জাপানের হাইকু জাদুঘর
মালেক মুস্তাকিম
‘পুরানো পুকুর
ব্যাঙের লাফ
জলের শব্দ’
পড়তে পড়তে মনে হতে পারে চিরায়ত বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঘরদোর, মেঠোপথ আর নদীনালা খালবিলের চিরচেনা জগতের এক অপার দৃশ্যের কথা কবি বলেছেন। আমারও তাই মনে হয়েছিল। জাপানের বিখ্যাত হাইকু কবি মাৎসুও বাশোর হাইকু পড়ার অভিজ্ঞতা আমাদেরকে ঠিক এমনি এক আবহমান প্রকৃতি ও জনজীবনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রকৃতির সাথে জীবনের মিশেলে হাইকু এক অনন্য কবিতা। জাপানের হাইকু পড়তে পড়তে কিছুদিন ধরে সারাক্ষণ মাথার ভেতরে কবিতা ঘোরাঘুরি করছে।
আমার এই এক সমস্যা- যেখানে যাই কবিতা সাথে করে নিয়ে যাই। কবিতারও ওই এক সমস্যা- একবার মাথায় ঢুকলে আর বের হতে চায় না। এজন্য হয়তো কবিদের কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো হয়ে ওঠে না। কবিতাকে যতই দূরে ঠেলে দিতে চাই, জোর করে সে আরো কাছে চলে আসে। আবার যখন খুব করে কাছে টানি, ঠিকমতো ধরা দেয় না। কবিতা কি আমার প্রেমিকা? আমি তার প্রেমিক? আমাদের অভিমানের শিকড় জুড়ে আলুথালু দিনের বেহিসেবি আলাপ। ডানায় রোদের চিহ্ন মুছে ক্লান্ত পাখির মতো আকাশ ভেদ করে ওপরে উঠে যাওয়া এক টুকরো মেঘের সামিয়ানা যেন আমার কবিতার খাতা। এখানে শব্দেরা ভাগ হয়ে যায়, মুহূর্তেরা জমে যায় অপরূপ এক নিস্তব্ধতায়। তাই কবিতাকে সংগী করেই হেঁটে যাই। হাঁটতে হয়।
এমনি এক স্নিগ্ধ সকালে টোকিও শহরের ফুকাগাওয়ার সুমিদা নদীর তীর ধরে হাটতে হাঁটতে চলে যাই জাপানি হাইকুর আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ‘বাশো মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে’। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি কেবল একটি যাদুঘরের দিকে যাচ্ছি না, বরং যাচ্ছি সময়ের অতল গহ্বরে- যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র সতেরোটি সিলেবলের টানে। যাদুঘরটির সামনে দাঁড়াতেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি আমাকে আচ্ছন্ন করল। জাপানি স্থাপত্যের সেই চিরাচরিত পরিচ্ছন্নতা আর আভিজাত্য সেখানে বিদ্যমান। ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল বিখ্যাত হাইকু সম্রাট মাৎসুও বাশোর একটি ব্রোঞ্জমূর্তি। তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন, যেন সুদূর অতীতে কোনো এক শরতের বিকেলে ঝরে পড়া পাতা দেখে একটি কালজয়ী পঙ্ক্তি বুনছেন। যাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারি যেন এক একটি নীরব কবিতা। দেয়াল জুড়ে টাঙানো রয়েছে প্রাচীন স্ক্রল বা ‘কাকেনোমো’। তাতে তুলির আঁচড়ে আঁকা ছবির পাশে বাঁকা হরফে লেখা বিখ্যাত সব হাইকু। যাদুঘরটিতে কেবল বাশো নন, বুসন এবং ইসার মতো প্রথিতযশা হাইকু কবিদের পা-ুলিপিও সংরক্ষিত আছে। বিশেষ করে বাশোর ব্যবহৃত ভ্রমণকালীন জামা, জুতা, ব্যাগ, টুপি, কলম, কালির পাত্র আর ভ্রমণের লাঠিগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, হাইকু কেবল সাহিত্য নয়- এটি একটি জীবনযাপন পদ্ধতি। জাপানিরা বিশ্বাস করে, যা কিছু ক্ষণস্থায়ী, যা কিছু সাধারণ, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক সৌন্দর্য। মূল জাদুঘরের অদূরে নদীর কূল ঘেঁষে কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই ছাদের মতো একটি ছোট্ট বাগান- যেখান থেকেও সুমিদা নদী দেখা যায়। বাশো এই নদীর ধারেই তাঁর বিখ্যাত ‘কলাগাছের কুটিরে’ বাস করতেন। নদীর বয়ে চলা দেখতে দেখতে ভাবলাম, জাপানিরা কত যতœ করে তাদের সংস্কৃতি আর ইতিহাসকে আগলে রেখেছে। তারা জানে কীভাবে একটি ছোট্ট মুহূর্তকে অনন্তের রূপ দিতে হয়।