নির্বাচনে বামপন্থিদের ভরাডুবি, জামানত টেকেনি ‘যুক্তফ্রন্টের’ ১৪৭ প্রার্থীর

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো আসনেই মুখ রক্ষা করতে পারেননি বামপন্থি দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা। এই জোটের ১৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে কোনো প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত জামানত টেকাতে পারেননি। অর্থাৎ আসনে গৃহীত মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগও তারা পাননি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ১৪৭ প্রার্থী মোট ০.১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এরমধ্যে প্রাচীন বামপন্থি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কাস্তে প্রতীক নিয়ে ৬৩ আসনে ০.০৮ শতাংশ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মই প্রতীক নিয়ে ৩৬ আসনে ০.০৫ শতাংশ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্ক্সবাদী) কাঁচি প্রতীক নিয়ে ৩৩ আসনে ০.০২ শতাংশ ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( বাংলাদেশ জাসদ) মোটরগাড়ি প্রতীক নিয়ে ১৫ আসনে ০.০২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

এই জোটের মোট ভোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৭৮। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের এই চারটি দলের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রয়েছে। অনিবন্ধিত আরও ৬টি দল যুক্তফ্রন্টের নিবন্ধিত শরিক দলগুলোর প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এই দলগুলো হলো বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ সামজতান্ত্রিক আন্দোলন, ঐক্য ন্যাপ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব) ও সোনার বাংলা পার্টি। এই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে প্রার্থী দেয়। মোট ৯৭টি আসনে জোটের একক প্রার্থী দেয়া হয়েছিল। তবে এর বাইরে ৫০টি আসনে জোটভুক্ত দলগুলোর একাধিক প্রার্থী নির্বাচন করেছেন।

বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ার লক্ষ্যে নির্বাচনের আগে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে জোট গঠন করে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল। গত বছর ২৯ নভেম্বর বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ আয়োজিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এই যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। নতুন এই জোটে পরে আরও বাম-প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক দল ও সংগঠনকে যুক্ত করা হয় । সবমিলিয়ে এই জোটভুক্ত দলগুলোর প্রার্থী ছিল ১৪৭টি আসনে। এরমধ্যে সিপিবির প্রার্থী ছিল ৬৫ আসনে, বাসদের প্রার্থী ছিল ৩৭ আসনে, বাসদের (মার্ক্সবাদী) ৩৩ আসনে এবং বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী ছিল ১৫টি আসনে।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন জোটের শরিক বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী মণীষা চক্রবর্তী। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বরিশাল-৫ আসন থেকে। মণীষা চক্রবর্তী ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পেয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনিও তার জামানত রক্ষা করতে পারেননি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আসনে যত সংখ্যক ভোট পড়বে, তার আট ভাগের এক ভাগের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ১৪৭টি আসনে বাম দলগুলোর যে প্রার্থীরা লড়েছিলেন, তারা সেসব আসনের প্রত্যেকটিতে গৃহীত মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগও তারা পাননি

এই জোটের শরিক দল বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে বিজয়ী হন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে জামানত টিকিয়ে রাখতে পারেননি। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি ৩ হাজার ১০ ভোট পেয়েছেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুইজনই জামানত হারিয়েছেন। কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন প্রার্থী নরসিংদী-৪ আসন থেকে পেয়েছেন মাত্র ৮১৭ ভোট এবং আবদুল্লাহ কাফী রতন কুমিল্লা-৫ আসনে পেয়েছেন ১৮৪ ভোট। এই জোটের অধিকাংশ প্রার্থীই ভোট পেয়েছেন এক হাজারের নিচে। তবে কেনো প্রার্থী পাঁচ হাজারের ওপরে ভোট পাননি।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক সিপিবি থেকে মোট ৬৫টি আসনে প্রার্থী দেয়া হয়েছিল। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন খুলনা-১ আসনের প্রার্থী কিশোর রায়। তিনি ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৮৪২টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন নেত্রকোনা-১ আসনের প্রার্থী আলকাছ উদ্দিন মীর। তিনি ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৪২৯টি।

নির্বাচনে এই ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ চহির চন্দন বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে প্রথম থেকেই আমাদের এই দাবিটা ছিল, বিশেষ করে আমরা বামপন্থিরা এটা জোরেশোরে বলার চেষ্টা করেছি। এবং নির্বাচনটা হয়েছে; নির্বাচনে ত্রুটি ছিল কিন্তু একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘এবারের ভোটটা হয়েছে একটি পোলারাইজড ভোট। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বনাম অন্যরা; বিশেষ করে জামায়াত বনাম অন্য শক্তির সঙ্গে। এখানে যেটা হয়েছে, আমাদের দিকের লোকজন যারা আছে, তারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকানোর জন্য তাদের ভোটগুলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষকে দিয়েছে। এটা হলো একটি বড় কারণ।’ তাছাড়া নিজেদের সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা থাকার কথা স্বীকার করে চন্দন বলেন, ‘আমরা পুরো শক্তিটাকে নামাতে পারি নাই, সেই জায়গাটাতে আমাদের একটা ঘাটতি আছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, যতক্ষণ শ্রেণী সংগ্রাম এবং জাতীয় সংগ্রামকে একত্র করে একটি ‘ন্যাশনাল ওয়েভ’ (জাতীয় জোয়ার/কাঠামো) দাঁড় করানো না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় না। আমরা সেই ন্যাশনাল কারেন্ট বা জোয়ারটা এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারি নাই। সেটা চেষ্টা আমরা করছি। ওই জাতীয় জোয়ার তৈরি না হওয়ার ফলেই আমাদের নির্বাচনে এই ঘাটতি বা ফলাফলে আমরা আশানুরূপ ফল পাই নাই। এটা একটা বিরাট কারণ, কারণ ন্যাশনাল ওয়েভ না থাকলে হয় না।’

?সেই ন্যাশনাল ওয়েভ কীভাবে তৈরি করবেন জানতে চাইলে সিপিবির এই সভাপতি বলেন, ‘এজন্যই আমরা বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং কমিউনিস্ট পার্টি মানে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে যেমন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে সংগ্রাম করছি, বন্দর রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছি এগুলো আমরা করি। সেই সংগ্রামগুলোকে শক্তিশালী করার ভেতর দিয়েই একটি ন্যাশনাল ওয়েভ আমরা তৈরি করতে পারবো বলে মনে করি। তা না হলে অগ্রসর হওয়া যাবে না। আমাদের ভোটে যেটা অতীতেও দেখেছি যে এই পার্সেন্টেজেই থাকে। এটা যে এখনকার ব্যাপারটা তা না। ২০০৮ সালে দেখেছি, ১৯৯৬ সালে বা ২০০১ সালেও দেখেছি এ ধরনের পার্সেন্টেজ থাকে আমাদের। এই জায়গাটাতে আমরা এখনও জাতীয়ভাবে কোনো ওয়েভ তৈরি করতে পারি নাই।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» টেকনাফে মালয়েশিয়া পাচারচেষ্টা: শিশুসহ ১৫ জন উদ্ধার

» সহযোগিতার জন্য সেনাপ্রধানকে প্রধান উপদেষ্টার ধন্যবাদ

» জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ রেখে সই করেছি: নাহিদ ইসলাম

» নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক’ হয়েছে: টিআইবি

» একই দিনে তিন শপথ, একটি নিয়ে বিএনপিতে অস্পষ্টতা

» নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান ৩৭ বিশিষ্টজনের

» নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি

সম্প্রতি