মাহবুবর রহমান
বাসা থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টার কিলো পায়ে হেঁটে এভিনিউ এইচ স্টেশনে দাঁডানো মাত্র পকেটে হাত দিয়ে সাহানা বুঝতে পারল মোবাইল ফোনটি ফেলে এসেছে। এরকম আগেও হয়েছে, তবে আজকে না হলেই ভাল হতো। হাতে যে সময় ছিল তাতে সময় মতো অফিসে পৌঁছাতে পারত। তিন দিন আগে অফিসে ঢুকতে তিরিশ মিনিট দেরি করায় মেক্সিক্যান বস যেভাবে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সেটা মনে হতেই বুকটা ধড়াম করে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের মেধাবী ছাত্রী যার স্বপ্ন ছিল দর্শনের অধ্যাপক হয়ে দৃষ্টির অন্ধকার দূর করবে, সে আজ ভাগ্যচক্রে প্রবল প্রতাপশালী দেশের কেবলই একজন বিক্রয়কর্মী।
যাই হোক মনের ওপর রাগ করে, ভাগ্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। মনকে শাস্তি দেবার কায়দা জানা থাকলে সাহানা সেটা নিশ্চয় দিত। আপাতত নিজেকে একটা শক্তরকম অশ্রাব্য গালি দিয়ে মোবাইল ফোনটি নিতে বাসার দিকে রওনা দিল।
ব্রুকলিনের এই বাসাটায় তারা প্রায় দশ বছর ধরে আছে। কোনো এক অজানা কারণে ফরাসি বাড়িওয়ালী মার্গারেটা তাকে বেশ পছন্দ করেন। মায়ের বয়েসী এই ভদ্রমহিলা বাড়ির দোতলায় সম্পূর্ণ একা থাকেন। তিনতলায় ভারতীয় এক দম্পতি এবং নীচতলায় থাকে সাহানার পরিবার। আমেরিকায় যখন প্রথম সে আসে তখন উঠেছিল জ্যাকসন হাইটসের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়। মাস তিনেক সেখানে থাকার পর মনে হলো তার নিজের বাসা নেয়া দরকার।
তার নিজের বাসা নেয়া দরকার। ইতিমধ্যে ম্যানহাটানে একটা কফি শপে তার চাকরি হলো। মাসশেষে যে আয় হতো সেটার উপর ভর করে এক হাজার ডলারে একটা স্টুডিও বাসা ভাড?া নিল। এখানে একরুমের একটি বেড, সঙ্গে কিচেন আর চিপাচাপা একটি বাথ নিয়েই স্টুডিও বাসা। কিচেনের মধ্যেই ছোট্ট একটি ডাইনিং টেবিল আর দুটো চেয়ার নিয়েই স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন জীবন।
কিন্তু এই স্বাধীন জীবন বেশিদিন স্থায়ী হলো না সাহানার। জ্যাকসন হাইটস এলাকাটি ভারতীয় উপমহাদেশের লোক দিয়ে ঠাসা। তার মধ্যে বাঙালির সংখ্যা প্রচুর। অফিস থেকে ফিরবার পথেই দেখা যাবে অনেক বাঙালি পান খেতে খেতে, আকিজ বিড়ি ফুকতে ফুকতে দেশের রাজনীতি নিয়ে গরম আলোচনায় সরব হয়ে পড়েছে। সরকার কীভাবে বিরোধী পক্ষকে পিটুনি দিচ্ছে, আর বিরোধী দল কীভাবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- নস্যাৎ করতে তৎপর সে বিষয়ে উভয় পক্ষ এমন সব অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করছে যে, কেউ কারও যুক্তি খ-ন করতে না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই পানবিড়ি আর শক্ত সুপারির উপর আক্কেল দাঁতের তীব্র চাপ প্রয়োগে বেয়াক্কল বাঙালের মৃদু শান্তি মিলছে।
প্রথম প্রথম সাহানা এসব শুনে বিরক্ত হতো। কিন্তু কিছুদিন যেতে এগুলো গা সহা হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কি এই নিষ্কর্মা লোকগুলোর অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে এদের জন্য এক ধরনের সহানুভূতি বোধ করা শুরু করে সে। প্রতিদিন সকাল বিকাল কাজে যেতে যেতে প্রবাস জীবনের যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের যন্ত্রণা এই ধরনের লঘু আলাপে কিছুটা হলেও লাঘব