মিথুশিলাক মুরমু
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে দেশবাসী দিশাহারা। বিগত ৩১ জানুয়ারি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার জুনাব আলী কলেজ মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে আর কোনো বিভেদ রাখব না। সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশকে ফুলের বাগানের মতো করে গড়ে তুলব।’ একই দিনে নির্বাচনী সফরে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় পুনরুক্তি করে বলেছেন, ‘এ দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। আমরা মিলেমিশে ফুলের বাগানের মতো দেশটাকে গড়ব। সব ধর্মের মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার পাবে, এজন্য তার লড়াই করার দরকার হবে না। কারণ সমাজে আমরা সুবিচার কায়েম করব। যোগ্যতা অনুযায়ী সবাই দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করবে। দেশ ও সরকার দেখবে না- তিনি কোন ধর্মের বা গোত্রের, দেখবে তিনি যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কিনা।’
আরেক ইসলামি দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছেন, ‘আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীকে নিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চাই। এই দেশে আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যালঘুদের অত্যাচার ও জুলুম চলবে না।’
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিনিধিরা চারটি ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম) লোকদের বাইরে খুব কম অন্য ধর্মের কথা উচ্চারণ করে থাকেন। বাংলাদেশের সংবিধানও প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করলেও উল্লেখ করতে সংকীর্ণতার পরিচয় দেখিয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে আদিবাসী ধর্ম- ক্রামা, সারনা, সানামাহি, সাংসারেক, ধর্মেস, বাহাই প্রভৃতি ধর্মের অনুসারীরা বসবাস করেন।
জাতিগতভাবে রয়েছেন- সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালি, মুণ্ডা, কোল, ভীল, গারো, হাজং, খাসি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বমসহ অর্ধশতাধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। রয়েছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারণের পদ্ধতি। প্রতিটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীই শত সহস্র বছর পূর্ব থেকেই এই ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছেন। দেশের প্রতি তাদের মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও অবদানও কম নয়। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রয়েছে অসামান্য অবদান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক দেশ নির্মাণের স্বপ্নে তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, আদিবাসীরা ফিরে গেছেন ছায়াঘেরা গ্রামে, জন্মভিটায়। কিন্তু অদ্যাবধি বিচারহীনতা, বৈষম্য এবং উচ্ছেদের মতো আতঙ্কের পরিস্থিতিতে তাদের সর্বদাই তটস্থ থাকতে হয়। বাংলাদেশ নামক ফুলের বাগানে আদিবাসীরা যেন বুনো ফুলের মতোই অবহেলিত। ভোটের মৌসুমে তাদের কদর বেড়ে যায়, যেন বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে তাদের প্রয়োজন।
একটি আদর্শ বাগানে যেমন নানা রঙের ও ঘ্রাণের ফুল থাকে, অনুরূপভাবে নির্বাচনী বাগানেও বিভিন্ন ধরনের ফুল বা ভোটার রয়েছে। বাগানে যেমন কিছু ফুল সংখ্যায় বেশি থাকে, তেমনি দেশের রাজনীতিতে বাঙালি মুসলিম-হিন্দু ভোটাররা প্রধান শক্তি। অন্যদিকে আদিবাসী ও অন্ত্যজ সংখ্যালঘুরা হলো সেই দুর্লভ ফুল, যারা সংখ্যায় কম হলেও বাগানের বৈচিত্র?্য বজায় রাখে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দল আদিবাসীদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর সেই ফুলগুলো ঝরে যায়- অর্থাৎ তাদের আর মনে রাখা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাগানের বুনো ফুল যেমন শুধু শোভার জন্য নয়, বরং তার টিকে থাকার জন্য নিয়মিত জল আর সার (যত্ন) দিতে হয় এবং বাগানের ফুল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হয়।
আদিবাসী ভোটারদের শুধু ভোটের সময় মনে রাখলে চলবে না; প্রয়োজন তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ। তাদের অধিকারগুলোর যতœ নিতে হবে সারা বছর জুড়েই। যত্ন নেয়া মানে হলো- তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া, তাদের নিজ ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এবং তাদের সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দেয়া।
সমতলের আদিবাসীরা বাগানের এক কোণে ফুটে থাকা বুনো ফুলের মতোই অবহেলিত থাকে; বুনো ফুলকে মাড়িয়ে গেলেও কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না। ক্ষেত্রবিশেষে আবার রোগ সারানোর ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে- গুরুত্ব বহন করলেও উপেক্ষিত। নির্বাচনের সময় আদিবাসীদের কদর বাড়লেও অন্য সময় তাদের অস্তিত্বের কথা রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে যায়।
