image

আলোচিতরা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ে হলেন উপদেষ্টা, নতুন সরকারে তারুণ্যের জয় জয়কার

মহসীন ইসলাম টুটুল

দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে সরকার গঠনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার মন্ত্রিসভা। মোট ৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিপরিষদে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ অনেক নেতা বাদ পড়েছেন তবে তারা যায়গা পেয়েছেন উপদেষ্টা পরিষদে। আর শূন্যস্থানপূরণ করা হয়েছে নতুন মুখ দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাদের একজন। বিএনপি নেতার বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই মন্ত্রিসভার বিন্যাসে।

প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় পূর্ণ মন্ত্রী ২৫ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, তারেক রহমান তার সরকার সাজিয়েছেন ৪০ জন সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে। ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে ১৬ জন এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই প্রথমবারের মতো এই দায়িত্ব পেয়েছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিলেন।

নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে দলের শীর্ষস্থানীয় ও অভিজ্ঞ নেতাদের বাদ পড়ার ঘটনায়। আলোচনায় থাকলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং আব্দুল মঈন খান মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এই চারজনই খালেদা জিয়ার বিগত মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

এছাড়া সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, আমান উল্লাহ আমানও নতুন সরকারে ডাক পাননি। কখনো সংসদ সদস্য না হলেও নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভীও নতুন সরকারে ডাক পাননি। দলের ভেতর গুঞ্জন রয়েছে, কৌশলগত কারণে তাদের মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মতে, ‘চেয়ারম্যানের নিশ্চয়ই ভিন্ন পরিকল্পনা থাকতে পারে।’ তাদের জানিয়েছেন, খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে রাষ্ট্রপতি এবং আব্দুল মঈন খানকে স্পিকার করার বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।

পুরনোদের পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা হয়নি। অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ ঘটাতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে। মির্জা ফখরুল এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগেও খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রীসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

আলোচিত যারা মন্ত্রীসভায় যায়গা পাননি তাদের মধ্যে ১০ জনকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা করা হয়েছে। তবে উপদেষ্টাদের কার কী দায়িত্ব হবে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল ইসলাম, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সম্পাদক ও টেলিভিশন আলোচক জাহেদুর রহমান, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখাপাত্র ড. মাহদী আমিন, বিএনপি রিসার্চ অ্যান্ড মনিটরিং সেলের প্রধান রেহান আসিফ আসাদ।

সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার এক-দশমাংশ সদস্য সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পারেন, যা ‘টেকনোক্র্যাট কোটা’ হিসেবে পরিচিত। এই কোটায় তিনজন স্থান পেয়েছেন, যা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে এসেছেন খলিলুর রহমান, যিনি পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা’ এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা ও রোহিঙ্গা করিডোর ইস্যুতে তার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ভেতরেই বিতর্ক ছিল, এমনকি তার অপসারণও চাওয়া হয়েছিল। তবুও পররাষ্ট্র ক্যাডারের সাবেক এই কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক টেকনোক্র্যাট কোটায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। ঢাকা-১৬ আসনে নির্বাচনে পরাজিত হলেও ক্রীড়াঙ্গনে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া কুমিল্লা থেকে মনোনয়নবঞ্চিত নেতা হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিনকেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা হয়েছে।

তারেক রহমানের সরকারে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মূল্যায়ন করা হয়েছে, তবে তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

তবে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের মতো সিনিয়র নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। এ নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাইফুল হক। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়ে একলা চলো নীতির দিকে যাচ্ছে। নতুন মন্ত্রিসভায় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখা গেল।’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, দুর্দিনের সঙ্গীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠনের তাৎপর্য বা অভিঘাত কিছুদিন পর বোঝা যাবে।

নতুনদের মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মিজানুর রহমান মিনু, এবং শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির মতো নেতারা। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীদের তালিকায় রয়েছেন শামা ওবায়েদ, ইশরাক হোসেন এবং সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর মতো তরুণ নেতৃত্ব।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি