alt

উপ-সম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের সংস্কৃতি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছিল বহু আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চার্চ, ক্লাব, স্টেডিয়াম, সুপার মার্কেটসহ সব জায়গায় বন্ধুকধারীদের হামলার ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর আমেরিকায় বন্দুকের গুলিতে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ডেমোক্র্যাটরা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষে হলেও রিপাবলিকানেরা সব সময় বিপক্ষে। ফলে বারবার চেষ্টা করেও আইনের সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। বন্দুক ক্রয় ও ব্যবহার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মিডিয়ার সামনে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। জো বাইডেন যত দ্রুত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে চেয়েছেন তত দ্রুত হবে না বলে আইন প্রণেতারা জানিয়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যেভাবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাও আইন প্রণেতাদের পরিকল্পনায় কাটছাঁট হয়ে গেছে। অবশেষে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে একটি আইন প্রণয়নে ১০ জন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একমত হয়ে একটি আন্তঃদলীয় গ্রুপ গঠন করেছে।

খামখেয়ালিপনায় যখন তখন যত্রতত্র গুলি করে মানুষ মেরে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের নিত্যদিনের ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে। গুলিবর্ষণের কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশির ভাগ আততায়ীর বয়স কম এবং ব্যক্তিগত কারণে সৃষ্ট আক্রোশ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি করে নিরপরাধী ব্যক্তিদের মারা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্ত বয়স্ক যে কেউ ডলার থাকলেই আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারে; অস্ত্র কিনতে আমাদের দেশের মতো সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এমন কি অস্ত্র ক্রেতার কোন অপরাধ রেকর্ড আছে কী না, তাও যাচাই করা হয় না। ঊনিশ-বিশ বছর বয়সের কিশোরেরাও অস্ত্র সংগ্রহ করে তাদের হেফাজতে রেখে দিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকারের বিপক্ষে কোন আইন পাস করার সাহস রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কারোই নেই। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত; তাই একের পর এক গণহত্যা ঘটে চললেও আমেরিকায় কঠোর অস্ত্র আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

১৯৪৯ সন থেকে এলোপাতাড়ি গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকান্ড চলতে থাকলেও ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ অনেক উগ্র জাতীয়তাবাদী যুবককে অভিবাসীদের প্রতি হিংসাত্মক কর্মকান্ড চালাতে প্ররোচিত করেছে। ওবামার আমলেও প্রবল বর্ণবিদ্বেষী এক প্রাক্তন মার্কিন সেনার এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণে শিখদের প্রার্থনাগৃহ গুরুদুয়ারায় অনেকের মৃত্যু হয়। জাতীয়তাবাদের উগ্রতা থেকে সৃষ্ট ঘৃণা বা বিদ্বেষের হিংসাত্মক প্রকাশ ঘটে বন্দুকের গুলিতে। বন্দুক সহজলভ্য না হলে খালি হাতে হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানো কঠিন। জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে আমেরিকা প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও নিজেদের অভ্যন্তরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নিতে সাহস করে না। অথচ জঙ্গি হামলার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ নিহত হয় অভ্যন্তরীণ বন্দুক হামলায়।

আমেরিকার ৩২ কোটি লোকের কাছে ৩১ কোটি অস্ত্র রয়েছে। অস্ত্র রাখাটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার বলে তারা বড়াই করে। অস্ত্রশস্ত্রের মালিকদের সংগঠন ‘ন্যাশনাল রাইফেলস অ্যাসোসিয়েশন’ বা এনআরএ এত বেশি ক্ষমতাশালী যে, তাদের চটাতে কোনো আইনপ্রণেতা সাহস করে না। রক্ষিত অস্ত্রগুলো বাসায় অযত্নে যত্রতত্র পড়ে থাকার কারণে বহু শিশু অস্ত্র নিয়ে খেলতে গিয়ে ট্রিগার টিপে নিজে মরে গেছে এবং অন্যদের মেরেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ লোক এসব হত্যাকান্ডের জন্য অস্ত্রের সহজ লভ্যতাকে দায়ী করে না; তারা বিশ্বাস করে যে, অস্ত্র নয় বরং অস্ত্র ব্যবহারকারী মানুষটিই হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী। তাদের ধারণা সবার হাতে অস্ত্র থাকলে অপরাধীরাও অপরাধ করতে ভয় পাবে। হলিউডের মারদাঙ্গা মুভিগুলোর প্রভাবে হয়তো কিশোর ও যুবকেরা হিরো হওয়ার বাসনায় খামখেয়ালির বশবর্তী হয়ে গুলি করে লোক মারে।

যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য পণ্যের মতোই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি হয়। কোন সামরিক অভ্যুত্থান নয়, অস্ত্র বহনে অধিকারী সাধারণ নাগরিকেরাই যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্টকে গুলি করে মেরে ফেলেছে,-আব্রাহাম লিংকন, জন কেনেডি, জেমস গারফিল্ড এবং উইলিয়াম ম্যাককিনলি। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানকেও ১৯৮১ সনে মাথায় গুলি করা হয়েছিল; ভাগ্যগুণে তিনি বেঁচে গেলেও সেই আক্রমণে তার প্রেস সেক্রেটারি পঙ্গু হয়ে যান। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের পাশাপাশি এন্ড্রু জ্যাকসন, রুজভেল্টকেও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সম্ভবত এই জন্যই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামাঞ্চলের মানুষ শহরের মানুষের চেয়ে বেশি অস্ত্র রাখে; শিকারের জন্য এবং আক্রমণ প্রতিহত করতে। গ্রামে পুলিশের দ্রুত উপস্থিতি শহরের মতো সম্ভব হয় না বলে নিজেদের রক্ষায় অস্ত্র রাখার অপরিহার্যতা অনুভব করে থাকে।

ওবামা একবার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় তাকে তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়। অন্যদিকে অস্ত্র ক্রেতার অতীত ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে ওবামার একটি নির্বাহী আদেশেরও বিরোধিতা করেছিলো রিপাবলিকানরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, অপরাধ বা মানসিক অসুখের তত্ত্ব তালাশে প্রাপ্ত সব তথ্য শতভাগ নিখুঁত হয় না। দুটি নির্বাচনে অস্ত্রের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, এই ইস্যু নিয়ে কথা বললে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো রাজ্য একসময় নিরাপত্তার খাতিরে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করেছে। আমেরিকার নাগরিকদের সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ডের মাধ্যমে অস্ত্র কেনা এবং বহনের অনুমতি দেয়া হয়েছে মূলত আমেরিকার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। আমেরিকার সবগুলো স্টেট মিলে ফেডারেল সরকার গঠন করলেও সবারই নিজস্ব সরকার এবং লোকাল আইন আছে। পুনরায় সিভিল ওয়ারের মতো সিচুয়েশনের উদ্ভব হলে সাধারণ নাগরিকেরা মিলে যাতে লোকাল মিলিশিয়া গঠন করে ফেডারেল আর্মির হাত থেকে নিজেদের রাজ্য রক্ষা করতে পারে সেজন্য সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ডে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, সাধারণ নাগরিকদের হাতে অস্ত্র থাকার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আমেরিকার মূল ভূখন্ডে সেনা প্রেরণ করতে ভয় পেয়েছিল।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমেরিকা অনেক অগ্রগামী; পৃথিবীর সব মেধাবীকে আমেরিকা তার নাগরিক করে নিতে পারলে খুশি হয়। দুনিয়ার শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বোধহয় ৬টিই তাদের। তাদের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর সব মেধাবীদের তীর্থস্থল। এই দেশটি এমন কতগুলো লোকের সৃষ্টি করেছে যাদের নাম বা আবিষ্কার পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত, বিল গেটসের মাইক্রোসফট, মার্ক জাকারবার্গের ফেসবুক, স্টিভ জবসের অ্যাপল কম্পিউটার ও মোবাইল সেট; কোকাকোলা, ম্যাকডোনাল্ড, পিৎজা হাট, কেএফসি, হটডগ, হলিউড, স্টিফেন স্পিলবার্গ, মেরিলিন মনরো। মানুষের অধিকার রক্ষায়, মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে এই দেশটি আপোসহীন। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকারের বিপক্ষে কোন আইন পাস করার সাহস রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কারোই নেই। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত; তাই একের পর এক গণহত্যা ঘটে চললেও আমেরিকায় কঠোর অস্ত্র আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