আদিবাসীরা কেবল নির্বাচনী বাগানের সৌন্দর্য বাড়ানোর কোনো উপকরণ নয়। তারা এই দেশের নাগরিক, এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করাই হলো আসল যত্ন। সব ফুলই সমান যতে্নর দাবিদার। কেবল বড় বা উজ্জ্বল ফুলগুলোর যত্ন নিলেই বাগান পূর্ণতা পায় না; ছোট ও প্রান্তিক ফুলগুলোর সমান পরিচর্যা প্রয়োজন।
আদিবাসী ফুল বা আদিবাসী নেতৃত্বের ধরন কেবল শোভাবর্ধনকারী হওয়া উচিত নয়। বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে বিচিত্র ফুলের সমাহার যেমন আবশ্যিক, রাজনীতিতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নও তেমনি জরুরি। এতে বৈচিত্র্য বাড়ে, রাষ্ট্রের সৌন্দর্য বাড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক অংশী হিসেবে নয়, কেবল সৌন্দর্যের দিকটিকেই গুরুত্বারোপ করে।
বাগানের সৌন্দর্য ও সম্প্রীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাগানে সম্ভবপর হলেও মানুষের সমাজে তা বাস্তবায়ন কঠিনতম কাজ। তবু মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব; আমাদের রয়েছে বিচারবুদ্ধি, বিবেক এবং ভালো-মন্দকে চিহ্নিত করার শক্তি। এজন্যই স্রষ্টা ঈশ্বর মানুষকে অধিক দায়িত্ববোধ দিয়েছেন- যার মধ্যে রয়েছে অন্তর্ভুক্তি, ন্যায্যতা, ভালোবাসা এবং একে-অপরকে সম্মান করা। মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে কেউই তেমন সোচ্চার হন না। যার ফলেই আদিবাসীরা অনেক সময় রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করতে উদ্যত হন। আদিবাসীদের ভূমি দখল বা উচ্ছেদ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না বললেই চলে। রাজনীতিতে আদিবাসীদের ভূমিকা হওয়া উচিত এমন- যাদের ছাড়া ‘গণতন্ত্রের বাগান’ অপূর্ণ থাকবে এবং যাদের উপেক্ষা করা কোনো দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না।
ফুলের বাগানের মতো কিংবা সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং স্রষ্টা ঈশ্বরের নিজ প্রতিমূর্তিতে নির্মিত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি বিদ্যমান- এই চেতনাই বাগানের ফুলের মতো সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মিথুশিলাক মুরমু
শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে দেশবাসী দিশাহারা। বিগত ৩১ জানুয়ারি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার জুনাব আলী কলেজ মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে আর কোনো বিভেদ রাখব না। সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশকে ফুলের বাগানের মতো করে গড়ে তুলব।’ একই দিনে নির্বাচনী সফরে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় পুনরুক্তি করে বলেছেন, ‘এ দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। আমরা মিলেমিশে ফুলের বাগানের মতো দেশটাকে গড়ব। সব ধর্মের মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার পাবে, এজন্য তার লড়াই করার দরকার হবে না। কারণ সমাজে আমরা সুবিচার কায়েম করব। যোগ্যতা অনুযায়ী সবাই দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করবে। দেশ ও সরকার দেখবে না- তিনি কোন ধর্মের বা গোত্রের, দেখবে তিনি যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কিনা।’
আরেক ইসলামি দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছেন, ‘আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীকে নিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চাই। এই দেশে আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যালঘুদের অত্যাচার ও জুলুম চলবে না।’
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিনিধিরা চারটি ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম) লোকদের বাইরে খুব কম অন্য ধর্মের কথা উচ্চারণ করে থাকেন। বাংলাদেশের সংবিধানও প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করলেও উল্লেখ করতে সংকীর্ণতার পরিচয় দেখিয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে আদিবাসী ধর্ম- ক্রামা, সারনা, সানামাহি, সাংসারেক, ধর্মেস, বাহাই প্রভৃতি ধর্মের অনুসারীরা বসবাস করেন।
