alt

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

মোস্তাফা জব্বার

: সোমবার, ১৯ জুলাই ২০২১

চার

নানা সমীকরণে ভারতের সেনাবাহিনীর এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন ছিল যেটি রাজনীতি সচেতন, মুজিবের অনুগত, সাহসী ও প্রজ্ঞাবান। অন্যদিকে ২৬ মার্চের আগে যারা স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াইতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে চাননি। তারা খুব ভালো করে জানতেন যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সশস্ত্র হয়েছেন তারা সবাই মুজিবের আদর্শের সমর্থক হলেও ছাত্রলীগ কর্মী বা ত্যাগী সৈনিক নন কিংবা মুজিবের আদর্শে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নীতি ও আদর্শের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত নন। মুক্তিবাহিনীতে যোগদানকারী অনেকেই একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে মুজিবের আদর্শের স্বায়ত্তশাসনের বা ছয় দফার বিরোধিতা করেছেন। বস্তুত তৎকালে সমাজতন্ত্রের ধারাটি উচ্চকিত থাকায় শেখ মুজিবের স্বাধীনতার লড়াই অনেকটাই পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতার লড়াইটা পাকিস্তানি পুঁজির সঙ্গে বাঙালি পুঁজির বিরোধের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। বিশেষ করে পিকিংপন্থি বাম এবং উগ্র বামেরা এই ধারণা পোষণ করতেন। অনেকেই পরিস্থিতির চাপে পড়েও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হন। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী এই বিষয়ে তার লেখা একটি এই কথাটি স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই বাহিনীটি নিয়ে স্বীকৃতিহীনতার পাশাপাশি প্রচুর বিতর্কও আছে।

মুজিব বাহিনী গঠন প্রসঙ্গে ভারতীয় সংগঠক জেনারেল উবানের বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

‘গোলযোগের অশান্ত দিনগুলোতে আমরা একদল নিবেদিতপ্রাণ যুবনেতার কথা জানতে পারলাম, যারা বাংলাদেশে বেশ পরিচিত। তারা হলেনÑশেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, ও তোফায়েল আহমেদ। তাদের মনে হলো অত্যন্ত অনুপ্রাণিত, করতে অথবা মরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তাদের নেতৃত্বে গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, অস্থায়ী সরকার এদের তেমন মর্যাদা দিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা চাইছিলেন, এরা মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে ও যুদ্ধে অংশ নেবে। কিন্তু এই যুবনেতাদের তাতে দৃঢ় আপত্তি ছিল। (মুজিবের প্রতি তাদের গভীরতার আনুগত্যের ও নৈকট্যের কারণে তারা সবাই পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেল খেটেছেন মুজিবের সঙ্গে) তারা মুজিব বাহিনী নামে অভিহিত হতে পছন্দ করলেন। তারা তাদের পুরোনো সহকর্মীদের ক্যাডার হিসেবে বেছে বেছে সত্যায়িত করলেন।

ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সেক্রেটারি শ্রী আর এন কাও এ সময় আমার ঊর্ধ্বতন সিভিলিয়ান কর্মকর্তা ছিলেন। আওয়ামী লীগের যুব উইংয়ের নেতৃত্বে এবং খোদ সংগঠনটি সম্পর্কে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য জানার সুযোগ তার হয়েছিল। তার গভীর উপলব্ধি ছিল যে, তিনি আমার তত্ত্বাবধানে যে যুবনেতাদের দিয়েছিলেন, শুধু তাদের দ্বারাই আসল কাজটি হবে এবং তাদের বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অঞ্চলে কাজ করার জন্য বিশেষ মর্যাদা দেয়া দরকার। তিনি তাদের প্রতি অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীদের ঈর্ষার কথা জানতেন তাদের আপোসহীন মনোভাবের জন্য এবং মন্ত্রীদের উচ্চাকাক্সক্ষা ও অভিসন্ধির জন্য।’

ভারতীয় সংগঠকরা যেভাবেই মুজিব বাহিনীর গঠনকে ব্যাখ্যা করুন না কেন, বাংলাদেশের তারুণ্যের নিজস্ব ও আদর্শগত একটি সংগঠন দরকার ছিল বলেই মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। মুজিবের নামে বাহিনী গঠন করার চাইতে শ্রেষ্ঠতম কোন অর্জন আমাদের কাছে মনে হয়নি। এর সবচেয়ে সঙ্গত কারণ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যোগদানের ঐকান্তিক প্রেরণাই ছিলেন শেখ মুজিব। বিশেষ করে ৬৮ থেকে ৭১ সময়কালে মুজিবকে সারা দেশের একমাত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হই আমরা। তার সমসাময়িক নেতা মাওলানা ভাসানী বা মোজাফফর আহমদ বা কমরেড মণি সিংহ আর যাই হোন তাদের অনুসারীদের কাছেও অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন না, দেশের মানুষের কাছে তো ছিলেনই না। তার ওপরে ৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর একচেটিয়া বিজয় সব কিছুকে ছাপিয়ে তাকেই সবার ওপরে স্থাপন করেছিল। আমরা শেখ মুজিবের কথাকে বাণী এবং প্রশ্নাতীত মনে করতাম এবং তিনি আমাদের সামনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক যুবনেতাদের সম্পর্কে উবানের ধারণা ছিল অত্যন্ত উঁচু। বিএলএফের প্রধান দুই নেতা সম্পর্কে তার মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ ফজলুল হক মনি সম্পর্কে তিনি বলছেন : ‘হালকা-পাতলা গড়নের মানুষটি যেন এক জ্বলন্ত মশাল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাভাবিক নেতা বলে মনে হতো তাঁকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এবং যেকোনো আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। তোফায়েল ও রাজ্জাক তাকে শ্রদ্ধা করতেন। সিরাজও তা করতেন, কিন্তু মাত্র অল্প পরিমাণে। প্রায়ই আলোচনা গরম হয়ে উঠত। সিরাজ অপেক্ষা করতে চাইতেন না। কিন্তু সব সময় তারা একটা টিম হয়ে কাজ করতেন এবং যৌথ নেতৃত্বের ভালো উদাহরণ তুলে ধরতেন। তিনি র‌্যাডিকেল ধ্যানধারণা পোষণ করতেন। আপসহীন মনোভাবের ছিলেন। যুদ্ধ করতেন বাঘের মতো। কাজ করতেন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীতদাসের মতো। একসঙ্গে অনেক দিন তিনি না খেয়ে না ঘুমিয়ে শুধু চায়ের ওপর থাকতে পারতেন। বক্তৃতা দিতে তিনি পছন্দ করতেন না। কথা এমন বলতেন যে, বোঝা যেত তিনি কাজের লোক, কথার নয়। তৃণমূল কর্মীর মতো তিনি কথা বলতেন। তিনি প্রচার অপছন্দ করতেন। মুখ বুজে কাজ করে যেতে চাইতেন। চিরকুমার। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার ধরন ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি এমন মানুষ যাকে ভালোবাসতে হয়। তিনি আত্মোৎসর্গের প্রতীক। আমার শুধু এই ভয়ই ছিল যে দারিদ্র্যমুক্তির পথের ধীরগতিতে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না এবং হয়তো রূঢ় ও অগ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে অপ্রিয় হয়ে যাবেন। সিরাজুল আলম খানের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতি অবশ্যই আলোচনার বিষয় হিসেবে এখনও ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। যুদ্ধোত্তরকালে তিনি ছাত্রলীগের সেরা ও মেধাবী মানুষগুলোকে কেন বঙ্গবন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন, জাসদ গঠন করেছিলেন, কেন সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন এবং এখনও কোন রহস্যময় ভূমিকা পালন করছেন তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে। তার শিষ্যরা-রব, সিরাজ, ইনু যে রাজনৈতিক মেরুকরণকে বহন করছেন তারাই বা কি ভাবছেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে মুজিববাহিনীর স্বাধীনতা উত্তর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। জেনেছি সম্প্রতি তার জবানিতে শামসুদ্দিন আহমদের একটি বই বাজারে এসেছে। বইটি পেলে আরও বিস্তারিত কিছু লিখতে পারবো।

