ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আজ সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নেবেন। একই সঙ্গে তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও আলাদা শপথ নেয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচিতদের দুটি শপথের বিষয়ে প্রস্তুতিও নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বর্তমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই।’ তার মতে, এই শপথ তখনই সম্ভব যদি এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়, প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয় এবং শপথ পরিচালনার ফরম বা পদ্ধতি নির্ধারিত হয়
সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ পড়াতে সিইসিকে চিঠি দিয়েছে সংসদ সচিবালয়
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ পড়ানোর এখতিয়ার সিইসির নেই: বিএনপি
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের শপথের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন, শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি
এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে কিনা এ নিয়ে দলটির মধ্যে অস্পষ্টতা ও আপত্তি রয়েছে।
বিএনপি মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। বিদ্যমান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন পদের শপথের বিষয়ে বলা আছে। সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথের কথা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয় নেই।
এদিকে সোমবার, (১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নবনির্বাচিত সদস্যরা প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। আজ সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে তাদের শপথ অনুষ্ঠান হবে।
সকালের এ আয়োজনের পর বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে নতুন সরকারের শপথ। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এবার মন্ত্রিসভার শপথের আয়োজন করা হয়েছে।
সিইসিকে চিঠি
সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ- দুটো শপথই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনকে পড়াতে নির্বাচন কমিশন [ইসি] সচিবালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংসদ সচিবালয়। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সোমবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সংসদ সচিবালয় থেকে সিইসি মহোদয়কে শপথ পাঠের সময় ও তারিখের বিষয়ে পাঠিয়েছে। দুটি শপথই পড়াবেন তিনি। সকাল ১০টা থেকে এ শপথ পাঠ হবে।’
আইনি এখতিয়ার নেই
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বর্তমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই।’ তার মতে, এই শপথ তখনই সম্ভব যদি এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়, প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয় এবং শপথ পরিচালনার ফরম বা পদ্ধতি নির্ধারিত হয়।
সোমবার দুপুরে ঢাকার গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কনস্টিটিউশনে (সংবিধান) ধারণ হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন) হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়, এতগুলো হয়। তারপরে হলে হতে পারে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করা। আজ সকাল ১০টায় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সাংবিধানিকভাবে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অ্যাভেইলেবল না থাকলে বা অপারগ হলে বা তাদের মনোনীত প্রতিনিধি না থাকলে দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। সে হিসেবে আগামীকাল সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ হবে। এটা সিইসির সাংবিধানিক এখতিয়ার আছে।’
বিএনপি মনে করে, বর্তমান সংবিধানে সংস্কার পরিষদের শপথ পড়ানোর কোনো আইনি এখতিয়ার সিইসির নেই। দলটি বলছে, তারা সংবিধান সংস্কারের বিরোধী নয়, তবে তারা মনে করে যেকোনো স্থায়ী সংস্কার কেবল নতুন নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
————একইদিনে দুই ভোট
শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশে গঠন করে বেশকিছু সংস্কার কমিশন। সর্বশেষ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করে এবং জুলাই সনদের আদেশ জারি।
অন্তর্বর্তী সরকার একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে ইসি। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবপার অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ২৯৭ আসনের ফলাফলে বিএনপি ২০৯ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিএনপির এক সময়কার মিত্র জামায়াত ইসলামী ৬৮ আসন পায়।
বিএনপি জোটে থাকা মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পাটি-বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি এবং গণঅধিকার পরিষদ ১টি আসন পায়।
জামায়াত জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসন পায়।
জামায়াত জোট ছেড়ে আসা চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পায় ১টি আসন।
নির্বাচনে ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন। তারা সবাই বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নেন। বিদ্রোহী হওয়ার কারণে এদের সবাইকে দল থেকে বহিস্কার করে বিএনপি।
একইদিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ ভোট পড়ে ৬৮ শতাংশের বেশি। না ভোট পড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ।
—-আমন্ত্রণপত্র
এদিকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে সংসদ সচিবালয়। এ প্রসঙ্গে সোমবার সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে ‘শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ইস্যু করা হচ্ছে। কোনো কারণে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছাতে না পারলে শপথের দিন সংসদ ভবনের টানেলের অভ্যন্তরে মূল প্রবেশপথে স্থাপিত ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে তা সংগ্রহ করা যাবে।’ নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে সংসদ সচিবালয়।
দেশের আইনসভার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনের শপথ নেন আগের সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে। স্পিকার অপারগ হলে ডেপুটি স্পিকার শপথ পড়ান। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে সেই। ডেপুটি স্পিকার কারাগারে বন্দী। সে কারণে নতুন এমপিরা এবার শপথ নেবেন সিইসির কাছ থেকে।
——জুলাই সনদ আদেশ
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী সংস্কার আনবেন তারা।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর। ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সে কারণে এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পর তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদাভাবে শপথ নিতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার ভোটের পর পরদিন রাতে ২৯৭ আসনে নির্বাচিতদের গেজেট করা হয়। সোমবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসন রেখে বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দেন। সেক্ষেত্রে মঙ্গলবার ২৯৬ জন শপথ নেবেন। সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে দুই শপথ ‘পর্যায়ক্রমে’ হবে বলে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে।