image
সোমবার বেতারে বিদায়ী ভাষণ দেন মুহাম্মদ ইউনূস -সংবাদ

সফলতা ও ব্যর্থতা বিচারের ভার আপনাদের: বিদায় ভাষণে ইউনূস

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

অন্তর্বতী সরকারের কোথায় কতটুকু সফলতা, কোথায় কী ব্যর্থতা- সে বিচারের ভার দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে বিদয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারার আগে সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ দেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান।

একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান

দেশের ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার যেসব পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তা ধরে রাখতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমি ও আমার সহকর্মীরা- সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকল।”

শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসন অবসানের পর অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস।

এই সরকারের তত্ত্বাবধানে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবার বিকেল জাতীয় সংসদ ভবনের দাক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ হবে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও সেখানে উপস্থিত থাকবেন। মূলত এর মধ্যে দিয়েই তার দেড় বছরের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটবে।

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, “গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, একটি কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা-সমালোচনা করতে পারা, জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হল, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের অধিকার নিশ্চিত হল, এই ধারা যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের আপামর জনগণ এবং সকল রাজনৈতিক পক্ষ ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে এই ধারাকে আগামী দিনগুলিতে রক্ষা করবে, সমৃদ্ধ করবে।”

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণের শুরুতেই একটি ‘উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য’ সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, “এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

তিনি বলেন, “এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হল গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আগামী দিন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে–এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।”

২০০৪ সালের অগাস্টে কোন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “চব্বিশের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মানুষ এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি উচ্চারণ করেছিল। সেই সময় দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সংকটে নিপতিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, গণতন্ত্র হয়েছিল ধুলিস্যাৎ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত।”

তিনি বলেন, “ঠিক সেই সংকটময় সময়ে আমাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল—একটি লক্ষ্য সামনে রেখে। বাংলাদেশকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সংস্কার। বিচার। সেই দায়িত্ব পালনে অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল হয়েছে, তা বিচারের ভার দেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে বিদায়ী সরকারপ্রধান বলেন, “আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।”

তার ভাষায়, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার “নতুন অভিযাত্রার সূচনা; নতুন বাংলাদেশের জন্ম।” এই অর্জনের পেছনে যারা ছিলেন- জুলাইয়ে সেই ‘শহীদ’ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের অভূতপূর্ব ত্যাগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হত না।”

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল-তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তিনি তথ্য দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই সংস্কারসমূহ নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।”

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ‘অত্যন্ত ভঙ্গুর’ ছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না।”

বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে সংস্কারের কথাও প্রধান উপদেষ্টা বলেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যেন আর কখনো মানবাধিকারহীন রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—সে লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এবং কমিশন গঠন করা হয়েছে।”

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাই- একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে।”

দেশের শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ- দায়িত্ব থেকে বিদায় নেয়ার আগে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায়ী ভাষণ শেষ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» টেকনাফে মালয়েশিয়া পাচারচেষ্টা: শিশুসহ ১৫ জন উদ্ধার

» সহযোগিতার জন্য সেনাপ্রধানকে প্রধান উপদেষ্টার ধন্যবাদ

» জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ রেখে সই করেছি: নাহিদ ইসলাম

» নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক’ হয়েছে: টিআইবি

» একই দিনে তিন শপথ, একটি নিয়ে বিএনপিতে অস্পষ্টতা

» নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান ৩৭ বিশিষ্টজনের

» নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি

» নির্বাচনে বামপন্থিদের ভরাডুবি, জামানত টেকেনি ‘যুক্তফ্রন্টের’ ১৪৭ প্রার্থীর

সম্প্রতি