alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

মতিউর রহমান

: শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নের একটি কার্যকর কাঠামো। এই ধারণার মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ বিস্তৃত হয়েছে, সরকারি সেবা ডিজিটাল হয়েছে এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এআই যেন কেবল একটি গ্ল্যামারাস স্লোগান হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন হয় প্রতিটি নাগরিকের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার

প্রযুক্তি এখানে অন্তত আংশিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ যখন ‘এআই বাংলাদেশ’-এর দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রশ্নটি আরও জটিল ও গভীর হয়ে উঠছে। এই রূপান্তরের সুফল কারা পাবে এবং কারা পিছিয়ে পড়বে-এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রারম্ভিক সময়ে প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাশ্রয়ী ছিল। একটি সাধারণ স্মার্টফোন এবং স্বল্পমূল্যের মোবাইল ইন্টারনেট থাকলেই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হতে পেরেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.২৫ কোটিতে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে নিবন্ধিত হিসাবের সংখ্যা ১২.৫ কোটির বেশি, যার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এটি দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং খাতে প্রায় ৬.৫ লাখ সক্রিয় কর্মী নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। যদিও এই প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো দেশের সব প্রান্তে সমানভাবে পৌঁছায়নি, তবুও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ছিল না।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর আবির্ভাব এই সহজলভ্য প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এআই কেবল একটি ইন্টারনেট সংযোগ বা সাধারণ স্মার্টফোনের বিষয় নয়। এটি মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিপুল পরিমাণ সুবিন্যস্ত ডেটা, উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশের তুলনায় ‘এআই বাংলাদেশ’-এর প্রবেশের পথ অনেক বেশি সংকীর্ণ ও ব্যয়বহুল।

ডেটারিপোর্টাল-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪৭.৪ শতাংশে পৌঁছালেও, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতাভুক্ত পরিবার মাত্র ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কার্যকরভাবে ডিজিটাল জগতের বাইরে অবস্থান করছে। এআই-নির্ভর সেবা ও সুযোগ-সুবিধা যদি এই বিদ্যমান ডিজিটাল বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের একটি ক্ষুদ্র ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীকেই উপকৃত করবে। যারা প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে আছে, তারা আরও এগিয়ে যাবে, আর যারা পিছিয়ে আছে, তারা এক অতল বৈষম্যের গহ্বরে পতিত হবে।

এআই-এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে। আমাদের দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪.৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কাজের ধরন সাধারণত পুনরাবৃত্তিমূলক এবং কম দক্ষতানির্ভর। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-এর এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এআই ও অটোমেশনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ পেশা কোনো না কোনোভাবে পরিবর্তনের সম্মুখীন হবে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যে রোবোটিকস ও এআই-ভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও উৎপাদন, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এমনকি সাধারণ অফিসিয়াল কাজে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে হয়তো সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে লাখ লাখ কম দক্ষ শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে যারা ড্রাইভিং, ডাটা এন্ট্রি কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মতো পেশায় নিয়োজিত, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে এক বিশাল বেকারত্বের সৃষ্টি হবে। বিআইডিএস-এর গবেষণা বলছে, শিক্ষিত বেকারদের প্রায় ৩৩ শতাংশই যথাযথ ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছে নাÑএআই যুগে এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো তৈরি পোশাক খাত। এই খাতেও এআই-এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বড় ও আধুনিক কারখানাগুলোতে ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন ও এআইভিত্তিক কিউসি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে পোশাক খাতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় প্রতি এক কোটি টাকা বিনিয়োগে কর্মসংস্থানের হার প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে।

পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। যদি প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কোনো সমন্বিত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা না হয়, তবে এআই এই খাতের ভেতরেই একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে। একদিকে উচ্চদক্ষ কারিগরি কর্মীদের বেতন যেখানে ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, সেখানে সাধারণ সেলাই কর্মীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতা শহরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও মোবাইল ইন্টারনেট দেশের প্রায় সবখানে পৌঁছেছে, কিন্তু ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি এবং স্থিতিশীলতা গ্রামে এখনো অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘আইসিটি ব্যবহার জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহারের হার মাত্র ৩.৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এটি ১৯.৫ শতাংশ।