হয়। এমনি এক সকালে প্রায় দৌড়ে সাবওয়ে স্টেশনে পৌঁছাতেই চোখের সামনে দিয়ে ট্রেন ছেড়ে চলে গেল। পরের ট্রেন দশ মিনিট পরে। বাধ্য হয়ে স্টেশনের অপেক্ষমাণ একটা সিটে বসে পড়ল। তখনই আফজালের সাথে আলাপ। আফজালও কাছাকাছি একটা স্টুডিও বাসায় থাকে। বছর চারেক আগে সে এদেশে এসেছে। এতদিনে সে এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটা বুঝে ফেলেছে। ম্যানহাটানের সুপার শপ মেসিতে সেলসম্যানের কাজ করে। দেশে দুজনেরই বাবা মা ভাইবোন দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে, স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন।
এরপর কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সাহানা এবং আফজালের প্রায় প্রতিদিনের যাত্রার সময় এবং ট্রেন এক হতে থাকল। কেউ একজন একটু পরে এলে অপেক্ষার সময় বড় অসহ্য হতে লাগল এবং বারবার আগমন পথে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘাড়টি ঘুরে যাচ্ছিল। এমনকি একদিন সাহানার আসতে দেরি হওয়ায় আফজাল ইচ্ছে করেই ট্রেন মিস করে স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইল।
এভাবে একদিন শনিবার বিকেলে তারা নিজেদের আবিষ্কার করল শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রুকলিন ব্রিজের উপর। সেখানে অগুনতি মানুষ যার যার আপন মনে পরপারে পারাপার হচ্ছে। কেউ পশ্চিম পাড়ের ম্যানহাটান থেকে পূর্বপাড়ের ব্রুকলিনে যাচ্ছে, কেউবা পূর্ব থেকে পশ্চিমে। ক্রমে সূর্য ম্যানহাটানের আকাশচুম্বি ভবনগুলোকে চুম্বন করে হাডসন নদীর ওপারে নিউ জার্সির আকাশে গোধূলির ললাটে দিনের শেষ স্ট্রোকটি এঁকে দিয়ে অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করার আয়োজন করছে। এদিকে কালের সাক্ষী ব্রুকলিন ব্রিজ নিথর নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে এক অপেক্ষমাণ নরনারীর অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকার নিগূঢ় অর্থ উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিচে বহমান ইস্টরিভার নদীর সেই ধৈর্য নেই। সে সামনে অপেক্ষমাণ নিউ ইয়র্ক উপসাগরের প্রশস্ত গহীনে হারিয়ে যেতে উদগ্রীব হয়ে ছুটে চলেছে।
ইস্টরিভার নদীর গতিপথ অনুসরণ করলে দূরে নিউ ইয়র্ক উপসাগরের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক স্ট্যাচু অব লিবার্টি দৃশ্যমান হয়। সেদিকে তাকিয়ে এই উদাসীন মানবদ্বয়ের মনে পরস্পর পৃথক থাকার স্বাধীনতাকে নিতান্ত পরাধীনতা বলে মনে হলো। শেষ পর্যন্ত এই বিমূঢ় মানবমানবী হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, খামাখা দুটি স্টুডিও বাসার জন্য পৃথক অর্থ খরচ করাও অর্থহীন। সুতরাং তারা সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতাকে স্ট্যাচু অব লিবার্টির মাধ্যমে মাননীয় ভলতেয়ার বরাবর বিসর্জন দিয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করবার সিদ্ধান্ত নিল।
কিছুদিন তারা জ্যাকসন হাইটসে থাকার পর বুঝতে পারল যে, বাঙালি সমাজ যতই এই মুক্ত সমাজে বসবাস করুক তাদের অনেকের ভেতরে বাস করে মধ্যযুগীয় এক মানস। পথে ঘাটে তাদের নিয়ে নানান কানাঘুষা, ফিসফিসানি চলতে শুরু করল। একসময় তারা চেনাজানা আত্মীয় স্বজনদের বাসায় যাওয়া ছেড়ে দিল। পরে দেখল যে, এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর পথ নেই।
সাহানার এক সহকর্মী তাদের এই অসুবিধার কথা জানত। তারই মাধ্যমে ব্রুকলিনের এই বাড়িওয়ালীর সাথে যোগাযোগ হয়। এবং বেশ সস্তায় এই বাড়িটি পেয়ে যায়। আজ দীর্ঘ দশটি বছর এখানে কেটে গেছে। এখানেই জন্ম হয়েছে তাদের দুই সন্তান- আট বছরের শাফিন আর তিন বছরের সারাহ। তাদের পেয়ে মার্গারেটার আনন্দের আর সীমা নেই। যখন তখন এসে নানান গিফট দিয়ে, আদর দিয়ে তিনি তাঁর নিঃসঙ্গ বুভুক্ষ হৃদয়কে শান্ত করেন।
আমেরিকায় আসবার পরে তাদের আর দেশে যাওয়া হয়নি। জীবন সংগ্রাম, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, দুটি বাচ্চা বড় করা, স্কুলে দেয়া, দেশে বাবামায়ের অভাবী সংসারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে এতগুলো বছর কেটে গেল। তাই এবারে তারা ঠিক করেছে সামারে স্কুল বন্ধ হলে দেশে যাবে। আফজালদের বাড়িতেও যাবে। সবাই তাদেরকে দেখবার জন্য উন্মূখ হয়ে আছে।
ব্রুকলিনের এই বাসায় ঢুকতে পরপর দুটো দরজা। প্রথম দরজা পার হলে কমন স্পেস। লিফট্ লবী। দ্বিতীয় দরজা খুললেই সাহানাদের ঘর। সাহানা দরজা খুলেই টেবিলের উপর মোবাইল ফোনটি দেখতে পেল। সেটি তুলে ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে শোবার ঘরে একনজর উঁকি দিল। গতকাল থেকে আফজালের শরীরটা ভাল না। জ্বরজ্বর ভাব, গলা ব্যথা, হাল্কা কাশি। আজকে আফজাল অফিসে যাবে না, বসকে বলে দিয়েছে। বাচ্চাদের স্কুল হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছে। নিউইয়র্ক শহরে করোনা ইনফেকশনের মাত্রা দ্রুত বেড়ে চলেছে। কিন্তু তাদের অফিস দোকানপাট এখনো বন্ধ হয়নি।
সাহানা আফজালের কপালে হাত ছোঁয়ায়। এখনো হাল্কা জ্বর।
-তুমি আবার ফিরে এলে যে?
-ভুলে মোবাইল ফেলে গিয়েছি, নিতে আসলাম। তোমার কেমন লাগছে এখন?
-এখন কিছুটা ভাল। ঠিক হয়ে যাবে।
-ডাক্তারকে একটু দেখাবে আজ?
-না, এখন থাক। তুমি চিন্তা করো না।
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাহানা বেরিয়ে পড়ে।
এভিনিউ এইচ এর এই স্টেশনের সাথে তার সম্পর্কটি বেশ আপন। এখানের স্টেশনমাস্টার, নিয়মিত যাত্রীরা প্রায় সবাই মুখচেনা হয়ে গেছে। জীবনের অনেক স্মৃতি এর সাথে জড়িয়ে আছে। বেশিরভাগ সময়ে সে কনি আইল্যান্ড থেকে ছেড়ে আসা কিউ ট্রেনে চেপে ম্যানহাটানের কর্মক্ষেত্রে পৌঁছায়। আজকেও তাই করল।
অফিসে দেরিতে পৌঁছালেও কোনো সমস্যা হলো না। কেননা বস নিজেই এখনো আসেননি। গতকাল থেকে বসের স্ত্রী অসুস্থ। জ্বরে ভুগছেন। তার দুজন সহকর্মীও করোনায় আক্রান্ত। শহরজুড়ে এক মহাআতঙ্ক গ্রাস করছে। বহির্বিশ্বের সাথে প্লেন যোগাযোগ এখনো চলছে। পৃথিবীকে সকল প্রান্ত থেকে এক অদৃশ্য অবিনাশী দজ্জাল ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে উদ্যত হয়েছে।
ব্যস্ত ম্যানহাটান ধীরে ধীরে জনশূন্য হতে শুরু করেছে। সারাদিনে কমসংখ্যক কাস্টমারই এলো সাহানাদের দোকানে। বাসার জন্য খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। বার কয়েক ফোন করে আফজাল ও বাচ্চাদের খবর নিয়েছে। আফজাল জানাল এখন জ্বর নেই, শরীর আগের চেয়ে ভাল লাগছে।
অফিস শেষে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে সে বাসায় ফিরল। জ্বর না থাকলেও সে আফজালকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গেল। ডাক্তার তাদের আশ্বস্ত করলেন। তবে করোনার পরীক্ষা করতে দিলেন।
