alt

উপ-সম্পাদকীয়

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

সামসুল ইসলাম টুকু

: সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় জিআই সনদ আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছে। জিআই সনদ হচ্ছে ভৌগলিক নির্দেশক বা যা কোনো পণ্যসামগ্রী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য সংস্কৃতি ইতিহাসকে বোঝায়। পাশাপাশি এগুলোর গুণগতমান বৈশিষ্ট্য প্রস্তুত প্রণালি খ্যাতি নিশ্চিত করে।

ইতোমধ্যে দেশের ২১টি পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে এবং আরও ১৪টি পণ্য সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সনদপ্রাপ্ত ২১টি পণ্যের মধ্যে ১৫টির আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান এবং ৬টি পণ্যের আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক।

জিআই সনদ পেতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও সুপারিশ প্রয়োজন হয়; কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অসংখ্য সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা হওয়া সত্ত্বেও এবং বেশ কয়েকটি পণ্যের জিআই সনদ পাওয়ার পরিপূর্ণ যোগ্যতা থাকলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। ফলে কিছু পণ্যের সনদ অন্য জেলা নিয়ে গেছে। এর মধ্যে শিবগঞ্জের আদি চমচম। এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য কয়েকশ বছর আগের স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, নরম। এই চম চম প্রচুর পরিমানে জেলার বাইরে যায়। সোনামসজিদ দেখতে আসা পর্যটক ও আম মৌসুমে আসা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আম ব্যাপারীরা এই চমচম না নিয়ে যায় না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুরের তৈরি তিলের খাজার ইতিহাস কমপক্ষে দুইশ বছরের। মুচমুচে এই খাজার চাহিদা রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। শুধু তাই নয়, এই খাজা প্যাকেট হয়ে যায় পৃথিবীর বহু দেশে যেখানে প্রবাসী বাঙালিরা থাকেন। নকশিকাঁথা চাপাইনবাবগঞ্জের বহু পুরনো ঐতিহ্য। সর্বস্তরের মহিলাদের একটি অবসরকালীন কাজ। কাপড় আর বিভিন্ন রঙের সুতো দিয়ে মনোমুগদ্ধকর নকশা তৈরি করা, দর্শনীয় শিল্প। মহিলারা সংসারের কাজ সেরে বিকেলে দল বেঁধে নিজ নিজ গ্রামের কোনো গাছতলায় বা খোলা মাঠে বা কারো বাড়ির আঙিনায় কাঁথার ডালা আর সুচ সুতা নিয়ে হাজির হয়। আপন মনে কাজ করছে আর পারিবারিক গল্পের সঙ্গে নিপুনভাবে সুচের কাজ করছে। গত ৫০ বছর আগে থেকে কিছু এনজিও গ্রামীন মহিলাদের সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে এই নকশিকাঁথা তৈরি করিয়ে নেয়; যা তারা চড়া মূল্যে ব্র্যাকসহ ঢাকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন কয়েকটি দোকানও আছে।

প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এখান থেকে পছন্দমতো নকশিকাঁথা কেনেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জিআই সনদের জন্য আবেদন করা হয়নি। বরং জামালপুরের জেলা প্রশাসক আবেদন করে জিআই সনদ আদায় করেছেন। এই পণ্য ৩টি প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে পেটেন্ট বিভাগের কাছে তুলনামূলক বিচারেও স্থান করে নিতে পারেনি।

ব্রিটিশ আমলে দেশের বিভিন্ন স্থানে নীল চাষের পাশাপাশি রেশম চাষ হয়েছে। সেক্ষত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলা সেই যুগ থেকেই রেশমের সূতিকাগার হিসেবে চিহ্নিত। শুধু তাই নয়, দেশে মোট উৎপাদিত রেশম সুতার ৬০ শতাংশই ভোলাহাটে উৎপাদিত হয় এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও লাহারপুরের তাঁতিদের বোনা রেশম শাড়ি ও থান পৃথিবীখ্যাত।