এআইনির্ভর আধুনিক শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কিংবা স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি কাগজে-কলমে শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, বাস্তবে তা শহরকেন্দ্রিক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদি গ্রামীণ প্রান্তিক চাষি এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা বাজার বিশ্লেষণ টুল ব্যবহার করতে না পারে, তবে সে শহরের বড় কৃষিখামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এই ডিজিটাল ব্যবধান গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনযাত্রার মানে এক আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি করবে।

এআই বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। এআই এমন এক জনশক্তি চায় যারা কেবল মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী নয়, বরং সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী চিন্তায় দক্ষ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতার প্রায় ৪৪ শতাংশই হবে এআইভিত্তিক কারিগরি জ্ঞান।

শহরের নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে এআই ও প্রোগ্রামিং শিখছে, সেখানে দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যারা সরকারি সাধারণ স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ে, তারা যথাযথ ল্যাব বা ইন্টারনেট সুবিধাই পাচ্ছে না। এই শিক্ষা-বিভাজন সমাজে একটি ক্ষুদ্র ‘এআই এলিট’ শ্রেণি তৈরি করবে, যারা দেশের সব উচ্চমূল্যের চাকরি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় দখল করে নেবে। এর ফলে সাধারণ পরিবারের মেধাবী সন্তানরাও সুযোগের অভাবে ঝরে পড়বে।

লিঙ্গবৈষম্য এই প্রযুক্তিগত উত্তরণকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার ও স্মার্টফোন মালিকানার হার পুরুষদের তুলনায় যথাক্রমে ২৯ শতাংশ ও ২১ শতাংশ কম। জিএসএমএ রিপোর্ট অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই জেন্ডার গ্যাপ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। প্রযুক্তি ও এআই গবেষণায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য বিশেষ কোনো জাতীয় উদ্যোগ নেই। লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া এআই বাংলাদেশ নারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বদলে পুরনো বৈষম্যকেই আরও পাকাপোক্ত করতে পারে।

একইভাবে প্রবীণ নাগরিকরা যারা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ, তারা এই ডিজিটাল ও এআই রূপান্তরে চরমভাবে উপেক্ষিত। সরকারি ভাতা বা ব্যাংকিং সেবায় যে ধরনের অটোমেশন আসছে, তাতে অনেক প্রবীণ নাগরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রযুক্তির জটিলতা যেন কোনো নাগরিকের নূন্যতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ না হয়, রাষ্ট্রকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এআই সম্পূর্ণভাবে ডেটার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশের ডেটা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত অপরিকল্পিত ও শহরমুখী। প্রান্তিক মানুষের তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের ভাণ্ডারে অনুপস্থিত। এর ফলে এআই যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় (যেমন ঋণ অনুমোদন বা চাকরি বাছাই), তখন তা অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। একে বলা হয় ‘অ্যালগরিদমিক বায়াস’ বা গাণিতিক পক্ষপাতিত্ব।

পাশাপাশি, বাংলাদেশের মানুষের ডেটা যদি বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজস্ব এআই মডেল গড়ে তোলা না গেলে আমরা প্রযুক্তিগতভাবে চিরকাল অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ঘটিয়ে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে হাতে-কলমে কোডিং ও এআই এথিক্স বা নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনে শহর ও গ্রামের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি ও মূল্যের ব্যবধান দূর করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

একইসাথে, এআইয়ের প্রভাবে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ তহবিল গঠন ও পুনঃদক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিগত এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিক ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট ডেটা সুরক্ষা আইন ও গাইডলাইন প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। সর্বোপরি, জেন্ডার ইনক্লুসিভিটি বা লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিভাইসের সহজলভ্যতা ও বিশেষ কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে এআই বাংলাদেশে যাত্রা কেবল একটি কারিগরি অগ্রগতি নয়; এটি মূলত একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। এই উত্তরণ যদি কেবল একটি ক্ষুদ্র ধনিকশ্রেণীকে আরও সম্পদশালী করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে কর্মহীন ও সুযোগবঞ্চিত করে, তবে সেই উন্নয়নের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না।

উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এআই যেন কেবল একটি গ্ল্যামারাস স্লোগান হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন হয় প্রতিটি নাগরিকের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-প্রযুক্তির এই জোয়ারে যেন কোনো মানুষই ‘ব্রাত্য’ বা ‘বাতিল’ হয়ে না পড়ে। মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রে রেখে যদি আমরা এআইয়ের পথে হাঁটি, তবেই বাংলাদেশ সত্যিই ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