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে লিখেছেন, ‘বিএলএফের (তখনো মুজিব বাহিনী নামকরণ হয়নি) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল উবানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের (এসএফএল) একদল প্রশিক্ষকের হাতে। এর দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল, একটা দেরাদুনের চাকরাতা, অন্যটি আসামের হাফলং। প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করার জন্য চারটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এগুলোর অবস্থান ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ব্যারাকপুর। আঞ্চলিক অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তার সহকারী ছিলেন নূরে আলম জিকু। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল জলপাইগুড়ির কাছে পাংগা নামক স্থানে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তার সহকারী ছিলেন মনিরুল ইসলাম (বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি মার্শাল মনি নামে পরিচিত ছিলেন)। মধ্যাঞ্চলের ক্যাম্প ছিল মেঘালয়ের তুরা শহরে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। তার সহকারী ছিলেন সৈয়দ আহমদ। পূর্বাঞ্চলের (ঢাকাসহ) ক্যাম্প ছিল আগরতলায়। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। সহকারী ছিলেন আ স ম আব্দুর রব। কাজী আরেফ ছিলেন বিএলএফের গোয়েন্দা-প্রধান। বিএলএফের পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি করতেন শাজাহান সিরাজ। চার যুবনেতা নিজেদের নতুন নামকরণ করলেন। তারা নতুন নামেই অনেক জায়গায় নিজেদের পরিচয় দিতেন। নামগুলো সংক্ষেপে ছিল মনো (মনি), সরোজ (সিরাজ), রাজু (রাজ্জাক) ও তপন (তোফায়েল)। বিএলএফের চার আঞ্চলিক অধিনায়ককে লে. জেনারেল মর্যাদা ও প্রটোকল দেয়া হয়েছিল।

প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করা হতো মূলত ছাত্রলীগের সদস্যদের মধ্য থেকে। এ ছাড়া শ্রমিক লীগের অনেক সদস্যকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটি শুরু হয় মে মাসের শেষ সপ্তাহে এবং তা একটানা চলে অক্টোবর পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ ছিল ছয় সপ্তাহের। প্রশিক্ষণে হালকা ও মাঝারি অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি ও পরিকল্পনা- এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্ব দেয়া হয়। মোট কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। উবানের হিসাবমতে সংখ্যাটি ১০ হাজার। প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল সাত হাজার। নির্দেশ ছিল, প্রশিক্ষণ শেষে দেশের ভেতরে গিয়ে প্রত্যেক সদস্য আরও ১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং এভাবেই ৭০ হাজার সদস্যের একটি যোদ্ধা বাহিনী গড়ে উঠবে। দেশের ভেতরে গিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের খুঁজে বের করা, চারটি বেইস ক্যাম্প চালানো, প্রশিক্ষণার্থীদের বেইস ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদির খরচ মেটানোর জন্য ৭৬ লাখ টাকার একটা বাজেট তৈরি করে উবানের হাতে দেয়া হয়। বরাদ্দ হয়েছিল ৭০ লাখের কিছু বেশি। কয়েক কিস্তিতে টাকাটা দেয়া হয়।

অস্ত্র চালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের চারজন নেতাকে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত রাজনৈতিক পাঠ দেয়ার জন্য বাছাই করা হয়। তারা হলেন হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ ফ ম মাহবুবুল হক ও মাসুদ আহমেদ রুমি। তারা সবাই ছিলেন সিরাজপন্থি।

তৎকালে সমাজতন্ত্রের ধারাটি উচ্চকিত থাকায় শেখ মুজিবের স্বাধীনতার লড়াই অনেকটাই পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতার লড়াইটা পাকিস্তানি পুঁজির সঙ্গে বাঙালি পুঁজির বিরোধের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো

আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথাগত সরকার-পদ্ধতির বাইরে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ পাননি। তাদের অনেকেই মনে করতেন, দলের মধ্যকার ‘চরমপন্থি যুবকদের হঠকারী কার্যকলাপের’ ফলেই তাদের ভারতের মাটিতে এত কষ্ট করতে হচ্ছে। এ জন্য তারা বিএলএফের ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেক্টর কমান্ডাররা, যারা অস্থায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, বিএলএফের ব্যাপারে তাদেরও অনেক ক্ষোভ ছিল। তারা যুবকদের জন্য যার যার সেক্টরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তাদের হাতে সম্পদ ছিল অপ্রতুল। অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছিল না বললেই চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা পাঁচ-ছয় দিনের একটা মামুলি প্রশিক্ষণের পর তরুণদের নামমাত্র অস্ত্র দিয়ে দেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিতেন। তারা চেয়েছিলেন বিএলএফ আলাদা বাহিনী হিসেবে না থেকে তাদের কমান্ডে থাকুক। তারা এটা বুঝতে অক্ষম ছিলেন যে বিএলএফ প্রথাগত সেনাবাহিনী নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সংগঠন। তাজউদ্দীন বিএলএফের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিন্তু তিনি না পারতেন এদের তার নিয়ন্ত্রণে আনতে, না পারতেন এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে। তিনি ভালো করেই জানতেন, বিএলএফ ছিল শেখ মুজিবের নির্দেশিত একটি ‘অপশন’।

মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন: ১৮ ফেব্রুয়ারি ৭১ বঙ্গবন্ধু আমাদের চারজন- মনি ভাই, সিরাজ ভাই, আমি আর তোফায়েলকে ডাকলেন। ব্রিফিং দিলেন: ‘ওরা আমাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না, তোমার প্রস্তুতি সংঘবদ্ধ করো, সশস্ত্র বিপ্লব করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।’ তাজউদ্দীন ভাই একা উপস্থিত ছিলেন। আরও বললেন, ‘আমি না থাকলে এই তাজউদ্দীন হবে তোমাদের নেতা।”

ঢাকা। ২৬ মার্চ, ২০১৯। আপডেট ১৮ জুলাই, ২০২১।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং বিজয় ডিজিটাল শিক্ষা সফটওয়্যারের উদ্ভাবক]

সম্পদে হিন্দু নারীর অধিকার প্রসঙ্গে

ছবি

কোভিড-১৯ সচেতনতা ও সাঁওতাল স্বেচ্ছাসেবী

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বনাম উদ্ভাবন ও উন্নতি

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন

ছবি

লকডাউন, না বাঁশের নিচে হেডডাউন?

প্রাণের মাঝে আয়

সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব মিলবে কি?

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ : সম্ভাবনা ও শঙ্কা

ছবি

চীন এবং আফগানিস্তানে তালেবান : সম্পর্ক ও নতুন সমীকরণ

এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার

ছবি

দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী

ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের নেপথ্যে কী

জনতার সংগ্রাম কখনও ব্যর্থ হয় না

বাঁচতে হলে মানতে হবে

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি

ছবি

স্মরণ : বোধিপাল মহাথেরো

সংকটে জীবন ও জীবিকা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

টিকাদান কর্মসূচির গতি বাড়াতে হবে

কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

ছবি

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি

ছবি

উদ্বাস্তু শিশুদের শিক্ষা

ক্ষমতায় ফিরছে তালেবান?

ন্যাপ : বাম ধারার উন্মেষ

ছবি

জনতার বিক্ষোভে অশান্ত কিউবা

রাষ্ট্র বনাম জনগণ, নাকি রাষ্ট্র ও জনগণ?

ছবি

করোনা যুদ্ধে মাস্কই প্রধান অস্ত্র

হাসপাতালের সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা

কাজুবাদাম সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা

টানেলের ওপারে যাওয়ার রোডম্যাপ চাই

করোনাকালে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ

উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি

ছবি

করোনা অতিমারীতে পাবলিক পরীক্ষা

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

মোস্তাফা জব্বার

সোমবার, ১৯ জুলাই ২০২১

চার

নানা সমীকরণে ভারতের সেনাবাহিনীর এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন ছিল যেটি রাজনীতি সচেতন, মুজিবের অনুগত, সাহসী ও প্রজ্ঞাবান। অন্যদিকে ২৬ মার্চের আগে যারা স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াইতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে চাননি। তারা খুব ভালো করে জানতেন যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সশস্ত্র হয়েছেন তারা সবাই মুজিবের আদর্শের সমর্থক হলেও ছাত্রলীগ কর্মী বা ত্যাগী সৈনিক নন কিংবা মুজিবের আদর্শে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নীতি ও আদর্শের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত নন। মুক্তিবাহিনীতে যোগদানকারী অনেকেই একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে মুজিবের আদর্শের স্বায়ত্তশাসনের বা ছয় দফার বিরোধিতা করেছেন। বস্তুত তৎকালে সমাজতন্ত্রের ধারাটি উচ্চকিত থাকায় শেখ মুজিবের স্বাধীনতার লড়াই অনেকটাই পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতার লড়াইটা পাকিস্তানি পুঁজির সঙ্গে বাঙালি পুঁজির বিরোধের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। বিশেষ করে পিকিংপন্থি বাম এবং উগ্র বামেরা এই ধারণা পোষণ করতেন। অনেকেই পরিস্থিতির চাপে পড়েও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হন। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী এই বিষয়ে তার লেখা একটি এই কথাটি স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই বাহিনীটি নিয়ে স্বীকৃতিহীনতার পাশাপাশি প্রচুর বিতর্কও আছে।

মুজিব বাহিনী গঠন প্রসঙ্গে ভারতীয় সংগঠক জেনারেল উবানের বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

‘গোলযোগের অশান্ত দিনগুলোতে আমরা একদল নিবেদিতপ্রাণ যুবনেতার কথা জানতে পারলাম, যারা বাংলাদেশে বেশ পরিচিত। তারা হলেনÑশেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, ও তোফায়েল আহমেদ। তাদের মনে হলো অত্যন্ত অনুপ্রাণিত, করতে অথবা মরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তাদের নেতৃত্বে গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, অস্থায়ী সরকার এদের তেমন মর্যাদা দিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা চাইছিলেন, এরা মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে ও যুদ্ধে অংশ নেবে। কিন্তু এই যুবনেতাদের তাতে দৃঢ় আপত্তি ছিল। (মুজিবের প্রতি তাদের গভীরতার আনুগত্যের ও নৈকট্যের কারণে তারা সবাই পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেল খেটেছেন মুজিবের সঙ্গে) তারা মুজিব বাহিনী নামে অভিহিত হতে পছন্দ করলেন। তারা তাদের পুরোনো সহকর্মীদের ক্যাডার হিসেবে বেছে বেছে সত্যায়িত করলেন।

ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সেক্রেটারি শ্রী আর এন কাও এ সময় আমার ঊর্ধ্বতন সিভিলিয়ান কর্মকর্তা ছিলেন। আওয়ামী লীগের যুব উইংয়ের নেতৃত্বে এবং খোদ সংগঠনটি সম্পর্কে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য জানার সুযোগ তার হয়েছিল। তার গভীর উপলব্ধি ছিল যে, তিনি আমার তত্ত্বাবধানে যে যুবনেতাদের দিয়েছিলেন, শুধু তাদের দ্বারাই আসল কাজটি হবে এবং তাদের বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অঞ্চলে কাজ করার জন্য বিশেষ মর্যাদা দেয়া দরকার। তিনি তাদের প্রতি অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীদের ঈর্ষার কথা জানতেন তাদের আপোসহীন মনোভাবের জন্য এবং মন্ত্রীদের উচ্চাকাক্সক্ষা ও অভিসন্ধির জন্য।’

