alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

আনোয়ার হোসেন

: শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

একটি জাতির আত্মপরিচয় তার সার্বভৌমত্বের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। যখন সেই জাতিরই শীর্ষ নেতৃত্ব বা কোনো প্রভাবশালী পক্ষ পুরো জনগোষ্ঠীকে ‘জালিয়াত’ বা এই জাতীয় নেতিবাচক বিশেষণে ভূষিত করে, তখন তা কেবল একটি শব্দ প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেখানে এমন বিশেষণ কেবল অপমানজনক নয় বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো সরকারপ্রধান যখন তার নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করেন, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

একটি জাতিকে ঢালাওভাবে মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত প্রমাণ করার বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অপরাধ প্রবণতা কখনোই সেই জাতির জন্মগত ডিএনএ হতে পারে না। বরং এটি সিস্টেম বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার ফল। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ মানুষ টিকে থাকার প্রয়োজনে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনিয়মের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে যখন পুরো জাতির ওপর ‘জালিয়াত’ তকমা সেঁটে দেয়া হয়, তখন তা মূলত শাসকদের অযোগ্যতারই প্রতিফলন ঘটায়।

এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়ে তাদের মনে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা সোচ্চার হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক শাসকরা সব সময়ই পরাধীন জাতিকে চোর, অলস বা অবিশ্বস্ত হিসেবে চিত্রায়িত করত। ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালিদের ‘প্রতারক’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা ছিল, যা ছিল তাদের লুণ্ঠন ও শাসনকে বৈধতা দেয়ার একটি হাতিয়ার। আজ যদি স্বাধীন দেশে সেই একই ভাষা ব্যবহার করেন, তবে তা প্রমাণ করে মানসিকতা আজও ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এটি কেবল মুক্তি সংগ্রামের চেতনাকে অবমাননা করা নয়, বরং লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে তুচ্ছজ্ঞান করার শামিল। যে জাতি বিশ্ব মানচিত্রে নিজের নাম খোদাই করতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে জানে, তাদের ‘জালিয়াত’ বলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌতুক ও নিষ্ঠুরতা।

যৌক্তিক ও আইনি মানদ-ে কোনো নিরপরাধ নাগরিককে অপরাধী সাব্যস্ত করা দ-নীয় অপরাধ। আইনের শাসন যেখানে বিদ্যমান, সেখানে অপরাধের দায়ভার ব্যক্তিগত; সামষ্টিক নয়। অথচ বক্তৃতায় যখন পুরো জাতিকে কলঙ্কিত করা হয়, তখন তার কোনো আইনগত ভিত্তি থাকে না। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক

পরিম-লে। একটি দেশের পাসপোর্ট যখন দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু হয়, তার মূলে থাকে এই ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য। বিদেশি বিনিয়োগকারী বা পর্যটকরা যখন শুনেন যে দেশটির শীর্ষ

নেতৃত্বই জনগণকে অবিশ্বস্ত মনে করেন, তখন তারা সেই দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না।

ফলে অর্থনৈতিকভাবে দেশটি পিছিয়ে পড়ে, যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত সেই সাধারণ জনগণকেই বইতে হয়

যাদের ‘জালিয়াত’ বলে গালি দেয়া হয়েছিল।

সমাজতান্ত্রিক ও নৈতিক বিচারে এ ধরনের নেতিবাচক বিশেষণ সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে।

এটি এক ধরনের দম্ভ, যেখানে তারা নিজেদের পবিত্র মনে করে আর সাধারণ মানুষকে নীচু স্তরের অপরাধী

ভাবে। এর ফলে সমাজের মেধাবী ও সৎ মানুষরা চরমভাবে হতাশ হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী বা একজন সৎ ব্যবসায়ী শোনেন যে তার জাতিগত পরিচয় ‘জালিয়াত’, তখন তার মধ্যে দেশপ্রেমের বদলে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ জন্ম নেয়। এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে শুরু হয় ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেন।

মেধাবীরা মনে করে এই দেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, বরং তারা এক বিষাক্ত সিস্টেমের শিকার। ফলে

একটি জাতি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হারায় এবং ক্রমশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ে।