মতিউর রহমান

শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নের একটি কার্যকর কাঠামো। এই ধারণার মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ বিস্তৃত হয়েছে, সরকারি সেবা ডিজিটাল হয়েছে এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এআই যেন কেবল একটি গ্ল্যামারাস স্লোগান হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন হয় প্রতিটি নাগরিকের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার

প্রযুক্তি এখানে অন্তত আংশিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ যখন ‘এআই বাংলাদেশ’-এর দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রশ্নটি আরও জটিল ও গভীর হয়ে উঠছে। এই রূপান্তরের সুফল কারা পাবে এবং কারা পিছিয়ে পড়বে-এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রারম্ভিক সময়ে প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাশ্রয়ী ছিল। একটি সাধারণ স্মার্টফোন এবং স্বল্পমূল্যের মোবাইল ইন্টারনেট থাকলেই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হতে পেরেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.২৫ কোটিতে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে নিবন্ধিত হিসাবের সংখ্যা ১২.৫ কোটির বেশি, যার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এটি দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং খাতে প্রায় ৬.৫ লাখ সক্রিয় কর্মী নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। যদিও এই প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো দেশের সব প্রান্তে সমানভাবে পৌঁছায়নি, তবুও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ছিল না।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর আবির্ভাব এই সহজলভ্য প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এআই কেবল একটি ইন্টারনেট সংযোগ বা সাধারণ স্মার্টফোনের বিষয় নয়। এটি মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিপুল পরিমাণ সুবিন্যস্ত ডেটা, উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশের তুলনায় ‘এআই বাংলাদেশ’-এর প্রবেশের পথ অনেক বেশি সংকীর্ণ ও ব্যয়বহুল।

ডেটারিপোর্টাল-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪৭.৪ শতাংশে পৌঁছালেও, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতাভুক্ত পরিবার মাত্র ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কার্যকরভাবে ডিজিটাল জগতের বাইরে অবস্থান করছে। এআই-নির্ভর সেবা ও সুযোগ-সুবিধা যদি এই বিদ্যমান ডিজিটাল বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের একটি ক্ষুদ্র ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীকেই উপকৃত করবে। যারা প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে আছে, তারা আরও এগিয়ে যাবে, আর যারা পিছিয়ে আছে, তারা এক অতল বৈষম্যের গহ্বরে পতিত হবে।

এআই-এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে। আমাদের দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪.৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কাজের ধরন সাধারণত পুনরাবৃত্তিমূলক এবং কম দক্ষতানির্ভর। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-এর এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এআই ও অটোমেশনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ পেশা কোনো না কোনোভাবে পরিবর্তনের সম্মুখীন হবে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যে রোবোটিকস ও এআই-ভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও উৎপাদন, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এমনকি সাধারণ অফিসিয়াল কাজে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে হয়তো সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে লাখ লাখ কম দক্ষ শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে যারা ড্রাইভিং, ডাটা এন্ট্রি কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মতো পেশায় নিয়োজিত, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে এক বিশাল বেকারত্বের সৃষ্টি হবে। বিআইডিএস-এর গবেষণা বলছে, শিক্ষিত বেকারদের প্রায় ৩৩ শতাংশই যথাযথ ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছে নাÑএআই যুগে এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো তৈরি পোশাক খাত। এই খাতেও এআই-এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বড় ও আধুনিক কারখানাগুলোতে ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন ও এআইভিত্তিক কিউসি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে পোশাক খাতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় প্রতি এক কোটি টাকা বিনিয়োগে কর্মসংস্থানের হার প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে।

পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। যদি প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কোনো সমন্বিত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা না হয়, তবে এআই এই খাতের ভেতরেই একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে। একদিকে উচ্চদক্ষ কারিগরি কর্মীদের বেতন যেখানে ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, সেখানে সাধারণ সেলাই কর্মীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতা শহরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও মোবাইল ইন্টারনেট দেশের প্রায় সবখানে পৌঁছেছে, কিন্তু ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি এবং স্থিতিশীলতা গ্রামে এখনো অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘আইসিটি ব্যবহার জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহারের হার মাত্র ৩.৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এটি ১৯.৫ শতাংশ।

