alt

উপ-সম্পাদকীয়

খেলার চেয়ে ‘ধুলা’ বেশি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ১১ মে ২০২৪

নারী আম্পায়ার হিসেবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে প্রথম দায়িত্ব পেয়েছিলেন সাথিরা জাকির জেসি। ২৫ এপ্রিল ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংক ও মোহামেডানের ম্যাচে নারী আম্পায়ার দায়িত্ব পাওয়ায় আপত্তি জানিয়েছিল দুই দল। এই আপত্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে উক্ত দুই দলের সম্বিত ফিরে আসে, এখন রাজনৈতিক নেতাদের মতো নিজের বলা কথা অস্বীকার করে নতুন কথা বলা শুরু হয়েছে, ‘আমরা তো নারী আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিইনি, আমরা অবস্থান নিয়েছি নারী আম্পায়ারের অনভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে।’

কিন্তু জেসি তো অনভিজ্ঞ ও অপরিপক্ব আম্পায়ার নন, তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি পুরুষদের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে খেলা পরিচালনা করেছেন, তিনি আইসিসির ডেভেলপমেন্ট প্যানেলের আম্পায়ার। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বনাম ভারতীয় নারী দলের টি-২০ খেলায় আম্পায়ারিং করেছেন। উপরন্তু ধারাভাষ্যকার হিসেবেও তিনি পরিচিত।

তাই মনে হয়, জেসিকে মেনে না নেয়ার প্রকৃত কারণ নারীবিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতা। যারা ধর্মকে খেলায় টেনে এনেছে তাদের নাজায়েজ ক্রিকেট খেলা বাদ দেয়াই উচিত। দুই দলের কথা অনুযায়ী তাদের খেলাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খেলায় একজন গুরুত্বহীন আম্পায়ারকে তারা মেনে নিতে পারছিল না। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট খেলার মান কি সব সময় গুরুত্ব পায়? তারা নিশ্চয়ই জানে, অনেক অভিজ্ঞ আম্পায়ারও ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে অসংখ্য বাজে ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত গুরুত্বহীন আম্পায়ারকে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ করে তোলার নিমিত্তে গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আম্পায়ারিং করার সুযোগ দিতে হবে; সুযোগ না দিলে জেসিরা বিশ্বমানের আম্পায়ার হবেন কী করে?

যেসব ক্রিকেট খেলোয়াড় জেসির আম্পায়ারিং নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন তারাও এককালে অনভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিলেন, জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত না হলে আমৃত্যু অনভিজ্ঞই থেকে যেতেন। খেলাধুলার জগতে নারীবিদ্বেষের ঝাঁজ কমানোর জন্য খেলোয়াড়দের যথাযথ সবকের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের তীব্রতা লক্ষ্য করে ম্যাচের দুটি দল তাদের মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এটা মন্দের ভালো, কারণ তারা জনমতকে সমীহ করে নিজেদের ভুলটি বুঝতে পেরেছে।

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবৈষম্য, জাতবৈষম্য। লিঙ্গবৈষম্য মারাত্মক, শুধু লিঙ্গবৈষম্যের কারণে কোন নারী ‘ম্যারেজ রেজিস্ট্রার’ হতে পারে না, ঋতুস্রাব প্রধান বাধা। আইনের দ্বারা নির্ধারিত তথ্য দিয়ে বিয়ে তালিকাভুক্ত করাই হচ্ছে বিয়ে নিবন্ধন। পিরিয়ডকালীন একজন নারীর পক্ষে বিয়ের নিবন্ধকরণের কার্যাদি সম্পাদন কেন সম্ভব নয় তার কোন যুক্তসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। বিয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে ধর্মীয় রীতি মানা হলেও বিয়ের নিবন্ধন হয় রাষ্ট্রের আইন অনুসারে।

