alt

উপ-সম্পাদকীয়

সত্তরের ভাবনা : জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন

মোস্তাফা জব্বার

: সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২

৫১ বছর পরে একুশ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার লেখা একটি প্রবন্ধের ডিজিটাল কপি পেলাম। রক্তে আনো লাল নামক একটি স্মরণিকায় সেই লেখাটি ছাপা হয়। ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখা অমর একুশে সংকলন প্রকাশ করে; যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার সেই প্রবন্ধটি ছাপা হয়। সংকলনে সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক প্রয়াত এম আনিসুজ্জামান যিনি আমার প্রথম লেখা প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে ও প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদের লেখাও ছাপা হয়। লেখাটি আমার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে আমি গর্ববোধ করি এজন্য যে, সেখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল। আমার উত্তরসূরিরা দুজন প-িতের সাথে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপিয়ে আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। এখনও লেখাটি সমসাময়িক চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটায়। ৭০ সালে আমরা কি ভাবতাম তার প্রতিফলন এ লেখাটিতে রয়েছে। লেখাটি নিম্নরূপ-

মানুষ চিন্তাশীল। চিন্তার বিকাশে তার আত্মার বিকাশ ঘটে এবং সেই আস্থার জীবনেই মানুষের জীবন। ভাষা সেই চিন্তার প্রসার ও প্রকাশের মাধ্যম। ভাষাহীন চিন্তা করতে পারে না। তাই জীব জগতের একমাত্র মানুষই চিন্তাশীল, তার ভাষা আছে বলে। সুতরাং একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে চিন্তার সমিলতা থাকাটা স্বাভাবিক। সম্ভবত সেজন্যই ভাষাকেও জাতি গঠনের একটা পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতি বা ‘নেশনের’ বিজ্ঞানসম্মত পরিচয় হচ্ছে ‘পরস্পর’ একাত্মবোধ। কোনো একটা জনসমষ্টি একটা বিজাতীয় ঔপনিবেশিক শাসনে ক্রমে ক্রমে অধপাতে ধাবিত হবে। বিজাতীয় শক্তির জাতিগত নিপীড়ন, নির্যাতন ও চরম বঞ্চনার ফলে সৃষ্ট বেধনাবোধ, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার দুর্বার ইচ্ছায় অর্থাৎ স্বাধীনতা সম্ভোগের দুরন্ত বাসনায় সেই জনসমষ্টি জাতীয়তা বোধে উদ্দীপিত হবে।

বস্তুত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। অনেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সাম্রাজ্য বিস্তারের পদ্ধতি, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্ররূপে চিহ্নিত করেছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল তা নয়। দৃষ্টান্ত দেয়া হয়ে থাকে, জার্মান জাতীয়তাবাদকে। জার্মানির মানবতা বিরোধী ভূমিকা অবশ্য নিন্দনীয় এবং সেটা জাতীয়তাবাদের একটা বিকৃত ইচ্ছার প্রকাশ করেছে।

আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো জার্মানির মতো সাম্রাজ্য বিস্তারের বাসনা রাখে না এবং এ আন্দোলনে উপনিবেশবাদের বিস্তার রোধ করাও সম্ভব। সুতরাং কেবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা জাতীয় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় বিপ্লব সাধনের আজকের বিশ্বে ক্ষুদ্র শক্তিসমূহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহকে প্রতিহত করতে পারে। লক্ষণীয় যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়ে বিশেষ করে সর্বহারার শ্রেণিস্বার্থকে নস্যাৎ করে পুঁজিবাদী শোষণ কৌশলরূপে ব্যবহৃত হতে পারে এবং শুধু জাতীয় বিপ্লবই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকের মুক্তি আনতে পারে না। জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা যায় ও বিজাতীয় পুঁজির বিকাশ রুদ্ধ হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও বিজাতীয় পুঁজির দ্বন্দ্বের অবসান হওয়ার জাতীয় পুঁজি বিকাশের যথার্থ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে। সেই মুহূর্তে যদি সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। লক্ষ্যচ্যুত জাতীয় বিপ্লব তখন মুষ্টিমেয়র স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করে জাতীয় বণিক শ্রেণী সিংহাসনে বসলে, মূলত প্রভুত্বের রদ বদলই হয়ে যাবে।

