২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের ত্রিভুজে’ আটকে ছিল। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি, সমতা ছিল নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে, আর শাসনব্যবস্থা জড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতি ও ক্ষমতাশীল ধনী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে। রোববার,(৩০ নভেম্বর ২০২৫) রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি
সমতা ছিল নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে
শাসনব্যবস্থা জড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতি ও ক্ষমতাশীল ধনী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে
তিনি আরও বলেন, ‘২০২২ সালের পর একের পর এক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে দেশ আজ এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে- একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও প্রকৃত জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, মানুষকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে নতুন ধরনের সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলা।’
‘বিয়ন্ড জবলেস গ্রোথ: টুওয়ার্ডস অ্যান এমপ্লয়মেন্ট-সেন্টারড পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ থ্রো আ পোস্ট-নিওলিবারাল লেন্স’ (বাংলাদেশে বেকারত্বহীন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতি কাঠামো) শীর্ষক এ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রেডরিক এবার্ট স্টিফটাং (এফইএস) এ আয়োজন করে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য সায়মা হক।
পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘সহনশীল রাষ্ট্র’ বা রেজিলিয়েন্ট অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখা হয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে দেশ এখন ‘আনন্দহীন রেজিলিয়েন্সের ফাঁদে’ আটকে গেছে। অর্থাৎ সহনশীলতা আমাদের শক্তি হলেও বর্তমানে তা আর আনন্দ দিচ্ছে না। সংকট মোকাবিলার চক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন নেই। কৃষক পরিবারের সন্তানরা এখন কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে না। এজন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বাড়াতে হবে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ও অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য ছোট নীতি ও প্রণোদনা দেয়া হলে সেটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারে।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয় তার সঙ্গে চাকরি তৈরি করার সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে প্রতিবছরে উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৫ লাখের মতো। কাজেই প্রবৃদ্ধি হলেই কর্মসংস্থান হবে, এই ধারণা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে চাকরি তৈরি হবে, এমন জিনিসকে কেন্দ্র করে আমাদের সব নীতি সাজাতে হবে।’
প্যানেল আলোচনায় বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘১৫ বছর আগে দেশে বছরে তিন লাখের মতো গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতো। সেখানে এখন প্রতিবছর সাড়ে ৪ লাখের বেশি গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর ৭০ শতাংশই আসে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে। এই কলেজগুলো বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।’
প্রবাসী শ্রম রপ্তানিতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কথাও তুলে ধরেন ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর ১২ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের ৯০-৯৫ শতাংশই ম্যাট্রিক পাস।’ আমাদের বরং সাড়ে চার লাখ গ্র্যাজুয়েট থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ মানুষ বিদেশে পাঠানো উচিত ছিল। এ অবস্থায় নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়া উচিত বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রের কারণে কর্মসংস্থানের হার কমছে। শ্রমিকদের পুনঃ প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো অধিদপ্তর নেই। এটি দেশে কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা।’
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
রোববার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের ত্রিভুজে’ আটকে ছিল। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি, সমতা ছিল নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে, আর শাসনব্যবস্থা জড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতি ও ক্ষমতাশীল ধনী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে। রোববার,(৩০ নভেম্বর ২০২৫) রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি
সমতা ছিল নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে
শাসনব্যবস্থা জড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতি ও ক্ষমতাশীল ধনী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে
তিনি আরও বলেন, ‘২০২২ সালের পর একের পর এক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে দেশ আজ এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে- একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও প্রকৃত জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, মানুষকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে নতুন ধরনের সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলা।’
‘বিয়ন্ড জবলেস গ্রোথ: টুওয়ার্ডস অ্যান এমপ্লয়মেন্ট-সেন্টারড পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ থ্রো আ পোস্ট-নিওলিবারাল লেন্স’ (বাংলাদেশে বেকারত্বহীন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতি কাঠামো) শীর্ষক এ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রেডরিক এবার্ট স্টিফটাং (এফইএস) এ আয়োজন করে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য সায়মা হক।
পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘সহনশীল রাষ্ট্র’ বা রেজিলিয়েন্ট অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখা হয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে দেশ এখন ‘আনন্দহীন রেজিলিয়েন্সের ফাঁদে’ আটকে গেছে। অর্থাৎ সহনশীলতা আমাদের শক্তি হলেও বর্তমানে তা আর আনন্দ দিচ্ছে না। সংকট মোকাবিলার চক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন নেই। কৃষক পরিবারের সন্তানরা এখন কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে না। এজন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বাড়াতে হবে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ও অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য ছোট নীতি ও প্রণোদনা দেয়া হলে সেটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারে।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয় তার সঙ্গে চাকরি তৈরি করার সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে প্রতিবছরে উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৫ লাখের মতো। কাজেই প্রবৃদ্ধি হলেই কর্মসংস্থান হবে, এই ধারণা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে চাকরি তৈরি হবে, এমন জিনিসকে কেন্দ্র করে আমাদের সব নীতি সাজাতে হবে।’
প্যানেল আলোচনায় বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘১৫ বছর আগে দেশে বছরে তিন লাখের মতো গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতো। সেখানে এখন প্রতিবছর সাড়ে ৪ লাখের বেশি গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর ৭০ শতাংশই আসে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে। এই কলেজগুলো বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।’
প্রবাসী শ্রম রপ্তানিতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কথাও তুলে ধরেন ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর ১২ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের ৯০-৯৫ শতাংশই ম্যাট্রিক পাস।’ আমাদের বরং সাড়ে চার লাখ গ্র্যাজুয়েট থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ মানুষ বিদেশে পাঠানো উচিত ছিল। এ অবস্থায় নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়া উচিত বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রের কারণে কর্মসংস্থানের হার কমছে। শ্রমিকদের পুনঃ প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো অধিদপ্তর নেই। এটি দেশে কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা।’