অনুবাদ: কামরুল ইসলাম
পাগল মেয়ের ভালোবাসার গান
আমি চোখ বন্ধ করলেই পৃথিবীতে মৃত্যু নেমে আসে;
চোখ খুললেই আবার সবকিছু প্রাণ ফিরে পায়।
(মনে হয়, আমার মাথার ভেতরেই তুমি আছো।)
লাল নীল নক্ষত্রেরা নাচতে নাচতে সরে যায়,
ইচ্ছেমতো ক্ষিপ্র গতিতে ঢুকে পড়ে অন্ধকার;
আমি চোখ বন্ধ করলেই পৃথিবীতে মৃত্যু নেমে আসে।
স্বপ্ন দেখেছি- আমাকে তুমি আবেশে টেনেছ বিছানায়
শুনিয়েছ চন্দ্রগীত, চুম্বনে চুম্বনে উন্মাদ করেছ।
(মনে হয়, আমার মাথার ভেতরেই তুমি আছো।)
ঈশ^র আকাশ থেকে উল্টে পড়েছে, নরক নিভু নিভু;
দেবদূত ও শয়তানের চেলারা বেরিয়ে যাচ্ছে:
আমি চোখ বন্ধ করলেই পৃথিবীতে মৃত্যু নেমে আসে।
ভেবেছিলাম তুমি যেভাবে বলেছিলে ফিরে আসবে,
আমি বুড়ো হয়েছি এবং ভুলে গেছি তোমার নাম।
(মনে হয়, আমার মাথার ভেতরেই তুমি আছো।)
এর চেয়ে ভালো ছিল সেই বজ্রপাখিকেই ভালোবাসা;
বসন্ত এলে অন্তত গর্জন করে ফিরে আসত আবার।
আমি চোখ বন্ধ করলেই পৃথিবীতে মৃত্যু নেমে আসে।
(মনে হয়, আমার মাথার ভেতরেই তুমি আছো।)
আয়না
আমি রুপালি রঙের আর আমার গঠন নিখুঁত। আমার কোনো পূর্ব ধারণা নেই।
ভালোবাসা বা অপছন্দের স্পষ্ট ধারণায় আমি যা কিছুই দেখি
ঠিক যেটা যেমন, সাথে সাথে গলাধকরণ করি।
সত্যের সাথে আমার চির সখ্য, আমি নিষ্ঠুর নই,
এক খুদে দেবতার চোখ, চতুষ্কোণ।
বেশিরভাগ সময় আমি বিপরীত দেওয়াল নিয়ে গভীরভাবে ভাবি,
এটি গোলাপি রঙের এবং ভেতরে ছোট ছোট ফুটকি।
আমি দীর্ঘ সময় এর দিকে তাকিয়ে থাকি
আমি মনে করি এটি আমার হৃদয়ের অংশ। এটি টিমটিম করে জ¦লে।
অবয়ব ও অন্ধকার আমাদের বার বার আলাদা করে।
এখন আমি একটি হ্রদ। একজন মহিলা আমার ওপর ঝুঁকে আছে।
প্রকৃতপক্ষে সে কী সেটা জানার জন্যে আমার গভীরতা খুঁজে ফিরছে।
তারপর সে সেইসব মিথ্যুকের দিকে
মোমবাতি অথবা চাঁদের দিকে মুখ ফেরায়।
আমি তার পিছনটা দেখি, এবং তা বিশ^স্ততার সাথে প্রতিফলিত করি
সে আমাকে পুরস্কৃত করে চোখের জল এবং হাতের অস্থিরতা দিয়ে।
আমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে আসে এবং চলে যায়।
প্রত্যেক সকালেই তার মুখ অন্ধকারকে প্রতিস্থাপিত করে।
আমার ভেতরে সে এক তরুণীকে ডুবিয়ে রেখেছে, এবং আমার ভেতরে
এক বৃদ্ধা ভয়ংকর মাছের মতো দিনের পর দিন ওঠে আসে তার দিকে।
তিন রিংয়ের সার্কাস
মাতাল দেবতার নকশামাফিক তৈরি একটি ঘূর্ণিঝড়ের
সার্কাস তাঁবুতে আমার উচ্ছ্বসিত হৃদয় আবার ফেটে পড়ে
শ্যাম্পেন রঙের বৃষ্টির তা-বে,
এবং টুকরোগুলো ঘূর্ণি তুলে ঘোরে
আবহাওয়া-নির্দেশক যন্ত্রের মতো
যখন দেবদূতেরা সবাই হাততালি দেয়।
মৃত্যুর মতো দুঃসাহস ও আভিজাত্যের দৃঢ়তায়
আমি ঢুকে পড়ি আমার সিংহের গুহায়;
ঝুঁকি নিয়ে একটি গোলাপ আমার চুলের মধ্যে জ¦লে ওঠে
তথাপি আমি মারাত্মক বিচক্ষণতায় চাবুকটাকে শাণিত করি
আমার বিপদসংকুল ক্ষতগুলো চেয়ার দিয়ে রক্ষা করি
যখন ভালোবাসার দংশন শুরু হয়।
মেফিস্টোফেলিসের হাসির মতো বিদ্রƒপাত্মক,
জাদুকরের ছদ্মবেশ রচিত অন্ধকার,
আমার ভাগ্যের শয়তান ট্র্যাপিজের ওপর দুলে ওঠে,
ডানাওয়ালা খরগোস তার হাটুঁর চারদিকে ঘুরছে,
আর হঠাৎই শয়তানি কৌশলে সব অদৃশ্য হয়ে যায়
এক ধুঁয়োর ভেতরে, যা আমার চোখ ঝলসে দেয়।
কবি পরিচিতি :
সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন আমেরিকান কনফেশনাল কবিদের অন্যতম। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজকবি (১৯৩০-১৯৯৮) টেড হিউজের (অ্যাডওয়ার্ড জেমস টেড হিউজ) প্রথম স্ত্রী। অস্ট্রিয়ান এবং জার্মান পিতা-মাতার সন্তান প্লাথ ১৯৩২ সালের ২৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্সের বোস্টনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে স্মিথ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ফুলব্রাইট ফেলোশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। এখানে অধ্যায়নকালে ইংরেজ কবি টেড হিউজের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং ১৯৫৬ সালের ১৬ জুন তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে চলে যান। ১৯৬২ সালে এই দম্পতির বিচ্ছেদ ঘটে। প্লাথ তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় বিষণœতা ও অবসাদে ভুগেছেন। তাকে বেশ ঘন ঘন ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি(ইসিটি)দিয়ে চিকিৎসা করা হতো। এবং শেষে স্বেচ্ছামৃত্যুকে বরণ করে নেন । উল্লেখ্য,১৯৫৬ সালের প্রারম্ভে যখন প্লাথ ও অ্যান সেক্সটন (১৯২৮-১৯৭৪) বোস্টন ভার্সিটিতে তাঁর (টেড হিউজ) সেমিনারে নিয়মিত, সে-সময়ে তরুণী প্লাথের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিয়ের প্রথম বছর দুজনেই স্বপ্নিল সুখের এক রঙিন কুটির থেকে আকাশে উড়িয়েছিলেন প্রজাপতির সবুজ উপাখ্যান। দুই কবি একে অপরকে উৎসাহ দিয়েছেন কবিতার নানা বিষয়ে। ক্যামব্রিজের লেখাপড়া শেষ হলে তিনি কিছুকাল স্মিথ কলেজে পড়ানোর কাজে নিউ ইংল্যান্ডে কাটান।
তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘দ্য কলোসাস অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (১৯৬০) প্রকাশিত হলে তা সমালোচকদের নজরে আসে এবং এ-সময়ে পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়। ‘দ্য কলোসাস’-এ আমরা দেখি কবির একান্ত নিজস্ব অনুভূতির প্রকাশ এবং তার নিয়তির অনিবার্যতা। ‘ড্যাডি’ কবিতায় তিনি তাঁর পিতাকে তাঁর স্বামীর সাথে তুলনা করেছেন এবং তাঁর নষ্ট বিবাহ-জীবনের জন্যও দায়ী করেছেন অনেকখানি। দুর্বিসহ জীবনের দাঁড় টানা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
জীবনের শেষ কয়েক মাস দুর্মর মানসিক ঘোরের মধ্যে তিনি যে কবিতাগুলো লিখেছিলেন, সেগুলোই মূলত প্লাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিবেচিত। তাঁর এই সময়ের লেখা কবিতাগুলো ‘এরিয়েল’-এ স্থান পায়। ‘এরিয়েল’কে বলা হয়ে থাকে ‘দ্য ডায়েলেক্ট অব ডেথ’; এই সংকলনের কবিতাগুলোয় মৃত্যুই প্রধান থিম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মুখোশে মৃত্যুর পদচারণায় উন্মুখর এই গ্রন্থ। জীবনের চারদিকে যখন ঘনিয়ে আসে নগ্ন অন্ধকার, কোনোকিছুই যখন আর দেখা যায় না, না শান্তি, না সুখ কিংবা একটুখানি প্রেমময় কণ্ঠস্বর আশ্বাসের, বেঁচে থাকার মতো মন্ত্রে ভরপুর, তখন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তির পথ করে নেয়। কমপাউন্ড-সিম্বলের মধ্য দিয়ে প্লাথ তাঁর একধরনের হিমশীতল, বিফল বিচ্ছন্নতা, নিঃসঙ্গ, অর্থহীন অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় চাঁদ কিংবা ছায়াপথ বন্ধ্যত্ব কিংবা হতাশার ইমেজ নিয়ে হাজির হয়। কখনো কোনো সৌন্দর্যও যেন ধ্বংসের ইঙ্গিতে ভাস্বর হয়ে উঠছে। অনেক ইমেজের যুক্তস্বর উদ্ভাসিত করে তাঁর মনোজগতের মানচিত্র।
’৮১ সালে প্রকাশিত হয় ‘দ্য কালেক্টেড পোয়েমস’ যেখানে তাঁর অনেক অপ্রকাশিত কবিতার খোঁজখবর পাওয়া যায়। এই বই প্রকাশিত হলে ১৯৮২ সালে তিনি মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার পান । ফেবার অ্যান্ড ফেবার থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘সিলেক্টড পোয়েমস’।
তিনি গ্যাসের চুল্লিতে মাথা ঢুকিয়ে ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩০ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। উল্লেখ্য, সিলভিয়া প্লাথ প্রথমবার ২০ বছর বয়সে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি বেশ কিছু কলোত্তীর্ণ কবিতা লিখে গেছেন, যা তাঁর যন্ত্রণা-পীড়িত হৃদয় থেকে উৎসারিত। অনূদিত কবিতাগুলো গ্যারি গেডস সম্পাদিত টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি পোয়েট্রি অ্যান্ড পোয়েটিক্স (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, কানাডা-১৯৯৬)-এর অন্তর্ভুক্ত।