শোষক শোষকই এদের কোন জাত নেই ॥ জাতীয় শোষক ও শোষক বিজাতীয় তো বটেই। জাতীয় বিপ্লব পর্যন্ত জাতীয় বণিক শ্রেণি জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের সহায়তা করে থাকে। তাদের আশা থাকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিতাড়িত হলে নিজেরাই শোষণ করার পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন; কিন্তু তাদের ট্র্যাজেডি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের দানবীয় গ্রাস থেকে মুক্তি পাবার জন্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে এবং অনেকেই সফল হয়েছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম, কিউবা তার জলন্ত প্রমাণ। পক্ষান্তরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও মধ্যপ্রাচ্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি জাতীয়তাবাদই। আমাদের দেশেও পাঞ্জাবী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে আন্তর্জাতিক কারণে সরাসরি রাজ্য আক্রমণ খুব একটা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাল, তলোয়ার নিয়ে রাজ্য দখল করতে পারলেই বিশ্ব তা মেনে নিচ্ছে না। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের নতুন আবরণ এসেছে। উপনিবেশ বিস্তারের জন্য লুকানো হস্ত প্রসারিত হয় অওউ-র মাধ্যমে বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ নিয়ে। এই নয়া উপনিবেশবাদী কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পূর্বেই বলেছি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। বিজাতীয় শাসন ও শোষণকে উৎখাত করে জাতীয় জীবনের সর্বাাঙ্গ থেকে বিজাতীয় প্রভাব মুছে ফেলে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও ভাবাদর্শের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ও মূল লক্ষ্য। অতএব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারলে ও সার্থক রূপ দেয়া সম্ভব হলে বিপ্লবের পরবর্তী স্তরে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নির্মূল হয়।

মানুষের দেশগত একটা পরিচয় আছে। দেশের জলবায়ু, সমাজ, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি সভ্যতা ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ে মানুষ নিজেকে পরিচিত করতে ভালোবাসে। তার মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় মূল্যবোধ অগ্রসরমান হয়। সে নিজেকে চিনে তার পাশের মানুষকে দিয়ে। একে অন্যে পাশাপাশি জানাজানি, গুহাচারী ও গোত্রীয় মানুষকেও পরস্পরের আত্মীয় করে তুলেছে। পরস্পর ভাব বিনিময়ের জন্য প্রয়োজন পড়েছে কিছু কিছু সংকেতের তা দৈহিকই হোক আর ধ্বনিগতই হোক, মানুষ যতই সভ্য হয়েছে, ধ্বনিগত সংকেতের ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈহিক সংকেতগুলোর প্রকাশ আজও নৃত্যে ব্যবহৃত হয়। আর ধ্বনিগত সংকেতগুলো ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হয়ে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। জাগতিক বিবর্তনের তাগিদে মানুষের গুহা জীবন, গোত্রীয় জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন বারবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নতুন নতুন জনসমষ্টি একত্র হয়েছে। সেই ভাঙ্গা গড়ার সাথে সাথে ভাষারও ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। কালে কালে বিলুপ্ত হয়েছে কোনো ভাষা। নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। ধ্বংসের মাঝে জন্মেছে নতুন। ভাষা ও জাতি সম্পর্কযুক্ত এ জন্যই যে জাতি গঠনেও বিশেষ জনমসষ্টির পরস্পর একাত্মবোধের দরকার, ভাষা গঠনেও জনসমষ্টির ঐক্যবন্ধন আবশ্যকীয়। গোত্রযুগে একটা গোত্র যখন অন্য গোত্র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তখন আক্রান্ত গোত্রে স্বভাবতই একটা ঐক্য গড়ে উঠেছে। অনাত্মীয়কে প্রতিহত করার ও শত্রুর অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য, পরস্পর ভেদাভেদ তুলে, শ্রেণী চেতনাকে অস্বীকার করে সম্মিলিত সংগ্রাম চালিয়েছে। আধুনিক যুগে বিজাতীয় আক্রমণ আরো তীক্ষè ও জঘণ্য হয়েছে। পুঁজিবাদী দেশসমূহ তাদের উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের বাজারের আশায় ও কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সাধারণ উপনিবেশ বিস্তার করে থাকে। আক্রান্ত উপনিবেশের জনগণ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে রুখে দাঁড়ায়। ভাষা সেই ঐক্য বন্ধনের বাণী প্রচার করে মানুষকে মানুষের আরও কাছের, আরও গভীর আত্মীয়ে পরিণত করে।