পরেরদিন থেকে সমস্ত শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হলো। বহির্বিশ্বের সঙ্গে সব এয়ারলাইনস স্থগিত করা হলো। প্রতিদিন গভর্নর ক্যুমো তাঁর টিম নিয়ে পুরো পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করছেন, নগরবাসীর করণীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং পরবর্তী পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্বগুণে মুগ্ধ হয়ে সাহানা ইতিমধ্যেই অ্যান্ড্রু ক্যুমোকে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে মনে ভোট দিয়ে দিল।
বাজারে সম্ভাব্য ঘাটতি আঁচ করে সকাল থেকে প্রয়োজনীয় সব খাবার দাবার কিনে আনল সাহানা। দোকান থেকে টিস্যুপেপার আর স্যানিটাইজার মুহূর্তে উধাও। জীবনে কখনো এমনটি দেখেনি সে। দেশে ফোন করে বাবামা ভাইবোনের খবর নিল। সবাইকে সাবধানে থাকতে বলে নিজেরা তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে আফজালকে আলাদা ঘরে বিছানা করে দিয়ে সাহানা বাচ্চাদের নিয়ে ড্রয়িং রুমে শুয়ে পড়ল।
পরেরদিন সকালে স্কুল থেকে ফোন এলো। স্কুল বন্ধ হলেও বাচ্চাদের দুপুরের খাবার স্কুল থেকে দেয়া হবে। আফজালের শরীর একটু ভাল বোধ করায় সাহানা স্কুলে চলে গেল। রাস্তাঘাট ইতিমধ্যে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। যে শহর কখনো ঘুমায় না তা আজ এক অচেনা ভুতুড়ে নগর।
২
এরই মধ্যে ডাক্তার ফোন করে বললেন যে, আফজালের করোনা পজিটিভ। এরকমটাই আশংকা করেছিল সে। এখন বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে সব ম্যানেজ করবে? তার মাথা ঝিমঝিম করছে। হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যে তাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে বাইরে চলে গেছে। আইসিইউ তে বেড পাওয়া যাচ্ছে না। মৃত্যুহার দ্রুত বেড়ে চলেছে।
স্কুল থেকে বাসায় ঢুকেই আফজালের রুমে গেল সাহানা। তার কপালে হাত দিতেই বুকটা ধড?াস করে উঠল। সমস্ত শরীর নির্জীব হিমশীতল। “ওহ্ মাই গড!”
দ্রুত ৯১১ এ ফোন দিল। লাইন ব্যস্ত। বার কয়েক ডায়াল করার পর লাইন পেল। পুলিশ দুঃখ প্রকাশ করে জানাল যে, এই মুহূর্তে তারা কোনো টিম পাঠাতে পারছে না। সবাই ব্যস্ত রয়েছে। অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করতে বলে লাইন কেটে দিল। নিউ ইয়র্কে যেখানে যত পরিচিত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ছিল সবাইকে ফোন করে জানাল। সবাই ৯১১ এ যোগাযোগ করতে উপদেশ দিল কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না।
এভাবে অপেক্ষা করার পর সন্ধ্যার আগে আগে পুলিশ এলো। প্যারামেডিক আফজালকে পরীক্ষা করে বলল যে, সে অনেক আগেই মারা গেছে। মরচুয়ারিতে জায়গা না থাকায় মৃতদেহ এখনি নেয়া সম্ভব নয়। তারা ডাবল লেয়ার একটি প্লাস্টিক কফিনব্যাগে মৃতদেহ ঢুকিয়ে রুমটি লক করে চলে গেল।
শাফিন এবং সারাহ সাহানার দুই বাহু দু’দিক থেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। নিস্তব্ধ রাত। বাইরে কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেজে চলেছে।
৩
কখন যে চোখে তন্দ্রা লেগে এসেছিল মনে নেই। হঠাৎ কে যেন দরজায় নক করছে। এত রাতে কে আসতে পারে? সাহানা দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
-কে?
