image

সাময়িকী কবিতা

বসন্তের ডাকনাম বিরহ

রোকেয়া ইসলাম

পলাশের আগুনে জ্বলে ওঠে রাঙা সকাল,

সবুজ ডালে ডাকে কোকিল

তবু শূন্য লাগে এই ধূসর বিকাল।

শিমুলের রঙে ভাসে না বলা কথা,

মৃদু হাওয়ায় জেগে থাকে মিহি সেতার

তার নাম নিয়ে শতফুল ফোটে,

সদররাস্তার আলোয় আসে নতুন দিন,

শব্দের ভেতর জমে থাকে

মায়াবি সন্ধ্যার দীর্ঘ ঋণ।

ফাগুনের দহন রোদে পুড়ে যায়

স্মৃতির খসড়া কাগজ,

শুধু সে আসেনি বলে

বিপুল বিরহে নীরবে ঝরে একা।

ধুপ গন্ধে কেউ তো জানে

কোকিলের কণ্ঠে মূর্ত হয়ে ওঠে

ফুলেল বসন্ত পসরা...

পুরনো গান বেজে যাচ্ছে

নাসরীন জাহান

যে পথ হেঁটেছে তোমার চিহ্ন ধরে,

যে মন উতলা উত্তরী পানে চেয়ে,

প্রেম সংগীত বিরহের মতো ঝরে,

বাতাস গুনগুনে সান্ধ্য দীপাবলি ছেয়ে!

যে জল ছুঁয়েছি, যে নদী ভিজেছি স্মৃতি,

শৈশব আর কৈশোর একাকারে,

মনোরম সেই দিনের হয়নি ইতি,

এই যৌবনে খুঁজে যাচ্ছি তাহারে,

যে অবলীলে এদ্দিন পরে এসে,

স্মরণ করাচ্ছ হাওয়ার দিনের গলি,

যে গুঞ্জরণে কেবলই যাচ্ছি ভেসে,

এ হাওয়ায় আমি কোন দিকে বলো চলি?

যে পথে হেঁটেছি আমরা মধ্যরাতে,

ঢেকে দিয়েছিলে চাদরে বাহির ঘরে,

অমৃত দীপালোকে হাত রেখেছিলে হাতে

চলেছি আবার থেমে গেছি ঘনঘোরে,

যে গানের দিনে আমরা কিশোর হাতে,

স্পর্শ রেখেছি বুদ্বুদ ওঠা প্রাণে,

যে ঘ্রাণে এখনো আকাশ ভীষণ মাতে,

হাওয়ার সুরে সুরে মন বেজে যায় গানে,

আলতো স্পর্শ স্পন্দনে গুঞ্জরায়!

শরীর শরীর কখনো করিনি বলে,

পুরোনো দিনের প্রেমে দেহ ভেসে যায়,

পুরোনো প্রদীপ নতুনের মতো জ্বলে!

আমাদের সেই প্রদীপ দিনের শেষে,

যে নদী দুজন স্পর্শ করেছি গানে,

মধুরতা ছিঁড়েনি উত্তরী বাতাস এসে,

সে সন্ধ্যার কথা সেই হাওয়া মন জানে।

স্পার্টাকাস

মুমির সরকার

জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন

গোটা রোম জুড়ে

ভয়ংকর সে শীত!

বরফের কফিনে সাম্রাজ্যবাদীরা,

তবুও কিছুটা উষ্ণতা ভোগ করছে

আর তা দেখে-দেখে শিখে নিচ্ছে

অর্থোষ্ণতায়- ধনী রোমানরাও!

এর বাইরে

সংখ্যাধিক্য কৃতদাস ওরা সবই,

ফিবছর বরাদ্দ দু’টি মাত্র কম্বলে

শরীরের রক্ত-প্রবাহ ধরে রাখছে

অজ্ঞাতকাল আলস্যে থাকা সবে

চোখ খুলতে শুরু করা ভীমদেব-

বরফ-শাদা জমিনে অগ্নি+রশ্মি

এ যাত্রা বাঁচিয়ে রাখছে ওদের

বুঝি আরও কিছুটা সময়।

তখন রোম হতে দাগ-টানা পশ্চিম

স্কুলে-স্কুলে চলছে তুমুল প্রশিক্ষণ।

সম্রাট-কূল দেখবেন বলেই কি না

চিরায়ত সে সার্কাস:

খাঁচায় বন্দী বেড়িবদ্ধ শক্তপোক্ত

কৃতদাসের সংগে লড়বে মুক্ত সে

এক আফ্রেদিতি!

তবে আর কত এ জান্তব সার্কাস!

‘স্পার্টাকাস’

গ্রীস উপকণ্ঠ হতে উঠে আসা সে

বেজন্মা এক যোদ্ধা,

শত-সহ¯্র কৃতদাস মুক্ত করেই

ছুটলেন বন্ধুর প্রান্তরে; সংগে-

আর-এক সংগী, ভিসুভিয়াস!