tab

উপ-সম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের সংস্কৃতি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছিল বহু আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চার্চ, ক্লাব, স্টেডিয়াম, সুপার মার্কেটসহ সব জায়গায় বন্ধুকধারীদের হামলার ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর আমেরিকায় বন্দুকের গুলিতে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ডেমোক্র্যাটরা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষে হলেও রিপাবলিকানেরা সব সময় বিপক্ষে। ফলে বারবার চেষ্টা করেও আইনের সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। বন্দুক ক্রয় ও ব্যবহার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মিডিয়ার সামনে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। জো বাইডেন যত দ্রুত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে চেয়েছেন তত দ্রুত হবে না বলে আইন প্রণেতারা জানিয়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যেভাবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাও আইন প্রণেতাদের পরিকল্পনায় কাটছাঁট হয়ে গেছে। অবশেষে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে একটি আইন প্রণয়নে ১০ জন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একমত হয়ে একটি আন্তঃদলীয় গ্রুপ গঠন করেছে।

খামখেয়ালিপনায় যখন তখন যত্রতত্র গুলি করে মানুষ মেরে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের নিত্যদিনের ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে। গুলিবর্ষণের কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশির ভাগ আততায়ীর বয়স কম এবং ব্যক্তিগত কারণে সৃষ্ট আক্রোশ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি করে নিরপরাধী ব্যক্তিদের মারা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্ত বয়স্ক যে কেউ ডলার থাকলেই আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারে; অস্ত্র কিনতে আমাদের দেশের মতো সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এমন কি অস্ত্র ক্রেতার কোন অপরাধ রেকর্ড আছে কী না, তাও যাচাই করা হয় না। ঊনিশ-বিশ বছর বয়সের কিশোরেরাও অস্ত্র সংগ্রহ করে তাদের হেফাজতে রেখে দিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকারের বিপক্ষে কোন আইন পাস করার সাহস রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কারোই নেই। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত; তাই একের পর এক গণহত্যা ঘটে চললেও আমেরিকায় কঠোর অস্ত্র আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

১৯৪৯ সন থেকে এলোপাতাড়ি গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকান্ড চলতে থাকলেও ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ অনেক উগ্র জাতীয়তাবাদী যুবককে অভিবাসীদের প্রতি হিংসাত্মক কর্মকান্ড চালাতে প্ররোচিত করেছে। ওবামার আমলেও প্রবল বর্ণবিদ্বেষী এক প্রাক্তন মার্কিন সেনার এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণে শিখদের প্রার্থনাগৃহ গুরুদুয়ারায় অনেকের মৃত্যু হয়। জাতীয়তাবাদের উগ্রতা থেকে সৃষ্ট ঘৃণা বা বিদ্বেষের হিংসাত্মক প্রকাশ ঘটে বন্দুকের গুলিতে। বন্দুক সহজলভ্য না হলে খালি হাতে হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানো কঠিন। জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে আমেরিকা প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও নিজেদের অভ্যন্তরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নিতে সাহস করে না। অথচ জঙ্গি হামলার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ নিহত হয় অভ্যন্তরীণ বন্দুক হামলায়।

আমেরিকার ৩২ কোটি লোকের কাছে ৩১ কোটি অস্ত্র রয়েছে। অস্ত্র রাখাটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার বলে তারা বড়াই করে। অস্ত্রশস্ত্রের মালিকদের সংগঠন ‘ন্যাশনাল রাইফেলস অ্যাসোসিয়েশন’ বা এনআরএ এত বেশি ক্ষমতাশালী যে, তাদের চটাতে কোনো আইনপ্রণেতা সাহস করে না। রক্ষিত অস্ত্রগুলো বাসায় অযত্নে যত্রতত্র পড়ে থাকার কারণে বহু শিশু অস্ত্র নিয়ে খেলতে গিয়ে ট্রিগার টিপে নিজে মরে গেছে এবং অন্যদের মেরেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ লোক এসব হত্যাকান্ডের জন্য অস্ত্রের সহজ লভ্যতাকে দায়ী করে না; তারা বিশ্বাস করে যে, অস্ত্র নয় বরং অস্ত্র ব্যবহারকারী মানুষটিই হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী। তাদের ধারণা সবার হাতে অস্ত্র থাকলে অপরাধীরাও অপরাধ করতে ভয় পাবে। হলিউডের মারদাঙ্গা মুভিগুলোর প্রভাবে হয়তো কিশোর ও যুবকেরা হিরো হওয়ার বাসনায় খামখেয়ালির বশবর্তী হয়ে গুলি করে লোক মারে।

যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য পণ্যের মতোই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি হয়। কোন সামরিক অভ্যুত্থান নয়, অস্ত্র বহনে অধিকারী সাধারণ নাগরিকেরাই যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্টকে গুলি করে মেরে ফেলেছে,-আব্রাহাম লিংকন, জন কেনেডি, জেমস গারফিল্ড এবং উইলিয়াম ম্যাককিনলি। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানকেও ১৯৮১ সনে মাথায় গুলি করা হয়েছিল; ভাগ্যগুণে তিনি বেঁচে গেলেও সেই আক্রমণে তার প্রেস সেক্রেটারি পঙ্গু হয়ে যান। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের পাশাপাশি এন্ড্রু জ্যাকসন, রুজভেল্টকেও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সম্ভবত এই জন্যই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামাঞ্চলের মানুষ শহরের মানুষের চেয়ে বেশি অস্ত্র রাখে; শিকারের জন্য এবং আক্রমণ প্রতিহত করতে। গ্রামে পুলিশের দ্রুত উপস্থিতি শহরের মতো সম্ভব হয় না বলে নিজেদের রক্ষায় অস্ত্র রাখার অপরিহার্যতা অনুভব করে থাকে।

ওবামা একবার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় তাকে তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়। অন্যদিকে অস্ত্র ক্রেতার অতীত ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে ওবামার একটি নির্বাহী আদেশেরও বিরোধিতা করেছিলো রিপাবলিকানরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, অপরাধ বা মানসিক অসুখের তত্ত্ব তালাশে প্রাপ্ত সব তথ্য শতভাগ নিখুঁত হয় না। দুটি নির্বাচনে অস্ত্রের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, এই ইস্যু নিয়ে কথা বললে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো রাজ্য একসময় নিরাপত্তার খাতিরে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করেছে। আমেরিকার নাগরিকদের সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ডের মাধ্যমে অস্ত্র কেনা এবং বহনের অনুমতি দেয়া হয়েছে মূলত আমেরিকার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। আমেরিকার সবগুলো স্টেট মিলে ফেডারেল সরকার গঠন করলেও সবারই নিজস্ব সরকার এবং লোকাল আইন আছে। পুনরায় সিভিল ওয়ারের মতো সিচুয়েশনের উদ্ভব হলে সাধারণ নাগরিকেরা মিলে যাতে লোকাল মিলিশিয়া গঠন করে ফেডারেল আর্মির হাত থেকে নিজেদের রাজ্য রক্ষা করতে পারে সেজন্য সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ডে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, সাধারণ নাগরিকদের হাতে অস্ত্র থাকার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আমেরিকার মূল ভূখন্ডে সেনা প্রেরণ করতে ভয় পেয়েছিল।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমেরিকা অনেক অগ্রগামী; পৃথিবীর সব মেধাবীকে আমেরিকা তার নাগরিক করে নিতে পারলে খুশি হয়। দুনিয়ার শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বোধহয় ৬টিই তাদের। তাদের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর সব মেধাবীদের তীর্থস্থল। এই দেশটি এমন কতগুলো লোকের সৃষ্টি করেছে যাদের নাম বা আবিষ্কার পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত, বিল গেটসের মাইক্রোসফট, মার্ক জাকারবার্গের ফেসবুক, স্টিভ জবসের অ্যাপল কম্পিউটার ও মোবাইল সেট; কোকাকোলা, ম্যাকডোনাল্ড, পিৎজা হাট, কেএফসি, হটডগ, হলিউড, স্টিফেন স্পিলবার্গ, মেরিলিন মনরো। মানুষের অধিকার রক্ষায়, মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে এই দেশটি আপোসহীন। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকারের বিপক্ষে কোন আইন পাস করার সাহস রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কারোই নেই। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত; তাই একের পর এক গণহত্যা ঘটে চললেও আমেরিকায় কঠোর অস্ত্র আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

back to top