বসন্তের আকাশ হঠাৎ অন্ধকার, মনে বিষণ্ণতার ছায়া

রোজিনা রোজী ও মৌমিতা মাসিয়াত

সকালে জানালা খুলে দেখলেন ঝকঝকে রোদ। মনটা চনমন করে উঠল। তবে একটু পরই দেখলেন আকাশ ধূসর। চারদিকে যেন আঁধার নেমে এসেছে। এমন মুহূর্ত বর্ষাকালে হলে গুনগুন করে গেয়ে উঠতেন, “আকাশ এতো মেঘলা/ যে-ও নাকো একলা/ এখনি নামবে অন্ধকার...।”

কিন্তু না। এতো রক্ত পলাশ, শিমুল ফোটা বসন্তকাল। সকালের রোদ কোথায় হারাল? কেন আকাশজুড়ে নেমে এলো হঠাৎ অন্ধকার?বৃষ্টি হবে? নাকি বড় কোনো বিপদের ইঙ্গিত? মনে অকারণ অস্বস্তি। কেমন যেন সকালটা এলোমেলো হয়ে গেল।

বসন্তের শুরুতে রাজধানীতে এমন দৃশ্য কিন্তু নতুন নয়। তবে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া আকাশ শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়; আমাদের মনেও ছায়া ফেলে। চঞ্চল মনটা থমকে যায়। আবহাওয়াবিদদের ভাষায় ঘটনাটি ‘ধোঁয়াশা’। শীতের বিদায় আর গরমের আগমনের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ এভাবে বদলে যায় প্রকৃতি।

এ সময় বায়ুপ্রবাহের দিক বদলায়। উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক হাওয়া সরে গিয়ে দক্ষিণের উষ্ণ, আর্দ্র হাওয়া ঢুকতে শুরু করে। দুই প্রবাহের সংঘাতে বাতাস অস্থির হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যোগ হয় দূষিত কণা, জলীয় বাষ্প আর দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ার প্রভাব। ফলে আকাশ কখনও মেঘলা, কখনও ধূসর, কখনও হঠাৎ অন্ধকার মনে হয়। যদিও প্রকৃতপক্ষে তা ঘন মেঘ নয়।

ঢাকার বায়ুদূষণের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে আইকিউএয়ার। বায়ুর মান ২০০ পেরোলে সেটিকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। ৩০০ হলে ‘দুর্যোগপূর্ণ’। সম্প্রতি ঢাকার মান ২৮০–৩০০ ঘরে ওঠানামা করছে।অর্থাৎ বাতাসে অদৃশ্য কণার ঘনত্ব এত বেশি যে তা চোখে না পড়লেও শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞান বলছে, বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম কণা শুধু ফুসফুসে নয়, রক্তপ্রবাহে ঢুকে মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি দূষণ উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগে ঘাটতি এমনকি বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ায়। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। আকাশ যখন হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়, আমাদের মস্তিষ্ক সেটিকে সম্ভাব্য বিপদের সংকেত হিসেবে ধরে।

বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষ হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তনকে ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবেই শিখেছে। ঝড়, বৃষ্টি, শিকারির আক্রমণ- সবই ছিল টিকে থাকার প্রশ্ন। আলো কমে গেলে শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন সামান্য বেড়ে যেতে পারে। আপনি হয়তো টেরই পান না। অথচ মন একটু ভারী লাগে। কাজের আগ্রহ কমে। অকারণ অস্থিরতা জন্মায়।

বসন্ত এখন আর আগের মতো স্থির নয়। তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ঋতুর সীমানা ঝাপসা হচ্ছে। উষ্ণতা বাড়লে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বাড়ে। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দূষিত কণাকে দীর্ঘ সময় ভাসমান রাখে। ফলে ধোঁয়াশা ঘন হয়। আকাশের রঙ বদলায়।

সাগরে লঘুচাপ তৈরি হলে তার সীমিত প্রভাবও কখনও যুক্ত হয়। যদিও সব সময় বৃষ্টি নামে না, তবু আকাশের রঙ বদলে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অস্থিরতা বাড়ছে। কখনও দীর্ঘ শুষ্ক সময়, কখনও হঠাৎ বৃষ্টি। আমাদের মনও এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করছে।

মানুষ আলোকনির্ভর প্রাণী। সূর্যালোক আমাদের শরীরে সেরোটোনিন বাড়ায়, যা ভালো লাগা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। হঠাৎ আলো কমে গেলে মস্তিষ্কের জৈবঘড়ি সাময়িক বিভ্রান্ত হয়। বিশেষ করে সকালে যদি আকাশ ধূসর হয়, অনেকেরই ঘুম ঘুম লাগে, কাজের গতি কমে।

শহুরে জীবনে আমরা এমনিতেই কংক্রিট, শব্দ আর চাপের মধ্যে থাকি। তার ওপর যদি আকাশও ভারী হয়, মনও ভারী হয়ে যায়। কেউ কেউ অকারণ মনখারাপ, কেউ বিরক্তি, কেউ আবার অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেন। এটা দুর্বলতা নয়; পরিবেশের প্রতি স্বাভাবিক সাড়া।

তবে কিন্তু সব অন্ধকারই ঝড়ের পূর্বাভাস নয়। দূষণমাত্রা বেশি থাকলে বাইরে কম যাবেন। অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন। ঘরে গাছ রাখা বা এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার সহায়ক হতে পারে। সকালে পর্যাপ্ত আলো পাওয়ার চেষ্টা করুন। জানালা খুলে বসুন। ছাদে কয়েক মিনিট হাঁটুন। হালকা ব্যায়াম করতে পারেন।

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/20Feb26/news/%E0%A6%A4%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A3%E0%A7%80.JPG

সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মনের পরিবর্তনকে অস্বীকার না করে স্বীকার করুন। “আজকে একটু অদ্ভুত লাগছে” এ কথা নিজেকে বলা মানেই আপনি সচেতন। পরিবেশ বদলালে মনও বদলায়, এটাই স্বাভাবিক বিবর্তন।

বসন্তের এই হঠাৎ অন্ধকার আকাশ তাই শুধু আবহাওয়ার খেলা নয়; এটি আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন আর নগরজীবনের চাপের এক সম্মিলিত ছায়া। তবে যেমন হঠাৎ অন্ধকার নামে, তেমনি কিছুক্ষণ পর আকাশ পরিষ্কারও হয়। মনও তেমনই, আলো ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে।

‘নগর-মহানগর’ : আরও খবর

» মুন্সীগঞ্জে চালককে হত্যা করে অটো ছিনতাই, ৪ জন গ্রেপ্তার

সম্প্রতি