বসন্তবাউরি

পুলিন রায়

ভোরের কুয়াশা সরে সরে জাগে গ্রাম

বসন্তবাতাসে সবুজের সুর

মধুর কলতানে

স্বপ্নডানায় ভর করে কুড়াই

জীবনের নুড়িপাথর,

বাউল সন্ন্যাস আমি-

পাতা ঝরা শব্দে সচকিত হয়ে দেখি

বুক ভরে আছে সুখ-দুঃখের টানাপোড়েন

প্রাপ্তির খাতা শূন্যে সয়লাব তবু

বসন্তবাউরি করে আনাগোনা নিত্যদিন

হৃদয় কোটরে জাগে ভালোবাসা গান।

হৃদয় রেফারি

খসরু পারভেজ

স্কুল থেকে ফিরে

সহসা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমলকী বন

সহস্র পাখির ঠোঁট লুট করে নেয়

দুপুরের ঘুম

হঠাৎ দূরে নাচতে থাকে

নূপুর পরা নদী

এখানে কখনো ফেরা হবে না জেনে

স্মৃতির মোজায় ঝুলে আছে

একজোড়া লাল জুতা

এখনও কান পেতে শুনি

বেনোজলে কালো পিঁপড়ার কান্না

পুরনো দেয়াল

পলেস্তারা খসা আমাদের মানচিত্র

মাছরাঙা জীবন নিয়ে একটি কবিতা লেখা হবে

হৃদয় রেফারি বাজাও তোমার বাঁশি।

বিভাজ্যের দিকে অগ্রসর সময়

কাজল রশীদ

গণনায় কোনো ত্রুটি ছিল না

আমাদের প্রত্যেকেরই একটি করে পা ছিল,

তবু হেঁটেছি যুগ্ম ভারে,দুটি পায়ের স্মৃতিতে ভর করে।

সময় কি বুঝেছিল দুটি পথ দু’দিকে প্রসারিত হলে

একই পদচিহ্ন আর দীর্ঘস্থায়ী হয় না?

দিগন্তের বিভাজ্য রেখায়

আমরা দাঁড়িয়েছিলাম অনিশ্চিত ব্যাকরণে

একটি তারা ছিল,কিন্তু ভাগ করার অঙ্কে

তার আলো ভেঙে গেল ভগ্নাংশে।

এই ব্যর্থতা কি এড়ানো যেত?

নাকি ভাগ নিজেই ছিল আমাদের নিয়তি,

আলো নয় অন্ধকারের সমানুপাত।

প্রতি শব্দের ভেতর একটি করে ফাটল জন্ম নেয়,

অর্থের কাঁধে চাপিয়ে দেয় বিভাজনের দায়।

আমরা এগোই ভাষার কঠিন বোঝা বয়ে,

উচ্চারণের রক্তক্ষরণ গোপন রেখে।

সময় তখন নীরব বিচারক সে কোনো পক্ষ নেয় না,

শুধু ক্যালেন্ডারের শিরায় ভবিষ্যৎ ঢেলে দেয়।

আমাদের আগামী নির্ধারিত হয় মুহূর্তের অজান্তে,

যেখানে মিল ছিল কেবল স্মৃতি,

আর বিচ্ছেদ একটি সুপরিকল্পিত বিরামচিহ্ন।

তবু হিসেবের খাতায় ভুল নেই বলে মনে হয়

কারণ আমরা যা ছিলাম, ঠিক ততটাই ভেঙে

নিজ নিজ পথে পৌঁছে গেছি।

তোমার সাথে খেলবো খেলা

শশিভূষণ

তোমার সাথে খেলবো খেলা- যে খেলা আজ

চেরির ডালে খেলছে বসে বসন্ত।

পাগলপারা দুইটি ডানায় খেলছে দুলে

বনের পাখি দুরন্ত।

মাতাল হাওয়া খেলছে যেমন

উড়িয়ে তার খোলা-বেণীর চুলগুলি;

হোক না কুসুম সন্ধিবিহীন- রক্তরাঙা

বুকের গোপন বসন তো!

পাতায় পাতায় আগামীকাল

আলম মাহবুব

অন্ধকারের কালো ছায়া নেমে এলে

শুরু হয় রাত্রির গল্প

ভুলগুলি সব বসে থাকে দীর্ঘ পথের বাঁকে

সন্ধ্যায় নদী ম্লান, রুগ্ণ ভোর

ফিরে আসে করতলে হলুদ জ্যোৎস্না

লাল-নীল বেদনাগুচ্ছ প্রিন্ট হয় ছাপাখানায়

যে প্রেম হারিয়ে গেছে মানুষের হৃদয় থেকে

পাতায় পাতায় সে কাহিনী রাঙাবে আগামীকাল

ঘুম

তাহসান কবির

বারবার আমি ফাঁসির মঞ্চে ঘুমিয়ে পড়ি

কাঠগড়ায় ঘুমানোর কারণে আমার ফাঁসি হয়েছিল

অথচ আমি ঘুমিয়ে ছিলাম ভুল মানুষের বুকে

যে নিমগ্ন প্রেমের রাতে মরে গিয়েছিল!

হে মাননীয় উৎসুক জনতা, আমায় ক্ষমা করবেন

আমি জেগে থাকলে তার মৃত্যুরহস্য জানাতে পারতাম

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জেনে নিতে পারতাম আমার অপরাধ

ফাঁসির মঞ্চে বুঝতে পারতাম পুনর্জন্মের চক্কর

কিন্তু আমি বারবার স্টেশনে ঘুমিয়ে পড়ি

কোন ট্রেন কোথায় গিয়ে থামে, কার ঘরে হয় আশ্রয়

কার বুকে মুখ গুঁজে আমি এক খুনী হয়ে উঠি

আর কেনইবা আমার প্রেমিকারা মরে যায় আমাকে ফাঁসিয়ে?

এইসব লিখতে লিখতে রোজ ঘুমিয়ে পড়ি আমি

জেগে দেখি স্বীকারোক্তি লেখার দায়ে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত!

সম্প্রতি