এটা ইতিহাস স্বীকৃত। তথাপি রাজশাহী শহরে কিছু পাওয়ার লুম বসিয়ে রাজশাহী শিল্ক নামে জিআই সনদ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে সনদ প্রদানকারী সংস্থা সনদ দানের পুর্বে খোঁজ নেয়নি যে এমন মানসম্মত দুই প্রকারের মিষ্টি অন্য জেলাতেও থাকতে পারে এবং রেশমের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অন্য কোথাও রয়েছে। যেমনভাবে বলা যায়, ঐতিহাসিকভাবে ফজলি আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের পণ্য হলেও সনদ দেয়া হয়েছিল রাজশাহীকে। ভাগ্য ভালো চাঁপাইনবাগঞ্জবাসী যথাসময়ে জানতে পেরে জেলাবাসীর পক্ষে কৃষি অ্যাসোসিয়েশন ওই সনদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তারপরেও শেষ পর্যন্ত রাজশাহীকে অর্ধেক অংশীদার করে রেখে দিয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আরও কিছু পণ্যের জিআই সনদ পেতে পারে যেমন- দমমিসরি (প্যাড়া), রসকদম, জিলাপী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই তিন জাতের মিষ্টি অন্যান্য জেলার মিষ্টির চাইতে গুণগতমান ও স্বাদের দিক থেকে অনন্য, উন্নত ও রুচিসম্মত। সারাদেশে এগুলোর কদর আছে ঢাকার অফিসপাড়ায় এই তিন জাতের মিষ্টির উপহার সর্বজনবিদিত। আর অন্ততপক্ষে দেড়শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। মনাকষার দমমিসরি বা প্যাড়া, পোস্তদানা সম্বলিত রসকদম এবং স্পেশাল জিলাপি যা শুধু রোজার মাসেই তৈরি হয়। এ জাতীয় মিষ্টি অন্য জেলাতেও তৈরি হয় কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধারে কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এ তিন জাতের মিষ্টির জিআই সনদের জন্য জেলা প্রশাসক ভূমিকা রাখতে পারেন।

কলাইয়ের রুটি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ একসঙ্গে বাঁধা। কলাইয়ের আটা ও চালের আটার সমন্বয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহবধূদের হাতে পাকানো রুটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের পুরনো। এ রুটি পুষ্টিগুণ ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এ রুটি খাওয়ার প্রচলন এখন জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় পৌঁছে গেছে দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে কলাই রুটি তৈরির দোকান দেখা যায়। দিয়াড় অঞ্চলে এ রুটি ছাড়া নাস্তা হয় না।

কাঁচা কলাইয়ের আটা এবং চালকুমড়ার শাঁশ মিশিয়ে অন্ততপক্ষে দুই ঘণ্টাব্যাপী হাত দিয়ে ফেনিয়ে সাদা না হওয়া এবং পানিতে না ভাসা পর্যন্ত তা উৎকৃষ্ট বড়ি হয় না। সেই বড়ি একটি ভিন্ন স্বাদযুক্ত লোভনীয় তরকারি বহুকাল ধরে চিহ্নিত। শীতের শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে বড়ি করার ধুম পড়ে যায়। প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে থেকে এই কলাইয়ের আটা ও বড়ি উড়োজাহাজে ভ্রমণ করে আমেরিকা কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত গেছে। প্রবাসী চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহিলারা বিদেশ যাওয়ার আগে তদের লাগেজে অতি যতœ করে আটা ও বড়ি নিবেই। এখন ওইসব দেশের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার মলগুলোতে কলাই আটা ও বড়ি পাওয়া যায়। চালের আটার লাড়– অত্যন্ত সুস্বাদু, পুষ্টিকর, রুচিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। বিশেষ করে প্রসব পরবর্তী মহিলাদের জন্য খুবই বলকারক ও ক্ষত নাড়ি শুকানোর জন্য মহৌষধ। এটি সব শ্রেণীর মানুষ খেতে পারে। প্রথমে চাল খোলায় ভেজে তার সঙ্গে পরিমাণমতো গরম মসলা, সুঁট, গোলমরিচ, জৈত্রি মিশিয়ে জাতায় পিষে আটা করতে হয়। তারপরে পরিমাণমতো আঁখের গুড় মিশিয়ে ঢেঁকিতে বা ওখলে কুটে একাকার হলে এবং মিশ্রনটা সামান্য গরম হলে সেগুলো হাত দিয়ে গোল করলে লাড়ু তৈরি হয়। কিছুক্ষণ পরে সেটা খুব শক্ত হয়। ২ বছর পর্যন্ত এর স্বাদ ও গন্ধ অপরিবর্তিত থাকে। আগের যুগে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসার ঘটেনি তখন কবিরাজরা প্রসবকারিণী মহিলাদের জন্য এই আটার লাড়ু খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। কাঁচা নাড়ি শুকানোর জন্য এই লাড়ু সত্যি ধন্বন্তরি ছিল।

