নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত, কেন?

সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, ‘ভোটগ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করতে পারেন।’

বিদায় অত্যাসন্ন- এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করছে। নিচ্ছে বড় বড় সিদ্ধান্ত। কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার আয়োজন করেছে।

দেশের ক্রান্তিকালে দায়িত্ব নেয়া একটি অনির্বাচিত সরকারের এসব পদক্ষেপে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য কী সেটা জানতে চাইছে নাগরিকরা। দেশে কি যুদ্ধাবস্থা চলছে বা কোনো যুদ্ধের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে যে অন্তর্বর্তী একটি সরকার যুদ্ধের সরঞ্জাম কেনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছে?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনির্বাচিত সরকারের এখতিয়ার কতটুকু? দেশের গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া বা এ নিয়ে চুক্তি করার দায়িত্ব তাদেরকে কে দিয়েছে? তাদের ম্যান্ডেট কী? নির্বাচন করে দ্রুত গণতন্ত্রে ফেরা ও রুটিন ওয়ার্ক করাই এধরনের সরকারের সীমারেখা।

৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি কি তারা রাখতে পারছে? বিচার নিয়ে তারা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চাইলেও জনমনে এর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নের মীমাংসা অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারেনি।

আমরা শুরু থেকেই বলেছি সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরই এই কাজ করা উচিত। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে প্রহসনই করেছে কেবল- এই অভিযোগ অনেকের। নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকের অনীহা ছিল। অভিযোগ আছে, সরকারের ভেতরের একটি অংশ নির্বাচন না হলেই খুশি হন। শেষ পর‌্যন্ত একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

অনেক প্রশ্ন নিজেরা সৃষ্টি করে এবং সেসব প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে বিদায়ের ক্ষণগুনছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে নিতে তারা আরও প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রশ্নে প্রশ্নে তারা বিদ্ধ হচ্ছে কিন্তু বিতর্কিত কর্মকা- থেকে বিরত হচ্ছে না। বরং কত দ্রুত এসব কর্মকাণ্ড করা যায় সেটাই যেন তাদের লক্ষ্য। শুল্কের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, চীন ও জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতার পথে হাঁটছে তারা।

যে কাজ একটি নির্বাচিত সরকারের করবার কথা সে কাজে তাদের এত আগ্রহ কেন?

সরকারের ব্যাখ্যা হলো, এসবই চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। যুক্তি দেয়া হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সময়সীমা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার কারণে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার কথা বলা হচ্ছে।

তবে কেবল সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রশ্ন উঠছে না। সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে নন-ডিসক্লোজার চুক্তির আওতায় আলোচনা চালানো, অংশীজনদের যথাযথভাবে যুক্ত না করা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি করা-এসব বিষয় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এসব চুক্তি সংশোধন করতে চাইলে আইনি, কূটনৈতিক ও আর্থিক জটিলতার মুখে পড়বে কিনা সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কোনো কোনো বিশ্লেষক অন্তর্বর্তী সরকারের এসব পদক্ষেপ ‘নীতিগত সীমা লঙ্ঘন’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সরকারের যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট থাকা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা বলতে চাই, যথেষ্ট হয়েছে। আপনারা এখন নির্বাচনটাই ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন করুন। ভালোয় ভালোয় বিদায় নিন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার গঠিত হোক। দেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরুক। আপনাদের যেসব কাজ না করলে এবং সিদ্ধান্ত না নিলেও জনগণের চলবে, সেসব কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকুন।

সম্প্রতি