জাতিগতভাবে রয়েছেন- সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালি, মুণ্ডা, কোল, ভীল, গারো, হাজং, খাসি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বমসহ অর্ধশতাধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। রয়েছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারণের পদ্ধতি। প্রতিটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীই শত সহস্র বছর পূর্ব থেকেই এই ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছেন। দেশের প্রতি তাদের মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও অবদানও কম নয়। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রয়েছে অসামান্য অবদান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক দেশ নির্মাণের স্বপ্নে তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, আদিবাসীরা ফিরে গেছেন ছায়াঘেরা গ্রামে, জন্মভিটায়। কিন্তু অদ্যাবধি বিচারহীনতা, বৈষম্য এবং উচ্ছেদের মতো আতঙ্কের পরিস্থিতিতে তাদের সর্বদাই তটস্থ থাকতে হয়। বাংলাদেশ নামক ফুলের বাগানে আদিবাসীরা যেন বুনো ফুলের মতোই অবহেলিত। ভোটের মৌসুমে তাদের কদর বেড়ে যায়, যেন বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে তাদের প্রয়োজন।
একটি আদর্শ বাগানে যেমন নানা রঙের ও ঘ্রাণের ফুল থাকে, অনুরূপভাবে নির্বাচনী বাগানেও বিভিন্ন ধরনের ফুল বা ভোটার রয়েছে। বাগানে যেমন কিছু ফুল সংখ্যায় বেশি থাকে, তেমনি দেশের রাজনীতিতে বাঙালি মুসলিম-হিন্দু ভোটাররা প্রধান শক্তি। অন্যদিকে আদিবাসী ও অন্ত্যজ সংখ্যালঘুরা হলো সেই দুর্লভ ফুল, যারা সংখ্যায় কম হলেও বাগানের বৈচিত্র?্য বজায় রাখে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দল আদিবাসীদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর সেই ফুলগুলো ঝরে যায়- অর্থাৎ তাদের আর মনে রাখা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাগানের বুনো ফুল যেমন শুধু শোভার জন্য নয়, বরং তার টিকে থাকার জন্য নিয়মিত জল আর সার (যত্ন) দিতে হয় এবং বাগানের ফুল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হয়।
আদিবাসী ভোটারদের শুধু ভোটের সময় মনে রাখলে চলবে না; প্রয়োজন তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ। তাদের অধিকারগুলোর যতœ নিতে হবে সারা বছর জুড়েই। যত্ন নেয়া মানে হলো- তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া, তাদের নিজ ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এবং তাদের সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দেয়া।
সমতলের আদিবাসীরা বাগানের এক কোণে ফুটে থাকা বুনো ফুলের মতোই অবহেলিত থাকে; বুনো ফুলকে মাড়িয়ে গেলেও কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না। ক্ষেত্রবিশেষে আবার রোগ সারানোর ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে- গুরুত্ব বহন করলেও উপেক্ষিত। নির্বাচনের সময় আদিবাসীদের কদর বাড়লেও অন্য সময় তাদের অস্তিত্বের কথা রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে যায়।
আদিবাসীরা কেবল নির্বাচনী বাগানের সৌন্দর্য বাড়ানোর কোনো উপকরণ নয়। তারা এই দেশের নাগরিক, এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করাই হলো আসল যত্ন। সব ফুলই সমান যতে্নর দাবিদার। কেবল বড় বা উজ্জ্বল ফুলগুলোর যত্ন নিলেই বাগান পূর্ণতা পায় না; ছোট ও প্রান্তিক ফুলগুলোর সমান পরিচর্যা প্রয়োজন।
আদিবাসী ফুল বা আদিবাসী নেতৃত্বের ধরন কেবল শোভাবর্ধনকারী হওয়া উচিত নয়। বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে বিচিত্র ফুলের সমাহার যেমন আবশ্যিক, রাজনীতিতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নও তেমনি জরুরি। এতে বৈচিত্র্য বাড়ে, রাষ্ট্রের সৌন্দর্য বাড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক অংশী হিসেবে নয়, কেবল সৌন্দর্যের দিকটিকেই গুরুত্বারোপ করে।
বাগানের সৌন্দর্য ও সম্প্রীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাগানে সম্ভবপর হলেও মানুষের সমাজে তা বাস্তবায়ন কঠিনতম কাজ। তবু মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব; আমাদের রয়েছে বিচারবুদ্ধি, বিবেক এবং ভালো-মন্দকে চিহ্নিত করার শক্তি। এজন্যই স্রষ্টা ঈশ্বর মানুষকে অধিক দায়িত্ববোধ দিয়েছেন- যার মধ্যে রয়েছে অন্তর্ভুক্তি, ন্যায্যতা, ভালোবাসা এবং একে-অপরকে সম্মান করা। মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে কেউই তেমন সোচ্চার হন না। যার ফলেই আদিবাসীরা অনেক সময় রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করতে উদ্যত হন। আদিবাসীদের ভূমি দখল বা উচ্ছেদ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না বললেই চলে। রাজনীতিতে আদিবাসীদের ভূমিকা হওয়া উচিত এমন- যাদের ছাড়া ‘গণতন্ত্রের বাগান’ অপূর্ণ থাকবে এবং যাদের উপেক্ষা করা কোনো দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না।
ফুলের বাগানের মতো কিংবা সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং স্রষ্টা ঈশ্বরের নিজ প্রতিমূর্তিতে নির্মিত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি বিদ্যমান- এই চেতনাই বাগানের ফুলের মতো সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]