আজও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহিলারা এই লাড়ু তৈরি করেন সপরিবারে খাওয়ার জন্য এবং নবজাতক হবার পর শ্বশুরবাড়ি থেকে এই লাড়ু তৈরি করে পাঠানো হয় অথবা লাড়ু তৈরি করার মাল মসলা বউমার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষায় ব্যাভার বলা হয়। লাক্ষা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একটি অতিরিক্ত এবং অর্থকরি কৃষি সম্পদ। দেশের শুধুমাত্র এই জেলাতেই কৃষক পর্যায়ে এর চাষ হয়। কুলের বাগানেই মূলত এর চাষ হয়। এ পণ্যটি জিআই সনদ পেতে পারে।

গোপালভোগ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাইরে উৎপাদন হয় বলে জানা যায় না। এটি একটি উৎকৃষ্টমানের আম; যা ল্যাংড়া ও খিরসাপাতের সঙ্গে তুল্য। ইতোপূর্বে অন্যান্য আমের সঙ্গে এটির জিআই সনদের জন্য আবেদন করার কথা ছিল। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁশা ও পিতল শিল্প, নকশিকাঁথা (যা বিদেশে যায়), ধনে পাতা প্রচুর পরিমাণে ঢাকা যায়Ñ এসব পণ্যের জিআই সনদ পাওয়ার হকদার চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী। প্রয়োজনে এগুলোর ইতিহাস ঐতিহ্য দেয়া যেতে পারে।

[লেখক : সাংবাদিক]

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত

ছবি

প্রাণের মেলা

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত হোক

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার রাজধানীর আজিমপুর

ছবি

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির নবজাগরণ

খুলনায় একুশে বইমেলার মুগ্ধতা

মধুরতম ভাষা ও রক্তাক্ত বাংলা

উৎসব ও প্রথার বিবর্তন

চুরমার ফিলিস্তিন ও খাদ্য রাজনীতি

কুষ্ঠজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে করণীয়

যুব ক্ষমতায়ন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে

লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের লাইব্রেরি

একজীবনে অনেক বছর বেঁচে থেকেও নিজেকে চেনা হয়ে ওঠে না

“ছুরি-কাঁটা ও নব্যধনী”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সন্দেশখালি লাইন

শিশুরও হতে পারে ক্যান্সার, প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চিকিৎসা নিতে কেন ভারতে গিয়েছিলাম

ইসরায়েলের গণহত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা

বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু গণিত

ছবি

সুন্দরবন কি আরেকটু বেশি মনোযোগ পেতে পারে না

নিজেকে বরং নিজেই প্রশ্ন করতে শিখুন

গড়ে উঠুক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ছবি

বিদ্যা দেবী মা সরস্বতী

বিশ্ব বেতার দিবস ও বাংলাদেশ বেতার

কৃষিবিদ দিবস

ছয় বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

জলবায়ু সম্মেলন এবং নয়া উদারবাদী কর্তৃত্ব

নির্বাচন ও সামাজিক অস্থিরতা

ছবি

খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরোনোর পথ কী

ছবি

ট্রাম্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন, তবে পথ মসৃণ নয়

দুর্নীতিবাজদের খতম করা যাবে কি?

মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে

শিক্ষা হচ্ছে জগতের আলো

tab

উপ-সম্পাদকীয়

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

সামসুল ইসলাম টুকু

সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় জিআই সনদ আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছে। জিআই সনদ হচ্ছে ভৌগলিক নির্দেশক বা যা কোনো পণ্যসামগ্রী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য সংস্কৃতি ইতিহাসকে বোঝায়। পাশাপাশি এগুলোর গুণগতমান বৈশিষ্ট্য প্রস্তুত প্রণালি খ্যাতি নিশ্চিত করে।

ইতোমধ্যে দেশের ২১টি পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে এবং আরও ১৪টি পণ্য সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সনদপ্রাপ্ত ২১টি পণ্যের মধ্যে ১৫টির আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান এবং ৬টি পণ্যের আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক।

জিআই সনদ পেতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও সুপারিশ প্রয়োজন হয়; কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অসংখ্য সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা হওয়া সত্ত্বেও এবং বেশ কয়েকটি পণ্যের জিআই সনদ পাওয়ার পরিপূর্ণ যোগ্যতা থাকলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। ফলে কিছু পণ্যের সনদ অন্য জেলা নিয়ে গেছে। এর মধ্যে শিবগঞ্জের আদি চমচম। এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য কয়েকশ বছর আগের স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, নরম। এই চম চম প্রচুর পরিমানে জেলার বাইরে যায়। সোনামসজিদ দেখতে আসা পর্যটক ও আম মৌসুমে আসা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আম ব্যাপারীরা এই চমচম না নিয়ে যায় না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুরের তৈরি তিলের খাজার ইতিহাস কমপক্ষে দুইশ বছরের। মুচমুচে এই খাজার চাহিদা রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। শুধু তাই নয়, এই খাজা প্যাকেট হয়ে যায় পৃথিবীর বহু দেশে যেখানে প্রবাসী বাঙালিরা থাকেন। নকশিকাঁথা চাপাইনবাবগঞ্জের বহু পুরনো ঐতিহ্য। সর্বস্তরের মহিলাদের একটি অবসরকালীন কাজ। কাপড় আর বিভিন্ন রঙের সুতো দিয়ে মনোমুগদ্ধকর নকশা তৈরি করা, দর্শনীয় শিল্প। মহিলারা সংসারের কাজ সেরে বিকেলে দল বেঁধে নিজ নিজ গ্রামের কোনো গাছতলায় বা খোলা মাঠে বা কারো বাড়ির আঙিনায় কাঁথার ডালা আর সুচ সুতা নিয়ে হাজির হয়। আপন মনে কাজ করছে আর পারিবারিক গল্পের সঙ্গে নিপুনভাবে সুচের কাজ করছে। গত ৫০ বছর আগে থেকে কিছু এনজিও গ্রামীন মহিলাদের সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে এই নকশিকাঁথা তৈরি করিয়ে নেয়; যা তারা চড়া মূল্যে ব্র্যাকসহ ঢাকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন কয়েকটি দোকানও আছে।

প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এখান থেকে পছন্দমতো নকশিকাঁথা কেনেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জিআই সনদের জন্য আবেদন করা হয়নি। বরং জামালপুরের জেলা প্রশাসক আবেদন করে জিআই সনদ আদায় করেছেন। এই পণ্য ৩টি প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে পেটেন্ট বিভাগের কাছে তুলনামূলক বিচারেও স্থান করে নিতে পারেনি।

ব্রিটিশ আমলে দেশের বিভিন্ন স্থানে নীল চাষের পাশাপাশি রেশম চাষ হয়েছে। সেক্ষত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলা সেই যুগ থেকেই রেশমের সূতিকাগার হিসেবে চিহ্নিত। শুধু তাই নয়, দেশে মোট উৎপাদিত রেশম সুতার ৬০ শতাংশই ভোলাহাটে উৎপাদিত হয় এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও লাহারপুরের তাঁতিদের বোনা রেশম শাড়ি ও থান পৃথিবীখ্যাত।

এটা ইতিহাস স্বীকৃত। তথাপি রাজশাহী শহরে কিছু পাওয়ার লুম বসিয়ে রাজশাহী শিল্ক নামে জিআই সনদ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে সনদ প্রদানকারী সংস্থা সনদ দানের পুর্বে খোঁজ নেয়নি যে এমন মানসম্মত দুই প্রকারের মিষ্টি অন্য জেলাতেও থাকতে পারে এবং রেশমের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অন্য কোথাও রয়েছে। যেমনভাবে বলা যায়, ঐতিহাসিকভাবে ফজলি আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের পণ্য হলেও সনদ দেয়া হয়েছিল রাজশাহীকে। ভাগ্য ভালো চাঁপাইনবাগঞ্জবাসী যথাসময়ে জানতে পেরে জেলাবাসীর পক্ষে কৃষি অ্যাসোসিয়েশন ওই সনদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তারপরেও শেষ পর্যন্ত রাজশাহীকে অর্ধেক অংশীদার করে রেখে দিয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আরও কিছু পণ্যের জিআই সনদ পেতে পারে যেমন- দমমিসরি (প্যাড়া), রসকদম, জিলাপী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই তিন জাতের মিষ্টি অন্যান্য জেলার মিষ্টির চাইতে গুণগতমান ও স্বাদের দিক থেকে অনন্য, উন্নত ও রুচিসম্মত। সারাদেশে এগুলোর কদর আছে ঢাকার অফিসপাড়ায় এই তিন জাতের মিষ্টির উপহার সর্বজনবিদিত। আর অন্ততপক্ষে দেড়শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। মনাকষার দমমিসরি বা প্যাড়া, পোস্তদানা সম্বলিত রসকদম এবং স্পেশাল জিলাপি যা শুধু রোজার মাসেই তৈরি হয়। এ জাতীয় মিষ্টি অন্য জেলাতেও তৈরি হয় কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধারে কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এ তিন জাতের মিষ্টির জিআই সনদের জন্য জেলা প্রশাসক ভূমিকা রাখতে পারেন।

কলাইয়ের রুটি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ একসঙ্গে বাঁধা। কলাইয়ের আটা ও চালের আটার সমন্বয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহবধূদের হাতে পাকানো রুটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের পুরনো। এ রুটি পুষ্টিগুণ ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এ রুটি খাওয়ার প্রচলন এখন জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় পৌঁছে গেছে দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে কলাই রুটি তৈরির দোকান দেখা যায়। দিয়াড় অঞ্চলে এ রুটি ছাড়া নাস্তা হয় না।

কাঁচা কলাইয়ের আটা এবং চালকুমড়ার শাঁশ মিশিয়ে অন্ততপক্ষে দুই ঘণ্টাব্যাপী হাত দিয়ে ফেনিয়ে সাদা না হওয়া এবং পানিতে না ভাসা পর্যন্ত তা উৎকৃষ্ট বড়ি হয় না। সেই বড়ি একটি ভিন্ন স্বাদযুক্ত লোভনীয় তরকারি বহুকাল ধরে চিহ্নিত। শীতের শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে বড়ি করার ধুম পড়ে যায়। প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে থেকে এই কলাইয়ের আটা ও বড়ি উড়োজাহাজে ভ্রমণ করে আমেরিকা কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত গেছে। প্রবাসী চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহিলারা বিদেশ যাওয়ার আগে তদের লাগেজে অতি যতœ করে আটা ও বড়ি নিবেই। এখন ওইসব দেশের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার মলগুলোতে কলাই আটা ও বড়ি পাওয়া যায়। চালের আটার লাড়– অত্যন্ত সুস্বাদু, পুষ্টিকর, রুচিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। বিশেষ করে প্রসব পরবর্তী মহিলাদের জন্য খুবই বলকারক ও ক্ষত নাড়ি শুকানোর জন্য মহৌষধ। এটি সব শ্রেণীর মানুষ খেতে পারে। প্রথমে চাল খোলায় ভেজে তার সঙ্গে পরিমাণমতো গরম মসলা, সুঁট, গোলমরিচ, জৈত্রি মিশিয়ে জাতায় পিষে আটা করতে হয়। তারপরে পরিমাণমতো আঁখের গুড় মিশিয়ে ঢেঁকিতে বা ওখলে কুটে একাকার হলে এবং মিশ্রনটা সামান্য গরম হলে সেগুলো হাত দিয়ে গোল করলে লাড়ু তৈরি হয়। কিছুক্ষণ পরে সেটা খুব শক্ত হয়। ২ বছর পর্যন্ত এর স্বাদ ও গন্ধ অপরিবর্তিত থাকে। আগের যুগে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসার ঘটেনি তখন কবিরাজরা প্রসবকারিণী মহিলাদের জন্য এই আটার লাড়ু খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। কাঁচা নাড়ি শুকানোর জন্য এই লাড়ু সত্যি ধন্বন্তরি ছিল।

আজও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহিলারা এই লাড়ু তৈরি করেন সপরিবারে খাওয়ার জন্য এবং নবজাতক হবার পর শ্বশুরবাড়ি থেকে এই লাড়ু তৈরি করে পাঠানো হয় অথবা লাড়ু তৈরি করার মাল মসলা বউমার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষায় ব্যাভার বলা হয়। লাক্ষা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একটি অতিরিক্ত এবং অর্থকরি কৃষি সম্পদ। দেশের শুধুমাত্র এই জেলাতেই কৃষক পর্যায়ে এর চাষ হয়। কুলের বাগানেই মূলত এর চাষ হয়। এ পণ্যটি জিআই সনদ পেতে পারে।

গোপালভোগ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাইরে উৎপাদন হয় বলে জানা যায় না। এটি একটি উৎকৃষ্টমানের আম; যা ল্যাংড়া ও খিরসাপাতের সঙ্গে তুল্য। ইতোপূর্বে অন্যান্য আমের সঙ্গে এটির জিআই সনদের জন্য আবেদন করার কথা ছিল। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁশা ও পিতল শিল্প, নকশিকাঁথা (যা বিদেশে যায়), ধনে পাতা প্রচুর পরিমাণে ঢাকা যায়Ñ এসব পণ্যের জিআই সনদ পাওয়ার হকদার চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী। প্রয়োজনে এগুলোর ইতিহাস ঐতিহ্য দেয়া যেতে পারে।

[লেখক : সাংবাদিক]

back to top