image

একাত্তরের জলস্রোত ও সামরিক মনস্তত্ত্বের নতুন পাঠ

লাবণী মন্ডল

ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানে আমরা যখন একাত্তরকে খুঁজি, সেখানে বারংবার উঠে আসে ডাঙার গল্প, সম্মুখসমরের বারুদগন্ধী আখ্যান। কিন্তু এই বদ্বীপের শরীরজুড়ে যে শিরা-উপশিরার মতো জড়িয়ে আছে অসংখ্য নদ-নদী, খাল আর বিল- তারা কি কেবলই ছিল নীরব দর্শক? নাকি এই ঘোলাজলের নিচে, কচুরিপানার জটলাতে, আর বর্ষার উন্মত্ত দাপটে লুকিয়ে ছিল যুদ্ধের এক অদৃশ্য মোড়? মোহাম্মদ এজাজের গ্রন্থ ‘১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ’ যেন সেই বিস্মৃত জলরাশির অতল থেকে তুলে আনা এক মহাকাব্যিক দলিল, যেখানে নদী কেবল ভূগোল নয়, নদী এক দুর্ধর্ষ গেরিলা।

গবেষক মোহাম্মদ এজাজ, যিনি নিজেও একজন পরিবেশ সংগঠক, তিনি যুদ্ধের মানচিত্রকে দেখেছেন এক ভিন্ন লেন্স দিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন, একাত্তরের যুদ্ধ কেবল ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের’ ছিল না, এ যুদ্ধে প্রকৃতিও ছিল সক্রিয়। অচিন প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম লড়াই করতে হয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে, যেখানে প্রকৃতি নিজেই পক্ষ নিয়েছিল শোষিতের।

বদ্বীপের ভৌগোলিক ফাঁদ: পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাদের যান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ ছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল, এই ভূখ-ের মাটি কাদার তৈরি, আর জলরাশি এখানে সীমানা মানে না। গবেষক এজাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেখিয়েছেন, কীভাবে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি- নদীনির্ভর অবকাঠামো- এক বিশাল প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাবলয় বা ‘ন্যাচারাল ডিফেন্সিভ শিল্ড’ হিসেবে কাজ করেছে।

বইটিতে ‘জিও-ডিফেন্সিভ অ্যানালিসিস’ বা ভৌগোলিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে এক চমকপ্রদ সত্য। পাকিস্তানি বাহিনী, যারা মূলত শুষ্ক ও কঠিন ভূমির যুদ্ধে অভ্যস্ত, তারা বাংলার বর্ষাকে মোকাবিলা করতে জানত না। এজাজ দেখিয়েছেন, সাতশোরও বেশি অপারেশনের অর্ধেকই ছিল ‘লজিস্টিক্যাল ডিসরাপশন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্নকরণ। আর এই বিচ্ছিন্নকরণের প্রধান অস্ত্র ছিল নদী। পাকিস্তানিরা যেখানে নদীকে দেখেছে আতঙ্ক আর বাধার দেয়াল হিসেবে, মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে নদীকে ব্যবহার করেছেন মায়ের আঁচলের মতো- নিরাপদ আশ্রয় আর আচমকা আক্রমণের রুট হিসেবে।

জলের নিচের সুইসাইড স্কোয়াড: বইটির হৃৎপিন্ড বলা চলে ১০ নম্বর সেক্টরের আলোচনাকে। এই সেক্টর ছিল নির্দিষ্ট ভূখ-হীন, এর সীমানা ছিল জল। লেখক আমাদের নিয়ে যান ফ্রান্সের তোলন নৌঘাঁটিতে, যেখানে পিএনএস ম্যানগ্রো সাবমেরিনের নাবিক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ও তার সঙ্গীরা এক অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিদেশের মাটিতে নিশ্চিত জীবন, ইউরোপের আলোঝলমলে শহরের হাতছানি উপেক্ষা করে, তারা মাদ্রিদের ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে বলেন, ‘আমরা দেশের জন্য লড়তে চাই।’ এই দেশপ্রেমের তাড়না, যা একজন সাবমেরিনারকে ‘দেশদ্রোহী’র তকমা মাথায় নিয়ে অনিশ্চিত মৃত্যুযাত্রায় ঠেলে দেয়- লেখক সেই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে এঁকেছেন অসামান্য মমতায়।

অপারেশন জ্যাকপট, যা ইতিহাসের পাতায় এক দুঃসাহসী অধ্যায়, তা এই গ্রন্থে উঠে এসেছে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা নিয়ে। চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ- একই রাতে, একই সময়ে জলের নিচ থেকে উঠে আসা একদল কালজয়ী মানুষ কীভাবে বিদেশি জাহাজের তলায় লিমপেট মাইন বসিয়ে দিয়ে তছনছ করে দিয়েছিল পশ্চিমের দম্ভ, তার বর্ণনা পড়তে গিয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। মোহাম্মদ এজাজ কেবল ঘটনার বিবরণ দেননি, তিনি দেখিয়েছেন এর ‘কৌশলগত অভিঘাত’ বা স্ট্র্যাটেজিক ইমপ্যাক্ট। লায়ডস রেজিস্ট্রার অফ শিপিং-এর হিসাব কষে তিনি দেখান, কীভাবে ওই এক রাতের হামলায় পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক লজিস্টিক চেইন ভেঙে পড়েছিল, কীভাবে বিমার হার বেড়ে গিয়ে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল।

অদৃশ্য যুদ্ধের সমীকরণ: মোহাম্মদ এজাজ আলোচ্য গ্রন্থে যুদ্ধের এক তাত্ত্বিক কাঠামো তুলে ধরেছেন- ‘ওয়ার অব লজিস্টিকস থিওরি’। এজাজ যুদ্ধের ধোঁয়াশার ভেতর থেকে বের করে এনেছেন লজিস্টিকসের নির্মম সত্য। তিনি দেখিয়েছেন, যুদ্ধ মানেই কেবল গুলিবিনিময় নয়; যুদ্ধ মানে রসদ, জ্বালানি আর যোগাযোগের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছেন, ফেরিঘাট অকেজো করে দিচ্ছেন, তখন তারা আসলে শত্রুর ধমনী কেটে দিচ্ছেন।

সালদা নদী অভিযান কিংবা বলাখাল রামচন্দ্রপুরের অ্যামবুশ- প্রতিটি অপারেশনের বর্ণনায় লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ছোট ছোট ট্যাকটিক্যাল বা কৌশলগত আঘাত শেষ পর্যন্ত একটি বিশাল স্ট্র্যাটেজিক বিজয়ে রূপ নেয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, লজিস্টিক সক্ষমতা ভেঙে পড়লে বিশ্বের তাবড় সেনাবাহিনীও মাটির পুতুলে পরিণত হয়, একাত্তর তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।

পদ্মা ও পলাশ: গ্রন্থের শেষাংশে গানবোট ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’-এর ট্র্যাজেডি পাঠকের বুকে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমানের ভুলে যখন আমাদের নিজস্ব গানবোট জ্বলছে, যখন ইঞ্জিনরুম আর্টিফিশার রুহুল আমিন আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে নিজের জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন- সেই দৃশ্যকল্পের বর্ণনা বড়ই করুণ, বড়ই মহাকাব্যিক। লে. কমান্ডার জালাল উদ্দিনের বয়ানে সেই মুহূর্তটি উঠে এসেছে তীব্র হাহাকার হয়ে। ‘ওগুলো ভারতীয় বিমান, গুলি কোরো না’- কমান্ডার সামন্তর এই নির্দেশের বিপরীতে ভারতীয় বিমানগুলোকে কোনো সিগন্যাল দেওয়া হয়নি মিত্রবাহিনীর গানবোটের উপস্থিতির। এর মাশুল দিতে হয়েছিল রক্ত দিয়ে। এজাজ এই বেদনাদায়ক অধ্যায়টিকে এড়িয়ে যাননি; বরং নির্মোহ গবেষকের দৃষ্টিতে এর বিশ্লেষণ করেছেন, যা বইটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ইতিহাসের নতুন পাঠ: মোহাম্মদ এজাজের ‘১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ’ কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি একটি সামরিক ম্যানুয়াল, একটি পরিবেশগত দলিল এবং সর্বোপরি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। ৫৫৯ পৃষ্ঠার এই বিশাল কলেবরে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর ‘সারভাইভাল ইন্সটিঙ্কট’ বা টিকে থাকার প্রবৃত্তি তার ভূগোলকে অস্ত্রে পরিণত করে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তন আর ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণের মুখোমুখি, তখন এই গ্রন্থ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বাংলার নিরাপত্তাকবচ কংক্রিটের দেয়ালে নয়, তা রয়েছে বহমান জলধারায়। যারা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস, ভূরাজনীতি কিংবা নিছকই একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর ঘ্রাণ নিতে চান, তাদের জন্য এই গ্রন্থটি এক অবশ্যপাঠ্য দলিল। এই গ্রন্থ একই সঙ্গে একাত্তরের নদীগুলোর জবানবন্দি, যেখানে জল আর রক্তের স্রোত মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ। মোহাম্মদ এজাজ। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫। প্রকাশন: জাগতিক প্রকাশন। পৃষ্ঠা: ৫৫৯। মূল্য: ১৫০০ টাকা

সম্প্রতি