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে গেল। দুপুরের লাঞ্চ সেরে রওনা দিলাম হাইকুর আরেক জাগতিক সংরক্ষণশালার সন্ধানে যেটি মূলত টোকিওর শিনজুকু এলাকার শিন ওকোবোতে অবস্থিত। এটি জাপানের হাইকু লিটেরেচার মিউজিয়াম নামে পরিচিত। শিন-ওকোবো এলাকাটি কোরিয়ান টাউন নামেই বেশি জনপ্রিয় তবে এ এলাকায় বর্তমানে অনেক ভারতীয়, ইন্দোনেশিয়ান, নেপালি এবং ভিয়েতনামি লোকজন বসবাস করে। মশলাদার খাবারের ঘ্রাণ আর পপ মিউজিকের আওয়াজে এলাকাটি সবসময় সরগরম থাকে। বাংলাদেশিদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় এই এলাকা। অনেকটা আমাদের গুলিস্তান কিংবা পুরান ঢাকার মতো। এইসব আওয়াজ আর মানুষের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামান্য এগোলেই পরিবেশটা বদলে যায়। আবাসিক এলাকার শান্ত এক গলির ভেতর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাইকু সাহিত্যের এই অনন্য সংগ্রহশালা।
জাদুঘরটিতে প্রবেশের সাথে সাথেই বাইরের কোলাহল যেন মিলিয়ে গেল। এখানে বাতাসের গতিও যেন কিছুটা ধীর, কিছুটা কাব্যিক। জাপানিদের নিজস্ব এই অতি-ক্ষুদ্র কাব্যধারা হাইকু- কীভাবে শত শত বছর ধরে তাদের দর্শন ও প্রকৃতিকে ধারণ করে আছে, তা এখানে প্রতিটি নিদর্শনে স্পষ্ট। তিন তলায় খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো স্বল্প পরিসরের এই মিউজিয়াম। এখানেও মাৎসুও বাশো বা কোবায়াশি ইসার মতো কিংবদন্তি কবিদের হাতে লেখা পা-ুলিপি দেখার সুযোগ হলো। তাদের কালির আঁচড়ে যেন জীবন্ত হয়ে আছে জাপানের চিরন্তন ঋতুচক্র। পুরো মিউজিয়ামটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। গ্যালারিগুলোর ঠিক পাশেই একটি ছোট্ট হলরুমের মতো জায়গায় হাইকু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখানে বছরের বিভিন্ন সময় হাইকু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, আলোচনা সভা, প্রদর্শনী হয়ে থাকে। দেশ বিদেশের কবিরা এতে অংশগ্রহণ করে। অনলাইনে রেজিস্টেশন করে যে কেউ নির্দিষ্ট ফী দিয়ে এসব সেমিনারে অংশ নিতে পারে। মিউজিয়াম ভবনের দোতলায় রয়েছে বিরাট একটি লাইব্রেরি। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রমহিলার সাথে কথা হলো। তিনি জানালেন এখানে পঞ্চাশ হাজারের মতো বই রয়েছে যার সবগুলোই হাইকু সংক্রান্ত। যে কেউ চাইলে এখানে বসে এসব বই পড়তে পারেন। তবে এই লাইব্রেরিতে পড়ার জন্য এবং বই নেওয়ার জন্য একশো ইয়েনের একটি এন্ট্রি ফি দিতে হয় দর্শনার্থীদের। এখানে যদিও ছবি তোলা নিষেধ তবুও বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনেই ভদ্রমহিলা ছবি তোলার অনুমতি দিয়ে নিজেই কয়েকটি ছবি তুলে দিলেন।
মিউজিয়াম থেকে যখন বের হলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারপাশ কিছুটা আবছা, কিন্তু আমার মনের ভেতরটা তখন শরতের আকাশের মতোই পরিষ্কার। আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, হাইকু কেবল পড়ার বিষয় নয়, এটি দেখার বিষয়- প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক অনন্য অনুসন্ধান।
জাপানের এই হাইকু যাদুঘর আমাদেরকে শিখিয়ে দেয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি একদিকে যেমন চর্চার বিষয় তেমনি এটি সংরক্ষণেও উদ্যোগ ও উদ্ভাবন প্রয়োজন। সাহিত্যের মাধ্যমেই একটি জাতির কৃষ্টি, ভাষা, সংস্কৃতি ও নান্দনিক শিল্পবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যকে সংরক্ষণ ও আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমরাও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এরকম মিউজিয়াম গড়ে তুলতে পারি এবং বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশ্বপরিম-লে তুলে ধরতে পারি।