আবদুল ওয়াহাব
এক বলে এক রান। অবিস্মরণীয় এক জয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। রাস্তার পাশের শো-রুমের বিশাল টিভিস্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে বাসির সাহেব। উত্তেজনায় কাঁপছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস বাংলাদেশ জিতবে। মিরাজের ওপর ভরসা আছে তাঁর। মনের গহীন কোণে সূক্ষ্ম একটু সন্দেহও আছে। অস্ট্রেলিয়া বলে কথা। রান-আপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বোলার। প্রস্তুত মিরাজ। প্রস্তুত মিরপুর স্টেডিয়াম। বাসির সাহেব কিছুটা অপ্রস্তুত। পারবে তো? বুক ভর্তি করে একটা শ্বাস নিলেন। বল ব্যাটে লাগলো। মিরাজ অপর প্রান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রাণপণে দৌড় দিল। কাছাকাছি গিয়ে ব্যাট সামনে বাড়িয়ে ঝাঁপ দিল সে। মাটিতে শুয়ে থেকেই আম্পায়ারের দিকে তাকাল। আম্পায়ারের তর্জনী জানিয়ে দিল ‘রান আউট’।
বাসির সাহেব ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। ছেলেটা এভাবে রান আউট হয়ে গেল! ও কি আজ রাতে ঘুমাতে পারবে? বাসির সাহেব মনে মনে হাসলেন। বাষট্টি বৎসরের জীবনে তিনি নিজেই কতবার যে রান আউট হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তারপরও তো রাতের পর রাত দিব্যি ঘুমাচ্ছেন।
রান আউট-১।
তিথি। টিংকুদের সাথে ক্লাস নাইন-এ মেয়েটা ভর্তি হয়েছে কিছুদিন আগে। ক্লাসের আর সব মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকে। কিসের যেন একটা আকর্ষণ আছে তিথির চাহনিতে। তার চোখের দিকে তাকালে টিংকুর সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়। কিছুদিনের মধ্যেই টিংকু তার পরিবর্তনটা বুঝতে পারে। তিথিকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে তার। ক্লাসে বসেও তার চোখ দুটো বারবার ছুটে যায় তিথির কাজল চোখে। কত প্রশ্ন! সমাধান মেলে না। বন্ধুমহলে টিংকুর নাম হয়ে যায় আশিক। স্কুলের বার্ষিক প্রতিযোগিতার দিন তিথি হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। মুখে মিষ্টি হাসির আলোকচ্ছটা।
‘তুমি এভাবে তাকিয়ে থাক কেন? অন্যরা হাসাহাসি করে। আমার ভীষণ লজ্জা লাগে’।
টিংকুর সারা শরীরে যেন দপদপ করে আগুন জ্বলছে। রীতিমত কাঁপছে সে। তিথি তার পাশে দাঁড়ানো! কথা বলছে তার সাথে! টিংকু কোনো কথা বলতে পারেনি। তিথি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে তার পাশে। তারপর টিংকুর হাতে গুঁজে দেয় একটা চিরকুট। মাত্র একটা লাইন লেখা চিরকুটে... তোমাকে আমার খুব ভাললাগে...। অথচ টিংকু সেই চিরকুট সারারাত পড়েও শেষ করতে পারেনি। তিথির ঐ হাতের স্পর্শই টিংকুর প্রথম প্রেমের স্মৃতিচিহ্ন। তিথির পাশে আর দাঁড়ানো হয়ে ওঠেনি তার। প্রথম পার্বিক পরীক্ষা শেষ না হতেই তিথির বিয়ে হয়ে যায়। টিংকু ভেবেছিল, সে জীবনে কখনও ঘুমাতে পারবে না...আর কোনো মেয়েকে তার পছন্দ হবে না... ভালবাসবে না, সারাটা জীবন একা থাকবে। টিংকুর আজ পাঁচ ছেলেমেয়ে। সে আজ বাসির সাহেব। শাহেরা বানুকে পাশে নিয়ে বাসির সাহেব দিব্যি নাক ডেকে ঘুমান।
রান আউট-২।
স্নিগ্ধা। বাসির সাহেবের বড় মেয়ে। নামের পুরো গুণ আছে তার মাঝে। এমন শান্ত স্বভাবের মেয়ে এখন পাওয়া দায়। লেখাপড়া শেষ করে বিয়ের প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। স্নিগ্ধার ছোটখালার বাসা থেকে ফোন আসে এক বিকেলে। জরুরি প্রয়োজন। এক্ষুনি যেতে হবে। বাসির সাহেব দ্রুত চলে গেলেন। বাসায় ঢুকেই বুঝতে পারলেন কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। শাহেরা বানুর ছোট বোন হাসেনা বানু তাকে একরকম টেনে নিয়ে গেল ভিতরে।
‘দুলাভাই, তী করব ভেবে পাচ্ছি না। পাশের ঘরে স্নিগ্ধা বসে আছে। সাথে আছে আমার দেবর জাহিদ। ওরা বিয়ে করবে। আজই। আমি কখনো টের পাইনি। স্বপ্নেও ভাবিনি। স্নিগ্ধা তো জাহিদকে মামা বলে ডাকতো। আমি আর ভাবতে পারছি না’। হাসেনা বানু গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেলো।
বাসির সাহেব একদম স্থির হয়ে গেলেন। ধীর পায়ে চলে গেলেন পাশের ঘরে। স্নিগ্ধা আর জাহিদ সোফায় বসা ছিল। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। স্নিগ্ধার হাত ধরে বললেন, বাসায় চল মা।
স্নিগ্ধা তার সাথে আসতে লাগল। বিপত্তি বাধল জাহিদকে নিয়ে। সে স্নিগ্ধার আরেকটা হাত ধরে বলল, না, স্নিগ্ধা যাবেনা।
আশ্চর্য অধিকার। পঁচিশ বছর ধরে যে মেয়েটাকে তিনি পৃথিবীর সবকিছু থেকে আগলে রেখে এত বড় করেছেন তার ওপর অধিকার নিয়ে কথা বলছে অপরিচিত একজন। অধিকার নিয়ে আর বেশি ভাবার সময় পেলেন না বাসির সাহেব। বুঝতে পারলেন স্নিগ্ধা তার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাসির সাহেব ফিরে গেলেন অতীতে। মেয়েটার জন্য কত কষ্ট করেছেন। কত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। মুখে একটু হাসি দেখার জন্য কতই না আকুতি ছিল তার। বাসির সাহেবের মনে হলো তিনি স্বার্থপরের মতো ভাবছেন। তার মনে হচ্ছিল তিনি ডুকরে কেঁদে উঠবেন। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। স্নিগ্ধার দিকে তাকালেন। তার অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এই মেয়েটাই তো বাবার কোনো অসুখে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতো। বাসির সাহেব ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে নিলেন।
দুই বছর পেরিয়ে গেছে। মেয়েটার সাথে দেখাও হয়নি আর। রাতের পর রাত ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। মেয়েটার কথা মনে করে কখনো কখনো দু-এক ফোঁটা অশ্রুও চলে আসে। কতদিন দেখা হয়নি!
