image

আমার অর্ধাঙ্গিনীকে জিজ্ঞেস করুন

ইকবাল তাজওলী

‘ওই যে ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে, তিনি কি ভালো, নাকি মন্দ মানুষ?’ আপনাকে কেউ যদি এই কথাটি জিজ্ঞেস করে তাহলে কথাটির উত্তর এক কথায় বা অতি সংক্ষেপে কী দেয়া যাবে? না, আমার তো মনে হয় দেয়া যাবে না। আর যদি দেয়া যায় তাহলে ওই ভদ্রলোক সম্পর্কে আপনি ভালোভাবে জানেন, অথবা তাকে আপনি পড়তে পারেন। এই পড়তে পারাটা হলো আসল। পরে এই বিষয়টি নিয়ে বলছি। এখন ধরুন স্বল্প পরিচিত অথবা মাঝেমধ্যে আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে এ রকম মানুষ সম্পর্কে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘লোকটি কি ভালো মানুষ না মন্দ মানুষ?’ আপনি মোটামুটি, অথবা ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো মানুষ এ ধরনের কথা বলতে চেষ্টা করবেন। তারপরও কেউ যদি জোর করে জিজ্ঞেস করে, ‘বলুন, তিনি কি ভালো না মন্দ মানুষ? এক কথায় জবাব দিন, প্লিজ।’ আপনি একান্ত বিপদে না পড়লে মন্তব্য করবেন, ‘যদ্দুর জানি তার সম্পর্কে, তিনি তো একজন ভালো মানুষ। তারপরও তার সম্পর্কে একদম নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলা আমার পক্ষে সমীচীন হবে না। কেন খামোখা তার সম্পর্কে ভালো-মন্দ মন্তব্য করব।’ বলে রেহাই পেতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু ওই লোকটি যদি আবার জোর করেন, কাঁচুমাচু হয়ে বলেন, ‘বলুন না ভাই। আমার তার সম্পর্কে জানার একটু দরকার আছে। প্লিজ বলুন।’ তখন আপনি কী করবেন? প্রশ্নকর্তাকে কি এড়িয়ে যাবেন? যদি সক্ষম হোন তাহলে হয়ত বলবেন, ‘ওই যে একজন ভদ্রলোক এদিকে আসছেন, তিনি তার সম্পর্কে ভালো জানেন; ভালো বলতে পারবেন। আপনি জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’ আর না হয় যদি তাকে ভালোভাবে জানেন তাহলে হয়ত এরকম বলবেন, ‘তিনি একজন মাটির মানুষ। এরকম মানুষ আপনি এ তল্লাটে আর পাবেন না।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভালো-মন্দ বিষয়ক জবাব আপনার একান্ত জানার উপর নির্ভর করে। তবে এই জানা একদম নির্মোহ হতে হবে। অর্থাৎ যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা হলে হবে না। ব্যক্তি সম্পর্কে আবেগ, অনুভূতি, ‘না ওর সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে পারব না।’- এগুলো ত্যাগ করতে হবে। অর্থাৎ পুরোপুরি নির্মোহ হতে হবে। তাহলে আপনি একজন লোক ভালো কি মন্দ একদম সঠিকভাবে বলতে পারবেন।

এই যে মব লিঞ্চিং-এর কথা ইদানীং শোনা যাচ্ছে বেশ জোরেশোরে, তো এর আক্ষরিক অনুবাদ কী তা হয়ত ডিকশনারি না ঘাটলে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই শব্দ দুটি যে গণপিটুনির কথা বলছে তা বোঝা যায়। এখনকার কথা বাদ দিলেও আমাদের দেশে গণপিটুনি কালচার আকসার রয়েছে। আমাদের সিলেটিতে তো এ নিয়ে একটি প্রবাদ বাক্য আছে। ‘বাজারি কিল মাটিত পড়ে না।’ এই বাজারি কিল মানে গণপিটুনি। বছর পনেরো অথবা তারও আগে হতে পারে, সারাদেশে তখন গণপিটুনি দিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে মানুষ হত্যা করা হচ্ছিল। আর এই গণপিটুনির যারা শিকার হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই মহিলা ছিলেন। এবং একদম নিরাপরাধ ছিলেন। একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। পত্র-পত্রিকা থেকে জেনেছি, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ঢাকার বাড্ডার দিকে। একজন শিক্ষিত মহিলাকে মব লিঞ্চিং দিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে মন্দ মানুষ সন্দেহে মন্দ মানুষের মন্দ কাজ।

মন্দ মানুষ কি ভালো কাজ করে না? করে, ভালো কাজ তো একটু বেশিই করে। কিন্তু ওই এক বা দুটি মন্দ কাজ তার ভালোতে¦র সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। দেখবেন দেশে দেশে অনেক মন্দ মানুষ- খারাপ মানুষ তার দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। তার মানুষের অধিকারের জন্যে, মুক্তির জন্যে জীবনমরণ লড়াই জারি রেখেছে।