তাই রেজিস্ট্রার ঋতুবতী হলেও ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার কথা নয়, কারণ বিয়ে পড়ানোর দায়িত্ব রেজিস্ট্রারের নয়। নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন পুরুষ প্রার্থীর পক্ষে নিকাহ রেজিস্ট্রারের মৃত্যু বা অবসরে যাওয়ার কারণে পদটি শূন্য হলে তার পুত্রসন্তান যোগ্যতা থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন, কিন্তু মেয়ে সন্তান এই অগ্রাধিকার পাবে না। ফলে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশনের ব্যবস্থা আইনেই আছে। ক্রিকেটারদের দোষ দিয়ে লাভ কী! দেশের আইনপ্রণেতাদের নারীবিদ্বেষী মনোভাব ক্রিকেটারদের চেয়ে কম নয়। মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তাদের বাদ রাখার সুপারিশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই প্রস্তাব অবশ্য পরে ক্রিকেটারদের মতো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে এই লোকের মানসিকতা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত হলেই মানুষ সংস্কার মুক্ত হয় না, সংস্কার মুক্ত হতে হলে বিকশিত মনের অধিকারী হতে হয়। ‘গার্ড অব অনার’ যারা দেন তাদের কেউ তো জানাজা পড়ান না; ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে গার্ড অব অনারের কোন সম্পর্ক আছে কিনা আমার জানা নেই, থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। প্রকৃতপক্ষে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করা তত সহজ নয়; প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা বিরোধী দলীয় নেতা নারী হলেই লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।

পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ নারীদের সমকক্ষ ভাবতে এখনও মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। ছক্কা মেরে, ৫০ বা ১০০ রান করে অনেক ক্রিকেট খেলোয়াড়কে মাটিতে সেজদা দিতে দেখে যায়, কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকায়। যে ক্রিকেট খেলায় নারী আম্পায়ার পছন্দ হচ্ছে না সেই ক্রিকেট কি জায়েজ? ইসলাম ধর্মে মাত্র তিনটি খেলা জায়েজÑ এক, আপন স্ত্রীর সঙ্গে অত্যধিক প্রেমভরে খেলা করা; দুই, স্বীয় অশ্বকে যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেয়া; তিন, শত্রুর মোকাবিলায় জয় লাভের জন্য তীর ছোড়ার প্রশিক্ষণ।

অন্যদিকে যে খেলার সঙ্গে পুরস্কার বা অর্থের সংশ্লেষ থাকে তা ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোরআন তেলাওয়াতের ‘প্রতিযোগিতা’ও অনেক আলেমের মতে নিষিদ্ধ। হাদিস অনুযায়ী ‘ঘোড়া অথবা তীর নিক্ষেপ কিংবা উটের প্রতিযোগিতা ব্যতীত অন্য প্রতিযোগিতা’ নাজায়েজ। অবশ্য ইমাম শাফীর মতে সাঁতার কাটা, কুস্তি প্রতিযোগিতা জায়েজ। ক্রিকেট খেলার সঙ্গে কোটি কোটি টাকা জড়িত, ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেয়া হয়, তাই ক্রিকেট খেলা জায়েজ তা কোনভাবেই বলা যাবে না। পুরস্কার সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলা শরিয়াহ বিরুদ্ধ বিধায় এই খেলায় কোন মুসলিম ফারহেজগার খেলোয়াড় খেললেও তা জায়েজ হবে না, বরং তিনি ইসলাম বিরুদ্ধ কাজ করছেন।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ খেলায় নারী-পুরুষনির্বিশেষে সব খেলোয়াড়, আম্পায়ার নাজায়েজ, সেখানে শুধু নারী আম্পায়ারকে আলাদা করা নির্বোধের কাজ। খেলার মাঠে নামাজ শুধু পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলোয়াড়রাই পড়েন না, অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও খেলার মাঠে নিজের কোন কৃতিত্বে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে থাকেনÑ লিওনেল মেসি গোল করে বুকে ক্রুশ চিহৃ আঁকেন, শচীন টেন্ডুরকার সেঞ্চুরি করে আকাশে ব্যাট উঁচিয়ে তার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতেন। অবশ্য মেসি এবং শচীনদের ধর্ম খেলাধুলাবিরোধী নয়, তাই তাদের ক্রুশ চিহ্ন আঁকা বা আকাশের দিকে ব্যাট উঁচু করে ধরার মধ্যে কোন বিরোধ নেই, ভ-ামি নেই; কিন্তু সিনেমার শুটিং শুরুর আগে মাওলানা ডেকে মোনাজাত করার মধ্যে বিরোধ আছে, বিরোধ আছে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ক্রিকেট খেলার প্রাইজ মানি নেয়ার মধ্যে।

খেলা হয় বিনোদনের জন্য, ধর্ম প্রচারের জন্য নয়। খেলার মাঠে ধর্মের প্রদর্শনে প্রচুর বাহবা পাওয়া যায়, এই বাহবার লোভেও অনেকে ধর্ম প্রচারে নেমে ভাইরাল হয়েছেন। ধর্মান্ধ ক্রিকেটার আর ধর্মপ্রাণ খেলোয়াড়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। মগজভর্তি নারীবিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতা এই দুটি যে ব্যক্তির মধ্যে প্রবল সেই ব্যক্তি ভয়ঙ্কর। ভয়ঙ্কর বলেই ক্রিকেট খেলোয়াড় খেলার মাঠ ছেড়ে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে নোংরা মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না।

তবে ধর্মান্ধরাই সম্ভবত প্রকৃত ধার্মিক, তারা কোন কিছুতেই আপোষ করেন না। ইসলামে পূণরূপে প্রবেশ করার কথা কোরআনে বলা হয়েছে, তাই সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের অনৈসলামিক কাজ বা লাভকে ইসলামিক বলার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। ক্রিকেট খেলাটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘শয়তানদের’ আবিষ্কার, তারা এই আবিষ্কার করেছে মুসলমানদের ঈমান-আমল নষ্ট করে তাদের কুফরিতে নিমজ্জিত করার জন্য, হারাম আনন্দে মশগুল করে রাখার জন্যÑ এই বক্তব্য আমার নয়, নেট খুললেই এই কথাগুলো শোনা যায়। ক্রিকেটকে ‘ওয়েস্ট অব টাইম’ বলেছেন ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ডা. জাকির নায়েক। এই কারণে মাঠে গিয়ে বা টিভিতে খেলা দেখা হারাম ও কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন অনেক মাওলানা।

তাই ‘শয়তানের’ পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্রিকেট খেলা একজন মুমিন মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই ধর্মান্ধ খেলোয়াড়দের উচিত খেলা ছেড়া দেয়া, যেমন ছেড়েছেন পাকিস্তানের নারী ক্রিকেটার আয়শা নাসিম। যে সব বাংলাদেশি ক্রিকেট খেলোয়াড় জেসিকে তাদের খেলায় আম্পায়ার হিসেবে দেখতে চান না তাদেরও উচিত আয়েশা নাসিমের মতো খেলা ছেড়ে দিয়ে ধর্মে পূর্ণাঙ্গরূপে সমর্পণ করা। আয়েশা নাসিম ১৮ বছর বয়সে খেলা ছেড়ে ধর্মে মনোনিবেশ করেছেন, হারাম খেলার মাধ্যেমে অগাধ সম্পদ-সম্পত্তি করার পর মহিলা আম্পায়ারকে অপছন্দ করলে ভ-ামির উন্মোচন হয়। সব যুগে সব সমাজে নারীদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে।

