ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী "৩১
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সেদিন ছিল ১৯৯৪ সালের ৬ই জুলাই। দুদিন আগেই আমেরিকার জন্মদিন পালিত হয়ে গেল। আজ আসলাম সে স্বাধীনতার স্মারক দেখতে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে।
ফেরিতে ওঠার আগেই চোখে পড়ল লেডি লিবার্টির হাতের মশাল। কোনো সময় ভাবিনি যে তার ওপরে ওঠা যায়। পরে কাছে যেয়ে স্ট্যাচুকে দেখলাম- বাইরে ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে, স্ট্যাচুর ভেতরে ঢুকে, সবশেষে সরু সিঁড়ি বেয়ে মশালে উঠে। স্ট্যাচু অব লিবার্টি কি অসাধারণ এক শিল্পকর্ম ফরাসি স্থপতি ফ্রেডারিক-অগাস্ট বার্থোল্ডি-র। মানুষের কল্পনা ও চেষ্টার সীমা কত দূর যেতে পারে এটি তার এক বড় উদাহরণ।
ফেরার পথে ফেরিতে চোখে পড়ছিল একজোড়া গগণচুম্বী ভবন- টুইন টাওয়ার। যতই তার কাছে আসছি তা ততই দীর্ঘ হতে লাগল। ফেরি থেকে নামতেই ফারজানা বলল, ‘চল, টুইন টাওয়ারে উঠি।’ বললাম, ‘আজ থাক। পরে আরেক সময় আসব।’ তবে ‘আরেক সময়’ আর আসল না । এর ৭ বছর ২ মাস ৫ দিন পর কিছু হঠকারী ব্যক্তি অনিন্দ্যসুন্দর সে টুইন টাওয়ার গুঁড়িয়ে দেয়, আর এতে নিহত হন ২৯৭৭ নিরাপরাধ মানুষ। আর কোনোদিন সে টাওয়ারে ওঠা হবে না। মনে রয়ে গেল এক গভীর দুঃখ!
‘A man can be destroyed but not defeated’-আমেরিকার লেখক হেমিংওয়ের সে কথাটি সত্য প্রমাণ করে আবার উঠে এল টাওয়ার- দুটি টাওয়ার সুদৃঢ় ঐক্যে ওয়ান ওয়ার্ল্ড টাওয়ার হয়ে দাঁড়িয়ে গেল আরো উঁচুতে- ১৭৭৬ ফিট উচ্চতায় আমেরিকার স্বাধীনতার বছরকে তুলে ধরে সব স্বাধীনতাকেই মহীয়ান করল।
সেদিন টুইন টাওয়ারে উঠতে চেয়েছিলাম আমরা দুজন, তা হয়নি। এত বছর পর আজ আমাদের সাথে যোগ দিল নাবিল ও নাতাশা- গড়ে উঠল আমাদের চারজনের ওয়ান ওয়ার্ল্ড।
নাইন ইলেভেন এর নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রথমে গেলাম গ্রাউন্ড জিরো মেমোরিয়ালে। কালো পাথরের দেয়াল, তার ওপর লেখা ২৯৭৭ জনের প্রত্যেকের নাম পড়ল নাবিল ও নাতাশা। নিচে বিশাল গর্তে গড়িয়ে পড়ছে জলের অনন্ত স্রোতধারা- এ যেন প্রিয়জনদের অশ্রু বিসর্জনের জলপ্রপাত।
নাইন ইলেভেন মিউজিয়ম দেখে এরপর উঠলাম টাওয়ারের একবারে শীর্ষদেশে। লেডি লিবার্টিকে আবার দেখলাম। সাথে দেখা হলো ম্যানহাটানের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। ওপর থেকে এ মহানগর ও তার জীবনযাত্রার এক চকিত দেখা মিলল। মনে হলো সব থেমে আছে। আবার নেমে আসলাম চলমান মহানগরীর রাজপথে।
কাছেই ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক- পৃথিবীর অর্থের খনি। সেখানকার অর্থের চেয়ে আমাদের বেশি আগ্রহ তার চার্জিং বুল, অর্থাৎ ধাবমান ষাঁড়কে দেখা। সে বুলের পথে এগোলাম সবাই।
ফাঁকে ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক এর ইতিহাসের দিকে একটু তাকাই। আমেরিকার সম্পদের ভোজের টেবিলে প্রথম দিকে যারা যোগ দিয়েছিল তাদের মধ্যে ওলন্দাজরাও ছিল। তারা ১৬৫৩ সালে ব্রিটিশ ও স্থানীয় আদিবাসীদের আক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ওয়াল স্ট্রিট এলাকায় মাটির রক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করে। এ থেকেই আসে প্রাচীর সড়ক বা ওয়াল স্ট্রিট। এ সড়কটি ব্রডওয়ে থেকে ইস্ট রিভার পর্যন্ত বিস্তৃত।
ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক-এর ঝলমলে প্রাচুর্যের ছায়ায় মিশে আছে এক কালো অধ্যায়। এখানে ওয়াল স্ট্রিট ও পার্ল স্ট্রিট এর কোনায় ১৭১১-১৭৬২ সালে চালু ছিল ক্রীতদাস কেনা-বেচার একটি বাজার।
এসব এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখছি, আর ফিরে ফিরে যাচ্ছি অতীতে- উজ্জ্বল ও অন্ধকার, দুটিতেই।
দেখি, এক বিশাল ও মনোরম ভবনের সামনে জর্জ ওয়াশিংটনের মনুমেন্ট। এ ভবনটির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। ২৬ ওয়াল স্ট্রিটে এ ভবন- ফেডারেল হল ন্যাশনাল মেমোরিয়াল- এখানে ছিল আমেরিকার প্রথম ক্যাপিটল। আর এখানেই অনুমোদিত হয় বিল অফ রাইটস।
নাতাশা বলল, ‘ট্রিনিটি চার্চের সিমেট্রিতে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনএর সমাধি আছে। দেখতে যাব।’ গতকালই মাত্র তাঁর জীবন নিয়ে রচিত নাটক হ্যামিল্টন দেখে এসেছি ব্রডওয়েতে। তাই তাঁর ব্যাপারে উৎসাহ আছে সবার। ট্রিনিটি চার্চটির ঠিকানা ৮৯ ব্রডওয়ে, তবে আমরা কি থিয়েটার ডিস্ট্রিকের কাছাকাছি যাচ্ছি? নাতাশাকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘না, ঠিকানা ৮৯ ব্রডওয়ে হলেও এটি থিয়েটার ডিস্ট্রিক থেকে অনেক দূরে। ব্রডওয়ে রাস্তাটি মোট ১৫ মাইল- দক্ষিণ থেকে উত্তরে- ম্যানহাটানকে দুই ভাগ করেছে। দক্ষিণে ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক থেকে ওপরে চলে গেছে উত্তরে, হার্লেমে। চল, আমরা এ রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হার্লেম পর্যন্ত চলে যাই। পুরো ম্যানহাটানকে দেখা হবে হেঁটে হেঁটে।’ বললাম, ‘ভাল আইডিয়া। আমার তো শেষ মাথাতেই যেতে হবে- রাত ৮টায় এক জ্যাজ গানের এক শো আছে হার্লেমে। কতক্ষণ লাগবে পুরো ব্রডওয়ে রাস্তাটি হেঁটে যেতে?’ নাবিল ও নাতাশা সব সময় গুগল ম্যাপে সব কিছু বের করে নেয়। নাবিল বলল, ‘ব্রডওয়ে রাস্তাটির দক্ষিণ মাথা থেকে উত্তরে হার্লেমে হেঁটে যেতে ৫ ঘন্টা সময় লাগবে।’ বললাম, ‘আজ হবে না। আরেকদিন যাওয়া যাবে।’
ট্রিনিটি চার্চটি কাছেই- সেখানে সিমেট্রিতে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন-এর সমাধি দেখতে গেলাম। তা দেখে চলে আসতেই নাবিল বলল, ‘এখানে হ্যামিল্টন ছাড়াও আরো অনেকের সমাধি আছে। তা কি দেখব না?’ বললাম, ‘দেখতে পার, তবে সময়ের ব্যাপার। বড় কারো নাম মনে আসলে বলতে পার।’ নাবিল বলল, ‘এখানে ছোট বড় কেউ নয়, সিমেট্রিতে সবাই সমান। ঠিক আছে, আরো কয়েকজনের সমাধি দেখতে পারি। একজন হলেন মিস্টার হ্যামিল্টনের ছেলে ফিলিপ এর। এটি এক স্যাড স্টোরি।’ বললাম, ‘কেমন?’। বেদনা ভরা এক কণ্ঠ নিয়ে নাবিল বলল, ‘বাবা মিস্টার হ্যামিল্টনকে নিয়ে একজন খারাপ একটি মন্তব্য করেছিল। তার প্রতিবাদ করে এক ডুয়েলে লিপ্ত হয়ে ছেলে ফিলিপ মারা যায়। তাকেও এখানে সমাহিত করা হয়েছিল।’ এটি শুনে আমরা সবাই ব্যথিত হয়ে ফিলিপের সমাধি স্তম্ভ দেখতে গেলাম। কিন্ত এটি কোথাও দেখলাম না। নাবিল বলল, ‘এদের জিজ্ঞেস করে দেখি।’ আমাদের জানানো হলো, ফিলিপকে এখানে সমাহিত করা হলেও এর কোনো চিহ্ন রাখা হয়নি। তাই তার সমাধি-স্তম্ভ নেই। বললাম, ‘দেখ, সিমেট্রিতে সবাই সমান নয়। বাবা মিস্টার হ্যামিল্টন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাই তাঁর সমাধি-স্তম্ভ করা হয়েছে। ছেলে ফিলিপ বিখ্যাত কেউ নন। তাই তার সমাধি-চিহ্নই নেই, সমাধি-স্তম্ভ দূরে থাক।’ নাবিল, ‘মিস্টার হ্যামিল্টন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ফাউন্ডিং ফাদার। আর্টিলারি অফিসার হিসেবে তিনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরে প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের কেবিনেটে তিনি ছিলেন দেশের প্রথম ট্রেজারি সেক্রেটারি।’
সিমেট্রি দেখা শেষ করে আবার চলল চার্জিং বুল এর সন্ধান। পথে ব্রডওয়ের শেষ মাথায় পড়ল বাউলিং গ্রিন। অনেকক্ষণ পর সবুজের ছোঁয়া পেলাম এ পার্কে এসে। বাউলিং গ্রিন নিউ ইয়র্কের প্রাচীনতম পার্ক। এখানে ১৮শ শতাব্দীর ঢালাই লোহার এক পার্ক-বেষ্টনী সংরক্ষিত আছে। সম্রাট রাজা তৃতীয় জর্জ এর মনুমেন্ট রক্ষা করার জন্যে এ বেষ্টনী দেয়া হয়েছিল- তবুও সে মনুমেন্ট রক্ষা করা যায়নি। ওলন্দাজ সময়ে বাউলিং গ্রিন ছিল গবাদি পশুর বাজার ও কুচকাওয়াজের স্থান। ব্রিটিশদের সময়ে ১৭৭৩ সালে একে পার্কে রূপান্তরিত করা হয়। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে বাউলিং গ্রিন ছিল আদিবাসীদের মন্ত্রণা সভার স্থান। বলা হয়ে থাকে এ স্থানেই ১৬২৬ সালে হয়েছিল বিখ্যাত ম্যানহাটান পারচেজ- যখন মাত্র ৬০ গিল্ডারের মূল্যমানের পণ্য দিয়ে আদিবাসী লেনাপে গোত্রের কাছ থেকে ওলন্দাজ প্রশাসক পিটার মিনুইট কিনে নিয়েছিলেন ম্যানহাটান দ্বীপ। এরপর এর নাম দেয়া হয় নিউ আমস্টারডাম। ১৬৬৪ সালে ইংরেজরা এটি দখল করে ডিউক অফ ইয়র্কের সম্মানে নাম দেয় নিউ ইয়র্ক।
বাউলিং গ্রিন পার্কটির সাথে আমেরিকার এক গৌরবময় ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। ৯ জুলাই ১৭৭৬ সালে কাছের সিটি হলে জর্জ ওয়াশিংটনের সৈন্যদের সামনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তখন তারা উদ্দীপ্ত হয়ে জনসাধারণকে সাথে নিয়ে বাউলিং গ্রিন-এ স্থাপিত ব্রিটিশ সম্রাট রাজা তৃতীয় জর্জ-এর মনুমেন্ট ভেঙ্গে ফেলে। ১৭৮৩ সালে পরাজিত ব্রিটিশ বাহিনী জাহাজ যোগে শহর পরিত্যাগ করার সময় জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে ম্যানহাটান দিয়ে বাউলিং গ্রিন এসে পৌঁছেন- এ দৃশ্য দেখতে।
চার্জিং বুলকে দেখতে এসে এতসব ইতিহাস দেখা হবে ভাবতে পারিনি। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে খুঁজে পেলাম বাউলিং গ্রিন পার্কটির পাশেই। ষাঁড়টি রাগান্বিত, কিন্তু গর্বিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরটি মোচড় দিয়ে, মাথা নিচু করে ধারালো শিংয়ের গুঁতা দিতে উদ্যত। বুলটিকে লোকজন ঘিরে ধরেছে পিঁপড়ের মতো। ষাঁড়টির সাখে ছবি তোলার জন্য বিরাট লাইন। অনেকে তার শিং, নাক, পেছনে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে- অনেকের বিশ্বাস, এটি তাদের সমৃদ্ধি আনবে। সে রকম এ ষাঁড়টির ইতালীয় ভাস্কর আর্তুরো দি মদিকান্ডার জীবনের ভাগ্য বদলে যায় আমেরিকায় এসে। তিনি এ দেশের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন এ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য চার্জিং বুল- যা আশাবাদ ও শক্তির প্রতীক।