পাকিস্তান হলো। বাঙালিদের তাতে সমর্থন ছিল মুক্তির আশায়; কিন্তু পাকিস্তানি মুসলিম ধনিক সম্প্রদায় তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে তৎপর হলেন। পাকিস্তানে যে সব জাতি বা জাতির অংশ অন্তর্ভুক্ত হলো, ধনিক সম্প্রদায় প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঙালিরা এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন। আর্য, সেন, পাল, মোগল, পাঠান, ইংরেজ সবাই বাঙালিদের সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকতো। তাদের আশঙ্কা হচ্ছিলো যে কোনো সময় বাঙালিদের পাকিস্তানি মুসলিম ধনিকের স্বার্থোদ্ধারের পথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে এবং তারা পাঞ্জাবের মানুষের ওপর একটু বেশি আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেজন্য মুসলিক ধনিক সম্প্রদায়ের আক্রমণ চললো বাঙালিদের লক্ষ্য করে। ভাষা চক্রান্তে তার প্রথম প্রকাশ ঘটে।

জাতীয়তাবোধ মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যেতে পারে না। শতাব্দীর পর শতাব্দীর শোষণে বাঙালিরা কোনোমতে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রেখেছিল, তেমনি তার ছিল নিজের সব কিছুর প্রতিই একটা মমত্ববোধ। ধনিক চক্রের ও সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়াল চক্রান্ত বাঙালি চিত্তে প্রবল নাড়া লাগলো। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে ঘিরে ঘটলো এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণই পাকিস্তানোত্তর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রকাশ ও সূচনা।

বাঙালির একটা দেশ আছে। সেই দেশের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় আছে। স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সর্বোপরি একটা বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে, যা সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালিকে একটা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সব মানুষেরই, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকে। চিন্তাশীল মানুষ সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন। দৈশিক পরিধিতে, কালিক চেতনা নিয়ে জাতীয় পরিচয়ে মানুষ শিল্প সাহিত্যের লালন করে। শিল্প সাহিত্য, তাই তার অতি প্রিয় বস্তু, আত্মার আত্মীয়। কেননা জাতীয় ভাবাদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধে ক্রমে ক্রমে সে গড়ে তুলে শিল্প সাহিত্যের ভিত্তি। শিল্প সাহিত্যে লালন করে সে জাতীয় মনন। সেই মননশীলতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই যথার্থই বলা হয়, ‘জাতিকে বাদ দিয়ে যেমন মানুষকে ভাবা যায় না, মাটিকে বাদ দিয়ে তেমনি মানুষের অস্তিত্ব থাকে না, দৈশিক পরিচিতি ব্যতীত মানুষের মননশীলতার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না।’

ভাষা যুগে যুগে সংস্কৃতি-প্রবাহকে বহন করে; কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয়, সে দেশে দেশীয় ভাষার মর্যাদা থাকে না। ঔপনিবেশিক নিগঢ়ে দেশীয় ভাষাকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, নয়তো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাবে দেশীয় ভাষা লুপ্ত হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষা হয়ে যায় উপনিবেশের ভাষা। পাকিস্তানের তাই হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধী, বেলুচী, পশতু, পাঞ্জাবী ভাষাগুলো ক্রমে ক্রমে উর্দুর চাপে লুপ্ত হতে চলেছে। সম্প্রতি খোদ সেখানেও সিন্ধীরা উর্দুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

ভাষা আন্দোলনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম তার নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল কেবল সংস্কৃতিসেবীদের হাতে। কিন্তু অতি দ্রুত নেতৃত্ব অতি দ্রুত একটি ছাত্রসংগঠনের কাছে চলে যায়। কেননা তখন ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষা আন্দোলনই ছিল না সেটা একটা জাতির সঠিক বিক্ষোভের বাহন হয়ে পড়ে। তার সাথে যুক্ত হয় জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাসমূহ। ক্রমে ক্রমে সেই আন্দোলন ৫৪ সালের নির্বাচনী সংগ্রাম, অমর শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ৬৬ সালে একটা সুষ্ঠু কর্মসূচি পেয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথান সেই আন্দোলনকে করেছে আরো সুসংহত, আরো বেগবান।

৭০ সালের বাঙালি সুসংবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ বাঙালি। স্থির চিত্তে মুক্তির শপথে তার অনঢ় অবস্থান। সাম্রাজ্যবাদী চক্র ভাষা সমস্যার বাঙালিদের একটা ‘কনসেশন’ দিয়েছে ঠিকই কিন্তু প্রকারান্তরে ভেঙ্গে ফেলেছে বাঙলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদ-।

বাংলাদেশ হয়েছে একটা উপনিবেশ। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বিস্ফোরণ হয়েছিল ৫২ সালে; উত্তপ্ত বাংলাদেশ এখন তার চরম বিস্ফোরণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায়।

তখন বাংলাদেশে কেবল একটি মাত্র ছাত্র সংগঠনই ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে, বর্তমানে সেটা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (এখন সেটি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ)।

[লেখক : ৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সত্তরের ভাবনা : জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন

মোস্তাফা জব্বার

সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২

৫১ বছর পরে একুশ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার লেখা একটি প্রবন্ধের ডিজিটাল কপি পেলাম। রক্তে আনো লাল নামক একটি স্মরণিকায় সেই লেখাটি ছাপা হয়। ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখা অমর একুশে সংকলন প্রকাশ করে; যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার সেই প্রবন্ধটি ছাপা হয়। সংকলনে সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক প্রয়াত এম আনিসুজ্জামান যিনি আমার প্রথম লেখা প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে ও প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদের লেখাও ছাপা হয়। লেখাটি আমার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে আমি গর্ববোধ করি এজন্য যে, সেখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল। আমার উত্তরসূরিরা দুজন প-িতের সাথে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপিয়ে আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। এখনও লেখাটি সমসাময়িক চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটায়। ৭০ সালে আমরা কি ভাবতাম তার প্রতিফলন এ লেখাটিতে রয়েছে। লেখাটি নিম্নরূপ-

মানুষ চিন্তাশীল। চিন্তার বিকাশে তার আত্মার বিকাশ ঘটে এবং সেই আস্থার জীবনেই মানুষের জীবন। ভাষা সেই চিন্তার প্রসার ও প্রকাশের মাধ্যম। ভাষাহীন চিন্তা করতে পারে না। তাই জীব জগতের একমাত্র মানুষই চিন্তাশীল, তার ভাষা আছে বলে। সুতরাং একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে চিন্তার সমিলতা থাকাটা স্বাভাবিক। সম্ভবত সেজন্যই ভাষাকেও জাতি গঠনের একটা পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতি বা ‘নেশনের’ বিজ্ঞানসম্মত পরিচয় হচ্ছে ‘পরস্পর’ একাত্মবোধ। কোনো একটা জনসমষ্টি একটা বিজাতীয় ঔপনিবেশিক শাসনে ক্রমে ক্রমে অধপাতে ধাবিত হবে। বিজাতীয় শক্তির জাতিগত নিপীড়ন, নির্যাতন ও চরম বঞ্চনার ফলে সৃষ্ট বেধনাবোধ, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার দুর্বার ইচ্ছায় অর্থাৎ স্বাধীনতা সম্ভোগের দুরন্ত বাসনায় সেই জনসমষ্টি জাতীয়তা বোধে উদ্দীপিত হবে।

বস্তুত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। অনেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সাম্রাজ্য বিস্তারের পদ্ধতি, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্ররূপে চিহ্নিত করেছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল তা নয়। দৃষ্টান্ত দেয়া হয়ে থাকে, জার্মান জাতীয়তাবাদকে। জার্মানির মানবতা বিরোধী ভূমিকা অবশ্য নিন্দনীয় এবং সেটা জাতীয়তাবাদের একটা বিকৃত ইচ্ছার প্রকাশ করেছে।

আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো জার্মানির মতো সাম্রাজ্য বিস্তারের বাসনা রাখে না এবং এ আন্দোলনে উপনিবেশবাদের বিস্তার রোধ করাও সম্ভব। সুতরাং কেবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা জাতীয় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় বিপ্লব সাধনের আজকের বিশ্বে ক্ষুদ্র শক্তিসমূহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহকে প্রতিহত করতে পারে। লক্ষণীয় যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়ে বিশেষ করে সর্বহারার শ্রেণিস্বার্থকে নস্যাৎ করে পুঁজিবাদী শোষণ কৌশলরূপে ব্যবহৃত হতে পারে এবং শুধু জাতীয় বিপ্লবই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকের মুক্তি আনতে পারে না। জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা যায় ও বিজাতীয় পুঁজির বিকাশ রুদ্ধ হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও বিজাতীয় পুঁজির দ্বন্দ্বের অবসান হওয়ার জাতীয় পুঁজি বিকাশের যথার্থ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে। সেই মুহূর্তে যদি সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। লক্ষ্যচ্যুত জাতীয় বিপ্লব তখন মুষ্টিমেয়র স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করে জাতীয় বণিক শ্রেণী সিংহাসনে বসলে, মূলত প্রভুত্বের রদ বদলই হয়ে যাবে।

শোষক শোষকই এদের কোন জাত নেই ॥ জাতীয় শোষক ও শোষক বিজাতীয় তো বটেই। জাতীয় বিপ্লব পর্যন্ত জাতীয় বণিক শ্রেণি জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের সহায়তা করে থাকে। তাদের আশা থাকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিতাড়িত হলে নিজেরাই শোষণ করার পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন; কিন্তু তাদের ট্র্যাজেডি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের দানবীয় গ্রাস থেকে মুক্তি পাবার জন্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে এবং অনেকেই সফল হয়েছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম, কিউবা তার জলন্ত প্রমাণ। পক্ষান্তরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও মধ্যপ্রাচ্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি জাতীয়তাবাদই। আমাদের দেশেও পাঞ্জাবী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে আন্তর্জাতিক কারণে সরাসরি রাজ্য আক্রমণ খুব একটা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাল, তলোয়ার নিয়ে রাজ্য দখল করতে পারলেই বিশ্ব তা মেনে নিচ্ছে না। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের নতুন আবরণ এসেছে। উপনিবেশ বিস্তারের জন্য লুকানো হস্ত প্রসারিত হয় অওউ-র মাধ্যমে বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ নিয়ে। এই নয়া উপনিবেশবাদী কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পূর্বেই বলেছি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। বিজাতীয় শাসন ও শোষণকে উৎখাত করে জাতীয় জীবনের সর্বাাঙ্গ থেকে বিজাতীয় প্রভাব মুছে ফেলে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও ভাবাদর্শের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ও মূল লক্ষ্য। অতএব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারলে ও সার্থক রূপ দেয়া সম্ভব হলে বিপ্লবের পরবর্তী স্তরে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নির্মূল হয়।

মানুষের দেশগত একটা পরিচয় আছে। দেশের জলবায়ু, সমাজ, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি সভ্যতা ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ে মানুষ নিজেকে পরিচিত করতে ভালোবাসে। তার মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় মূল্যবোধ অগ্রসরমান হয়। সে নিজেকে চিনে তার পাশের মানুষকে দিয়ে। একে অন্যে পাশাপাশি জানাজানি, গুহাচারী ও গোত্রীয় মানুষকেও পরস্পরের আত্মীয় করে তুলেছে। পরস্পর ভাব বিনিময়ের জন্য প্রয়োজন পড়েছে কিছু কিছু সংকেতের তা দৈহিকই হোক আর ধ্বনিগতই হোক, মানুষ যতই সভ্য হয়েছে, ধ্বনিগত সংকেতের ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈহিক সংকেতগুলোর প্রকাশ আজও নৃত্যে ব্যবহৃত হয়। আর ধ্বনিগত সংকেতগুলো ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হয়ে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। জাগতিক বিবর্তনের তাগিদে মানুষের গুহা জীবন, গোত্রীয় জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন বারবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নতুন নতুন জনসমষ্টি একত্র হয়েছে। সেই ভাঙ্গা গড়ার সাথে সাথে ভাষারও ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। কালে কালে বিলুপ্ত হয়েছে কোনো ভাষা। নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। ধ্বংসের মাঝে জন্মেছে নতুন। ভাষা ও জাতি সম্পর্কযুক্ত এ জন্যই যে জাতি গঠনেও বিশেষ জনমসষ্টির পরস্পর একাত্মবোধের দরকার, ভাষা গঠনেও জনসমষ্টির ঐক্যবন্ধন আবশ্যকীয়। গোত্রযুগে একটা গোত্র যখন অন্য গোত্র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তখন আক্রান্ত গোত্রে স্বভাবতই একটা ঐক্য গড়ে উঠেছে। অনাত্মীয়কে প্রতিহত করার ও শত্রুর অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য, পরস্পর ভেদাভেদ তুলে, শ্রেণী চেতনাকে অস্বীকার করে সম্মিলিত সংগ্রাম চালিয়েছে। আধুনিক যুগে বিজাতীয় আক্রমণ আরো তীক্ষè ও জঘণ্য হয়েছে। পুঁজিবাদী দেশসমূহ তাদের উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের বাজারের আশায় ও কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সাধারণ উপনিবেশ বিস্তার করে থাকে। আক্রান্ত উপনিবেশের জনগণ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে রুখে দাঁড়ায়। ভাষা সেই ঐক্য বন্ধনের বাণী প্রচার করে মানুষকে মানুষের আরও কাছের, আরও গভীর আত্মীয়ে পরিণত করে।

পাকিস্তান হলো। বাঙালিদের তাতে সমর্থন ছিল মুক্তির আশায়; কিন্তু পাকিস্তানি মুসলিম ধনিক সম্প্রদায় তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে তৎপর হলেন। পাকিস্তানে যে সব জাতি বা জাতির অংশ অন্তর্ভুক্ত হলো, ধনিক সম্প্রদায় প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঙালিরা এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন। আর্য, সেন, পাল, মোগল, পাঠান, ইংরেজ সবাই বাঙালিদের সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকতো। তাদের আশঙ্কা হচ্ছিলো যে কোনো সময় বাঙালিদের পাকিস্তানি মুসলিম ধনিকের স্বার্থোদ্ধারের পথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে এবং তারা পাঞ্জাবের মানুষের ওপর একটু বেশি আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেজন্য মুসলিক ধনিক সম্প্রদায়ের আক্রমণ চললো বাঙালিদের লক্ষ্য করে। ভাষা চক্রান্তে তার প্রথম প্রকাশ ঘটে।

জাতীয়তাবোধ মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যেতে পারে না। শতাব্দীর পর শতাব্দীর শোষণে বাঙালিরা কোনোমতে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রেখেছিল, তেমনি তার ছিল নিজের সব কিছুর প্রতিই একটা মমত্ববোধ। ধনিক চক্রের ও সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়াল চক্রান্ত বাঙালি চিত্তে প্রবল নাড়া লাগলো। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে ঘিরে ঘটলো এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণই পাকিস্তানোত্তর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রকাশ ও সূচনা।

বাঙালির একটা দেশ আছে। সেই দেশের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় আছে। স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সর্বোপরি একটা বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে, যা সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালিকে একটা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সব মানুষেরই, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকে। চিন্তাশীল মানুষ সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন। দৈশিক পরিধিতে, কালিক চেতনা নিয়ে জাতীয় পরিচয়ে মানুষ শিল্প সাহিত্যের লালন করে। শিল্প সাহিত্য, তাই তার অতি প্রিয় বস্তু, আত্মার আত্মীয়। কেননা জাতীয় ভাবাদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধে ক্রমে ক্রমে সে গড়ে তুলে শিল্প সাহিত্যের ভিত্তি। শিল্প সাহিত্যে লালন করে সে জাতীয় মনন। সেই মননশীলতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই যথার্থই বলা হয়, ‘জাতিকে বাদ দিয়ে যেমন মানুষকে ভাবা যায় না, মাটিকে বাদ দিয়ে তেমনি মানুষের অস্তিত্ব থাকে না, দৈশিক পরিচিতি ব্যতীত মানুষের মননশীলতার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না।’

ভাষা যুগে যুগে সংস্কৃতি-প্রবাহকে বহন করে; কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয়, সে দেশে দেশীয় ভাষার মর্যাদা থাকে না। ঔপনিবেশিক নিগঢ়ে দেশীয় ভাষাকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, নয়তো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাবে দেশীয় ভাষা লুপ্ত হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষা হয়ে যায় উপনিবেশের ভাষা। পাকিস্তানের তাই হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধী, বেলুচী, পশতু, পাঞ্জাবী ভাষাগুলো ক্রমে ক্রমে উর্দুর চাপে লুপ্ত হতে চলেছে। সম্প্রতি খোদ সেখানেও সিন্ধীরা উর্দুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

ভাষা আন্দোলনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম তার নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল কেবল সংস্কৃতিসেবীদের হাতে। কিন্তু অতি দ্রুত নেতৃত্ব অতি দ্রুত একটি ছাত্রসংগঠনের কাছে চলে যায়। কেননা তখন ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষা আন্দোলনই ছিল না সেটা একটা জাতির সঠিক বিক্ষোভের বাহন হয়ে পড়ে। তার সাথে যুক্ত হয় জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাসমূহ। ক্রমে ক্রমে সেই আন্দোলন ৫৪ সালের নির্বাচনী সংগ্রাম, অমর শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ৬৬ সালে একটা সুষ্ঠু কর্মসূচি পেয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথান সেই আন্দোলনকে করেছে আরো সুসংহত, আরো বেগবান।

৭০ সালের বাঙালি সুসংবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ বাঙালি। স্থির চিত্তে মুক্তির শপথে তার অনঢ় অবস্থান। সাম্রাজ্যবাদী চক্র ভাষা সমস্যার বাঙালিদের একটা ‘কনসেশন’ দিয়েছে ঠিকই কিন্তু প্রকারান্তরে ভেঙ্গে ফেলেছে বাঙলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদ-।

বাংলাদেশ হয়েছে একটা উপনিবেশ। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বিস্ফোরণ হয়েছিল ৫২ সালে; উত্তপ্ত বাংলাদেশ এখন তার চরম বিস্ফোরণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায়।

তখন বাংলাদেশে কেবল একটি মাত্র ছাত্র সংগঠনই ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে, বর্তমানে সেটা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (এখন সেটি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ)।

[লেখক : ৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন]

back to top