নারীদের ভোটাধিকার পেতে বহু যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে, এখনও অনেক সমাজে নারীদের ভোটাধিকার নেই, বহু সমাজে এখনও মাহরম ছাড়া নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারে না, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষেধ, গাড়ি চালানো অপরাধ, মাঠে গিয়ে খেলা দেখা নাজায়েজ। নারীদের এক সময় ডাক্তার হতে নিষেধ ছিল, বিচারক হতে বাধা ছিল, উকিল হতে প্রতিবন্ধকতা ছিলÑ সামাজিক নিষেধ ডিঙ্গিয়ে এখন নারী বিচারক হচ্ছে, পাইলট হচ্ছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, দুর্গম এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসামি ধরছে, কেরাত শিখছে, কুস্তি লড়ছে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ শাসন করছে। বাংলাদেশের মেয়েরা ছেলেদের আগে এশিয়া কাপ জিতেছে, ফুটবলে আনছে গৌরব। শুধু জেসি নয়, ১৯৮৯ সনেই সায়মা রূপা বাংলাদেশের প্রথম নারী কোয়ালিফাইড আম্পায়ার ছিলেন যিনি জাতীয় বিভাগের ম্যাচে আম্পায়ারিং করেছেন ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সনে। তাই সুযোগ পেলে মেয়েরাও পারে, সুযোগ দেয়া হলে সাথিরা জাকির জেসিও বিশ্বমানের আম্পায়ার হবেন, তখন হয়তো লিগের ক্রিকেট খেলার আম্পায়ারিং করার দরকার হবে না।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও টাকশালের সাবেক এমডি]

দূর হোক মনের পশুত্ব

মনের পশুত্বের প্রতীকী ত্যাগের আরেক নাম কোরবানি

ঈদে সুস্থ খাদ্যাভ্যাস

এমআইটি : প্রযুক্তির সৃষ্টি রহস্যের খোঁজ

কবিগুরুর বাণী ‘প্রমাণিত মিথ্যা’

কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ হবে কিভাবে

কানিহাটি সিরিজ এবং পঞ্চব্রীহি নিয়ে আরও কিছু কথা

কলকাতায় হিজাব বিতর্ক

বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক

হাতের শক্তি ও মহিমা

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

ছবি

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে

সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুটেরাদের বিচার কি হবে

বাজেট ভাবনায় শঙ্কিত যারা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যে

জ্ঞানই শক্তি

পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা

অগ্নিমূল্যের বাজার : সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলবে কি?

বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নৈরাজ্য

যৌতুক মামলার অপব্যবহার

শহীদের রক্তে লেখা ঐতিহাসিক ছয় দফা

রসে ভরা বাংলাদেশ

সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই

দুর্নীতির উৎসমুখ

কানিহাটি সিরিজের বোরো ধান নিয়ে কিছু কথা

নজিরবিহীন বেনজীর

টেকসই উন্নয়ন করতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখে আহমদ

কী বার্তা দিল ভারতের সংসদ নির্বাচন

গরমে প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা

ক্লাইমেট জাস্টিস ফর বাংলাদেশ : শুধু ঋণ বা অনুদান নয়, প্রয়োজন ক্ষতিপূরণ

এখন ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কী

দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া দরকার

গোল্ডেন রাইস কেন বারবার থমকে দাঁড়ায়

প্রাকৃতিক রসগোল্লা

বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

tab

উপ-সম্পাদকীয়

খেলার চেয়ে ‘ধুলা’ বেশি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ১১ মে ২০২৪

নারী আম্পায়ার হিসেবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে প্রথম দায়িত্ব পেয়েছিলেন সাথিরা জাকির জেসি। ২৫ এপ্রিল ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংক ও মোহামেডানের ম্যাচে নারী আম্পায়ার দায়িত্ব পাওয়ায় আপত্তি জানিয়েছিল দুই দল। এই আপত্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে উক্ত দুই দলের সম্বিত ফিরে আসে, এখন রাজনৈতিক নেতাদের মতো নিজের বলা কথা অস্বীকার করে নতুন কথা বলা শুরু হয়েছে, ‘আমরা তো নারী আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিইনি, আমরা অবস্থান নিয়েছি নারী আম্পায়ারের অনভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে।’

