image

ছায়ামন্ত্রিসভার শেকড় ব্রিটিশ সংবিধানের ইতিহাসে

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ছায়ামন্ত্রিসভা আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের এক পরিণত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। যার শিকড় ব্রিটিশ সাংবিধানিক ইতিহাসে প্রোথিত। এটি এমন এক কাঠামো, যেখানে বিরোধী দল সরকারে থাকা প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে “ছায়ামন্ত্রী” নির্ধারণ করে। যারা সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব পালন করেন। এই ধারণা হঠাৎ উদ্ভূত হয়নি। বরং কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

এর সূত্রপাত খুঁজতে হলে যেতে হয় ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থার বিকাশপর্বে। ১৭শ শতকের গ্লোরিয়াস রেভল্যুশনের পর ব্রিটেনে রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা সীমিত হয়ে সংসদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮শ ও ১৯শ শতকে বিশেষত হুইগ ও টোরির পর লিবারেল ও কনজারভেটিভ দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে দলীয় রাজনীতি স্থিতিশীল আকার পায়। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক রাজনৈতিক ধারণা জন্ম নেয়। যার মূল কথা “হিজ ম্যাজিস্টিজ লয়াল ওপজিশন”। অর্থাৎ বিরোধী দল রাষ্ট্র বা সিংহাসনের বিরুদ্ধে নয়; বরং ক্ষমতাসীন সরকারের নীতির বিরোধিতা করবে।

বিরোধী দলকে বৈধতা দেওয়ার সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ছায়ামন্ত্রিসভার ভিত্তি স্থাপন করে।ধীরে ধীরে বিরোধী দল বুঝতে পারে, কেবল সমালোচনা যথেষ্ট নয়; ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। যে কারণে ১৯শ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিরোধী দলের ভেতরে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের প্রথা চালু হয়। অর্থনীতি, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে নির্দিষ্ট মুখপাত্র নির্ধারণ করা হয়।

২০শ শতকে এসে প্রচলিত প্রথা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৩৭ সালের মিনিস্টার অব দ্য ক্রাউন অ্যাক্টের মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতাকে আনুষ্ঠানিক মর্যাদা ও ভাতা দেওয়া হয়। যা ছায়ামন্ত্রিসভার সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে সুদৃঢ় করে। ফলে ছায়ামন্ত্রিসভা কেবল রাজনৈতিক রীতি নয়, সংসদীয় সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।

ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধারণাও ছড়িয়ে পড়ে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশে বিরোধী দল আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে, যা সরকার-ইন-ওয়েটিং হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে ছায়ামন্ত্রীরা নিয়মিতভাবে বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেন। সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে সক্রিয় থাকেন। সংশ্লিষ্ট নীতিখাতে গবেষণা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।

সংবিধানে ছায়ামন্ত্রিসভার কথা বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ না থাকলেও রাজনৈতিক রীতি হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ভারতে ব্রিটিশ সাংবিধানিক ধারার উত্তরাধিকার বজায় থাকলেও ছায়ামন্ত্রিসভা পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পায়নি। বড় বিরোধী দলগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করে। তবে সেটি স্থায়ী বা আনুষ্ঠানিক রূপ পায় না। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় মেরুকরণ ও বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই কাঠামোর স্থিতিশীল বিকাশকে কঠিন করে তোলে।

বাংলাদেশে ছায়ামন্ত্রিসভা

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। স্বাধীনতার পর সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ আর তীব্র মেরুকরণ ছায়ামন্ত্রিসভা ধারণার বিকাশে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। সংসদে বিরোধী দলের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সুসংগঠিত ছায়া কাঠামো গড়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে বিরোধী দল দায়িত্ব বণ্টনের উদ্যোগ নিয়েছে বটে। তবে তা ধারাবাহিক হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক রূপও পায়নি। যার পেছনে রেয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ।

প্রথমত, সংসদীয় বিতর্ক ও কমিটি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় বিরোধী দলের নীতিগত হস্তক্ষেপ সীমিত থাকে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আস্থাহীনতা বিরোধী দলকে “বিকল্প সরকার” নয়, বরং “প্রতিরোধী শক্তি” হিসেবে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক তথ্যপ্রাপ্তি ও গবেষণা সহায়তার অভাব ছায়ামন্ত্রিসভাকে কার্যকর করার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

এত বাধার মধ্যেও ছায়ামন্ত্রিসভার ধারণাটি বাংলাদেশে মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। ছায়ামন্ত্রিসভা মূলত গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। এটি দেখায় যে বিরোধী দল রাষ্ট্রবিরোধী নয়; বরং সম্ভাব্য বিকল্প প্রশাসন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে বাংলাদেশ যে সংসদীয় কাঠামো গ্রহণ করেছে, তার যৌক্তিক পরিণতি হতে পারে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ছায়ামন্ত্রিসভা। তবে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, সংসদীয় সংস্কৃতির পরিপক্বতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিবৃদ্ধি প্রয়োজন।

ছায়ামন্ত্রিসভার ইতিহাস মূলত একটি ধারণার ইতিহাস। যা ক্ষমতার বিরোধিতাকে বৈধতা দেওয়া আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রস্তুত বিকল্পে রূপান্তর করার ঘটনা। ব্রিটিশ সংসদীয় ঐতিহ্য থেকে শুরু হয়ে উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে এর অভিযোজন দেখা যায়। যা বোঝায় যে, গণতন্ত্রের গভীরতা নির্ভর করে কেবল নির্বাচনের ওপর নয়, বরং বিরোধী শক্তিকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থায় ছায়ামন্ত্রিসভা তাই সম্ভাবনাময়।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি