alt

উপ-সম্পাদকীয়

কেন সহিংস হয়ে যাচ্ছে দেশের রাজনীতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

: বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৩
image

অবরোধকে কেন্দ্র করে পোড়ানো হচ্ছে গাড়ি

নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের ভীতিকর আশংকা। জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বিগ্নতা। রাজনৈতিক অঙ্গন অশান্ত। গুজব-গুঞ্জনের কানাকানি চারিদিকে। জনমনে অস্বস্তি। ভীতিকর অবস্থায় সাধারণ নাগরিকরা ঘর থেকে বের হচ্ছেন। হরতাল-অবরোধ হচ্ছে, এতে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন অবস্থান নেই। হরতাল করছে বিএনপি-জামায়াতসহ কিছু ডান ও বামপন্থি দলের নেতাকর্মীরা আর প্রতিরোধ করতে মাঠে নামছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি এক্ষেত্রে দৃশ্যমান না। অপরদিকে হরতালের প্রভাবে নানা জায়গায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে।

কোন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকে ঘিরে এ ধরনের পরিবেশ কোন ভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে তাই হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতান্ত্রিক একটি দেশ। এই দেশটির সব সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক জনগণ। আর রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার জন্য আজকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিরা হস্তক্ষেপ করছে। এই হস্তক্ষেপটা অনেকটা ঔপনিবেশিক আমলের মতো। দিন দিন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অশান্তি বাড়ছে। তাই বিদেশি রাষ্ট্র বিশেষ করে মাকির্নিরা দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে। যা কোনভাবে কাম্য নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর আগে। অথচ বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা স্থিতিশীলতা পায়নি। অপরদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত স্বাধীনতা লাভের পর থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী রূপ দিতে পেরেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের রীতিনীতি অনুসারে যে ভাবে নির্বাচন হওয়া উচিত, সেই প্রক্রিয়ায় কেন নির্বাচন হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন।

দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপিসহ কিছু ডান ও বামপন্থি দল নির্বাচন বর্জন করেছে। তাদের দাবি নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের অধীন। কারণ দলীয় সরকারের অধীন কোন নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না এই দাবি নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল মাঠে নেমেছে। নিরপেক্ষ শব্দটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক বিষয়। নিরপেক্ষতার পরিমাপকের সূচকগুলো কি? নির্বিঘেœ ভোট দেয়াটাই কি নির্বাচন নিরপেক্ষ? বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার প্রতিটিতে জড়িয়ে আছে টাকার বিষয়টি। স্থানীয় সরকারসহ সাধারণ নির্বাচনে ভোট কেনাবেচার বিষয়টি নতুন কিছুই নয়। তাই বলা যায় বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোর মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে টাকাওয়ালারা নির্বাচিত হবে। এই প্রক্রিয়াকে কতটা নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা যায়? টাকা দিয়ে ভোট কেনে নির্বাচিত হওয়া আর জোর করে ভোট কেন্দ্র দখল করে নির্বাচিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে কি?

তবে যাই হোক বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো চাইছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। বিশ্বের সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাটা থাকে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংসদীয় গণতন্ত্র হলো সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতি। কারণ সংসদীয় পদ্ধতিতে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক ও সম্পূর্ণ স্বাধীন। পৃথিবীর সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে কাজ করে। বাংলাদেশের বেলায় নির্র্বাচন কমিশনকে যদি একটি স্বাধীন সার্বভৌম সংস্থার পরিণত করা যায় তাহলে আদৌ কি, তদারকি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন হবে? ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গত বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচনী আচরণ বিধি লংঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক নোটিশ দেয়। কমিশনের নোটিশ দুই প্রধানই মানতে বাধ্য। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সংবিধানে কেন নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের ক্ষমতা নেই? সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচন কমিশনকে এ ধরনের ক্ষমতা দেয়া উচিত বলে কি রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে? দেশের রাজনৈতিক দল গুলো তদারকি সরকার কেউ কেউ কেয়ারটেকার সরকার আবার কেউ কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে করে আসছে। অথচ কেউ কমিশনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যেসব আইন প্রণয়ন করা দরকার সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। অথচ যে ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তত্ত্বাবধায়ক নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা হবে। তাদের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছেন তারা নিরপেক্ষ হবেন। তাহলে ওই নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যদি রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন ওই ধরনের ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসাবে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করবেন তাহলে তা তারা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনে এলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন।

বাংলাদেশের নির্র্বাচন ব্যবস্থায় কমিশনের সঙ্গে প্রশাসন জড়িত। অথচ প্রশাসন কমিশনের অধীনস্ত নয়। তবে বর্তমান নিয়মানুসারে নির্বাচনকালীন সময় তারা কমিশনের অধীনে থাকবে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সারা বছর সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই প্রশাসন নির্বাচনকালী সময়ে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই নির্বাচন কমশিনকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন সংস্থায় পরিণত করা প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরকে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এই ব্যবস্থাটা যথাযথ না কারণ এতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া উচিত। এবং নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন চালানোর দায়িত্ব থাকবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ কমিশনের কর্মকর্তাদের নির্দেশেই প্রশাসন পরিচালিত হবে। অবাধ ও পক্ষপাতহীন নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে হবে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে কিভাবে শক্তিশালী করা যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে না। দেশের রাজনীতিটা একটা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তাই পেশিশক্তির আগমন ঘটছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পেশিশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন অর্থের তাই নেতা হতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে টাকা। মূলত গণতন্ত্রকে সুসংহতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করার জন্য সাংবিধানিক ভাবে যে, বিষয়গুলো সংযোজন করা ও বিয়োজন করা দরকার তা নিয়ে রাজনৈতিক নেতারা কথা বলছেন না। যার জন্য রাজনীতিতে চলছে হানাহানি, গাড়ি পোড়ানো, ধরপাকড়সহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড।

বিগত পনেরো বছর ধরে বিএনপিসহ ডান-বাম দলগুলো তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের দাবিতে কর্মসূচি দিচ্ছে, তারা কেউ স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীন নির্বাচন হোক, এই দাবিটি তুলছেন না। প্রশ্ন হচ্ছে শুধু সাধারণ নির্বাচন নিরপেক্ষ হলেই কি নির্বাচন শেষ। দেশে তো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও রয়েছে, তাছাড়া সাধারণ নির্বাচনের পর উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পর বাকি নির্বাচনগুলো কি দলীয় সরকারের অধীন হবে, যদি তাই হয় তাহলে সেখানেও তো নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি আসে। শুধু সাধারণ নির্বাচন নয় সব নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করতে হবে। যদি ক্ষমতায় যাওয়াটা মূল প্রশ্নই না হতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম না হয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের জন্য আন্দোলন হতো। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনটা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য নয়। তাই দেখা যাচ্ছে যে, যারা ক্ষমতায় আছে এত সহজেই ক্ষমতাটা ছেড়ে দেবে। ফলে বর্তমানে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্ষমতা দখলের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য না দেশে যতই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসুক না কেন, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে রূপ দিতে না পারলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা স্থিতিশীল হবে না।

[ লেখক : উন্নয়নকর্মী ]

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত

ছবি

প্রাণের মেলা

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত হোক

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার রাজধানীর আজিমপুর

ছবি

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির নবজাগরণ

খুলনায় একুশে বইমেলার মুগ্ধতা

মধুরতম ভাষা ও রক্তাক্ত বাংলা

উৎসব ও প্রথার বিবর্তন

চুরমার ফিলিস্তিন ও খাদ্য রাজনীতি

কুষ্ঠজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে করণীয়

যুব ক্ষমতায়ন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে

লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের লাইব্রেরি

একজীবনে অনেক বছর বেঁচে থেকেও নিজেকে চেনা হয়ে ওঠে না

“ছুরি-কাঁটা ও নব্যধনী”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সন্দেশখালি লাইন

শিশুরও হতে পারে ক্যান্সার, প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চিকিৎসা নিতে কেন ভারতে গিয়েছিলাম