কিন্তু জেসি তো অনভিজ্ঞ ও অপরিপক্ব আম্পায়ার নন, তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি পুরুষদের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে খেলা পরিচালনা করেছেন, তিনি আইসিসির ডেভেলপমেন্ট প্যানেলের আম্পায়ার। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বনাম ভারতীয় নারী দলের টি-২০ খেলায় আম্পায়ারিং করেছেন। উপরন্তু ধারাভাষ্যকার হিসেবেও তিনি পরিচিত।

তাই মনে হয়, জেসিকে মেনে না নেয়ার প্রকৃত কারণ নারীবিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতা। যারা ধর্মকে খেলায় টেনে এনেছে তাদের নাজায়েজ ক্রিকেট খেলা বাদ দেয়াই উচিত। দুই দলের কথা অনুযায়ী তাদের খেলাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খেলায় একজন গুরুত্বহীন আম্পায়ারকে তারা মেনে নিতে পারছিল না। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট খেলার মান কি সব সময় গুরুত্ব পায়? তারা নিশ্চয়ই জানে, অনেক অভিজ্ঞ আম্পায়ারও ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে অসংখ্য বাজে ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত গুরুত্বহীন আম্পায়ারকে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ করে তোলার নিমিত্তে গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আম্পায়ারিং করার সুযোগ দিতে হবে; সুযোগ না দিলে জেসিরা বিশ্বমানের আম্পায়ার হবেন কী করে?

যেসব ক্রিকেট খেলোয়াড় জেসির আম্পায়ারিং নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন তারাও এককালে অনভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিলেন, জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত না হলে আমৃত্যু অনভিজ্ঞই থেকে যেতেন। খেলাধুলার জগতে নারীবিদ্বেষের ঝাঁজ কমানোর জন্য খেলোয়াড়দের যথাযথ সবকের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের তীব্রতা লক্ষ্য করে ম্যাচের দুটি দল তাদের মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এটা মন্দের ভালো, কারণ তারা জনমতকে সমীহ করে নিজেদের ভুলটি বুঝতে পেরেছে।

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবৈষম্য, জাতবৈষম্য। লিঙ্গবৈষম্য মারাত্মক, শুধু লিঙ্গবৈষম্যের কারণে কোন নারী ‘ম্যারেজ রেজিস্ট্রার’ হতে পারে না, ঋতুস্রাব প্রধান বাধা। আইনের দ্বারা নির্ধারিত তথ্য দিয়ে বিয়ে তালিকাভুক্ত করাই হচ্ছে বিয়ে নিবন্ধন। পিরিয়ডকালীন একজন নারীর পক্ষে বিয়ের নিবন্ধকরণের কার্যাদি সম্পাদন কেন সম্ভব নয় তার কোন যুক্তসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। বিয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে ধর্মীয় রীতি মানা হলেও বিয়ের নিবন্ধন হয় রাষ্ট্রের আইন অনুসারে।

তাই রেজিস্ট্রার ঋতুবতী হলেও ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার কথা নয়, কারণ বিয়ে পড়ানোর দায়িত্ব রেজিস্ট্রারের নয়। নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন পুরুষ প্রার্থীর পক্ষে নিকাহ রেজিস্ট্রারের মৃত্যু বা অবসরে যাওয়ার কারণে পদটি শূন্য হলে তার পুত্রসন্তান যোগ্যতা থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন, কিন্তু মেয়ে সন্তান এই অগ্রাধিকার পাবে না। ফলে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশনের ব্যবস্থা আইনেই আছে। ক্রিকেটারদের দোষ দিয়ে লাভ কী! দেশের আইনপ্রণেতাদের নারীবিদ্বেষী মনোভাব ক্রিকেটারদের চেয়ে কম নয়। মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তাদের বাদ রাখার সুপারিশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই প্রস্তাব অবশ্য পরে ক্রিকেটারদের মতো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে এই লোকের মানসিকতা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত হলেই মানুষ সংস্কার মুক্ত হয় না, সংস্কার মুক্ত হতে হলে বিকশিত মনের অধিকারী হতে হয়। ‘গার্ড অব অনার’ যারা দেন তাদের কেউ তো জানাজা পড়ান না; ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে গার্ড অব অনারের কোন সম্পর্ক আছে কিনা আমার জানা নেই, থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। প্রকৃতপক্ষে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করা তত সহজ নয়; প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা বিরোধী দলীয় নেতা নারী হলেই লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।

পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ নারীদের সমকক্ষ ভাবতে এখনও মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। ছক্কা মেরে, ৫০ বা ১০০ রান করে অনেক ক্রিকেট খেলোয়াড়কে মাটিতে সেজদা দিতে দেখে যায়, কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকায়। যে ক্রিকেট খেলায় নারী আম্পায়ার পছন্দ হচ্ছে না সেই ক্রিকেট কি জায়েজ? ইসলাম ধর্মে মাত্র তিনটি খেলা জায়েজÑ এক, আপন স্ত্রীর সঙ্গে অত্যধিক প্রেমভরে খেলা করা; দুই, স্বীয় অশ্বকে যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেয়া; তিন, শত্রুর মোকাবিলায় জয় লাভের জন্য তীর ছোড়ার প্রশিক্ষণ।

অন্যদিকে যে খেলার সঙ্গে পুরস্কার বা অর্থের সংশ্লেষ থাকে তা ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোরআন তেলাওয়াতের ‘প্রতিযোগিতা’ও অনেক আলেমের মতে নিষিদ্ধ। হাদিস অনুযায়ী ‘ঘোড়া অথবা তীর নিক্ষেপ কিংবা উটের প্রতিযোগিতা ব্যতীত অন্য প্রতিযোগিতা’ নাজায়েজ। অবশ্য ইমাম শাফীর মতে সাঁতার কাটা, কুস্তি প্রতিযোগিতা জায়েজ। ক্রিকেট খেলার সঙ্গে কোটি কোটি টাকা জড়িত, ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেয়া হয়, তাই ক্রিকেট খেলা জায়েজ তা কোনভাবেই বলা যাবে না। পুরস্কার সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলা শরিয়াহ বিরুদ্ধ বিধায় এই খেলায় কোন মুসলিম ফারহেজগার খেলোয়াড় খেললেও তা জায়েজ হবে না, বরং তিনি ইসলাম বিরুদ্ধ কাজ করছেন।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ খেলায় নারী-পুরুষনির্বিশেষে সব খেলোয়াড়, আম্পায়ার নাজায়েজ, সেখানে শুধু নারী আম্পায়ারকে আলাদা করা নির্বোধের কাজ। খেলার মাঠে নামাজ শুধু পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলোয়াড়রাই পড়েন না, অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও খেলার মাঠে নিজের কোন কৃতিত্বে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে থাকেনÑ লিওনেল মেসি গোল করে বুকে ক্রুশ চিহৃ আঁকেন, শচীন টেন্ডুরকার সেঞ্চুরি করে আকাশে ব্যাট উঁচিয়ে তার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতেন। অবশ্য মেসি এবং শচীনদের ধর্ম খেলাধুলাবিরোধী নয়, তাই তাদের ক্রুশ চিহ্ন আঁকা বা আকাশের দিকে ব্যাট উঁচু করে ধরার মধ্যে কোন বিরোধ নেই, ভ-ামি নেই; কিন্তু সিনেমার শুটিং শুরুর আগে মাওলানা ডেকে মোনাজাত করার মধ্যে বিরোধ আছে, বিরোধ আছে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ক্রিকেট খেলার প্রাইজ মানি নেয়ার মধ্যে।

খেলা হয় বিনোদনের জন্য, ধর্ম প্রচারের জন্য নয়। খেলার মাঠে ধর্মের প্রদর্শনে প্রচুর বাহবা পাওয়া যায়, এই বাহবার লোভেও অনেকে ধর্ম প্রচারে নেমে ভাইরাল হয়েছেন। ধর্মান্ধ ক্রিকেটার আর ধর্মপ্রাণ খেলোয়াড়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। মগজভর্তি নারীবিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতা এই দুটি যে ব্যক্তির মধ্যে প্রবল সেই ব্যক্তি ভয়ঙ্কর। ভয়ঙ্কর বলেই ক্রিকেট খেলোয়াড় খেলার মাঠ ছেড়ে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে নোংরা মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না।