-সাহানা আমি। দরজা খোল।
সাহানা চমকে ওঠে। এত রাতে আফজাল তো বাইরে যায় না! সে কি তবে ভুল শুনছে?
-তোমার কাছে চাবি নেই?
-না সাহানা। চাবিটা হারিয়ে ফেলেছি। চল আমরা একসাথে চাবিটা খুঁজতে যাই।
সাহানার খুব মায়া হয়। সে দরজা খুলে দেয়। আফজাল হাত বাড়িয়ে সাহানার ডান হাতটি নিজের বাম হাতের মুঠোয় নিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দেখে সালাম তার রিকসা নিয়ে অপেক্ষা করছে। এই সালামটা কিছুতেই তার পিছু ছাড়বে না। রোকেয়া হল থেকে নিউমার্কেট, গাউছিয়া থেকে পলাশীর কাঁচাবাজার যেখানেই যেত এই সালাম ছিল বান্ধা রিকসাচালক। একবার সে আর লাভলী রিকসা নিয়ে বেইলী রোডে যাচ্ছিল। নাটক দেখতে। কার্জন হলের সামনে যেতেই এক ছিনতাইকারী মুহূর্তে সাহানার বুকের উপর ছুরি ঠেকিয়ে বসল। সাহানার তো ভয়ে হাতপা কেঁপে ঠা-া হয়ে এলো। ক্ষণিকের মধ্যে দেখা গেল সালাম ছিনতাইকারীর বুকের উপর বসা। ছুরি ছিটকে দূরে পড়ে আছে।
সাহানা আফজালকে নিয়ে সালামের রিকসায় উঠল।
-কোথায় যাইবেন আফা?
-নদীর পাড়ে চল।
-আইচ্ছা আফা।
সালাম ধীরে ধীরে রিকসার গতি বাড়ায়। শহরের রাস্তা একদম ফাঁকা। দু’পাশের লাইটপোস্টগুলো হাতে হাত মিলিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে পূর্ণ চাঁদ। ফকফকে জোছনায় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু আফজালের মুখটা ঝাপসা কেন?
-তোমার কি মন খারাপ আফজাল?
-না তো! জোছনা দেখছি।
সে সাহানার আরো কাছে ঘেঁষে বসে। তারপর কখন যে তারা ব্রুকলিন ব্রিজের উপর চলে এল টেরই পেল না।
-সালাম কোথায় গেল?
-ঐ তো চায়ের দোকানে।
-আচ্ছা আফজাল আমরা দেশে কবে যাব?
-কেন তুমি ভুলে গেছ? আগামীকালই আমাদের ফ্লাইট।
-এবার কিন্তু তোমাদের বাড়িতে প্রথম যাচ্ছি। শ্বশুর বাড়ি। আচ্ছা কোন্ শাড়িট পরব বল তো?
-নীল রঙের শাড়িটি।
-কী যে বল না ! বিয়ের শাড়ি নীল হয় বুঝি?
তারপর দুজনে হাত ধরাধরি করে ব্রিজের ঠিক মাঝখানে এসে দক্ষিণমুখী হয়ে দাঁড়ায়।
আফজাল বলে- “সাহানা, তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি চাবিটা নিয়ে আসি।”
এই বলে সে জোছনার ভেতর মিলিয়ে গেল।
কাছাকাছি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনগুলো বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের মতো অবিরাম বেজে চলেছে।
দরজায় ধাক্কার শব্দে সাহানা ধড়ফড় করে উঠে বসল। সকাল হয়ে গেছে। শাফিন এবং সারাহ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে তার দুর্বল শরীরখানি টেনে নিয়ে দরজা খুলে দিল।
পুলিশ এসেছে। মরচুয়ারিতে জায়গা খালি হয়েছে।
নগর-মহানগর: জবিতে সব দল-মতের ঐক্য অক্ষুণ্ণ থাকবে: রইছ উদ্দীন
নগর-মহানগর: ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ জামায়াত প্রার্থীর
নগর-মহানগর: সিলেটে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ
সারাদেশ: ১১ দলের বিক্ষোভ সমাবেশ আজ