এই বয়ানগুলো অনেক সময় বৈদেশিক চাপ মোকাবিলা বা অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো সরকার আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার বা গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন তারা দেখাতে চায় যে তাদের দেশের মানুষই সংস্কারের অযোগ্য বা আইন অমান্যকারী। এটি একটি ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার কৌশল। অথচ বাস্তব সত্য হলো, নথিপত্র জালিয়াতি বা প্রশাসনিক দুর্নীতির যে চক্রগুলো সক্রিয় থাকে, সেগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা তদারকির অভাবেই শক্তিশালী হয়। রুট লেভেলের একজন সাধারণ মানুষ কখনোই সিস্টেমের সহযোগিতা ছাড়া বড় ধরনের জালিয়াতি করতে পারে না। তাই মাছের পচন যখন মাথা থেকে শুরু হয়, তখন লেজকে দায়ী করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং হাস্যকর।

যখন কোনো শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শোনানো হয় যে তার চারপাশের সবাই চোর বা জালিয়াত, তখন সে বড় হয়ে নীতি-নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়ার প্রেরণা হারিয়ে ফেলে। সে মনে করে-যেহেতু সবাই এমন, তাই আমাকেও এভাবেই চলতে হবে। এভাবে একটি শাসকগোষ্ঠী কেবল বর্তমানকে কলঙ্কিত করে না, বরং

আগামীর প্রজন্মের নৈতিক মেরুদ- ভেঙে দেয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক পতন, যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। একটি জাতির আত্মমর্যাদা তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সেই সম্পদে আঘাত করা মানেই জাতিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেওয়া।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতি সচল রাখেন। কিন্তু যখন দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের চারিত্রিক

সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন বিদেশি নিয়োগকর্তারা তাদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেন।

এর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বস্ততা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। এলসি খোলা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত গ্যারান্টি বা কড়াকড়ির সম্মুখীন হতে হয়। একটি ভুল বিশেষণ বা দায়িত্বহীন মন্তব্য পুরো অর্থনীতির চাকাকে স্থবির করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যখন কোনো জাতি ‘জালিয়াত’ হিসেবে পরিচিতি পায়, তখন সেই দেশের শিক্ষাগত সনদ বা ডিগ্রির ওপর বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আস্থা হারিয়ে ফেলে।

হাজার হাজার সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী যারা বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, তাদের নথিপত্র বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের নামে হয়রানি করা হয়। মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করার এই প্রক্রিয়া মূলত শুরু হয় রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা সেই নেতিবাচক ধারণা থেকে। এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন, যা শিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র-সর্বত্রই নেতিবাচকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। বিভাজন ও বিদ্বেষের এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে অকার্যকর করে তোলে।

বিদ্রোহী চেতনার নিরিখে বলতে গেলে, কোনো শাসককে এই অধিকার দেয়া হয়নি যে তিনি তার জনগণকে গালি দেবেন। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর সরকার কেবল তাদের সেবক। সেবক যখন মালিককে

চোর বলে সম্বোধন করে, তখন সেই শাসনের নৈতিক ভিত্তি বুঝতে হবে। এটি জনগণের আত্মসম্মানে এক বিরাট কুঠারাঘাত। এই অপমানের প্রতিবাদ জানানো কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের পরিচয় ‘জালিয়াত’ নয়, বরং আমাদের পরিচয় আমরা বীরের জাতি, আমরা লড়াকু জাতি। মুষ্টিমেয় কিছু দুর্নীতিবাজ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় পুরো ১৬ কোটি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার এই অপচেষ্টাকে

বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রুখে দিতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, জাতিকে ‘জালিয়াত’ বলা কোনো সাধারণ মন্তব্য নয়, বরং এটি একটি জাতির গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের লক্ষণ। একটি জাতির উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোতে হয় না, বরং তার আত্মসম্মান ও মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে হয়। যেদিন কোনো দেশের শাসক তার জনগণকে সম্মান করবেন, সেদিনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে। বাংলাদেশের মানুষ জালিয়াত নয়, বরং তারা এক বৈরী কাঠামোর মধ্যে বেঁচে থাকা লড়াকু সৈনিক। এই সংগ্রামী জনতার সময় এসেছে এই নেতিবাচক বয়ানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জাতীয় সংহতি ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটার, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল]