তবে ধর্মান্ধরাই সম্ভবত প্রকৃত ধার্মিক, তারা কোন কিছুতেই আপোষ করেন না। ইসলামে পূণরূপে প্রবেশ করার কথা কোরআনে বলা হয়েছে, তাই সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের অনৈসলামিক কাজ বা লাভকে ইসলামিক বলার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। ক্রিকেট খেলাটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘শয়তানদের’ আবিষ্কার, তারা এই আবিষ্কার করেছে মুসলমানদের ঈমান-আমল নষ্ট করে তাদের কুফরিতে নিমজ্জিত করার জন্য, হারাম আনন্দে মশগুল করে রাখার জন্যÑ এই বক্তব্য আমার নয়, নেট খুললেই এই কথাগুলো শোনা যায়। ক্রিকেটকে ‘ওয়েস্ট অব টাইম’ বলেছেন ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ডা. জাকির নায়েক। এই কারণে মাঠে গিয়ে বা টিভিতে খেলা দেখা হারাম ও কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন অনেক মাওলানা।

তাই ‘শয়তানের’ পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্রিকেট খেলা একজন মুমিন মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই ধর্মান্ধ খেলোয়াড়দের উচিত খেলা ছেড়া দেয়া, যেমন ছেড়েছেন পাকিস্তানের নারী ক্রিকেটার আয়শা নাসিম। যে সব বাংলাদেশি ক্রিকেট খেলোয়াড় জেসিকে তাদের খেলায় আম্পায়ার হিসেবে দেখতে চান না তাদেরও উচিত আয়েশা নাসিমের মতো খেলা ছেড়ে দিয়ে ধর্মে পূর্ণাঙ্গরূপে সমর্পণ করা। আয়েশা নাসিম ১৮ বছর বয়সে খেলা ছেড়ে ধর্মে মনোনিবেশ করেছেন, হারাম খেলার মাধ্যেমে অগাধ সম্পদ-সম্পত্তি করার পর মহিলা আম্পায়ারকে অপছন্দ করলে ভ-ামির উন্মোচন হয়। সব যুগে সব সমাজে নারীদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে।

নারীদের ভোটাধিকার পেতে বহু যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে, এখনও অনেক সমাজে নারীদের ভোটাধিকার নেই, বহু সমাজে এখনও মাহরম ছাড়া নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারে না, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষেধ, গাড়ি চালানো অপরাধ, মাঠে গিয়ে খেলা দেখা নাজায়েজ। নারীদের এক সময় ডাক্তার হতে নিষেধ ছিল, বিচারক হতে বাধা ছিল, উকিল হতে প্রতিবন্ধকতা ছিলÑ সামাজিক নিষেধ ডিঙ্গিয়ে এখন নারী বিচারক হচ্ছে, পাইলট হচ্ছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, দুর্গম এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসামি ধরছে, কেরাত শিখছে, কুস্তি লড়ছে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ শাসন করছে। বাংলাদেশের মেয়েরা ছেলেদের আগে এশিয়া কাপ জিতেছে, ফুটবলে আনছে গৌরব। শুধু জেসি নয়, ১৯৮৯ সনেই সায়মা রূপা বাংলাদেশের প্রথম নারী কোয়ালিফাইড আম্পায়ার ছিলেন যিনি জাতীয় বিভাগের ম্যাচে আম্পায়ারিং করেছেন ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সনে। তাই সুযোগ পেলে মেয়েরাও পারে, সুযোগ দেয়া হলে সাথিরা জাকির জেসিও বিশ্বমানের আম্পায়ার হবেন, তখন হয়তো লিগের ক্রিকেট খেলার আম্পায়ারিং করার দরকার হবে না।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও টাকশালের সাবেক এমডি]

back to top