শব্দ পাওয়া যায়নি।’ বাংলাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসার ফলে এমনটি হয়েছে সন্দেহ নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পা-িত্য অসাধারণ। অথচ তার লেখার মধ্যে অন্য ভাষার শব্দের কোনো চাপ লক্ষ্য করা যায় না। ‘শান্তিনিকেতন’ (১৩১৬) দ্বিতীয় খ- থেকে ১০,০০০ (দশ হাজার) শব্দের ভেতর পাওয়া যায় মাত্র একটি ইংরেজি শব্দ। বাক্যের মধ্যে সে শব্দটি ছিল ‘ভারতবর্ষের ব্রহ্ম একটি অবচ্ছিন্ন (ধনংঃৎধপঃ) পদার্থ।’
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ব্যতিক্রম বাঙালি। তার পরিবার ছিল উর্দু আর আরবি ভাষার অনুরাগী। কিন্তু তিনি নিজ আগ্রহে রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি বাংলা শিখেছিলেন ভাইয়ের কাছে। সমাজ পরিবর্তনের তাগিদে রোকেয়া লেখার জগতে প্রবেশ করেন। ‘সৎ সমাজচেতনার সাথে মাতৃভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার চেতনারও যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে,তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বেগম রোকেয়ার বাংলা ভাষায়।’ রোকেয়ার ‘মতিচুর’ গ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ। এ গ্রন্থের প্রথম খন্ডে ইংরেজি শব্দের হার পাওয়া গেছে ০.৩৬ শতাংশ। এতেই শেষ নয় তিনি তার লেখায় যে সকল ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন তা বন্ধনীর মধ্যে আবদ্ধ রেখেছেন সব সময়।
আজ একুশ শতকের তৃতীয় দশকে দেখা যাচ্ছে বাংলা ভাষা শুদ্ধ উচ্চারণ ও শুদ্ধ লেখেন স্বল্পকিছু ভাষাপ্রেমিক। তাছাড়া কারো তেমন গুরুত্ব নেই এ ভাষার প্রতি। কিন্তু সঠিক শব্দ ব্যবহার ও শুদ্ধ উচ্চারণ করতে সমস্যা কোথায়? উত্তরে বলা যায় সদিচ্ছার। ব্যক্তি মানুষের ভাষার প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগের অভাব এ পথে প্রধান অন্তরায়। ১৯৫২’র অর্জন হয়েছিল ব্যক্তিবিশেষ জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত হওয়ার কারণে। উনিশ শতকের শেষ দিকে নজর দিলে খুব আশাব্যঞ্জক একটি খবর নজরে পড়ে। এ সময়ে খ্যাতিমান প-িত রাজনারায়ণ বসুর মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ কিংবদন্তি হয়ে আছে।
রাজনারায়ণ বসু ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী’ সভা নামে একক প্রচেষ্টায় একটি প্রতষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে নিয়ম চালু করা হয়েছিল যে, ‘কথাবার্তা সব বাংলায় হবে, কেবল তা-ই নয় অভ্যাসবশত কেউ যদি ইংরেজি ব্যবহার করেন,তার প্রতি বাক্যের জন্য তাকে এক পয়সা হারে জরিমানা দিতে হবে।’ মাতৃভাষার প্রতি এমন নিষ্ঠা আজকের দিনে ভাবা পাগলের প্রলাপ বললে খুব বেশি বলা হবে কি? বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ নিয়মও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া আর তেমন কেউ সাড়া দেননি। এ যুগের গড়পরতা বিকৃত ভাষা ব্যাবহারকারি কি সেই নেতিবাচক মানসিকতার দোসর?
তা নাহলে যার যেমন ইচ্ছা, তেমন শব্দ প্রয়োগ হচ্ছে কেন এ ভাষাতে? শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি কারো নজর তো নেই। বরং ভাব দেখে মনে হয় আমার মুখ, যেমন বলবো তেমন সুখ অবস্থা। ফলে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে,ভাষার প্রতি এমন স্বেচ্ছাচারী মনোভাব অব্যাহত থাকলে,আগামী দিনে আমাদের প্রিয় ভাষার অবস্থান কেমন হবে! অবশ্য ৫২’র সংগ্রামটা চালু থাকলে সমস্যা থাকবেনা তা সুনিশ্চিত।
অর্থ-বাণিজ্য: বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি এফআইসিসিআই’র