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

আনোয়ার হোসেন

শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

একটি জাতির আত্মপরিচয় তার সার্বভৌমত্বের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। যখন সেই জাতিরই শীর্ষ নেতৃত্ব বা কোনো প্রভাবশালী পক্ষ পুরো জনগোষ্ঠীকে ‘জালিয়াত’ বা এই জাতীয় নেতিবাচক বিশেষণে ভূষিত করে, তখন তা কেবল একটি শব্দ প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেখানে এমন বিশেষণ কেবল অপমানজনক নয় বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো সরকারপ্রধান যখন তার নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করেন, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

একটি জাতিকে ঢালাওভাবে মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত প্রমাণ করার বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অপরাধ প্রবণতা কখনোই সেই জাতির জন্মগত ডিএনএ হতে পারে না। বরং এটি সিস্টেম বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার ফল। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ মানুষ টিকে থাকার প্রয়োজনে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনিয়মের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে যখন পুরো জাতির ওপর ‘জালিয়াত’ তকমা সেঁটে দেয়া হয়, তখন তা মূলত শাসকদের অযোগ্যতারই প্রতিফলন ঘটায়।

এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়ে তাদের মনে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা সোচ্চার হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক শাসকরা সব সময়ই পরাধীন জাতিকে চোর, অলস বা অবিশ্বস্ত হিসেবে চিত্রায়িত করত। ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালিদের ‘প্রতারক’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা ছিল, যা ছিল তাদের লুণ্ঠন ও শাসনকে বৈধতা দেয়ার একটি হাতিয়ার। আজ যদি স্বাধীন দেশে সেই একই ভাষা ব্যবহার করেন, তবে তা প্রমাণ করে মানসিকতা আজও ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এটি কেবল মুক্তি সংগ্রামের চেতনাকে অবমাননা করা নয়, বরং লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে তুচ্ছজ্ঞান করার শামিল। যে জাতি বিশ্ব মানচিত্রে নিজের নাম খোদাই করতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে জানে, তাদের ‘জালিয়াত’ বলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌতুক ও নিষ্ঠুরতা।

যৌক্তিক ও আইনি মানদ-ে কোনো নিরপরাধ নাগরিককে অপরাধী সাব্যস্ত করা দ-নীয় অপরাধ। আইনের শাসন যেখানে বিদ্যমান, সেখানে অপরাধের দায়ভার ব্যক্তিগত; সামষ্টিক নয়। অথচ বক্তৃতায় যখন পুরো জাতিকে কলঙ্কিত করা হয়, তখন তার কোনো আইনগত ভিত্তি থাকে না। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক

পরিম-লে। একটি দেশের পাসপোর্ট যখন দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু হয়, তার মূলে থাকে এই ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য। বিদেশি বিনিয়োগকারী বা পর্যটকরা যখন শুনেন যে দেশটির শীর্ষ

নেতৃত্বই জনগণকে অবিশ্বস্ত মনে করেন, তখন তারা সেই দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না।

ফলে অর্থনৈতিকভাবে দেশটি পিছিয়ে পড়ে, যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত সেই সাধারণ জনগণকেই বইতে হয়

যাদের ‘জালিয়াত’ বলে গালি দেয়া হয়েছিল।

সমাজতান্ত্রিক ও নৈতিক বিচারে এ ধরনের নেতিবাচক বিশেষণ সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে।

এটি এক ধরনের দম্ভ, যেখানে তারা নিজেদের পবিত্র মনে করে আর সাধারণ মানুষকে নীচু স্তরের অপরাধী

ভাবে। এর ফলে সমাজের মেধাবী ও সৎ মানুষরা চরমভাবে হতাশ হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী বা একজন সৎ ব্যবসায়ী শোনেন যে তার জাতিগত পরিচয় ‘জালিয়াত’, তখন তার মধ্যে দেশপ্রেমের বদলে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ জন্ম নেয়। এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে শুরু হয় ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেন।

মেধাবীরা মনে করে এই দেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, বরং তারা এক বিষাক্ত সিস্টেমের শিকার। ফলে

একটি জাতি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হারায় এবং ক্রমশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ে।

এই বয়ানগুলো অনেক সময় বৈদেশিক চাপ মোকাবিলা বা অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো সরকার আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার বা গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন তারা দেখাতে চায় যে তাদের দেশের মানুষই সংস্কারের অযোগ্য বা আইন অমান্যকারী। এটি একটি ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার কৌশল। অথচ বাস্তব সত্য হলো, নথিপত্র জালিয়াতি বা প্রশাসনিক দুর্নীতির যে চক্রগুলো সক্রিয় থাকে, সেগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা তদারকির অভাবেই শক্তিশালী হয়। রুট লেভেলের একজন সাধারণ মানুষ কখনোই সিস্টেমের সহযোগিতা ছাড়া বড় ধরনের জালিয়াতি করতে পারে না। তাই মাছের পচন যখন মাথা থেকে শুরু হয়, তখন লেজকে দায়ী করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং হাস্যকর।

যখন কোনো শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শোনানো হয় যে তার চারপাশের সবাই চোর বা জালিয়াত, তখন সে বড় হয়ে নীতি-নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়ার প্রেরণা হারিয়ে ফেলে। সে মনে করে-যেহেতু সবাই এমন, তাই আমাকেও এভাবেই চলতে হবে। এভাবে একটি শাসকগোষ্ঠী কেবল বর্তমানকে কলঙ্কিত করে না, বরং

আগামীর প্রজন্মের নৈতিক মেরুদ- ভেঙে দেয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক পতন, যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। একটি জাতির আত্মমর্যাদা তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সেই সম্পদে আঘাত করা মানেই জাতিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেওয়া।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতি সচল রাখেন। কিন্তু যখন দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের চারিত্রিক

সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন বিদেশি নিয়োগকর্তারা তাদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেন।

এর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বস্ততা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। এলসি খোলা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত গ্যারান্টি বা কড়াকড়ির সম্মুখীন হতে হয়। একটি ভুল বিশেষণ বা দায়িত্বহীন মন্তব্য পুরো অর্থনীতির চাকাকে স্থবির করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যখন কোনো জাতি ‘জালিয়াত’ হিসেবে পরিচিতি পায়, তখন সেই দেশের শিক্ষাগত সনদ বা ডিগ্রির ওপর বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আস্থা হারিয়ে ফেলে।

হাজার হাজার সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী যারা বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, তাদের নথিপত্র বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের নামে হয়রানি করা হয়। মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করার এই প্রক্রিয়া মূলত শুরু হয় রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা সেই নেতিবাচক ধারণা থেকে। এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন, যা শিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র-সর্বত্রই নেতিবাচকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। বিভাজন ও বিদ্বেষের এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে অকার্যকর করে তোলে।

বিদ্রোহী চেতনার নিরিখে বলতে গেলে, কোনো শাসককে এই অধিকার দেয়া হয়নি যে তিনি তার জনগণকে গালি দেবেন। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর সরকার কেবল তাদের সেবক। সেবক যখন মালিককে

চোর বলে সম্বোধন করে, তখন সেই শাসনের নৈতিক ভিত্তি বুঝতে হবে। এটি জনগণের আত্মসম্মানে এক বিরাট কুঠারাঘাত। এই অপমানের প্রতিবাদ জানানো কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের পরিচয় ‘জালিয়াত’ নয়, বরং আমাদের পরিচয় আমরা বীরের জাতি, আমরা লড়াকু জাতি। মুষ্টিমেয় কিছু দুর্নীতিবাজ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় পুরো ১৬ কোটি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার এই অপচেষ্টাকে

বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রুখে দিতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, জাতিকে ‘জালিয়াত’ বলা কোনো সাধারণ মন্তব্য নয়, বরং এটি একটি জাতির গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের লক্ষণ। একটি জাতির উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোতে হয় না, বরং তার আত্মসম্মান ও মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে হয়। যেদিন কোনো দেশের শাসক তার জনগণকে সম্মান করবেন, সেদিনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে। বাংলাদেশের মানুষ জালিয়াত নয়, বরং তারা এক বৈরী কাঠামোর মধ্যে বেঁচে থাকা লড়াকু সৈনিক। এই সংগ্রামী জনতার সময় এসেছে এই নেতিবাচক বয়ানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জাতীয় সংহতি ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটার, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল]

back to top