ভারতীয় সংগঠকরা যেভাবেই মুজিব বাহিনীর গঠনকে ব্যাখ্যা করুন না কেন, বাংলাদেশের তারুণ্যের নিজস্ব ও আদর্শগত একটি সংগঠন দরকার ছিল বলেই মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। মুজিবের নামে বাহিনী গঠন করার চাইতে শ্রেষ্ঠতম কোন অর্জন আমাদের কাছে মনে হয়নি। এর সবচেয়ে সঙ্গত কারণ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যোগদানের ঐকান্তিক প্রেরণাই ছিলেন শেখ মুজিব। বিশেষ করে ৬৮ থেকে ৭১ সময়কালে মুজিবকে সারা দেশের একমাত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হই আমরা। তার সমসাময়িক নেতা মাওলানা ভাসানী বা মোজাফফর আহমদ বা কমরেড মণি সিংহ আর যাই হোন তাদের অনুসারীদের কাছেও অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন না, দেশের মানুষের কাছে তো ছিলেনই না। তার ওপরে ৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর একচেটিয়া বিজয় সব কিছুকে ছাপিয়ে তাকেই সবার ওপরে স্থাপন করেছিল। আমরা শেখ মুজিবের কথাকে বাণী এবং প্রশ্নাতীত মনে করতাম এবং তিনি আমাদের সামনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক যুবনেতাদের সম্পর্কে উবানের ধারণা ছিল অত্যন্ত উঁচু। বিএলএফের প্রধান দুই নেতা সম্পর্কে তার মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ ফজলুল হক মনি সম্পর্কে তিনি বলছেন : ‘হালকা-পাতলা গড়নের মানুষটি যেন এক জ্বলন্ত মশাল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাভাবিক নেতা বলে মনে হতো তাঁকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এবং যেকোনো আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। তোফায়েল ও রাজ্জাক তাকে শ্রদ্ধা করতেন। সিরাজও তা করতেন, কিন্তু মাত্র অল্প পরিমাণে। প্রায়ই আলোচনা গরম হয়ে উঠত। সিরাজ অপেক্ষা করতে চাইতেন না। কিন্তু সব সময় তারা একটা টিম হয়ে কাজ করতেন এবং যৌথ নেতৃত্বের ভালো উদাহরণ তুলে ধরতেন। তিনি র‌্যাডিকেল ধ্যানধারণা পোষণ করতেন। আপসহীন মনোভাবের ছিলেন। যুদ্ধ করতেন বাঘের মতো। কাজ করতেন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীতদাসের মতো। একসঙ্গে অনেক দিন তিনি না খেয়ে না ঘুমিয়ে শুধু চায়ের ওপর থাকতে পারতেন। বক্তৃতা দিতে তিনি পছন্দ করতেন না। কথা এমন বলতেন যে, বোঝা যেত তিনি কাজের লোক, কথার নয়। তৃণমূল কর্মীর মতো তিনি কথা বলতেন। তিনি প্রচার অপছন্দ করতেন। মুখ বুজে কাজ করে যেতে চাইতেন। চিরকুমার। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার ধরন ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি এমন মানুষ যাকে ভালোবাসতে হয়। তিনি আত্মোৎসর্গের প্রতীক। আমার শুধু এই ভয়ই ছিল যে দারিদ্র্যমুক্তির পথের ধীরগতিতে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না এবং হয়তো রূঢ় ও অগ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে অপ্রিয় হয়ে যাবেন। সিরাজুল আলম খানের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতি অবশ্যই আলোচনার বিষয় হিসেবে এখনও ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। যুদ্ধোত্তরকালে তিনি ছাত্রলীগের সেরা ও মেধাবী মানুষগুলোকে কেন বঙ্গবন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন, জাসদ গঠন করেছিলেন, কেন সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন এবং এখনও কোন রহস্যময় ভূমিকা পালন করছেন তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে। তার শিষ্যরা-রব, সিরাজ, ইনু যে রাজনৈতিক মেরুকরণকে বহন করছেন তারাই বা কি ভাবছেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে মুজিববাহিনীর স্বাধীনতা উত্তর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। জেনেছি সম্প্রতি তার জবানিতে শামসুদ্দিন আহমদের একটি বই বাজারে এসেছে। বইটি পেলে আরও বিস্তারিত কিছু লিখতে পারবো।

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে লিখেছেন, ‘বিএলএফের (তখনো মুজিব বাহিনী নামকরণ হয়নি) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল উবানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের (এসএফএল) একদল প্রশিক্ষকের হাতে। এর দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল, একটা দেরাদুনের চাকরাতা, অন্যটি আসামের হাফলং। প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করার জন্য চারটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এগুলোর অবস্থান ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ব্যারাকপুর। আঞ্চলিক অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তার সহকারী ছিলেন নূরে আলম জিকু। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল জলপাইগুড়ির কাছে পাংগা নামক স্থানে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তার সহকারী ছিলেন মনিরুল ইসলাম (বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি মার্শাল মনি নামে পরিচিত ছিলেন)। মধ্যাঞ্চলের ক্যাম্প ছিল মেঘালয়ের তুরা শহরে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। তার সহকারী ছিলেন সৈয়দ আহমদ। পূর্বাঞ্চলের (ঢাকাসহ) ক্যাম্প ছিল আগরতলায়। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। সহকারী ছিলেন আ স ম আব্দুর রব। কাজী আরেফ ছিলেন বিএলএফের গোয়েন্দা-প্রধান। বিএলএফের পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি করতেন শাজাহান সিরাজ। চার যুবনেতা নিজেদের নতুন নামকরণ করলেন। তারা নতুন নামেই অনেক জায়গায় নিজেদের পরিচয় দিতেন। নামগুলো সংক্ষেপে ছিল মনো (মনি), সরোজ (সিরাজ), রাজু (রাজ্জাক) ও তপন (তোফায়েল)। বিএলএফের চার আঞ্চলিক অধিনায়ককে লে. জেনারেল মর্যাদা ও প্রটোকল দেয়া হয়েছিল।

