জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ঢাকার বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের মন্ত্রিপাড়ায় তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সকল ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮,৫০০ থেকে ৯,০৩০ বর্গফুট। এই জন্য ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা, যা বঙ্গবন্ধুর আমলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের সমান। এই সকল ভবনে থাকবেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে মন্ত্রী এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের থাকার সুবন্দোবস্ত রয়েছে- মন্ত্রীদের জন্য রয়েছে ৭১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট যা কোন সরকারের আমলেই পূর্ণ হয়নি; তারপরও কেন তাদের জন্য নতুন ভবন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দিতে পারেনি। সচিবদের জন্য রয়েছে ইস্কাটনে ‘সচিব নিবাস’, কাকরাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য রয়েছে ২০ তলা আবাসিক ভবন- ‘জাজেস কমপ্লেক্স’। সচিব নিবাস ও জাজেস কমপ্লেক্সে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট। এই দুটি ভবনে নাকি প্রায় সময়ই ফ্ল্যাট খালি থাকে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর মতো সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত বাসভবন রয়েছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়েও বিভাগীয় প্রধান, জেলা প্রশাসক এবং টিএনওদের জন্য রয়েছে বিরাট বিরাট এলাকাজুড়ে বিশাল বিশাল প্রাসাদ।
৩০-৪০ বছর আগেও ঢাকা শহরে আবাসিক সংকট ছিল ভয়াবহ। বিদেশ থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসার পর আমার মেজো ভাই কূটনৈতিক মহিউদ্দিন আহমদকে প্রতিবারই সার্কিট হাউজে থাকতে হয়েছে, কারণ তার কোন নিজস্ব ফ্ল্যাট-বাড়ি ছিল না। পর্যাপ্ত আবাসের ব্যবস্থা না থাকায় তখন সরকারের তরফ থেকেও বাসা বরাদ্দ পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। সরকারের বাসা প্রাপ্তির তালিকায় সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাসা না দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বাসা বরাদ্দ দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তার সিলেটের আরেকজন জুনিয়র কূটনৈতিককে, এই নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে মহিউদ্দিনের বাকবিত-াও হয়েছিল। বর্তমানে সেই অবস্থা নেই, এখন প্রায় সব আমলারই এক বা একাধিক বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে। এদতসত্ত্বে¡ও মন্ত্রিপাড়ার বাংলোগুলো ভাঙা দরকার, কারণ প্রত্যেকটি বাংলো দুই-তিন বিঘা জমির ওপর নির্মিত। এই সকল বাংলো ভেঙে বহুতলা ভবন নির্মাণ করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সমীচীন হবে বলে মনে হয়।
দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত বাংলাদেশে মন্ত্রীদের জন্য এত বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণ শুধু বেমানান নয়, দৃষ্টিকটুও। যথাযথ তথ্য-উপাত্তের দরকার নেই, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কমবেশি আমরা সবাই অবগত যে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ দরিদ্র এবং তাদের মধ্যে কিছু অংশ হতদরিদ্র, এরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। অতি দরিদ্র তাদেরই বলা হয় যাদের আয় দৈনিক এক ডলার বা বর্তমান বিনিময় মূল্য অনুযায়ী ১২৫ টাকা। কিন্তু এই ১২৫ টাকা আয় করাও অনেক লোকের পক্ষে সম্ভব হয় না, হয় না বলেই অনেককেই ডাস্টবিন থেকে পচা খাবার সংগ্রহ করে খেতে হয়। এদের থাকার জায়গা নেই, এরা পুলিশ আর দারোয়ানের লাঠির বাড়ি খেয়ে খেয়ে লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফুটপাতে পলিথিন আর বস্তা টাঙিয়ে রাত কাটায়, মেয়েরা দেহ বিক্রি করে আর যুবকরা ছিনতাই করে। ছিনতাই করে টাকা জোগাড় করতে পারলে এরা মাদক সেবন করে, সিগারেট টানে, লুডু আর তাস খেলে সময় কাটায়। এদের কাছে বেহেশত আর দোজখ সমান, মাদকে ভরা সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে এরা নর্দমায় ঘুমিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ আমলে ছিন্নমূল মানুষদের বাড়ি-ঘর দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এখন বন্ধ, আবার চালু করা ফরজ; ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট না করে এই ভবঘুরে লোকদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা অনেক বেশি জরুরি।
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের জন্য রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে তিন তলা বিশিষ্ট দুইটি বাসভবন নির্মাণের প্রস্তাব ছিল, ভবন দুটি শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে কিনা তার খোঁজ নেয়ার গরজ বোধ করিনি। বাড়ি দুটি নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এই দুটি ভবনের প্রতিটিতে থাকার কথা ছিল দুটি করে সুইমিং পুল এবং সাতটি করে এলইডি টেলিভিশন। শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত না হলেও আওয়ামী লীগ আমলের আরও কিছু উদ্ভট প্রকল্পের প্রস্তাব জনগণকে বিনোদন দিয়েছিল- যেমন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খিচুড়ি রান্না ও তার বিতরণ পদ্ধতি শিখতে এক হাজার কর্মকর্তাকে পর্যায়ক্রমে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে শুধু ভবন দেখার জন্য ৩০ জন সরকারি কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব, গরু-ছাগল পালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ১ হাজার ৫০ জন এবং পুকুর কাটার কায়দা শেখার জন্য বিদেশে কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রস্তাব। এমন অপকর্ম এখনো অব্যাহত আছে এবং আছে বলেই অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী সরকারের মন্ত্রীদের সুখ-সাচ্ছন্দ বাড়াতে এত পেরেশান।
১৩ কাঠা জায়গার সমান একটি ফ্ল্যাট কেন একজন মন্ত্রীর আবাসের জন্য প্রয়োজন তা মাথায় ধরে না। বিরাট আকৃতির বাড়ি-ঘর রাজা-বাদশাহদের দরকার, কারণ তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যার চেয়ে দাস-দাসী ও উপপতœীর সংখ্যা বেশি; উপরন্তু বিরাট আকারের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ আভিজাত্যের প্রতীক। তাই বোধ হয় প্রতিটি দেশেই শত শত বছর আগে থেকেই বিরাট এলাকাজুড়ে ভবন নির্মাণ করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হচ্ছে ‘বঙ্গভবন’। আরও দুজন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের কথা মিডিয়ায় অহরহ উচ্চারিত হয়- ‘হোয়াইট হাউস’ এবং ‘ক্রেমলিন’। হোয়াইট হাউস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন, ৫৫ হাজার বর্গফুটের এই ভবনটি নির্মিত হয় ২২২ বছর পূর্বে। আর ক্রেমলিন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের আমলে নির্মিত হয়েছে ১ হাজার রুম বিশিষ্ট প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রাসাদ হচ্ছে ব্রুনাই রাষ্ট্রের সুলতানের সরকারি বাসভবন ‘ইসতানা নুরুল ইমান’; এই ভবনে কক্ষ রয়েছে ১ হাজার ৭৮৮টি এবং সুইমিং পুল রয়েছে ৫টি। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বাকিংহাম প্যালেস নির্মাণে, এই ভবনটির নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ২৯ কোটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের আবাসস্থল বাকিংহাম প্যালেসের পর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানীর বাড়ি ‘অ্যান্টিলিয়া’, যার মূল্য ২২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু অ্যান্টিলিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রতি মাসে খরচ হয় ২.৫ কোটি ভারতীয় রুপি।
প্রতিটি সরকারই মনে করে তাদের আমলে দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে সবল ও মোটাতাজা। কিন্তু ভিন্ন দলের নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই শ্বেতপত্র প্রকাশ করে বলবে, আগের সরকার সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। দলীয় সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও একই রীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে, কারণ রাজনীতিতে মিথ্যা বলা জায়েজ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিদিন নাকি দুয়েকটি করে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, অসংখ্য লোক কর্মহীন হচ্ছে। ঢাকা শহরে গ্যাস সংকট মারাত্মক, দুপুরের ভাত খেতে হয় বিকালে, দ্বিগুণ দাম দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, কনকনে শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন অসংখ্যবার লোডশেডিং হচ্ছে। উপরন্তু বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ব্যাপক। অর্থনীতির এমন করুণ অবস্থার মধ্যেও সরকার ও সরকারের লোকদের বিলাসিতার শেষ নেই - দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মতো প্রধান উপদেষ্টাও শতাধিক লোক নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, যাচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা, খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই সব ভ্রমণ থেকে দেশের কী মঙ্গল হচ্ছে তা জনগণের কাছে কখনোই স্পষ্ট হয়নি। অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় এমন যাচ্ছেতাই খরচ দেশের গরিবদের অসহায়ত্বকে বাড়িয়ে দেয়।
দেশের হাজার হাজার মানুষ যেখানে ফুটপাতে ঘুমায়, ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায়, অভাবের তাড়নায় দেহ বিক্রি করে, সেখানে জনগণের মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব মানসিক বৈকল্যের পরিচায়ক, এর মাধ্যমে সরকার সম্পর্কে ভুল বার্তা পরিবেশিত হয়, সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হয়। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে কোন সরকারই জনগণের পাল্স পড়তে চায় না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