ইসরায়েলের গণহত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা

বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু গণিত

ছবি

সুন্দরবন কি আরেকটু বেশি মনোযোগ পেতে পারে না

নিজেকে বরং নিজেই প্রশ্ন করতে শিখুন

গড়ে উঠুক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ছবি

বিদ্যা দেবী মা সরস্বতী

বিশ্ব বেতার দিবস ও বাংলাদেশ বেতার

কৃষিবিদ দিবস

ছয় বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

জলবায়ু সম্মেলন এবং নয়া উদারবাদী কর্তৃত্ব

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নির্বাচন ও সামাজিক অস্থিরতা

ছবি

খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরোনোর পথ কী

ছবি

ট্রাম্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন, তবে পথ মসৃণ নয়

দুর্নীতিবাজদের খতম করা যাবে কি?

মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

কেন সহিংস হয়ে যাচ্ছে দেশের রাজনীতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

image

অবরোধকে কেন্দ্র করে পোড়ানো হচ্ছে গাড়ি

বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৩

নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের ভীতিকর আশংকা। জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বিগ্নতা। রাজনৈতিক অঙ্গন অশান্ত। গুজব-গুঞ্জনের কানাকানি চারিদিকে। জনমনে অস্বস্তি। ভীতিকর অবস্থায় সাধারণ নাগরিকরা ঘর থেকে বের হচ্ছেন। হরতাল-অবরোধ হচ্ছে, এতে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন অবস্থান নেই। হরতাল করছে বিএনপি-জামায়াতসহ কিছু ডান ও বামপন্থি দলের নেতাকর্মীরা আর প্রতিরোধ করতে মাঠে নামছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি এক্ষেত্রে দৃশ্যমান না। অপরদিকে হরতালের প্রভাবে নানা জায়গায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে।

কোন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকে ঘিরে এ ধরনের পরিবেশ কোন ভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে তাই হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতান্ত্রিক একটি দেশ। এই দেশটির সব সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক জনগণ। আর রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার জন্য আজকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিরা হস্তক্ষেপ করছে। এই হস্তক্ষেপটা অনেকটা ঔপনিবেশিক আমলের মতো। দিন দিন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অশান্তি বাড়ছে। তাই বিদেশি রাষ্ট্র বিশেষ করে মাকির্নিরা দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে। যা কোনভাবে কাম্য নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর আগে। অথচ বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা স্থিতিশীলতা পায়নি। অপরদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত স্বাধীনতা লাভের পর থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী রূপ দিতে পেরেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের রীতিনীতি অনুসারে যে ভাবে নির্বাচন হওয়া উচিত, সেই প্রক্রিয়ায় কেন নির্বাচন হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন।

দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপিসহ কিছু ডান ও বামপন্থি দল নির্বাচন বর্জন করেছে। তাদের দাবি নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের অধীন। কারণ দলীয় সরকারের অধীন কোন নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না এই দাবি নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল মাঠে নেমেছে। নিরপেক্ষ শব্দটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক বিষয়। নিরপেক্ষতার পরিমাপকের সূচকগুলো কি? নির্বিঘেœ ভোট দেয়াটাই কি নির্বাচন নিরপেক্ষ? বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার প্রতিটিতে জড়িয়ে আছে টাকার বিষয়টি। স্থানীয় সরকারসহ সাধারণ নির্বাচনে ভোট কেনাবেচার বিষয়টি নতুন কিছুই নয়। তাই বলা যায় বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোর মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে টাকাওয়ালারা নির্বাচিত হবে। এই প্রক্রিয়াকে কতটা নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা যায়? টাকা দিয়ে ভোট কেনে নির্বাচিত হওয়া আর জোর করে ভোট কেন্দ্র দখল করে নির্বাচিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে কি?