এআইনির্ভর আধুনিক শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কিংবা স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি কাগজে-কলমে শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, বাস্তবে তা শহরকেন্দ্রিক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদি গ্রামীণ প্রান্তিক চাষি এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা বাজার বিশ্লেষণ টুল ব্যবহার করতে না পারে, তবে সে শহরের বড় কৃষিখামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এই ডিজিটাল ব্যবধান গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনযাত্রার মানে এক আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি করবে।

এআই বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। এআই এমন এক জনশক্তি চায় যারা কেবল মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী নয়, বরং সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী চিন্তায় দক্ষ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতার প্রায় ৪৪ শতাংশই হবে এআইভিত্তিক কারিগরি জ্ঞান।

শহরের নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে এআই ও প্রোগ্রামিং শিখছে, সেখানে দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যারা সরকারি সাধারণ স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ে, তারা যথাযথ ল্যাব বা ইন্টারনেট সুবিধাই পাচ্ছে না। এই শিক্ষা-বিভাজন সমাজে একটি ক্ষুদ্র ‘এআই এলিট’ শ্রেণি তৈরি করবে, যারা দেশের সব উচ্চমূল্যের চাকরি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় দখল করে নেবে। এর ফলে সাধারণ পরিবারের মেধাবী সন্তানরাও সুযোগের অভাবে ঝরে পড়বে।

লিঙ্গবৈষম্য এই প্রযুক্তিগত উত্তরণকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার ও স্মার্টফোন মালিকানার হার পুরুষদের তুলনায় যথাক্রমে ২৯ শতাংশ ও ২১ শতাংশ কম। জিএসএমএ রিপোর্ট অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই জেন্ডার গ্যাপ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। প্রযুক্তি ও এআই গবেষণায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য বিশেষ কোনো জাতীয় উদ্যোগ নেই। লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া এআই বাংলাদেশ নারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বদলে পুরনো বৈষম্যকেই আরও পাকাপোক্ত করতে পারে।

একইভাবে প্রবীণ নাগরিকরা যারা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ, তারা এই ডিজিটাল ও এআই রূপান্তরে চরমভাবে উপেক্ষিত। সরকারি ভাতা বা ব্যাংকিং সেবায় যে ধরনের অটোমেশন আসছে, তাতে অনেক প্রবীণ নাগরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রযুক্তির জটিলতা যেন কোনো নাগরিকের নূন্যতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ না হয়, রাষ্ট্রকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এআই সম্পূর্ণভাবে ডেটার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশের ডেটা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত অপরিকল্পিত ও শহরমুখী। প্রান্তিক মানুষের তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের ভাণ্ডারে অনুপস্থিত। এর ফলে এআই যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় (যেমন ঋণ অনুমোদন বা চাকরি বাছাই), তখন তা অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। একে বলা হয় ‘অ্যালগরিদমিক বায়াস’ বা গাণিতিক পক্ষপাতিত্ব।

পাশাপাশি, বাংলাদেশের মানুষের ডেটা যদি বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজস্ব এআই মডেল গড়ে তোলা না গেলে আমরা প্রযুক্তিগতভাবে চিরকাল অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ঘটিয়ে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে হাতে-কলমে কোডিং ও এআই এথিক্স বা নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনে শহর ও গ্রামের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি ও মূল্যের ব্যবধান দূর করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

একইসাথে, এআইয়ের প্রভাবে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ তহবিল গঠন ও পুনঃদক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিগত এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিক ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট ডেটা সুরক্ষা আইন ও গাইডলাইন প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। সর্বোপরি, জেন্ডার ইনক্লুসিভিটি বা লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিভাইসের সহজলভ্যতা ও বিশেষ কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে এআই বাংলাদেশে যাত্রা কেবল একটি কারিগরি অগ্রগতি নয়; এটি মূলত একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। এই উত্তরণ যদি কেবল একটি ক্ষুদ্র ধনিকশ্রেণীকে আরও সম্পদশালী করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে কর্মহীন ও সুযোগবঞ্চিত করে, তবে সেই উন্নয়নের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না।

উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এআই যেন কেবল একটি গ্ল্যামারাস স্লোগান হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন হয় প্রতিটি নাগরিকের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-প্রযুক্তির এই জোয়ারে যেন কোনো মানুষই ‘ব্রাত্য’ বা ‘বাতিল’ হয়ে না পড়ে। মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রে রেখে যদি আমরা এআইয়ের পথে হাঁটি, তবেই বাংলাদেশ সত্যিই ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top