ঢাকার বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের মন্ত্রিপাড়ায় তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সকল ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮,৫০০ থেকে ৯,০৩০ বর্গফুট। এই জন্য ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা, যা বঙ্গবন্ধুর আমলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের সমান। এই সকল ভবনে থাকবেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে মন্ত্রী এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের থাকার সুবন্দোবস্ত রয়েছে- মন্ত্রীদের জন্য রয়েছে ৭১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট যা কোন সরকারের আমলেই পূর্ণ হয়নি; তারপরও কেন তাদের জন্য নতুন ভবন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দিতে পারেনি। সচিবদের জন্য রয়েছে ইস্কাটনে ‘সচিব নিবাস’, কাকরাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য রয়েছে ২০ তলা আবাসিক ভবন- ‘জাজেস কমপ্লেক্স’। সচিব নিবাস ও জাজেস কমপ্লেক্সে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট। এই দুটি ভবনে নাকি প্রায় সময়ই ফ্ল্যাট খালি থাকে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর মতো সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত বাসভবন রয়েছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়েও বিভাগীয় প্রধান, জেলা প্রশাসক এবং টিএনওদের জন্য রয়েছে বিরাট বিরাট এলাকাজুড়ে বিশাল বিশাল প্রাসাদ।
৩০-৪০ বছর আগেও ঢাকা শহরে আবাসিক সংকট ছিল ভয়াবহ। বিদেশ থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসার পর আমার মেজো ভাই কূটনৈতিক মহিউদ্দিন আহমদকে প্রতিবারই সার্কিট হাউজে থাকতে হয়েছে, কারণ তার কোন নিজস্ব ফ্ল্যাট-বাড়ি ছিল না। পর্যাপ্ত আবাসের ব্যবস্থা না থাকায় তখন সরকারের তরফ থেকেও বাসা বরাদ্দ পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। সরকারের বাসা প্রাপ্তির তালিকায় সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাসা না দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বাসা বরাদ্দ দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তার সিলেটের আরেকজন জুনিয়র কূটনৈতিককে, এই নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে মহিউদ্দিনের বাকবিত-াও হয়েছিল। বর্তমানে সেই অবস্থা নেই, এখন প্রায় সব আমলারই এক বা একাধিক বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে। এদতসত্ত্বে¡ও মন্ত্রিপাড়ার বাংলোগুলো ভাঙা দরকার, কারণ প্রত্যেকটি বাংলো দুই-তিন বিঘা জমির ওপর নির্মিত। এই সকল বাংলো ভেঙে বহুতলা ভবন নির্মাণ করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সমীচীন হবে বলে মনে হয়।
দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত বাংলাদেশে মন্ত্রীদের জন্য এত বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণ শুধু বেমানান নয়, দৃষ্টিকটুও। যথাযথ তথ্য-উপাত্তের দরকার নেই, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কমবেশি আমরা সবাই অবগত যে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ দরিদ্র এবং তাদের মধ্যে কিছু অংশ হতদরিদ্র, এরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। অতি দরিদ্র তাদেরই বলা হয় যাদের আয় দৈনিক এক ডলার বা বর্তমান বিনিময় মূল্য অনুযায়ী ১২৫ টাকা। কিন্তু এই ১২৫ টাকা আয় করাও অনেক লোকের পক্ষে সম্ভব হয় না, হয় না বলেই অনেককেই ডাস্টবিন থেকে পচা খাবার সংগ্রহ করে খেতে হয়। এদের থাকার জায়গা নেই, এরা পুলিশ আর দারোয়ানের লাঠির বাড়ি খেয়ে খেয়ে লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফুটপাতে পলিথিন আর বস্তা টাঙিয়ে রাত কাটায়, মেয়েরা দেহ বিক্রি করে আর যুবকরা ছিনতাই করে। ছিনতাই করে টাকা জোগাড় করতে পারলে এরা মাদক সেবন করে, সিগারেট টানে, লুডু আর তাস খেলে সময় কাটায়। এদের কাছে বেহেশত আর দোজখ সমান, মাদকে ভরা সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে এরা নর্দমায় ঘুমিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ আমলে ছিন্নমূল মানুষদের বাড়ি-ঘর দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এখন বন্ধ, আবার চালু করা ফরজ; ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট না করে এই ভবঘুরে লোকদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা অনেক বেশি জরুরি।