রান আউট-৩।
রাতুল। বাসির সাহেবের বড় ছেলে। প্রাইভেট ব্যাংকে আছে। পুরো সংসারের ভার তার ওপর। সাতজন মানুষ। ছোট তিন ভাইবোনের লেখাপড়া। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। বিয়ের কথা মাঝেমধ্যে উঠলেও খুব বেশি পাত্তা দেয় না সে। বলে, সময় হলে তোমাদের নিজেই জানাবো।
শুক্রবার। বাসির সাহেব সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন রাতুল পায়ের কাছে বসে আছে। কাঁদছে। ‘কী হয়েছে বাবা?’
‘কিছু হয়নি বাবা। তোমাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারছি না। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়। আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা।’
ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। ‘অক্ষমতা আমার বাবা। এই বয়সে তোকে পুরো সংসার টানতে হচ্ছে। প্রমার বিয়েতে যাবি না?’
রাতুল উঠে দাঁড়াল। ‘না বাবা। তোমরা যেয়ো।’
বাসির সাহেবের বন্ধুর মেয়ে প্রমা। ডাক্তার। খুব ভাল মেয়ে। তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল। তিনি জানতেন রাতুল প্রমাকে পছন্দ করে। সামাজিক অবস্থানের কারণে বন্ধুকে কখনও এ ব্যাপারে কিছু বলার সাহস পাননি। রাতুলও এ বিষয় নিয়ে জোরালো ভাবে তেমন কোন কথা বলেনি।
প্রমার বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে রাত দশটায় বাসায় ফিরল সবাই। কয়েকবার কলিং বেল-এ চাপ দিয়েও রাতুলের কোনো সাড়া মিলল না। সবাই ভাবল, হয়তো বাথরুমে আছে। মোবাইলে কল দেওয়া হলো। অনেক ডাকাডাকি চলল। রাতুলের কোন সাড়া নেই। পনের-বিশ মিনিট পর দরজা ভাঙ্গা হলো। বাসির সাহেবের মনটা অজানা আশঙ্কায় বারবার কেঁপে উঠছিল।
রাতুলের ঘরের সামনে গিয়ে বাসির সাহেব যেন যন্ত্র-মানব হয়ে গেলেন। ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকা রাতুলের লাশ নামালেন নিজেই। পুরো বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল। টেবিলের উপরে রাখা চিরকুটে লেখা... আমাকে তোমরা ক্ষমা করো। প্রমাকে ছাড়া বাঁচা সম্ভব কি না কখনো ভেবে দেখিনি। ব্যাংকে মার নামে সাত লাখ টাকা এফডিআর করা আছে। সব কাগজ ড্রয়ারে রাখা আছে।
প্রায় সাত মাস কেটে গেছে। বাসির সাহেব রাতের পর রাত অবলীলায় ঘুমাচ্ছেন। মানুষের পক্ষেই এটা সম্ভব। বাসির সাহেব সম্ভবত মানুষ।
রান আউট-৪।
বাসির সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন বাংলামোটর মোড়ে। প্রতিদিনের চেনা রাস্তা আজ যেন নতুন মনে হচ্ছে। দল বেঁধে লোকজন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। কিন্তু তার যে ঝুঁকি নিতে মন সায় দেয় না। অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে সুযোগ এলো। নেমে এলেন রাস্তায়। একা। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন রাস্তার শেষ প্রান্তে। আর মাত্র চার হাত। একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে। তার মনে হলো তিনি পারবেন। মিরাজের কথা মনে পড়ল। তিথি। স্নিগ্ধা। রাতুল। ক্ষণিকের জন্য সবার চেহারাই ভেসে উঠল একবার। তিনি ঝাঁপ দিলেন ফুটপাতের দিকে। চারিদিকে একটা কোলাহল উঠল। বাসির সাহেব চোখ মেলার চেষ্টা করলেন। চারপাশে যেন শতশত আম্পায়ার আঙ্গুল উঁচিয়ে আছে...রান আউট।
বাসির সাহেব তার মধ্যবিত্ত মাথাটা নামিয়ে নিলেন রাস্তায়।