তবে যাই হোক বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো চাইছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। বিশ্বের সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাটা থাকে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংসদীয় গণতন্ত্র হলো সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতি। কারণ সংসদীয় পদ্ধতিতে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক ও সম্পূর্ণ স্বাধীন। পৃথিবীর সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে কাজ করে। বাংলাদেশের বেলায় নির্র্বাচন কমিশনকে যদি একটি স্বাধীন সার্বভৌম সংস্থার পরিণত করা যায় তাহলে আদৌ কি, তদারকি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন হবে? ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গত বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচনী আচরণ বিধি লংঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক নোটিশ দেয়। কমিশনের নোটিশ দুই প্রধানই মানতে বাধ্য। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সংবিধানে কেন নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের ক্ষমতা নেই? সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচন কমিশনকে এ ধরনের ক্ষমতা দেয়া উচিত বলে কি রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে? দেশের রাজনৈতিক দল গুলো তদারকি সরকার কেউ কেউ কেয়ারটেকার সরকার আবার কেউ কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে করে আসছে। অথচ কেউ কমিশনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যেসব আইন প্রণয়ন করা দরকার সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। অথচ যে ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তত্ত্বাবধায়ক নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা হবে। তাদের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছেন তারা নিরপেক্ষ হবেন। তাহলে ওই নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যদি রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন ওই ধরনের ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসাবে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করবেন তাহলে তা তারা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনে এলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন।

বাংলাদেশের নির্র্বাচন ব্যবস্থায় কমিশনের সঙ্গে প্রশাসন জড়িত। অথচ প্রশাসন কমিশনের অধীনস্ত নয়। তবে বর্তমান নিয়মানুসারে নির্বাচনকালীন সময় তারা কমিশনের অধীনে থাকবে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সারা বছর সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই প্রশাসন নির্বাচনকালী সময়ে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই নির্বাচন কমশিনকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন সংস্থায় পরিণত করা প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরকে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এই ব্যবস্থাটা যথাযথ না কারণ এতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া উচিত। এবং নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন চালানোর দায়িত্ব থাকবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ কমিশনের কর্মকর্তাদের নির্দেশেই প্রশাসন পরিচালিত হবে। অবাধ ও পক্ষপাতহীন নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে হবে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে কিভাবে শক্তিশালী করা যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে না। দেশের রাজনীতিটা একটা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তাই পেশিশক্তির আগমন ঘটছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পেশিশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন অর্থের তাই নেতা হতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে টাকা। মূলত গণতন্ত্রকে সুসংহতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করার জন্য সাংবিধানিক ভাবে যে, বিষয়গুলো সংযোজন করা ও বিয়োজন করা দরকার তা নিয়ে রাজনৈতিক নেতারা কথা বলছেন না। যার জন্য রাজনীতিতে চলছে হানাহানি, গাড়ি পোড়ানো, ধরপাকড়সহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড।

বিগত পনেরো বছর ধরে বিএনপিসহ ডান-বাম দলগুলো তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের দাবিতে কর্মসূচি দিচ্ছে, তারা কেউ স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীন নির্বাচন হোক, এই দাবিটি তুলছেন না। প্রশ্ন হচ্ছে শুধু সাধারণ নির্বাচন নিরপেক্ষ হলেই কি নির্বাচন শেষ। দেশে তো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও রয়েছে, তাছাড়া সাধারণ নির্বাচনের পর উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পর বাকি নির্বাচনগুলো কি দলীয় সরকারের অধীন হবে, যদি তাই হয় তাহলে সেখানেও তো নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি আসে। শুধু সাধারণ নির্বাচন নয় সব নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করতে হবে। যদি ক্ষমতায় যাওয়াটা মূল প্রশ্নই না হতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম না হয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের জন্য আন্দোলন হতো। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনটা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য নয়। তাই দেখা যাচ্ছে যে, যারা ক্ষমতায় আছে এত সহজেই ক্ষমতাটা ছেড়ে দেবে। ফলে বর্তমানে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্ষমতা দখলের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য না দেশে যতই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসুক না কেন, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে রূপ দিতে না পারলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা স্থিতিশীল হবে না।

[ লেখক : উন্নয়নকর্মী ]

back to top