ব্ল্যাক মানডে- ১৯ অক্টোবর, ১৯৮৭ সালে স্টক মার্কেট ধসের কথা মনে রেখেই আর্তুরো দি মদিকা এ ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিটের স্টক মার্কেটের আরেকটি ধস ‘ব্ল্যাক টুয়েজডে’ দেখেছিলেন লোরকা।
১৯২৯ সালে নিউ ইয়র্ক আসেন লোরকা। এ শহরে ভ্রমণ করার জন্য হয়তো এর চেয়ে মন্দ সময় আর ছিল না। কারণ ২৯ অক্টোবর ১৯২৯ সালে ঘটে সেই ‘ব্ল্যাক টুয়েজডে’- যেদিন ওয়াল স্ট্রিটের স্টক মার্কেটে ধস নামে- যা অগণিত মানুষকে সর্বস্বান্ত করে দেয়। নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে এ এক বড় ট্র্যাজেডি। জীবনের হাসি-কান্না-কমেডি-ট্র্যাজেডি দেখা যার এক বড় ব্রত, লোরকা সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মিস করতে পারেন না। তিনি ঘটনার খবর পেয়ে শুরুতেই চলে গেলেন ওয়াল স্ট্রিটের স্টক একচেঞ্জে, সেখানে থাকলেন প্রায় সারাদিন, আর চাক্ষুষ দেখলেন এ বিপর্যয়। তাঁর কাছে অর্থনৈতিক ক্ষতি বড় ব্যাপার নয়, আসল হলো এ ক্ষতি থেকে মানুষের জীবনের যে উলট-পালট ও রক্তক্ষরণ, তা দেখা ও উপলদ্ধি করা। এ গভীর বিপর্যয়ের ছবি ও বেদনা অবশ্যই উঠে এসেছে লোরকার কবিতায়, চিঠিতে, সাক্ষাৎকারে। ওয়াল স্ট্রিটের ধস লোরকার কাছে যেন ছিল পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার নির্মমতা ও অসাড়তার এক বড় উদাহরণ।
১৯২৯ সালের নভেম্বরে পরিবারের কাছে পাঠানো চিঠিতে’১ লোরকা তুলে ধরেছেন ওয়াল স্ট্রিট স্টক মার্কেট ধসের এক চাক্ষুষ বিবরণ:
‘আমি আনন্দিত (বা আতঙ্কিত) যে, কদিন আগে স্টক মার্কেটের ধস দেখেছিলাম। আপনারা জানেন যে, নিউ ইয়র্ক স্টক মার্কেট পুরো বিশ্বের স্টক মার্কেট। এই ধস আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য কিছুই নয়। কিন্তু এটি ছিল এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। বারো বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি। ওয়াল স্ট্রিট, যার সম্পর্কে আমি আপনাদের আগেই জানিয়েছিলাম (এটি বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কেন্দ্র) সেদিন এমন রূপ ধারণ করেছিল যে তা বর্ণনাতীত। আতঙ্ক যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে, আমি তখন সাত ঘণ্টারও বেশি সময় জনসাধারণের সাথে মিশে ছিলাম। আমি সেখান থেকে চলে আসতে পারছিলাম না। যেখানেই আমি তাকাই, লোকজন পশুর মতো চিৎকার ও তর্ক করছিল, আর কিছু নারী করছিল কান্না। সিঁড়ি ও আনাচে-কানাচে কয়েক দল ইহুদি চিৎকার ও বিলাপ করছিল। এসব লোকদের সর্বস্ব হারিয়ে গেছে রাতারাতি। অর্ডার আনা-নেয়ার কাজে নিয়োজিত বার্তাবাহকরা এত পরিশ্রম করছিল যে, অনেকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে- তাদের অনেককে জাগানো বা নিজ পায়ের উপর ভর করানো যায়নি। অট্টালিকাগুলোর মাঝে ভীতিকর কামানগুলো আর