মিনা পেশওয়ারি নামটি হয়ত কেউ কেউ শোনেছেন, অথবা শোনেননি। যাইহোক, এই মিনা পেশওয়ারি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরের একজন মাস্তান; গু-া লোক। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে, তাঁর মুসলিম লীগকে সাপোর্ট করতেন। যতদূর জেনেছি, সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা যেত তাকে। সোহরাওয়ার্দীকে সাপোর্ট করতেন কেন? হয়ত গু-া লোকটি চেয়েছিলেন তার সংখ্যালঘু নিষ্পেষিত মুসলিম সম্প্রদায় এগিয়ে যাক সম্মুখ পানে। শিক্ষাদীক্ষা সবদিক দিয়েই ঊন্নতি লাভ করুক নিজ মোহামেডান সম্প্রদায়। পিছিয়ে পড়া নিজ সম্প্রদায়ের ঊন্নতি চাওয়া দোষের কিছু নয়। যদি গণহত্যায় জড়িত না থাকেন তাহলে এমন লোককে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের সময় তাকে হত্যা করা হয়। ওই একই সময়ের আরেকজন লোককে নিয়ে কথা বলা যায়। তিনি হচ্ছেন গোপাল পাঁঠা। ওর ভালো নাম একটি আছে। গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কিন্তু অনিবার্য কারণে আর ওইদিকে অগ্রসর হচ্ছি না। আর যদি অগ্রসর হই তাহলে আমাকে বিরুপ মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হবে। সমর্থক একদল লোক বলবে, ‘একটু অগ্রসর হয়ে নোয়াখালী নিয়ে কথা বলুন না মশাই। মন্দ কাজের সন্ধান পাবেন।’ আরেকদল দাঁড়িয়ে বলবেন, ‘কলকাতা- বিহার নিয়ে বিস্তারিত কথা বলুন। গান্ধিজি কেন বিহার গেলেন না! নোয়াখালী গেলেন, বিহার গেলেন না! এটি কি তাঁর ভালো কাজ?’

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কিন্তু একদল দাগি অপরাধী জেল ভেঙ্গে বের হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। এটি তাঁদের দেশের প্রতি ভালোবাসা। মাটির প্রতি টান। মাতৃভূমি মুক্ত করার প্রয়াস। দেশ স্বাধীন করার সুযোগ সকল প্রজন্ম পায় না। কোনো কোনো প্রজন্ম পায়। আর তাঁদের মধ্যে যাঁরা অংশগ্রহণ করে তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের প্রতি কমরেডিও কায়দায় আমার লাল সেলাম। আপনারা আমার শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন।

আলাপে ছিলাম ভালো মানুষ-মন্দ মানুষ নিয়ে। এবার ভালো মানুষের মন্দ কিছু কাজের উদাহরণ দিই। আশেপাশে একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ‘আরে ওই যে রহিম সাহেব। তিনি তো খুব ভালো মানুষ। মাটির মানুষ। এরকম মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। লাখে এরা একজন। আরে না কোটিতে একজন বলুন।’ এরকম কথা হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায়। ঘাবড়িয়ে মাত। ওই রহিম সাহেব কিন্তু বাড়িতে হিটলার-মুসোলিনি। স্বৈরশাসন জারি রেখেছেন। পান থেকে চুন খসতে দেন না। যৌবনে যে তার বিবি কতবার বাবার বাড়ি গেছেন রাগ করে ফিরবেন না বলে তার কোনো হিসেবনিকেশ নেই। অনেক সময় দেখা যায় এরকম লোকদের অর্ধাঙ্গিনীরা নিজেদের তালাক নিজেরা কার্যকর করে ফিরে যান। তবে এটা স্বীকার করতেই হয় সবদিক দিয়েই ভালো মানুষ আছেন কিন্তু সমাজে। তবে এদের দেখতে হলে মাইক্রোস্কোপ লাগিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে।

তবে, মানুষটি ভালো কি মন্দ এর উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারবেন তার এলাকার বা পাড়ার মেয়েছেলেরা। পাড়ার কোনো মহিলাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, ‘আপনাদের রহিম সাহেব লোকটি কেমন? ভালো নাকি মন্দ? এক কথায় বলুন তো। একদম সঠিক উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি একবার একজন লোক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম পরিচিত এক মহিলাকে। উত্তর এসেছিল লুইচ্চা ব্যাটা। এটিই আসলে পড়া। পাঠ করা। তিনি পড়তে পেরেছিলেন।

আর আমি? আমার অর্ধাঙ্গিনীকে জিজ্ঞেস করুন।

সম্প্রতি