প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করা হতো মূলত ছাত্রলীগের সদস্যদের মধ্য থেকে। এ ছাড়া শ্রমিক লীগের অনেক সদস্যকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটি শুরু হয় মে মাসের শেষ সপ্তাহে এবং তা একটানা চলে অক্টোবর পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ ছিল ছয় সপ্তাহের। প্রশিক্ষণে হালকা ও মাঝারি অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি ও পরিকল্পনা- এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্ব দেয়া হয়। মোট কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। উবানের হিসাবমতে সংখ্যাটি ১০ হাজার। প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল সাত হাজার। নির্দেশ ছিল, প্রশিক্ষণ শেষে দেশের ভেতরে গিয়ে প্রত্যেক সদস্য আরও ১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং এভাবেই ৭০ হাজার সদস্যের একটি যোদ্ধা বাহিনী গড়ে উঠবে। দেশের ভেতরে গিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের খুঁজে বের করা, চারটি বেইস ক্যাম্প চালানো, প্রশিক্ষণার্থীদের বেইস ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদির খরচ মেটানোর জন্য ৭৬ লাখ টাকার একটা বাজেট তৈরি করে উবানের হাতে দেয়া হয়। বরাদ্দ হয়েছিল ৭০ লাখের কিছু বেশি। কয়েক কিস্তিতে টাকাটা দেয়া হয়।

অস্ত্র চালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের চারজন নেতাকে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত রাজনৈতিক পাঠ দেয়ার জন্য বাছাই করা হয়। তারা হলেন হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ ফ ম মাহবুবুল হক ও মাসুদ আহমেদ রুমি। তারা সবাই ছিলেন সিরাজপন্থি।

তৎকালে সমাজতন্ত্রের ধারাটি উচ্চকিত থাকায় শেখ মুজিবের স্বাধীনতার লড়াই অনেকটাই পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতার লড়াইটা পাকিস্তানি পুঁজির সঙ্গে বাঙালি পুঁজির বিরোধের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো

আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথাগত সরকার-পদ্ধতির বাইরে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ পাননি। তাদের অনেকেই মনে করতেন, দলের মধ্যকার ‘চরমপন্থি যুবকদের হঠকারী কার্যকলাপের’ ফলেই তাদের ভারতের মাটিতে এত কষ্ট করতে হচ্ছে। এ জন্য তারা বিএলএফের ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেক্টর কমান্ডাররা, যারা অস্থায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, বিএলএফের ব্যাপারে তাদেরও অনেক ক্ষোভ ছিল। তারা যুবকদের জন্য যার যার সেক্টরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তাদের হাতে সম্পদ ছিল অপ্রতুল। অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছিল না বললেই চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা পাঁচ-ছয় দিনের একটা মামুলি প্রশিক্ষণের পর তরুণদের নামমাত্র অস্ত্র দিয়ে দেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিতেন। তারা চেয়েছিলেন বিএলএফ আলাদা বাহিনী হিসেবে না থেকে তাদের কমান্ডে থাকুক। তারা এটা বুঝতে অক্ষম ছিলেন যে বিএলএফ প্রথাগত সেনাবাহিনী নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সংগঠন। তাজউদ্দীন বিএলএফের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিন্তু তিনি না পারতেন এদের তার নিয়ন্ত্রণে আনতে, না পারতেন এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে। তিনি ভালো করেই জানতেন, বিএলএফ ছিল শেখ মুজিবের নির্দেশিত একটি ‘অপশন’।

মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন: ১৮ ফেব্রুয়ারি ৭১ বঙ্গবন্ধু আমাদের চারজন- মনি ভাই, সিরাজ ভাই, আমি আর তোফায়েলকে ডাকলেন। ব্রিফিং দিলেন: ‘ওরা আমাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না, তোমার প্রস্তুতি সংঘবদ্ধ করো, সশস্ত্র বিপ্লব করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।’ তাজউদ্দীন ভাই একা উপস্থিত ছিলেন। আরও বললেন, ‘আমি না থাকলে এই তাজউদ্দীন হবে তোমাদের নেতা।”

ঢাকা। ২৬ মার্চ, ২০১৯। আপডেট ১৮ জুলাই, ২০২১।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং বিজয় ডিজিটাল শিক্ষা সফটওয়্যারের উদ্ভাবক]

back to top