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের জন্য রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে তিন তলা বিশিষ্ট দুইটি বাসভবন নির্মাণের প্রস্তাব ছিল, ভবন দুটি শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে কিনা তার খোঁজ নেয়ার গরজ বোধ করিনি। বাড়ি দুটি নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এই দুটি ভবনের প্রতিটিতে থাকার কথা ছিল দুটি করে সুইমিং পুল এবং সাতটি করে এলইডি টেলিভিশন। শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত না হলেও আওয়ামী লীগ আমলের আরও কিছু উদ্ভট প্রকল্পের প্রস্তাব জনগণকে বিনোদন দিয়েছিল- যেমন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খিচুড়ি রান্না ও তার বিতরণ পদ্ধতি শিখতে এক হাজার কর্মকর্তাকে পর্যায়ক্রমে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে শুধু ভবন দেখার জন্য ৩০ জন সরকারি কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব, গরু-ছাগল পালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ১ হাজার ৫০ জন এবং পুকুর কাটার কায়দা শেখার জন্য বিদেশে কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রস্তাব। এমন অপকর্ম এখনো অব্যাহত আছে এবং আছে বলেই অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী সরকারের মন্ত্রীদের সুখ-সাচ্ছন্দ বাড়াতে এত পেরেশান।
১৩ কাঠা জায়গার সমান একটি ফ্ল্যাট কেন একজন মন্ত্রীর আবাসের জন্য প্রয়োজন তা মাথায় ধরে না। বিরাট আকৃতির বাড়ি-ঘর রাজা-বাদশাহদের দরকার, কারণ তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যার চেয়ে দাস-দাসী ও উপপতœীর সংখ্যা বেশি; উপরন্তু বিরাট আকারের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ আভিজাত্যের প্রতীক। তাই বোধ হয় প্রতিটি দেশেই শত শত বছর আগে থেকেই বিরাট এলাকাজুড়ে ভবন নির্মাণ করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হচ্ছে ‘বঙ্গভবন’। আরও দুজন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের কথা মিডিয়ায় অহরহ উচ্চারিত হয়- ‘হোয়াইট হাউস’ এবং ‘ক্রেমলিন’। হোয়াইট হাউস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন, ৫৫ হাজার বর্গফুটের এই ভবনটি নির্মিত হয় ২২২ বছর পূর্বে। আর ক্রেমলিন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের আমলে নির্মিত হয়েছে ১ হাজার রুম বিশিষ্ট প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রাসাদ হচ্ছে ব্রুনাই রাষ্ট্রের সুলতানের সরকারি বাসভবন ‘ইসতানা নুরুল ইমান’; এই ভবনে কক্ষ রয়েছে ১ হাজার ৭৮৮টি এবং সুইমিং পুল রয়েছে ৫টি। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বাকিংহাম প্যালেস নির্মাণে, এই ভবনটির নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ২৯ কোটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের আবাসস্থল বাকিংহাম প্যালেসের পর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানীর বাড়ি ‘অ্যান্টিলিয়া’, যার মূল্য ২২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু অ্যান্টিলিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রতি মাসে খরচ হয় ২.৫ কোটি ভারতীয় রুপি।
প্রতিটি সরকারই মনে করে তাদের আমলে দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে সবল ও মোটাতাজা। কিন্তু ভিন্ন দলের নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই শ্বেতপত্র প্রকাশ করে বলবে, আগের সরকার সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। দলীয় সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও একই রীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে, কারণ রাজনীতিতে মিথ্যা বলা জায়েজ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিদিন নাকি দুয়েকটি করে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, অসংখ্য লোক কর্মহীন হচ্ছে। ঢাকা শহরে গ্যাস সংকট মারাত্মক, দুপুরের ভাত খেতে হয় বিকালে, দ্বিগুণ দাম দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, কনকনে শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন অসংখ্যবার লোডশেডিং হচ্ছে। উপরন্তু বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ব্যাপক। অর্থনীতির এমন করুণ অবস্থার মধ্যেও সরকার ও সরকারের লোকদের বিলাসিতার শেষ নেই - দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মতো প্রধান উপদেষ্টাও শতাধিক লোক নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, যাচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা, খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই সব ভ্রমণ থেকে দেশের কী মঙ্গল হচ্ছে তা জনগণের কাছে কখনোই স্পষ্ট হয়নি। অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় এমন যাচ্ছেতাই খরচ দেশের গরিবদের অসহায়ত্বকে বাড়িয়ে দেয়।
দেশের হাজার হাজার মানুষ যেখানে ফুটপাতে ঘুমায়, ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায়, অভাবের তাড়নায় দেহ বিক্রি করে, সেখানে জনগণের মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব মানসিক বৈকল্যের পরিচায়ক, এর মাধ্যমে সরকার সম্পর্কে ভুল বার্তা পরিবেশিত হয়, সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হয়। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে কোন সরকারই জনগণের পাল্স পড়তে চায় না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]