রাস্তা- ভরে ছিল হিস্টিরিয়া ও বিশৃঙ্খলায়; জনসাধারণের কষ্ট ও মনস্তাপ- আপনারা সম্ভবত কল্পনাও করতে পারবেন না। স্পষ্টত, যতই লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছিল, ততই শেয়ারের দাম পড়ছিল। এক পর্যায়ে সরকার ও বৃহৎ ব্যাংকগুলোকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, সবাই যাতে শান্ত হয়। চিৎকার ও অসহনীয় আতঙ্কের মাঝেই জনতার ভিড়ে আমার এক বান্ধবীকে দেখতে পেলাম- অশ্রুসজল চোখে আমাকে এসে বলল যে, তার যা কিছু ছিল সবই চলে গেছে- প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলারের ক্ষতি। আমি তাকে সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করলাম, এরকম চেষ্টা করছিল তার আরো বন্ধু। সব জায়গায় একই দৃশ্য- লোকজন অজ্ঞান হয়ে পড়ছিল, গাড়ির হর্ন বাজছিল, আর বাজছিল টেলিফোনের রিং। বারো বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি। এটি সত্যিই অসহনীয়।
এ নরক থেকে বের হয়ে আসার পর দেখলাম সিক্সথ এভিনিউতে যানবাহন বন্ধ হয়ে আছে। কারণ, রাস্তায় পড়ে আছে এক ব্যাংকার- যিনি হোটেল এসটর-এর ১৬ তলায় তাঁর রুমের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন। তাঁর মৃতদেহ সরানো হচ্ছিল- আমি ঠিক সে মুহূর্তেই সেখানে পৌঁছলাম। তিনি ছিলেন এক দীর্ঘদেহী লাল-চুলো লোক- তাঁর ধুলায় ধূসরিত সাদা হাত ছড়িয়ে ছিল সিমেন্টের ধূসর রাস্তার উপর- এটুকুই শুধু আমার মনে আছে। এ দৃশ্য আমাকে দিল আমেরিকার সভ্যতার উপর নতুন এক উপলদ্ধি- আমার কাছে মনে হলো সবই যৌক্তিক। আমি বলছি না যে, আমার এটি ভালো লেগেছে। কিন্তু আমি সব কিছু ঠা-া মাথায় দেখেছি এবং ভাগ্যবান যে, এটি দেখেছি। তা জাহাজডুবির দৃশ্যের মতোই ভয়ঙ্কর এবং খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ ছিল এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। করুণা-ভরে আমি দেখেছি সেসব মানুষদের- যাদের মনন সংকীর্ণ ও বদ্ধ- যারা পৃথিবীর অধিপতি বনে যাওয়া দু’তিনজন ব্যাংকারের ভয়ঙ্কর চাপ, শীতলতা ও হিসেবী সংশোধনের শিকার।’
ওয়াল স্ট্রিট স্টক মার্কেট ধসের যে অভিজ্ঞতা ও উপলদ্ধি, তার ওপর লোরকা লিখেছেন কবিতা Danza de la Muerte।২ শেয়ার বাজারের ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতাকে তিনি দেখেছেন ‘শেওলার পিরামিড’ প্রতীকে : ‘শেওলার পিরামিড হয়ে উঠবে ওই শেয়ার বাজার’। স্টক মার্কেট ধসের নিষ্ঠুরতার আরো প্রকাশ: ‘গ্যাস-মাপা নলে ব্যাঙ্কের বড়ো কর্তা মাপছিলেন/নগদ টাকার নিষ্ঠুর নীরবতা,/ তখুনি মুখোশ পৌঁছল ওয়াল স্ট্রীটে’। এ পুজিবাদী, অমানবিক সমাজ-ব্যবস্থার প্রতি তাঁর ঘৃণা লোরকা রেখে ঢেকে বলেননি: ‘হায় রে বর্বর, হা রে নির্লজ্জ উত্তর আমেরিকা!’।
মুখোশ। কীভাবে মুখোশ আসছে দেখ আফ্রিকা
থেকে নগরী নিউ ইয়র্কে।
চলে গেছে, গোলমরিচ গাছ,
ফস্ ফরাসের ছোট ছোট ফুলকুঁড়ি।
চলে গেছে, কাটাছেঁড়া মাংসের উটদল,
মরালের ঠোঁটে তোলা আলোর মাঠখানা।
যা-কিছু ঝলসানো-পোড়া তারই সময়টা,
চোখফোঁড়া গমের দানা, প্লাস্টিক-আস্তর দেয়া মেনী,
সময়টা যেন ভয়ঙ্কর, মরচে-ধরা সেতু, আর
ছিপির নিশ্চিত এক মৃত্যুস্তব্ধতার।
... ... ...
খরা-পোড়া নিঢেউ নির্জনে
টোল-খাওয়া মুখোশ নাচছিল।
আধখানা দুনিয়া বালি ছাওয়া, বাকি আধা
পারা আর ঘুমন্ত সূর্যালোক।
মুখোশ। দেখ ও মুখোশ! শুধুই বালি, কুমির আর ত্রাস
নগরী নিউ ইয়র্কের মাথা ছেয়ে।
... ... ...
নেড়া ছাদে শুয়ে কাঁদছিল চীনেম্যান
বউয়ের নগ্ন দেহটা খুঁজে না পেয়ে,
গ্যাস-মাপা নলে ব্যাঙ্কের বড় কর্তা মাপছিলেন
নগদ টাকার নিষ্ঠুর নীরবতা,
তখুনি মুখোশ পৌঁছল ওয়াল স্ট্রীটে।
নাচের পক্ষে বিসদৃশ বলা চলে না জায়গাটিকে
কোনা-খাঁজ গোরখানার, দেখছে হলদে চক্ষু ফিরিয়ে।
স্ফিংক্স্ আর ব্যাঙ্ক-ভল্ট্ গিঁঠ দেয়া টানটান এক দড়ি
গরিব পাড়ার ছেলেপুলেদের বুক ফুঁড়ে চলে গেছে।
আদিম আবেগ নাচছে যন্ত্র-স্পন্দের পায়ে পায়ে,
জানে না কোথায় মূল আলো আচ্ছন্ন পায়ের তলায়।
কেননা চাকাও ভুলে যায় যদি ঘোরার নিয়ম-সূত্র
ঘোড়ার পালের তালে তালে গান গাইবে উদোম হয়ে সে,
শিখা যদি দেয় বরফজমাট ব্লুপ্রিন্ট্ নকশা জ্বালিয়ে
রোল জানালার মুখ দিয়ে পুরো আকাশকে হবে পালাতে।
জায়গাটা নাচের পক্ষে বিসদৃশ নয়, বলি শোনো।
রক্ত আর সংখ্যার থামের ফাঁকে নেচে নেচে ঘুরবে মুখোশ,
নাচবে সোনার বাত্যাঝড় আর বেকারের কাতরানির ফাঁকে ফাঁকে,
মাঝরাতে হুঙ্কার করে উঠবে তোমার অমাবস্যাকে ডাক দিয়ে।
হায় রে বর্বর, হা রে নির্লজ্জ উত্তর আমেরিকা!
রয়েছ বিস্তার হয়ে তুষারের সীমান্তপ্রদেশে।
... ... ...
কেউটে হিসিয়ে উঠবে ওপরতলার ঘরে ঘরে।
বিষবিছুটির ঝাড়ে ছেয়ে যাবে উঠোন আর ছাদ।
শেওলার পিরামিড হয়ে উঠবে ওই শেয়ার বাজার।
রাইফেলের পাছ ধরে ধেয়ে আসবে জঙ্লা দড়িলতা,
আর সে সমস্ত দ্রুত, এত দ্রুত, তীব্র তুরিত।
হায়, ওয়াল স্ট্রীট!
মুখোশ। দেখ ও মুখোশ! তাকিয়ে দেখ কীভাবে
জঙ্লা গরল ঢালছে নগরী নিউ ইয়র্কের অপূর্ণ
মনোযাতনার ফাঁকে ফাঁকে।
Ref:
1. `The Poet in New York’: Federico Garcia Lorca, translated from the Spanish by Greg Simon and Steven F, White: The poet writes to his family from New York and Havana, translated by Christopher Maurer.
Third edition: 2013, Published by: Farrar, Straus and Giroux, New York.
2. Danza de la Muerte: মৃত্যুর নৃত্য, অনুবাদ: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়