alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আমাদের অনেক দুঃখ-বেদনা, হাহুতাশ রয়েছে। আমরা ছোটকাল হতে পাহাড়ে বড় হয়েছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটের সব করুণ চিত্র অবলোকন করেছি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছি। পাহাড়ের দুঃখ-বেদনার কথাগুলো যদি বলি তা কখনও বলে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজনবোধ মনে করি না কারণ পাহাড় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখটা কোথায় সবকিছু সবাই অবগত রয়েছেন। তার ওপর বর্তমান সদাশয় সরকারের অনেক দূরদর্শী চিন্তা-চেতনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকারী যোগ্য নেতৃত্বেই এবারের বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, বিশ্বে দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেটা পাহাড়বাসী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। দেশের প্রচলিত কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। আন্দোলনের শুরুটা খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে সাধারণ দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, অর্থাৎ প্রচলিত কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে মেধার মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে সমসুযোগ পাওয়ার দাবি। কোটা সংস্কার আন্দোলন বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যা-ই বলি না কেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ যুগপৎ আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচলিত চলমান ব্যবস্থার ভিতকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ সরকারকে গদি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। সংবিধানের ২৮(৪) ও ২৯(৩)-এর অনুচ্ছেদগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে, যাতে প্রজাতন্ত্রের যেকোনো কাজে তারা প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারেন।

কোটাব্যবস্থার অর্থ এই নয় যে কাউকে দয়াদাক্ষিণ্য দেখানোর বিষয় কিংবা সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে তাদের জন্য কোটা বণ্টন রাখা। কোটা হলো সেই ব্যবস্থা, যারা দেশের অভ্যন্তরে জাতিগতভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নতার কারণে রাষ্ট্রের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও ভৌগোলিকভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসের কারণে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সমান সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাই পিছিয়ে থাকা সেই জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য সরকারি চাকরি কিংবা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটাব্যবস্থা রাখা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শুরুটা যদিও কোটাব্যবস্থার সংস্কারকে সামনে রেখে আবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামেই এটি পরিচালিত হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যেভাবে দুর্নীতি গেড়ে বসেছে, তার সংস্কারের বিষয়টিও জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছিল। দুর্নীতির শিকড় এ সমাজব্যবস্থায় চরম শ্রেণিবৈষম্য তৈরি করে দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন আওয়ামীলীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সাল থেকেই এ দেশের জাতিসত্তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে অস্বীকার করতে শুরু করে। যদিও ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী কথাটি তারা স্পষ্ট উল্লেখ করেছিল।

আওয়ামী লীগ এতটাই স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছিল যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর থেকে সরকারি আদেশ জারি করে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করা ও আদিবাসী দিবস পালন না করার নির্দেশ দেয়। তাই বর্তমান বৈষম্যমুক্ত সদাশয় সরকারের কাছে আমাদের প্রাণের দাবি থাকবে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামীলীগ দুঃশাসনের সময়ে জারি করা পরিপত্রগুলো অচিরেই প্রত্যাহার করে নেয়, যাতে এ দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা তাদের নিজ নিজ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার ফিরে পায়। কোটাবিষয়ক সর্বশেষ সিদ্ধান্তে দেখা যায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের জন্য মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেটি খুবই নগণ্য, অন্যায্য ও অযৌক্তিক। কেননা পাহাড় ও সমতলে যেখানে ৫০টির বেশি জাতিসত্তা রয়েছে। ২০১০ সালে প্রণীত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’ আইনটি প্রণয়ন করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির দিককে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের কথা বলা হলেও নিজ নিজ জাতিসত্তার পরিচিতি ও ভাষার স্বীকৃতির কথা আইনে বলা হয়নি। দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়া হলেও এ দেশের বহু জাতিসত্তার ভাষা আজ বিপন্নের মধ্যে আছে। সেসব ভাষা ধুঁকে ধুঁকে অতলে হারিয়ে যাবে কোনো একদিন। নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রধান প্রত্যাশাগুলো হলো:

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন: ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং চুক্তির পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সঠিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

ভূমি অধিকার: ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম সক্রিয় করে দীর্ঘদিনের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান। ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন এবং পাহাড়িদের ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাহাড় ও সমতল আবিাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।

অধিকার প্রতিষ্ঠা: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় আদিবাসী জনগোষ্ঠির স্ব-স্ব ভাষা অধ্যয়নের নিশ্চিত করা। ভাষা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

নিয়োগ ও কোটা প্রথা: সর্বক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে স্থানীয় আদিবাসীদের জন্য বিশেষ কোটা কার্যকর এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: পার্বত্য অঞ্চলকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পর্যটনের নামে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমি বেদখল বন্ধ করা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

অবকাঠামো উন্নয়ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা।

জাতীয় নীতি: দেশের সকল আদিবাসীদের উন্নয়নে জন্য একটি “জাতীয় নীতি” তৈরি করা।

নিরাপত্তা ও শান্তি: আঞ্চলিক অস্থিরতা দূর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন তরান্বিত করা। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার এবং নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থাকার নিশ্চয়তা নতুন সরকারের কাছ থেকে আশা করে। সদাশয় সরকার পাহাড়ের মানুষের আস্থা অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে পাহাড়বাসী।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আমাদের অনেক দুঃখ-বেদনা, হাহুতাশ রয়েছে। আমরা ছোটকাল হতে পাহাড়ে বড় হয়েছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটের সব করুণ চিত্র অবলোকন করেছি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছি। পাহাড়ের দুঃখ-বেদনার কথাগুলো যদি বলি তা কখনও বলে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজনবোধ মনে করি না কারণ পাহাড় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখটা কোথায় সবকিছু সবাই অবগত রয়েছেন। তার ওপর বর্তমান সদাশয় সরকারের অনেক দূরদর্শী চিন্তা-চেতনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকারী যোগ্য নেতৃত্বেই এবারের বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, বিশ্বে দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেটা পাহাড়বাসী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। দেশের প্রচলিত কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। আন্দোলনের শুরুটা খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে সাধারণ দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, অর্থাৎ প্রচলিত কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে মেধার মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে সমসুযোগ পাওয়ার দাবি। কোটা সংস্কার আন্দোলন বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যা-ই বলি না কেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ যুগপৎ আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচলিত চলমান ব্যবস্থার ভিতকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ সরকারকে গদি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। সংবিধানের ২৮(৪) ও ২৯(৩)-এর অনুচ্ছেদগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে, যাতে প্রজাতন্ত্রের যেকোনো কাজে তারা প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারেন।

কোটাব্যবস্থার অর্থ এই নয় যে কাউকে দয়াদাক্ষিণ্য দেখানোর বিষয় কিংবা সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে তাদের জন্য কোটা বণ্টন রাখা। কোটা হলো সেই ব্যবস্থা, যারা দেশের অভ্যন্তরে জাতিগতভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নতার কারণে রাষ্ট্রের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও ভৌগোলিকভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসের কারণে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সমান সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাই পিছিয়ে থাকা সেই জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য সরকারি চাকরি কিংবা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটাব্যবস্থা রাখা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শুরুটা যদিও কোটাব্যবস্থার সংস্কারকে সামনে রেখে আবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামেই এটি পরিচালিত হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যেভাবে দুর্নীতি গেড়ে বসেছে, তার সংস্কারের বিষয়টিও জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছিল। দুর্নীতির শিকড় এ সমাজব্যবস্থায় চরম শ্রেণিবৈষম্য তৈরি করে দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন আওয়ামীলীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সাল থেকেই এ দেশের জাতিসত্তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে অস্বীকার করতে শুরু করে। যদিও ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী কথাটি তারা স্পষ্ট উল্লেখ করেছিল।

আওয়ামী লীগ এতটাই স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছিল যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর থেকে সরকারি আদেশ জারি করে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করা ও আদিবাসী দিবস পালন না করার নির্দেশ দেয়। তাই বর্তমান বৈষম্যমুক্ত সদাশয় সরকারের কাছে আমাদের প্রাণের দাবি থাকবে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামীলীগ দুঃশাসনের সময়ে জারি করা পরিপত্রগুলো অচিরেই প্রত্যাহার করে নেয়, যাতে এ দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা তাদের নিজ নিজ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার ফিরে পায়। কোটাবিষয়ক সর্বশেষ সিদ্ধান্তে দেখা যায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের জন্য মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেটি খুবই নগণ্য, অন্যায্য ও অযৌক্তিক। কেননা পাহাড় ও সমতলে যেখানে ৫০টির বেশি জাতিসত্তা রয়েছে। ২০১০ সালে প্রণীত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’ আইনটি প্রণয়ন করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির দিককে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের কথা বলা হলেও নিজ নিজ জাতিসত্তার পরিচিতি ও ভাষার স্বীকৃতির কথা আইনে বলা হয়নি। দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়া হলেও এ দেশের বহু জাতিসত্তার ভাষা আজ বিপন্নের মধ্যে আছে। সেসব ভাষা ধুঁকে ধুঁকে অতলে হারিয়ে যাবে কোনো একদিন। নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রধান প্রত্যাশাগুলো হলো:

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন: ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং চুক্তির পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সঠিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

ভূমি অধিকার: ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম সক্রিয় করে দীর্ঘদিনের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান। ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন এবং পাহাড়িদের ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাহাড় ও সমতল আবিাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।

অধিকার প্রতিষ্ঠা: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় আদিবাসী জনগোষ্ঠির স্ব-স্ব ভাষা অধ্যয়নের নিশ্চিত করা। ভাষা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

নিয়োগ ও কোটা প্রথা: সর্বক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে স্থানীয় আদিবাসীদের জন্য বিশেষ কোটা কার্যকর এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: পার্বত্য অঞ্চলকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পর্যটনের নামে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমি বেদখল বন্ধ করা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

অবকাঠামো উন্নয়ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা।

জাতীয় নীতি: দেশের সকল আদিবাসীদের উন্নয়নে জন্য একটি “জাতীয় নীতি” তৈরি করা।

নিরাপত্তা ও শান্তি: আঞ্চলিক অস্থিরতা দূর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন তরান্বিত করা। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার এবং নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থাকার নিশ্চয়তা নতুন সরকারের কাছ থেকে আশা করে। সদাশয় সরকার পাহাড়ের মানুষের আস্থা অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে পাহাড়বাসী।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

back to top